বাইবেলের দৃষ্টিভঙ্গি
রেগে ওঠা কি সবসময়েই ভুল?
“রাগ হল ক্ষণিকের এক উন্মত্ততা।” এইভাবে প্রাচীন রোমীয় কবি হোরেস্ সকল প্রবল আবেগগুলির মধ্যে এটিকে অন্যতম হিসাবে একটি সাধারণ মনোভাব প্রকাশ করেন। রাগ হল ক্ষণিকের এক উন্মত্ততা এই বিষয়ে সকলে একমত না হলেও অনেকেই এটিকে সহজাত দোষ হিসাবে দেখে। সা.শ. ষষ্ঠ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, ক্যাথলিক সাধুরা “সাতটি মারাত্মক পাপের” বিখ্যাত তালিকাটি সংকলন করেন। আশ্চর্যের বিষয় নয়, রাগ সেই তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এটি বোঝা সহজ যে কেন তারা এরকম মনে করেছিল। বাইবেল বলে: “ক্রোধ হইতে নিবৃত্ত হও, কোপ ত্যাগ কর।” (গীতসংহিতা ৩৭:৮) আর প্রেরিত পৌল ইফিষীয় মণ্ডলীকে বিশেষভাবে প্রণোদিত করেছিলেন: “সর্ব্বপ্রকার কটুকাটব্য, রোষ, ক্রোধ, কলহ, নিন্দা এবং সর্ব্বপ্রকার হিংসেচ্ছা তোমাদের হইতে দূরীভূত হউক।”—ইফিষীয় ৪:৩১.
কিন্তু আপনি হয়ত ভাবতে পারেন যে, ‘এটিই কি রাগ সম্বন্ধে বাইবেলের একমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি? তাছাড়া, পৌল কি ভবিষ্যদ্বাণী করেননি যে এই “শেষ কালে,” আমরা যে সময়ে বাস করছি তা “বিষম সময় হবে মোকাবিলা করার জন্য”?’ (২ তীমথিয় ৩:১-৫, NW) ঈশ্বর কি সত্যই চান এই সময়ে যেখানে মানুষেরা ‘প্রচণ্ড, সদ্বিদ্বেষী, স্নেহরহিত’ সেখানে আমরা বাস করি—আর কখনও এমনকি একটুও রেগে উঠব না?
এক ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
এই বিষয়ে বাইবেলের মনোভাব খুব একটা সরল নয়। উদাহরণস্বরূপ, ইফিষীয় ৪:২৬ পদে পৌলের বাক্যগুলি লক্ষ্য করুন: “ক্রুদ্ধ হইলে পাপ করিও না।” যদি রাগ সহজাতরূপেই এক “মারাত্মক পাপ” হয় যার জন্য অনন্তকাল শাস্তি পেতে হয় তাহলে এই পদটি বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
পৌল গীতসংহিতা ৪:৪ (NW) পদ থেকে উদ্ধৃতি করেছিলেন যেখানে লেখা আছে: “তোমরা উত্তেজিত হও, পাপ করো না।” ভাইনস্ এক্সপোজিটরি ডিকশনারী অফ্ বিব্লিকাল ওয়ার্ডস্ অনুসারে “উত্তেজিত হও” শব্দটির ইব্রীয় অনুবাদ রা·ঘাজ্ʹ, যার অর্থ “প্রবল আবেগপ্রবণ হওয়া।” কিন্তু কোন্ প্রবল আবেগ? তা কি রাগ? গীতসংহিতা ৪:৪ পদের সেপটুয়াজিন্ট অনুবাদে রা·ঘাজ্ʹ শব্দটি গ্রীক ভাষায় বলা হয় “ক্রোধান্বিত হও,” এবং এই সর্ম্পকেই পৌল এখানে বলেন।
বাইবেল কেন রাগ করার অনুমতি দেয়? কারণ সব রাগ খারাপ নয়। যেমন এক বাইবেলের মন্তব্যকারী বলেন, “মানুষের রাগের যথার্থতা নেই ও তার অনুমতি দেওয়া চলে না” এই দৃষ্টিভঙ্গি শাস্ত্রীয় নয়। বাইবেল পণ্ডিত আর. সি. এইচ. লেন্সকি ইফিষীয় ৪:২৬ পদের উপর সঠিক মন্তব্য করেন: “যে নীতি রাগকে বর্জন করে ও প্রতিটি ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ শান্তি দাবি করে তা হল স্টোইক কিন্তু খ্রীষ্টীয় নয়।” একইভাবে অধ্যাপক উইলিয়াম বার্কলে বলেন: “খ্রীষ্টীয় জীবনে অবশ্যই রাগ আসতে পারে, কিন্তু সেটি সঠিক প্রকৃতির হওয়া চাই।” কিন্তু “সঠিক প্রকৃতির রাগ” কী?
সমীচীন ক্রোধ
রাগ যিহোবার প্রধান গুণাবলীর একটি গুণ না হলেও, তাঁকে অনেকবার শাস্ত্রে বর্ণনা করা হয় যে তিনি ক্রোধান্বিত হয়েছেন বা ক্রোধ প্রকাশ করেছেন। দুটি কারণে তাঁর রাগ সর্বদাই যুক্তিযুক্ত ছিল। একটি হল, সঠিক কারণ না থাকলে তিনি কখনও রাগ করেন না। আর দ্বিতীয়টি হল, তিনি ন্যায়ের সাথে ও সমীচীন ভাবে রাগ প্রকাশ করে থাকেন, কখনও নিয়ন্ত্রণ হারান না।—যাত্রাপুস্তক ৩৪:৬; গীতসংহিতা ৮৫:৩.
স্বেচ্ছাপূর্বক অধার্মিকতার জন্য যিহোবা ক্রুদ্ধ হন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ইস্রায়েলীয়দের বলেন যে যদি তারা অসহায় স্ত্রী বা বালক-বালিকাদের নিপীড়ন করে তাহলে তিনি “অবশ্য তাহাদের ক্রন্দন” শুনবেন। তিনি সতর্ক করেন: তাঁর “ক্রোধ প্রজ্বলিত হইবে।” (যাত্রাপুস্তক ২২:২২-২৪; তুলনা করুন হিতোপদেশ ২১:১৩.) পিতার মতই যীশুর হৃদয়ে শিশুদের জন্য এক কোমল স্থান ছিল। যখন তাঁর সমব্যথী অনুসরণকারীরা শিশুদের তাঁর কাছে আসতে একবার বাধা দেন তখন “যীশু . . . অসন্তুষ্ট হইলেন” এবং শিশুদের তার কোলে তুলে নিলেন। (মার্ক ১০:১৪-১৬) লক্ষণীয়, “অসন্তুষ্ট” শব্দের গ্রীক শব্দ মূলত “দৈহিক ব্যথা বা উত্তেজিত হওয়াকে” উল্লেখ করে। সত্যই প্রবল অনুভূতি!
সেইভাবে যথাযথ অসন্তুষ্টি যীশুর হৃদয়ে উদয় হয় যখন তিনি দেখেন যে ব্যবসায়ী ও পোদ্দাররা তাঁর পিতার উপাসনার গৃহকে “দস্যুদের গৃহ” করে তুলেছে। তিনি তাদের মেজ উল্টে দেন ও সেখান থেকে তাদের বার করে দেন! (মথি ২১:১২, ১৩; যোহন ২:১৫) যখন ফরীশী ও অধ্যাপকেরা যারা অসুস্থ, যাদের সাহায্যের প্রয়োজন তাদের চাইতে বিশ্রামবারের তুচ্ছ নিয়মগুলির প্রতি বেশি চিন্তা প্রদর্শন করছিল তখন যীশু “তাদের অমানুষিকতা দেখে খুবই দুঃখিত হলেন” এবং “সক্রোধে চারিদিকে তাদের প্রতি তাকালেন।”—মার্ক ৩:৫, ফিলিপস্।
অনুরূপে, প্রাচীনকালের বিশ্বস্ত মোশি অবিশ্বাসী ইস্রায়েলীয়দের প্রতি যথাযথরূপে অসন্তুষ্ট হন, যখন তিনি মোশির নিয়মের পাথরগুলি নিচে ফেলে দেন। (যাত্রাপুস্তক ৩২:১৯) আর ধার্মিক অধ্যাপক ইষ্রা, বিবাহ সম্পর্কে ঈশ্বরের নিয়মের প্রতি ইস্রায়েলীয়দের অবাধ্যতার জন্য এত রেগে গিয়েছিলেন যে তিনি তার জামা ছিঁড়ে ফেলেন, এমনকি তার কিছু চুলও ছেঁড়েন!—ইষ্রা ৯:৩.
যারা ‘উত্তমকে ভালবাসে’ তারা “মন্দকে ঘৃণা” করতে সচেষ্ট হয়। (আমোষ ৫:১৫) সুতরাং, বর্তমানে খ্রীষ্টানদের অন্তরে সমীচীন ক্রোধের উদয় হতে পারে যখন তারা নিষ্ঠুরতা, ভণ্ডামি, অসাধুতা, অবিশ্বস্ততা বা অন্যায়ের প্রতি স্বেচ্ছাকৃত, অনুতাপহীন কাজগুলি দেখেন।
ক্রোধ সঠিকরূপে ব্যবহার করা
বাইবেলের পক্ষে প্রায়ই রাগকে আগুনের সাথে তুলনা করা কোন আকস্মিক ঘটনাস্বরূপ নয়। আগুনের মতো এরও স্থান আছে। কিন্তু তা ভয়ঙ্কর ধ্বংসাত্মকও হতে পারে। যিহোবা ও যীশুর মতো না হয়ে বেশির ভাগ সময়েই মানুষ উপযুক্ত ভিত্তি ছাড়া বা অধার্মিক উপায়ে তাদের ক্রোধ প্রকাশ করে থাকে।—দেখুন আদিপুস্তক ৪:৪-৮; ৪৯:৫-৭; যোনা ৪:১, ৪, ৯.
অপরপক্ষে, রাগকে চেপে রেখে ও তা আর নেই বলে ভান করাও ধার্মিক নয়। স্মরণ করুন, পৌল পরামর্শ দেন: “সূর্য্য অস্ত না যাইতে যাইতে তোমাদের কোপাবেশ শান্ত হউক।” (ইফিষীয় ৪:২৬) ক্রোধকে প্রকাশ করতে শাস্ত্রগত উপায়ও আছে, যেমন ‘মনে মনে কথা’ বলে, পরিপক্ক বিশ্বাসভাজন ব্যক্তির কাছে মনের কথা প্রকাশ করে বা যে ভুল করেছে তার সাথে শান্তভাবে কথাবার্তা বলে।—গীতসংহিতা ৪:৪; হিতোপদেশ ১৫:২২; মথি ৫:২৩, ২৪; যাকোব ৫:১৪.
সুতরাং, রেগে যাওয়া নিশ্চয় সব সময় ভুল নয়। যিহোবা ও যীশু, উভয়েই রেগে গিয়েছিলেন—এবং আবার তারা ক্রোধ প্রকাশ করবেন! (প্রকাশিত বাক্য ১৯:১৫) আমরা যদি তাদের অনুসরণ করি, আমরা হয়ত এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারি যেখানে রেগে না যাওয়া ভুল হবে। আচরণের চাবিকাঠি হল বাইবেলের পরামর্শ অনুসরণ করা, নিশ্চিত হওয়া যে আমাদের অনুভুতির যেন যথাযথ ভিত্তি থাকে এবং আমরা যেন তা সমীচীন, খ্রীষ্টীয় উপায়ে প্রকাশ করি। (g94 4/8)
কয়িন ও হেবল