ঈশ্বর সম্বন্ধে কেন কথা বলব?
“প্রত্যেকের নিজস্ব ধর্ম আছে। তুমি তোমার ঈশ্বরের ধারণাকে অপরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পার না।”—১৪-বছর বয়স্ক রাকিশ, গায়ানা।
“উপহাসের জন্য আমি লজ্জিত হব বলে, ঈশ্বরের সম্বন্ধে কথা বলতে আমি ইতস্ততবোধ করি।—১৭-বছর-বয়স্ক রোহান, গায়ানা।
“আমাদের ঈশ্বর সম্বন্ধে কথা বলা উচিত কারণ তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি আমাদের জীবন দিয়েছেন।”—১৩-বছর-বয়স্ক মার্কো, জার্মানি।
মনোযোগসহকারে একদল যুবক-যুবতীদের কথাবার্তা শুনুন এবং আপনি সম্ভবত একটি অতি দুঃখজনক উপসংহারে আসবেন: অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঈশ্বর বিষয়বস্তুটি তাদের কথাবার্তার সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষয় নয়। খেলাধূলা, পোশাক-পরিচ্ছদ, সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র, কিংবা বিপরীত লিঙ্গ এই সব বিষয়ে কথা বলুন এবং আপনি সাধাণত আরও প্রাণবন্ত কথাবার্তা শুরু করতে পারবেন। ঈশ্বরের সম্বন্ধে কথা বলবার চেষ্টা করুন দেখবেন সবাই চুপচাপ, যেন চারিদিক কুয়াশায় ভরে গেছে।
কিছু যুবক-যুবতীরা শুধুমাত্র ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না। তারা হয়ত এইরকম যুক্তি করতে পারে, যেহেতু তারা তাঁকে দেখতে পায় না, তাহলে নিশ্চয় তাঁর অস্তিত্ব নেই—তাঁর বিষয়ে কথা বলা হল সময় নষ্ট করা। যুবক-যুবতীদের মধ্যে নাস্তিক ব্যক্তি খুব কম। গ্যালাপ সমীক্ষা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের যুবক-যুবতীদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে। বস্তুতপক্ষে গ্যালাপ বলেন: “অনেক যুবক-যুবতীদের কাছে তাদের ঈশ্বরের বিশ্বাস কোন অজানা অবাস্তব রীতি নয়, কিন্তু একজন ব্যক্তিগত ঈশ্বর যিনি তাদের কাজ অনুযায়ী পুরস্কার অথবা শাস্তি দিয়ে থাকেন।” তাহলে, এত যুবক-যুবতীরা ঈশ্বর সম্বন্ধে কথা বলতে কেন ইতস্ততবোধ করে?
কেন কয়েকজন প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করে
অনেকে সাধারণত মনে করতে পারে বিশ্বাসের বিষয় কথা বলা অভদ্র আচরণ এবং ধর্মীয় চিন্তাধারা নিজের কাছে রাখাই ভালো। কিছু যুবক-যুবতীরা রয়েছে যারা ঈশ্বর সম্বন্ধে কথা বলার বিষয়ে চিন্তা করলে লজ্জা পায়। তারা যুক্তি করে যে, ‘যুবক-যুবতীদের মধ্যে তা গ্রহণীয় নয়।’
সঙ্গীদের যাই দৃষ্টিভঙ্গি থাকুক না কেন, এই বিষয় তুমি কী মনে কর? এই প্রশ্ন বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ যদি তুমি এক যিহোবার সাক্ষী হিসাবে বড় হয়ে থাক। কেন? কারণ সাক্ষ্যদান করা, ঈশ্বরের সম্বন্ধে কথা বলা হল সেই বিশ্বাসের ভিত্তিমূল!—যিশাইয় ৪৩:৯, ১০; মথি ২৪:১৪.
তা হওয়া সত্ত্বেও, মাঝে মাঝে যে প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন তারা হয়ে থাকে তা তাদের নিরুৎসাহ করে এবং কিছু সাক্ষী যুবক-যুবতীরা জনসাধারণ্যে প্রচার কাজ করতে ইতস্ততবোধ করে—কিংবা হয়ত যোগদান করে কেবল পিতামাতা জোর করার জন্য। কয়েকজন প্রচার কাজ করে কিন্তু মনে মনে আশা করে যে, স্কুলের বন্ধুরা তা যেন না দেখে। স্কুলেতে অনেকে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। সহপাঠীদের কাছ থেকে বিদ্রূপের জন্য বেশির ভাগ তা হয়ে থাকে। “ঈশ্বর সম্বন্ধে কথা বলতে আমি ভয় পেতাম,” কিশোর রায়ান স্বীকার করে, “কারণ সাথীরা আমাকে বিভিন্ন নামে ডাকত এবং আমার সাহস ছিল না কথাবার্তা চালিয়ে যেতে।”
অনেকে আছে যারা কথা বলতে রাজি হয় না কারণ তারা ভয় পায় যে তারা হয়ত সম্পূর্ণরূপে বাইবেলের মান অনুযায়ী চলতে পারে না। তারা “যৌবনকালের অভিলাষ” অনুভব করে যুক্তি করে যে, নিজেকে খ্রীষ্টীয় বলে শনাক্ত করা ঠিক হবে না কারণ যদি তারা কোন ভুল কিছু করে।—২ তীমথিয় ২:২২.
কয়েকজন ঈশ্বর সম্বন্ধে কথা বলে না কারণ তারা মনে করে যে তারা অযোগ্য। উনিশ বছর বয়সী উইলটন এইভাবে বলে: “আমি সহকর্মীদের সাথে ঈশ্বর সম্বন্ধে কথা বলতে কঠিন বোধ করতাম কারণ আমি মনে করতাম তাঁর সম্বন্ধে প্রতিপাদন করতে অযোগ্য এবং তাঁর সম্বন্ধে কথা বলতে সঠিক যুক্তি আমি দেখাতে পারব না। আমি মনে করতাম যে, যদি আমার বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করা হয় তাহলে আমি হয়ত উপযুক্ত উত্তর দিতে পারব না।”
খ্রীষ্টীয় কর্তব্য
এইধরনের কারণের জন্য কি তুমি ঈশ্বর সম্বন্ধে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছ? যদি তাই হয়, তুমি একা নও। অন্য যুবক-যুবতীরা এই একই অনুভূতির জন্য কঠিন সময়ের সম্মুখীন হয়েছে। তবুও, অনেকে এই বিষয়ে উপলব্ধি করেছে যে, নিরুৎসাহ হওয়ার বহু কারণ থাকা সত্ত্বেও, আরও জোরাল কারণ রয়েছে ঈশ্বর সম্বন্ধে কথা বলার। এই কারণগুলি কী কী?
যুবক মার্কো যাকে প্রথমে উল্লেখ করা হয় উত্তমভাবে এটি বলে যখন সে ঈশ্বর সম্বন্ধে বলে “তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি আমাদের জীবন দিয়েছেন।” (প্রকাশিত বাক্য ৪:১১) হ্যাঁ, জীবন হল অতিমূল্যবান উপহার। গীতরচক, ঈশ্বর সম্বন্ধে বলেন: “তোমারই কাছে জীবনের উনুই আছে।” (গীতসংহিতা ৩৬:৯) এই উপহার পাওয়ার জন্য তোমার কি কৃতজ্ঞতা দেখানো উচিৎ নয়?
উপলব্ধি দেখানোর একটি উপায় হল অন্যদের সামনে যিহোবা ঈশ্বরের প্রশংসা করা। তিনি সূর্য, চন্দ্র, বৃষ্টি, যে বাতাস আমরা শ্বাস নিই এবং যে খাদ্য আমরা খাই সব কিছুর উৎস। (প্রেরিত ১৪:১৫-১৭) “সমস্ত উত্তম দান এবং সমস্ত সিদ্ধ বর উপর হইতে আইসে,” শিষ্য যাকোব বলেন। (যাকোব ১:১৭) তুমি কি ঈশ্বরকে এইসব উপহারের জন্য ধন্যবাদ দাও? (কলসীয় ৩:১৫) ঈশ্বর সম্বন্ধে কথা বলার থেকে, ধন্যবাদ দেওয়ার আর উত্তম উপায় কী আছে?—লূক ৬:৪৫.
আসলে, ঈশ্বর আমাদের আদেশ দেন তাঁর সম্বন্ধে কথা বলতে। তাঁর পুত্র, যীশু খ্রীষ্ট, খ্রীষ্টীয়দের আদেশ দেন: “অতএব তোমরা গিয়া সমুদয় জাতিকে শিষ্য কর।” (মথি ২৮:১৯, ২০) যুবক-যুবতীদের এই দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। গীতরচক আদেশ করে: “সদাপ্রভুর প্রশংসা কর . . . যুবকগণ ও যুবতী সকল; বৃদ্ধগণ ও বালক-বালিকা-সমূহ; সকলে সদাপ্রভুর নামের প্রশংসা করুক, কেননা কেবল তাঁহারই নাম উন্নত, তাঁহার প্রভা পৃথিবীর ও স্বর্গের উপরিস্থ।” (গীতসংহিতা ১৪৮:৭, ১২, ১৩) কিন্তু তুমি এই দায়িত্বকে বোঝা হিসাবে ধরে নিও না, সত্যিই এটি একটি বিশেষ সুযোগ—কারণ তুমি প্রকৃতপক্ষে ‘ঈশ্বরের সহকাযর্যকারী’ হতে পার।—১ করিন্থীয় ৩:৯.
যদি তুমি মনে কর যে তুমি অযোগ্য তাহলে কী? বাইবেলের সময়ে ভাববাদী যিরমিয়ের সেই একই মনোভাব ছিল। “হায় হায়, হে প্রভু সদাপ্রভু,” তিনি বলেন “দেখ, আমি কথা কহিতে জানি না, কেননা আমি বালক।” যিহোবার প্রতিক্রিয়া? “‘আমি বালক,’ এমন কথা বলিও না; কিন্তু আমি তোমাকে যাহার কাছে পাঠাইব, তাহারই কাছে তুমি যাইবে, এবং তোমাকে যাহা আজ্ঞা করিব, তাহাই বলিবে।” (যিরমিয় ১:৬, ৭) যিহোবার সাহায্যে যিরমিয় তা ৪০ বছর ধরে করেছিলেন!
ঠিক তেমনি আজকের দিনে খ্রীষ্টানদের ক্ষেত্রে, “আমাদের উপযোগিতা ঈশ্বর হইতে উৎপন্ন” হয়। (২ করিন্থীয় ৩:৫) যদিও তুমি সাধারণত লাজুক প্রকৃতির, সংযত স্বভাবের ব্যক্তি হও ঈশ্বর তোমাকে কথা বলার সাহস দেবেন। খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীর মধ্যে ব্যবস্থা রয়েছে যা তোমাকে সাহায্য করতে পারে ঈশ্বরের বাক্যের ‘উপযোগী’ শিক্ষক হতে। যদি তুমি মনে কর যে তোমার সাহায্যের প্রয়োজন আছে, তাহলে তুমি মণ্ডলীর অধ্যক্ষদের কাছে কথাটি বল না কেন? তা হয়ত শুধু ব্যক্তিগত বাইবেল অধ্যয়ন গড়ে তোলা অথবা যার অভিজ্ঞতা আছে এমন একজন ব্যক্তির সাথে কাজ করার মত সহজ ব্যাপার হতে পারে।
তুমি কী সম্পাদন করতে পার
ঈশ্বরের সম্বন্ধে কথা বলা তোমাকে কিছু সম্পাদন করার অনুভূতি দিতে পারে। একটি বিষয় হল যে, তোমার বেশিরভাগ সঙ্গীরা জীবনের সমস্যার উত্তর খুঁজছেন, এমনকি সাহায্যের জন্য হাঁতড়াচ্ছে। তাদের পথ দেখাবার কেউ নেই এবং ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তাদের স্পষ্ট ধারনা নেই। তারা চিন্তা করে, ‘আমরা কেন এখানে আছি? আমরা কোথায় যাচ্ছি? জগৎ কেন এত সমস্যাগ্রস্ত?’ একজন খ্রীষ্টীয় হিসাবে তোমার কাছে উত্তর আছে এবং সম্ভবত তোমার পরিস্থিতি হল সবচেয়ে উত্তম তোমার সঙ্গীদের কাছে সেই জ্ঞান পৌঁছানোর। তুমি তাদের বয়সী বলে তারা সম্ভবত অভিভাবকদের থেকে এই বিষয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হবে।
হ্যাঁ, কয়েকসময় হয়ত তোমায় প্রত্যাখ্যান করা হবে। কিন্তু তুমি হয়ত এমন ব্যক্তিও পাবে যারা বাইবেলের বার্তায় সাড়া দেবে। এক যুবতী সাক্ষী বাসেতে বসে তার ব্যক্তিগত যুবক-যুবতীদের জিজ্ঞাস্য—যে উত্তরগুলি কাজ করেa (ইংরাজি) নামক তার ব্যক্তিগত বইটি পড়ছিলেন। তার পাশে বসা ছেলেটিও তার সঙ্গে পড়তে শুরু করে। “এটি সত্যি একটি উত্তম বই!” ছেলেটি বলে। “এই বইটি ঈশ্বর সম্বন্ধে অনেক কিছু বলে। অনেক লোকদের ধর্ম সম্বন্ধে কোন আগ্রহ নেই।” যুবতী সাক্ষী সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ঈশ্বরের বিষয়ে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আলোচনা করে।
a ওয়াচ টাওয়ার বাইবেল আ্যন্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটি অফ নিউ ইয়র্ক, ইনক. দ্বারা প্রকাশিত।
এটি সত্যি যে, যখন তুমি নিজেকে খ্রীষ্টীয় হিসাবে শনাক্ত কর, তখন তোমার দায়িত্ব হচ্ছে সেই অনুযায়ী আচরণ করা। (১ পিতর ২:১২) কিন্তু উত্তম খ্রীষ্টীয় আচরণই তোমার বার্তাকে আরও সুদৃঢ় করে তুলবে। এরিক নামে এক যুবকের অভিজ্ঞতাটি বিবেচনা করে দেখ। সে তার স্কুলেতে যুবক সাক্ষীদের উত্তম আচরণ দেখে খুব প্রভাবিত হয়েছিল। এই বিষয়টি ঈশ্বর সম্বন্ধে আরও শিখতে তার আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলেছিল। তার সাথে একটি বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করা হয় এবং এখন তিনি একজন বাপ্তিস্মিত খ্রীষ্টান, যিনি নিউ ইয়র্কে যিহোবা সাক্ষীদের বিশ্ব-প্রধান কেন্দ্র দপ্তরে সেবা করছেন।
ঈশ্বর সম্বন্ধে কথা বলা তোমাকে সাহায্য করতে পারে! তা প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করতে পারে। যখন তোমার সঙ্গীরা জানবে যে তুমি একজন যিহোবার সাক্ষী, অনেকেই তোমাকে শ্রদ্ধা করবে। তারা তোমাকে ভুল কাজ করতে বেশি চাপ দেবে না কারণ তারা হয়ত বুঝতে পারবে যে তোমার উচ্চ নৈতিক মান রয়েছে এবং জানে যে যখন তারা তা করবে তুমি হয়ত তাদের সাক্ষ্যদান করবে।
অবশ্যই, এর মানে এই নয় যখনই তুমি তোমার মুখ খুলবে তুমি শাস্ত্রের বিষয় উল্লেখ করবে। তোমার তখনও খেলাধূলা, পোশাক-পরিচ্ছদ অথবা সঙ্গীত সম্বন্ধে কথা বলতে আগ্রহ থাকবে এবং এই বিষয়গুলি সম্বন্ধে সময় সময় কথা বলতে পারো। কিন্তু মনে রেখো: “হৃদয় হইতে যাহা ছাপিয়া উঠে, মুখ তাহাই বলে।” (মথি ১২:৩৪) যদি ঈশ্বরের সম্বন্ধে প্রেম সত্যি তোমার হৃদয়ে থাকে, তাহলে স্বভাবতই তুমি তাঁর বিষয়ে কথা বলবে। কিভাবে তুমি কার্যকারীরূপে তা করতে পার পরবর্তী সংখ্যাতে আমরা তা আলোচনা করব। (94 9/22)
যখন তুমি জনসাধারণ্যে প্রচার কাজ কর তোমার সহপাঠীরা তোমাকে দেখে ফেলবে বলে তুমি কি লজ্জা পাও?