ঈশ্বরের যত্ন থেকে আমি কিভাবে উপকৃত হয়েছিলাম
১৮ই মে, ১৯৬৩ সালের ভোর বেলা, আমি অত্যন্ত খোশমেজাজে ঘুম থেকে উঠি। সেটি ছিল একটি অপূর্ব উষ্ম রৌদ্রজ্জ্বল দিনের শুরু। কিন্তু কেন সেই দিনটি আমার জন্য এক বিশেষ অর্থ রেখেছিল তা বলার আগে, আসুন আমি আমার নিজের বিষয় আপানাদের কিছু জানাই।
আমি ২০শে মে, ১৯৩২ সালে, পেনিসিলভানিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, ফিলাডেলফিয়ায় জন্মগ্রহণ করি এবং পরিবারের চারটি মেয়ের মধ্যে আমিই ছিলাম সবচাইতে ছোট। আমার বয়স যখন দুবছর তখন আমার মা মারা যান আর আমি যখন পাঁচ বছরের মেয়ে তখন আমার বাবা আবার বিবাহ করেন। কালক্রমে আরও ছয়জন ভাই ও বোন আমাদের পরিবারের সাথে যুক্ত হয়। আমরা সকলে ব্যাপ্টিস্ট গির্জার সদস্য ছিলাম এবং কোন এক সময় আমি এমনকি সানডে-স্কুলের শিক্ষিকা হতে চেয়েছিলাম।
যেহেতু আমি গ্রন্থিবাত নিয়েই জন্মাই, সুতরাং আমার শৈশব কাটে অত্যন্ত অসুবিধার মধ্য দিয়ে। যখন আমার নয় বছর বয়স, তখন একজন ডাক্তার আমাকে বলেন যে যতই দিন যেতে থাকবে ততই আমার পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। দুঃখের বিষয় হল যে তার এই অনুমান সত্য প্রমাণিত হয়। আমার যখন ১৪ বছর বয়স তখন আমি আর হাঁটতে পারতাম না। পরিশেষে আমার হাত, পায়ের পাতা এবং সম্পূর্ণ পাটি বিকলাঙ্গ হয়ে যায় আর তার সাথে আমার উরুদেশও অবশ হয়ে পড়ে। আমার আঙুলগুলি এমন বিকৃতরূপ ধারণ করে যে আমার পক্ষে কিছু লেখা বা কোন জিনিস তোলা অত্যন্ত কষ্টকর হত। আমার এই অবস্থার জন্য, সাধারণ স্কুলে ফেরা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
১৪ বছর বয়সে যখন আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন আমার খুব ভাল লেগেছিল কারণ নার্সেরা আমাকে তাদের সাহায্য করার জন্য ছোটখাটো কিছু কাজ করতে দিত। এই কাজগুলি করতে আমার খুব ভাল লাগত। শেষ পর্যন্ত আমি এমন একটা সময় পৌঁছালাম যখন আমার পক্ষে একলা উঠে বসা সম্ভব ছিল না। ডাক্তারেরা আমার বাবামাকে জানান যে তারা আমার জন্য এর থেকে বেশি আর কিছু করতে পারবেন না, ফলে তিন মাস হাসপাতালে থাকার পর আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তী দুবছর, অর্থাৎ আমার যখন ১৬ বছর বয়স, সেই পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে থাকা ছাড়া আমি বিশেষ কিছুই করিনি। ঘরের মধ্যে পড়াশোনা করার কিছু ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু আমার অবস্থা ক্রমশই খারাপের দিকে যেতে লাগল। আমার ডান পায়ের গোড়ালিতে ঘা দেখা দেয় এবং তার সাথে বাতজনিত জ্বরের সূচনা হয়, যার ফলে আমাকে আবার হাসপাতালে ফিরে যেতে হয়। সেখানে আমি ১৭ বছরে পা দিই। আবার আমাকে তিন মাস হাসপাতালে থাকতে হয়। যখন আমি বাড়িতে ফিরে আসি তখন ঘরের মধ্যে পড়াশোনা করার মত ক্ষমতা আমার ছিল না।
যখন আমার বয়স ২০, আমি অত্যন্ত হতাশায় ভুগতে আরম্ভ করি এবং অধিকাংশ সময় আমি কেঁদেই কাটিয়ে দিতাম। আমি জানতাম যে ঈশ্বর আছেন এবং আমি অনেকবার সাহায্যের জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা জানাই।
ভবিষ্যতের জন্য এক আশা
আমার গোড়ালির চিকিৎসার জন্য যখন আমি ফিলাডেলফিয়া জেনেরাল হাসপাতালে ছিলাম তখন আমি মিরিয়াম কেলাম নামে একটি ছোট মেয়ের সাথে এক ঘরে থাকতাম। আমরা দুজনে খুব বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। যখন মিরিয়ামের বোন ক্যাথরিন মাইলস তাকে দেখতে আসত, তখন ক্যাথরিন আমাকে কিছু বাইবেলের তথ্য জানাত। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমি কোন না কোনভাবে ক্যাথরিনের সাথে যোগাযোগ রাখতে পেরেছিলাম, যে ছিল একজন যিহোবার সাক্ষী।
দুঃখের বিষয় হল যে, আমার সৎ মা আমাকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। আমার বয়স যখন ২৫ বছর আমি আমার বড় বোনের বাড়িতে থাকতে আরম্ভ করি আর ক্যাথরিনও সেই বাড়িরই কাছে একটি ঘর নিয়ে উঠে আসে। আমি তার সাথে যোগাযোগ করি এবং সে এসে আমার সাথে অধ্যয়ন সহায়ক হিসাবে ঈশ্বর যেন সত্য হোন (ইংরাজি) বইটির সাহায্যে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করে। এটা জানা আমার পক্ষে কতই না আনন্দের ছিল যে আমি চিরকাল পঙ্গু থাকব না এবং সমস্ত দুষ্টতা একদিন চলে যাবে! (হিতোপদেশ ২:২১, ২২; যিশাইয় ৩৫:৫, ৬) এই সত্যগুলি আর তার সাথে পুনরুত্থানের আশা এবং আমার মাকে আবার দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা আমাকে খুব আকৃষ্ট করে।—প্রেরিত ২৪:১৫.
আমি সঙ্গে সঙ্গে যিহোবার সাক্ষীদের সভাগুলিতে যোগদান করতে শুরু করি। ক্যাথরিনের স্বামী তাদের গাড়ি করে আমাকে কিংডম হলে নিয়ে যেত। যখন আমি সভাতে যেতাম তখন আমার প্রতি যেধরনের প্রেম দেখানো হত তার দ্বারা আমি খুবই উৎসাহ বোধ করতাম।
বাধাগুলি অতিক্রম করা
দুঃখের বিষয় যে আমার বোন ও তার স্বামীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যার ফলে আমাকে আবার আমার বাবা ও সৎ মায়ের কাছে ফিরে যেতে হয়। যেহেতু আমার সৎ মা অত্যন্ত যিহোবার সাক্ষীদের বিরুদ্ধে ছিলেন, তাই আমাকে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৩ অবধি গোপনে বাইবেল পড়তে হত। তিনি কোন যিহোবার সাক্ষীকে বাড়িতে আসতে দিতেন না। আমি টেলিফোনের মারফতে বিভিন্ন লোকের সাথে অধ্যয়ন করতাম অথবা যখন আমি হাসপাতালে থাকতাম তখন সেখানে পড়তাম।
আরেকটা বাধা ছিল যে অনেক সময় আমার সৎ মা আমাকে খাওয়াতে ও চান করাতে চাইতেন না। একবার তিনি আট মাস আমার মাথা ধোয়াননি। আর তার অনুমতি বিনা তিনি আমাকে আমার চিঠি পর্যন্ত পড়তে দিতেন না। কিন্তু যিহোবার যত্নের পরিচয় পাওয়া যায় যখন আমার ভাই তার বাড়িতে আমার চিঠিগুলি আসার অনুমতি দেয়। এই ব্যবস্থা একজন খ্রীষ্টীয় বোন যার নাম প্যাট স্মিথ এবং যার সাথে আমি চিঠি আদানপ্রদান করতাম তাকে সাহায্য করেছিল আমার সাথে যোগাযোগ রাখতে এবং শাস্ত্রীয় উৎসাহ দিতে। আমার ভাই তার চিঠিগুলি আমার কাছে পাচার করত; আমি সেগুলির উত্তর দিতাম আর সে আমার চিঠিগুলি সন্তর্পণে তার কাছে পাঠিয়ে দিত।
১৯৬৩ সালে, আমাকে আবার হাসপাতালে ফিরে যেতে হয় এবং প্যাট স্মিথ আমার সাথে অধ্যয়ন চালিয়ে যায়। একদিন সে আমাকে জিজ্ঞাসা করে: “আমাদের সীমা অধিবেশনে তুমি কি বাপ্তিস্ম নিতে চাও?”
“হ্যাঁ!” আমি উত্তর দিই।
আমি হাসপাতালের পুনর্বাসন বিভাগে ছিলাম, অতএব একদিনের পাশ আমার পক্ষে পাওয়া সম্ভব ছিল। সীমা অধিবেশনের দিন প্যাট ও তার সাথে আরও সাক্ষীরা আসে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমাকে ভাইরা একটি পার্টিশনের উপর তুলে ধরে এবং জলের মধ্যে আমাকে নামিয়ে দেয় বাপ্তাইজিত হওয়ার জন্য। এখন আমি একজন যিহোবার দাস হলাম! সেই দিনটি ছিল ১৮ই মে, ১৯৬৩ সাল, যেই দিনটিকে আমি কোন দিন ভুলতে পারব না।
নার্সিংহোম যাওয়া ও আসা
নভেম্বর মাসে আমাকে হাসপাতাল ছাড়তে হল। আমি বাড়িতে ফিরে যেতে চাইনি কারণ আমি জানতাম যে সেখানে আমার যিহোবার পরিচর্যার কাজ সীমিত হয়ে যাবে। অতএব আমি নার্সিং হোমে থাকার ব্যবস্থা করলাম। সেখানে আমি আমার পরিচর্যার কাজ শুরু করি সেই সব লোকেদের কাছে চিঠি লেখার মাধ্যমে যেখানে সাক্ষীদের গৃহ থেকে গৃহে প্রচারের মাধ্যমে যাওয়া সম্ভবপর হয়ে উঠত না। কাগজে মৃত্যু সংবাদের যে বিভাগগুলি থাকত সেখান থেকে আমি সেই সব আত্মীয়দের চিঠি লিখতাম যাদের কেউ সম্প্রতি মারা গেছে এবং তার সাথে বাইবেল থেকে সান্ত্বনাদায়ক শাস্ত্রগুলির কথাও উল্লেখ করতাম।
এর পর, মে ১৯৬৪ সালে, আমি নিউ ইয়র্ক শহরে আমার সবচাইতে বড় বোন ও তার স্বামীর সাথে থাকতে আরম্ভ করি। তিনি আমাকে প্রথম একটি উইল চেয়ার কিনে দেন এবং আমি সেখানে সভায় যোগদান করতে আরম্ভ করি। নিউ ইয়র্ক শহরে থাকাকালীন ঐশিক পরিচর্যা বিদ্যালয়ে প্রথমবার বক্তৃতা দেওয়া আমার পক্ষে কতই না আনন্দের ছিল!
১৯৬৫ সালের প্রথম দিকে ফিলাডেলফিয়ার কিছু বন্ধু আমাকে দুই সপ্তাহের জন্য তাদের সাথে কাটানোর জন্য আমন্ত্রণ জানায়। ফিলাডেলফিয়াতে থাকার সময় আমার বোন চিঠি লেখে এবং জানিয়ে দেয় যে সে আর আমাকে রাখতে চায় না এবং আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই যেন থাকি। আমি আবার নার্সিং হোমে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করি। সেখানে থাকার সময় আমি সভায় যোগদান করেই চলি এবং চিঠি লেখার মাধ্যমে লোকেদের কাছে সাক্ষ্য দান করি। এই সময়ই আমার সুযোগ আসে, সহায়ক অগ্রগামীর কাজ হিসাবে যেটি পরিচিত তাতে অংশ নেওয়ার দ্বারা আমার পরিচর্যাকে প্রসারিত করার।
প্রেমপূর্ণ যত্নের প্রাপ্তি
যিহোবার যত্নের আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় যেভাবে ফিলাডেলফিয়ার পশ্চিম মণ্ডলী আমাকে সাহায্য করেছিল। সভাতে নিয়ে যাওয়া ছাড়াও, তারা আমাকে পরিচর্যার জন্য কাগজ-কলম ও অন্যান্য জিনিস যা প্রয়োজন তা যোগান দিত।
১৯৭০ সালে যিহোবার যত্নের আরেকটি নমুনা পাওয়া যায় যখন আমাকে মড ওয়াশিংটন নামে একজন খ্রীষ্টান বোনের সাথে থাকবার জন্য নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় যিনি ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত নার্স। যদিও সেই সময় তার বয়স ছিল ৭০রের কাছাকাছি, কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় দুবছর আমার দেখাশোনা করেছিলেন এবং তারপর তিনি আর তা করে উঠতে পারেননি।
মডের সাথে থাকাকালীন ফিলাডেলফিয়ার রিজ মণ্ডলীর ভাইরা আন্তরিকতার চেষ্টা করেছেন যাতে করে আমি সমস্ত সভাগুলিতে যোগদান করতে পারি। এর অন্তর্ভুক্ত ছিল সপ্তাহে তিনবার তিনতলা পর্যন্ত আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া ও নামানো। আমি তাদের কাছে কতই না কৃতজ্ঞ যারা বিশ্বস্ততার সাথে আমাকে সাহায্য করেছে সভাগুলিতে যোগদান করতে!
১৯৭২ সালে, যখন বোন ওয়াসিংটনের পক্ষে আমাকে দেখা শোনা করা আর সম্ভব হল না তখন আমি নিজস্ব একটি ফ্ল্যাট কিনতে মনস্থির করলাম। রিজ মণ্ডলীর খ্রীষ্টীয় বোনেদের নিঃস্বার্থ সাহায্য ও ভালবাসা ছাড়া এটা সম্ভবপর হত না। তারা আমাকে খাইয়ে দেওয়া, চান করিয়ে দেওয়া এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনের প্রতি দৃষ্টি রাখার ব্যবস্থা করে। অন্যান্যেরা আমার জন্য জিনিসপত্র কেনাকাটা ও আরও প্রয়োজনীয় কাজের দেখাশোনা করার দ্বারা সাহায্য করেছিলেন।
প্রত্যেকদিন সকালে বোনেরা আসত সেই দিনের জন্য আমাকে খাওয়াতে ও জামাকাপড় পরিয়ে দিতে। আমাকে উইল চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে তারা আমাকে ঘরের কোণে জানালার ধারে টেবিলের কাছে আমাকে নিয়ে যেত। সেখানে আমি টেলিফোন ও চিঠি লেখার মাধ্যমে পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত থাকতাম। ঘরের এই কোণটিকে আমি পরমদেশ বলতাম কারণ নানারকম ঐশিক ছবির সাহায্যে আমি সেই জায়গাটিকে সাজিয়ে ছিলাম। আমি সারা দিন পরিচর্যার কাজে কাটিয়ে দিতাম যতক্ষণ না কেউ এসে রাত্রে আমাকে বিছানায় শুইয়ে দিত।
১৯৭৪ সালে আমার স্বাস্থ্যের জন্য আমাকে আবার হাসপাতালে যেতে হয়। সেখানে থাকার সময় ডাক্তারেরা আমাকে রক্ত নেওয়ার জন্য জোর করেন। দুসপ্তাহ পর যখন আমার শরীর একটু ভালোর দিকে যায়, তখন দুজন ডাক্তার আমার কাছে আসেন। “আমি আপনাদের দুইজনকে মনে রেখেছি,” আমি তাদের বললাম, “আপনারা আমাকে রক্ত নেওয়ার জন্য জোর করেছিলেন।”
“হ্যাঁ,” তারা উত্তর দেন, “কিন্তু আমরা জানতাম যে আপনি রাজি হবেন না।” পুনরুত্থান ও পরমদেশ সম্বন্ধে বাইবেলের যে প্রতিজ্ঞা সেই বিষয় ডাক্তারদের কাছে সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ আমার হয়।—গীতসংহিতা ৩৭:২৯; যোহন ৫:২৮, ২৯.
প্রথম দশ বছর একা থাকাকালীন, আমি খ্রীষ্টীয় সভাগুলিতে যোগদান করতে পেরেছিলাম। অসুস্থ না হলে আমি কখনও তা কামাই করিনি। যদি আবহাওয়া খারাপ থাকত তাহলে বন্ধুরা কম্বল দিয়ে আমার পা জড়িয়ে রাখত যাতে করে তা শুকনো থাকে। মাঝে মাঝে ভ্রমণ অধ্যক্ষ আমাকে দেখতে আসতেন। তার পরিদর্শনের সময় তিনি আমার “সাথে” থাকতেন যখন আমি টেলিফোনের মাধ্যমে বাইবেল অধ্যয়ন পরিচালনা করতাম। এই দিনগুলি ছিল আমার জন্য খুবই আনন্দময়।
আরও খারাপ অবস্থার সাথে মোকাবিলা করা
১৯৮২ সালে, আমি এমন এক অবস্থায় পৌঁছাই যখন আমার পক্ষে বিছানা ছেড়ে ওঠা সম্ভব হত না। আমি আর সভাতে যেতে পারতাম না এবং অগ্রগামীর কাজও করতে পারতাম না যা আমি ১৭ বছর ধরে করে আসছি। এইধরনের পরিস্থিতি আমাকে অত্যন্ত দুঃখিত করেছিল এবং এর জন্য আমি প্রায়ই কাঁদতাম। কিন্তু, যিহোবার যত্নের প্রমাণ পাওয়া যায়—খ্রীষ্টীয় প্রাচীনেরা আমার এই ছোট অ্যাপার্টমেন্টে মণ্ডলীর বুকস্টাডির ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থার জন্য আমি এখনও কতই না কৃতজ্ঞ!
যেহেতু আমি সারা দিন বিছানায় থাকতাম এবং আমার টেবিলের কাছে যেতে পারতাম না, তাই আমি বুকের উপরে পাতা রেখে লেখার অভ্যাস করতে শুরু করলাম। প্রথমে আমার লেখা বুঝা যেত না, কিন্তু অনেক অভ্যাস করার পর তা অন্তত পড়তে পারা যেত। আবার আমি কিছু দিন সাক্ষ্যদান করতে পেরেছিলাম এবং এটা আমার জন্য খানিকটা আনন্দ এনেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে আমার অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগল আর আমি কোন মতেই পরিচর্যার এই দিকটিতে অংশ নিতে পারতাম না।
১৯৮২ সাল থেকে যদিও আমি আর জেলা সম্মেলনে দৈহিকভাবে যোগদান করতে পারিনি, কিন্তু সম্মেলনের সময়ে আমি সেই মনোভাবটি বজায় রাখার চেষ্টা করি। একজন খ্রীষ্টীয় বোন আমার জন্য একটি ল্যাপেল কার্ড এনে আমার জামায় লাগিয়ে দেয়। এছাড়াও, আমি টেলিভিশন খুলে ফিলাডেলফিয়ার ভেটেরান স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বেসবল খেলা দেখি আর চিন্তা করি যে সেখানে আমি আমাদের সম্মেলন যখন হত তখন কোথায় বসতাম। সাধারণত কেউ না কেউ সম্মেলনের অনুষ্ঠানগুলিকে রেকর্ড করে যাতে করে আমি তার সবগুলি শুনতে পাই।
হাল ছেড়ে না দেওয়া
যদিও আগে আমি যেরকম করতাম এখন আর তা করতে পারি না, কিন্তু এখনও লোকের কাছে বাইবেলের সত্য সম্বন্ধে কথা বলার ক্ষেত্রে আমি খুবই সজাগ থাকি। অগ্রগামীর কাজ করতে এবং অনেককে বাইবেল অধ্যয়ন করতে উৎসাহিত করতে পারার জন্য এটা আমার কাছে একটা আনন্দের উৎস হয়ে উঠেছিল। গত ২২ বছর ধরে একা থাকা যদিও সহজ ছিল না, কিন্তু স্বাধীনভাবে যিহোবাকে সেবা করার সুযোগ পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম যা হয়ত বাড়িতে থাকলে আমি করে উঠতে পারতাম না।
নিজের ব্যক্তিত্বকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আমি উপলব্ধি করেছিলাম। এক এক সময় যারা স্বেচ্ছায় আমাকে সাহায্য করেছে তাদের প্রতি নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার কথাবার্তা হয়ত মধুর হয়নি। (কলসীয় ৪:৬) এই ক্ষেত্রে আমাকে উন্নতি করতে সাহায্য করার জন্য আমি সর্বদা যিহোবার কাছে প্রার্থনা করি। যারা বছরের পর বছর ধরে ধৈর্যের সাথে ক্ষমাসুলভ মনোভাব, প্রেম সহকারে আমার প্রতি দেখিয়ে এসেছে তাদের প্রতি আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। তাদের প্রেমপূর্ণ সাহায্য আমার কাছে একটা আশীর্বাদস্বরূপ যার জন্য আমি তাদের ও যিহোবাকে ধন্যবাদ দিতে চাই।
যদিও অনেক বছর যাবৎ দৈহিকভাবে আমি কোন সভায় যোগদান করতে পারিনি—আর সেই সময় থেকে আমি আমার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়েও কোথাও যাইনি শুধুমাত্র একবার হাসপাতালে যাওয়া ছাড়া—তবুও আমি আনন্দিত ও সুখী। আমি স্বীকার করছি যে এক এক সময় আমি বিষণ্ণতায় ভুগি, কিন্তু যিহোবা আমাকে সাহায্য করেন তা কাটিয়ে উঠতে। এখন আমি কিংডম হলের সাথে টেলিফোন মারফতে সভাগুলি উপভোগ করি। যিহোবার উপর প্রার্থনার মাধ্যমে নির্ভর এবং তাঁর উপর আস্থা রাখার দ্বারা আমি কখনও একলা বোধ করিনি। হ্যাঁ, আমি সত্যই বলতে পারি যে আমি যিহোবার যত্নের দ্বারা উপকৃত হয়েছি।—সিলেস্টি জোনস এর দ্বারা কথিত। (g95 6/22)
[২৩ পৃষ্ঠার চিত্র]
এই কোণাটিতে যেখানে আমি পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত থাকতাম সেটিকে আমি পরমদেশ বলতাম