জুন ১৫-২১, ২০২৬
গান ১২২ দৃঢ় থাকো, সুস্থির থাকো
সমস্যার বিষয়ে এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখুন
“যদিও আমার উপর বিপদ ও সমস্যা আসে, তবুও আমি তোমার আজ্ঞাগুলো খুব ভালোবাসি।”—গীত. ১১৯:১৪৩, NW.
আমরা কী শিখব?
সমস্যাগুলোর বিষয়ে আমাদের যদি এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, তা হলে আমরা সেগুলোর সঙ্গে ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারব।
১-২. নিজেদের সমস্যাগুলোর সঙ্গে সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য আমাদের কী করতে হবে? (ছবিও দেখুন।)
যিহোবা তাঁর লোকদের খুবই ভালোবাসেন এবং তাদের মূল্যবান হিসেবে দেখেন। কিন্তু, তাদের মধ্যে অনেকের জীবন “সমস্যা ও দুঃখে পরিপূর্ণ।” (গীত. ৯০:১০, NW) কিছু ভাই-বোন একাই যিহোবার সেবা করে এবং তাদের পরিবারের কাছ থেকে বিরোধিতার মুখোমুখি হয়। আবার অনেক ভাই-বোনকে তাদের বিশ্বাসের কারণে জেলে বন্দি করা হয়। কেউ কেউ আবার গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে অথবা বার্ধক্যের কারণে কষ্ট পায়। আবার অনেক ভাই-বোন তাদের প্রিয়জনদের মৃত্যুতে হারায়। অনেকে আবার কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয় এবং সেটার সঙ্গে মোকাবিলা করার চেষ্টা করে। আপনিও কি এইরকম কোনো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন?
২ সমস্যাগুলোর সঙ্গে সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য আমাদের এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ যিহোবার মতো দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে হবে। এভাবে আমরা শান্ত থাকতে পারব এবং বুঝতে পারব যে, আমাদের কী করতে হবে। আসুন, আমরা এই বিষয়টাকে একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করি। আমাদের জীবনে যে-সমস্যাগুলো আসে, সেগুলো এমন কিছু বাধার মতো, যেগুলো গাড়ি চালানোর সময় রাস্তার সামনে এসে পড়ে। সেই বাধাগুলো দেখে আমরা আমাদের গাড়ি ডানদিক কিংবা বাঁ-দিকে ঘুরিয়ে নিই, গাড়ি আস্তে করি অথবা কিছুক্ষণের জন্য গাড়ি থামিয়ে দিই। কিন্তু, কিছু করার আগে সেই বাধাগুলোকে ভালো করে দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গাড়ির কাঁচ যদি পরিষ্কার না থাকে, তা হলে আমরা সেই বাধাগুলোকে ঠিক করে দেখতে পাব না এবং বুঝতেও পারব না যে, আমাদের কী করতে হবে। তাই, আমাদের গাড়ির কাঁচ সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে অর্থাৎ নিজেদের সমস্যাগুলোকে সবসময় যিহোবার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। এমনটা করলে আমরা সেগুলোর সঙ্গে ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারব। এই প্রবন্ধে আমরা তিনটে বিষয় নিয়ে আলোচনা করব: (১) কোন বিষয়গুলো মনে রাখলে আমরা সমস্যাগুলোর বিষয়ে এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে পারব? (২) সমস্যাগুলোর বিষয়ে যদি আমাদের এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকে, তা হলে কী ক্ষতি হতে পারে? এবং (৩) সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার জন্য আমরা কী করতে পারি?
আমাদের সমস্যাগুলোকে যিহোবার দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখতে হবে, তা হলেই আমরা সেগুলোর সঙ্গে ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারব (২ অনুচ্ছেদ দেখুন)
সমস্যার বিষয়ে এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি
৩. বর্তমানে কেন আমরা সমস্যাগুলো থেকে রেহাই পেতে পারি না?
৩ এই মন্দ জগতে আমরা সমস্যাগুলো থেকে রেহাই পাব না। বর্তমানে এই জগৎকে শয়তান নিয়ন্ত্রণ করছে আর সেইসঙ্গে অসিদ্ধতার কারণে আমরা সবাই ভুল করে ফেলি, তাই আমাদের প্রত্যেকের জীবনে সমস্যা আসে। আর শেষ যতই এগিয়ে আসছে, ততই প্রাকৃতিক বা মানুষের তৈরি সমস্যা ও বিপর্যয় বেড়েই চলেছে। এ ছাড়া, দুষ্ট লোকদের কারণে আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়। (মথি ২৪:৮; ২ তীম. ৩:১৩) আমরা জানি যিহোবার রাজ্যে এই সমস্যাগুলো আর থাকবে না। কিন্তু, যিহোবা যদি এখনই এই সমস্যাগুলোকে সরিয়ে দেন, তা হলে এটা মনে হবে যে, এই জগৎকে শাসন করার জন্য তিনি শয়তানকে সাহায্য করছেন। আর আমরা জানি, শয়তান যত দিন এই জগতের উপর শাসন করবে, তত দিন ‘বিপর্যয়’ আসবেই।—উপ. ৯:১২, পাদটীকা, NW.
৪. আর কোন কারণে আমাদের উপর সমস্যা আসে?
৪ খ্রিস্টান হওয়ার কারণে আমাদের উপর আরও সমস্যা আসে। যিশু প্রায়ই তাঁর শিষ্যদের বলতেন, বিশ্বাসের কারণে তাদের উপর তাড়না আসবে। (মথি ২৪:৯; যোহন ১৬:২) এটা জানার ফলে সমস্যা এলেও আমরা উদ্বিগ্ন হই না এবং আমাদের বিশ্বাসও দুর্বল হয়ে পড়ে না। (১ থিষল. ৩:৩, ৪) আমরা কোনো পরিস্থিতিতেই যিহোবাকে ছেড়ে দিই না। সমস্যার সময়ে স্থির থাকলে আমাদের এই নিশ্চয়তা বেড়ে যায় যে, আমরা সঠিক পথে চলছি এবং এর জন্য যিহোবা ও যিশু আমাদের অবশ্যই পুরস্কার দেবেন। এ ছাড়া, আমরা এটা দেখানোর সুযোগ পাই যে, আমরা যিহোবাকেই সবচেয়ে উত্তম শাসক হিসেবে বেছে নিয়েছি আর শয়তান হল মিথ্যাবাদী। শয়তানের বলা মিথ্যা কথাগুলোর মধ্যে একটা হল, মানুষ শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থের জন্য যিহোবার সেবা করে। আর এটা প্রমাণ করার জন্য শয়তান যিহোবার লোকদের উপর আরও বেশি সমস্যা নিয়ে আসে, যাতে তারা যিহোবার সেবা করা ছেড়ে দেয়। (ইয়োব ১:৯-১১) কিন্তু, আমরা প্রতিটা পরিস্থিতিতে যিহোবার প্রতি বিশ্বস্ত থাকি কারণ আমরা তাঁকে হৃদয় থেকে ভালোবাসি আর এটা দেখে যিহোবা খুবই খুশি হন।—হিতো. ২৭:১১.
৫. উপদেশক ৭:১৩, ১৪ পদ থেকে আমরা কী জানতে পারি? (ছবিগুলোও দেখুন।)
৫ যিহোবা আমাদের উপর সমস্যা নিয়ে আসেন না, তিনি এগুলো ঘটার অনুমতি দেন। যিহোবা কখনো কোনো মন্দ কাজ করেন না আর এমনকী মন্দ বিষয়ের দ্বারা আমাদের পরীক্ষা করেন না। (যাকোব ১:১৩) তাহলে, রাজা শলোমন কেন এমনটা লিখেছিলেন যে, ‘বিপদের দিন’ হল ‘সত্য ঈশ্বরের কাজ’? (পড়ুন, উপদেশক ৭:১৩, ১৪.) শলোমন এটা বোঝাননি, যিহোবা আমাদের উপর সমস্যা নিয়ে আসেন বরং তিনি বলতে চেয়েছিলেন, ঈশ্বর বর্তমানে সমস্যাগুলো আসার অনুমতি দিচ্ছেন। ঈশ্বরের অনুপ্রেরণায় শলোমন এটাও লিখেছিলেন যে, সমস্যাগুলোর বিষয়ে আমাদের কোন দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। প্রথমত আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের জীবনে একেকটা দিন ভালো কাটবে, যখন সমস্ত কিছু ভালোভাবে চলবে। এই সময়গুলোতে আমরা যিহোবাকে ধন্যবাদ দিতে পারি কারণ প্রতিটা ভালো জিনিস তাঁর কাছ থেকে পাওয়া এক উপহার। অন্যদিকে, আমরা এটাও জানি যে, শয়তানের এই জগতে একেকটা দিন খারাপ কাটবে, যখন সব কিছু আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী হবে না। দ্বিতীয়ত, শলোমন এটাও বলেছিলেন, ‘মানুষ জানতে পারে না যে, ভবিষ্যতে কী হবে’ অর্থাৎ সেটা কি আনন্দের হবে, না কি দুঃখের? এর অর্থ হল, ভালো ও মন্দ উভয় প্রকার লোকের উপর হঠাৎই সমস্যা আসতে পারে।
এটা আমাদের মেনে নিতে হবে যে, শয়তানের জগতে কোনো কোনো দিন ভালো কাটবে, আবার কোনো কোনো দিন খারাপ (৫ অনুচ্ছেদ দেখুন)
৬. কোন কারণে যিহোবা আমাদের উপর পরীক্ষা আসার অনুমতি দেন? (ইব্রীয় ১২:৭, ১১)
৬ সমস্যার সময়ে আমরা নিজেদের উপর নয় বরং যিহোবার উপর নির্ভর করতে শিখি। আমরা যেন কখনো এটা না ভাবি, নিজেদের সমস্যা আমরা নিজেরাই সমাধান করতে পারব। সমস্যায় পড়লে আমরা কতটা কষ্ট পাই, সেটা যিহোবা দেখতে পান। যদিও যিহোবা আমাদের “ঘুটঘুটে অন্ধকারের উপত্যকা” দিয়ে যেতে দেন, তবে তিনি কখনো আমাদের হাত ছেড়ে দেন না। তিনি আমাদের সঠিক পথ দেখান, আমাদের এই নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি আমাদের ভালোবাসেন এবং এমন শক্তি দেন যেটার সাহায্যে আমরা সেই উপত্যকা অতিক্রম করতে পারি। (গীত. ২৩:৪, NW) কোনো পরীক্ষার এলে আমরা আমাদের দুর্বলতাগুলো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি এবং ঈশ্বরের সাহায্যে আমরা নিজেদের সংশোধন করতে পারি আর নিজেদের মধ্যে ভালো গুণগুলো বাড়াতে পারি। (পড়ুন, ইব্রীয় ১২:৭, ১১.) একবার ইয়োবের কথা চিন্তা করুন। যিহোবা ইয়োবের উপর পরীক্ষা নিয়ে আসেননি, তবে তিনি পরীক্ষা আসার অনুমতি দিয়েছিলেন। সেই কঠিন সময়ে ইয়োব বুঝতে পেরেছিলেন, তাকে নম্র হতে হবে। আর যিহোবার সাহায্যে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখতে পেরেছিলেন। (ইয়োব ৪২:১-৬) আমাদের ক্ষেত্রে কী বলা যায়? যিহোবা আমাদের উপরেও পরীক্ষা আসার অনুমতি দেন, তবে তিনি আমাদের কোনো স্থায়ী ক্ষতি হতে দেবেন না। আমাদের উপর যেকোনো সমস্যাই আসুক না কেন, আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত থাকতে পারি যে, যিহোবার সাহায্যে আমরা শেষ পর্যন্ত স্থির থাকতে পারব এবং সঠিক সময়ে আমরা পুরস্কার পাব। এভাবে, আমরা সমস্ত পরীক্ষায় “পুরোপুরিভাবে জয়ী” হতে পারব।—রোমীয় ৮:৩৫-৩৯.
৭. যিহোবার আজ্ঞা পালন করার কারণে যদি আপনার উপর তাড়না আসে, তা হলেও আপনি কীভাবে আনন্দে থাকতে পারেন?
৭ তাড়নার সময়ও আমরা আনন্দে থাকতে পারি। যিহোবার আজ্ঞা পালন করার কারণে যদি আপনার উপর তাড়না আসে, তা হলে এটা মনে করবেন না যে, যিহোবা আপনার উপর থেকে তাঁর আশীর্বাদের হাত সরিয়ে নিয়েছেন বরং এটা মনে রাখবেন, আপনার উপর তাঁর অনুমোদন রয়েছে। (মথি ৫:১০-১২) আমরা যদি এই কথাটা মনে রাখি, তা হলে প্রেরিতদের মতো আমরা তাড়নার সময়ে আনন্দে থাকতে পারব এবং অপমানিত বোধ করব না। (প্রেরিত ৫:৪০-৪২) এ ছাড়া, সেইসময় আপনি অন্যদের সত্য জানানোর এবং “ঈশ্বরের গৌরব” করারও সুযোগ পাবেন। (১ পিতর ২:১২) মনে রাখবেন, শুধুমাত্র সমস্যা শেষ হওয়ার পরেই নয়, কিন্তু সমস্যা চলাকালীনও আপনি সফল হতে পারেন। উদাহরণ স্বরূপ, যোষেফ যখন জেলে ছিলেন, তখন যিহোবা তার সঙ্গে ছিলেন এবং সমস্ত কাজে সফল হতে তাকে সাহায্য করছিলেন।—আদি. ৩৯:৩, ২৩.
৮. সমস্যা সহ্য করার সময় কোন বিষয়টা মনে রাখলে আমরা হাল ছেড়ে দেব না?
৮ একদিন-না-একদিন আমাদের সমস্ত সমস্যা শেষ হয়ে যাবে। ইয়োবের বিবরণ থেকে আমরা জানতে পারি, আমাদের সমস্যা সবসময় থাকবে না। কিছু সমস্যা হয়তো এই জগতে শেষ হবে আর সেটা যদি নাও হয়, তা হলে নতুন জগতে তা অবশ্যই শেষ হবে। এ ছাড়া, আমরা আর কোন বিষয়ে আস্থা রাখতে পারি? বাইবেল বলে, “যিহোবা ইয়োবকে আগের চেয়ে অনেক বেশি আশীর্বাদ করলেন।” (ইয়োব ৪২:১২, NW) আপনার ক্ষেত্রেও এমনটা হবে। যিহোবা আপনাকে “আগের চেয়ে” অনেক বেশি আশীর্বাদ করবেন, যেটা চিরস্থায়ী হবে। তাই আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আজকের সমস্যাগুলো আগামী দিনের আশীর্বাদের তুলনায় কিছুই নয়। শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরলে আমরা কতই-না চমৎকার পুরস্কার লাভ করব!—মথি ২৪:১৩.
সমস্যাগুলোর বিষয়ে এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে কী ক্ষতি হতে পারে?
৯. আমরা যদি সমস্যাগুলোর বিষয়ে এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি না রাখি, তা হলে আমাদের কষ্ট কীভাবে আরও বেড়ে যেতে পারে?
৯ আমরা যদি আমাদের সমস্যাগুলোকে যিহোবার দৃষ্টিকোণ দিয়ে না দেখি, তা হলে পরিস্থিতি হয়তো আরও বেশি জটিল হয়ে পড়তে পারে আর আমরা আরও কষ্ট পেতে পারি। যেমন আমাদের মনে হতে পারে, আমাদের সমস্যাগুলোর জন্য যিহোবাই দায়ী। কিছু সময়ের জন্য ইয়োবও এইরকমই ভেবেছিলেন। আর সেই কারণে তিনি “ঈশ্বরকে নয় বরং নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন।” (ইয়োব ৩২:২, NW) ঠিক একইভাবে, নয়মীর উপরে যখন সমস্যার পাহাড় ভেঙে পড়েছিল, তখন তিনিও প্রথমে ভেবেছিলেন, এই সমস্ত কিছুর জন্য যিহোবাই দায়ী। (রূৎ. ১:১৩, ২০, ২১) ইয়োব ও নয়মী যদি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না করতেন, তা হলে তারা যিহোবার কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যেতেন। (হিতো. ১৯:৩) যিহোবা প্রেমের সঙ্গে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছিলেন এবং তারা তাদের সমস্যাগুলোকে এক সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পেরেছিলেন। আর তাই ইয়োব ও নয়মী যিহোবার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পেরেছিলেন এবং যিহোবা তাদের আশীর্বাদ করেছিলেন।
১০. আমাদের জীবনে যখন সমস্যা চলতেই থাকে, তখন আমাদের মনে কোন চিন্তা আসতে পারে?
১০ যদিও আমরা বিশ্বাস করি যিহোবা আমাদের উপর কোনো পরীক্ষা নিয়ে আসেন না, কিন্তু যখন আমাদের জীবনে সমস্যা চলতেই থাকে, তখন হয়তো আমাদের মনে হতে পারে, ‘আমার কষ্ট কি যিহোবা সত্যিই বুঝতে পারছেন?’ এইরকম চিন্তাধারা আমাদের মনোবলকে একেবারে ভেঙে দিতে পারে। (হিতো. ২৪:১০) রাজা দায়ূদ ও ভাববাদী হবক্কূকের জীবনেও অনেক উত্থান-পতন এসেছিল। এইরকম পরিস্থিতিতে অনেক বার তাদের মনে হয়েছিল যে, যিহোবা কি সত্যিই তাদের প্রার্থনা শুনছেন? (গীত. ১০:১; হবক্. ১:২) তারপরও, তারা প্রার্থনা করা ছেড়ে দেননি বরং অবিরত যিহোবার কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। যিহোবা তাদের প্রার্থনার উত্তর দিয়েছিলেন এবং তাদের এই নিশ্চয়তাও দিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের সঙ্গে আছেন। তাই, নিশ্চিত থাকুন যিহোবা আপনার সঙ্গেও থাকবেন।—গীত. ১০:১৭.
১১. সমস্যাগুলোর বিষয়ে আমাদের যদি এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকে, তা হলে আমাদের কী মনে হতে পারে?
১১ আমরা যদি সমস্যাগুলোর বিষয়ে এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি না রাখি, তা হলে আমাদের হয়তো মনে হতে পারে, আমরা তো যিহোবার সেবা করছি, কিন্তু তারপরও কেন তিনি আমাদের উপর সমস্যাগুলো আসতে দিচ্ছেন। আর এটা ভেবে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারি। (১ পিতর ৪:১২) যিশুর শিষ্যেরাও প্রায়ই এইরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হত। যিশুকে অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হবে, এই বিষয়টা তাঁর শিষ্যেরা মেনে নিতে পারছিল না। (লূক ১৮:৩৩, ৩৪) কিন্তু, যিশু তাঁর শিষ্যদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁর প্রতি কী কী ঘটতে চলেছে। কিন্তু, পিতরের মনে হয়েছিল, যিহোবা কখনো যিশুর উপর কষ্ট আসতে দেবেন না। যিশু জানতেন, যিহোবা তাঁর কাছ থেকে কী চান এবং তিনি যিহোবার সেই আজ্ঞা পালন করতে চেয়েছিলেন। যিশু এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি যদি পিতরের মতো চিন্তা করেন, তা হলে তিনি কখনো যিহোবার ইচ্ছা পূরণ করতে পারবেন না এবং তাঁর উপর আসা তাড়নাগুলো সহ্য করতে পারবেন না। তাই, তিনি কড়াভাবে পিতরকে সংশোধন করেছিলেন। (মার্ক ৮:৩১-৩৩) যিশুর মৃত্যুর পর, তাঁর শিষ্যেরা সঙ্গেসঙ্গে বুঝতে পারেনি যে, তাঁকে কেন এত কষ্ট সহ্য করে মারা যেতে হল। তবে, যিশু পুনরুত্থিত হওয়ার পর তাঁর শিষ্যদের পরিত্যাগ করেননি বরং তিনি প্রেমের সঙ্গে তাদের চিন্তাধারাকে সংশোধন করেছিলেন। যিশু তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে দেখা করার পর, “তাদের শাস্ত্রের অর্থ পুরোপুরিভাবে বুঝতে সাহায্য” করেছিলেন এবং তাদের এটাও বুঝিয়েছিলেন যে, কেন তাঁর প্রতি এগুলো ঘটা প্রয়োজন ছিল। (লূক ২৪:২৫-২৭, ৩২, ৪৪-৪৮) যিশু তাঁর শিষ্যদের যা শিখিয়েছিলেন, সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার মাধ্যমে তারা ঘৃণা ও বিরোধিতার বিষয়ে এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে পেরেছিল। এ ছাড়া, খুব শীঘ্রই শিষ্যেরা প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছিল। যিশুর এই শিক্ষাগুলো তাদের সেই পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করতেও প্রস্তুত করেছিল। আমরাও তাড়নার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারি। কীভাবে? বাইবেলে বিরোধিতা ও তাড়নার বিষয়ে যা বলা রয়েছে, সেই বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার মাধ্যমে।
১২. নিজের পরিস্থিতির বিষয়ে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি না রাখলে কী হতে পারে?
১২ আমরা যদি যিহোবার দৃষ্টিকোণ দিয়ে আমাদের সমস্যাগুলোকে না দেখি, তা হলে হয়তো আমাদের পক্ষে সমস্যাগুলোর সঙ্গে মোকাবিলা করা আরও বেশি কঠিন হতে পারে। এটা বোঝার জন্য যিশুর দেওয়া একটা দৃষ্টান্তের কথা চিন্তা করুন। যিশু এমন কিছু মজুরদের কথা বলেছিলেন, যারা আঙুর খেতে কাজ করছিল। তাদের মধ্যে সঠিক মনোভাব ছিল না। কিছু মজুরের মনে হয়েছিল যে, মালিক তাদের সঠিক মজুরি দিচ্ছেন না, যেটা তাদের প্রাপ্য। কিন্তু, সেই মালিক একজন মজুরকে বলেন “বন্ধু, আমি তোমার প্রতি কোনো অন্যায় করিনি।” (মথি ২০:১০-১৩) আমরা যদি ভালোভাবে লক্ষ করি, তা হলে বুঝতে পারব যে, সেই মজুরদের সঙ্গে কোনো অন্যায় করা হয়নি। আসলে মজুরেরা সন্তুষ্ট ছিল না, কারণ তারা অতিরিক্ত আশা করেছিল, যেটা করা তাদের উচিত ছিল না। বর্তমানেও, কিছু ভাই-বোনের সঙ্গে এইরকমটা হতে পারে। তাদের হয়তো যিহোবার সেবায় কোনো দায়িত্ব ছাড়তে হতে পারে অথবা তারা কোনো বিশেষ সুযোগ না-ও পেতে পারে। এইরকম পরিস্থিতিতে তাদের মনে হতে পারে যে, তাদের সঙ্গে যা-কিছু হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। তাই আসুন আমরা দেখি, সমস্যাগুলোর বিষয়ে এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার জন্য আমরা কী করতে পারি।
সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করার সময় আমরা কী করতে পারি?
১৩. ব্যক্তিগতভাবে আমাদের জীবনে যখন সমস্যা আসে, তখন আমাদের কী মনে হতে পারে?
১৩ বাইবেল থেকে আমরা জেনেছি যে, কেন আমাদের উপর সমস্যাগুলো আসে। আমরা হয়তো এই বিষয়ে অন্যদের বলেছি এবং তাদের উৎসাহ দিয়েছি। কিন্তু, সমস্যাগুলো যখন ব্যক্তিগতভাবে আমাদের উপর আসে এবং সেগুলোর সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য এক একটা দিন কাটানো কঠিন হয়ে পড়ে, তখন সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা সহজ হয় না। সেইসময় আমাদের হয়তো মনে হতে পারে, ‘যিহোবা আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন বা তিনি আমার প্রার্থনা শুনছেন না।’ তাই, এইরকম সময়ে এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার জন্য আমরা কী করতে পারি?
১৪. সমস্যার সময়ে আপনি কোন বিষয়গুলো নিয়ে যিহোবার কাছে প্রার্থনা করতে পারেন? (ফিলিপীয় ৪:১৩)
১৪ যিহোবার কাছে সাহায্য চান। প্রার্থনায় আপনার মনের কথা যিহোবাকে খুলে বলুন। আপনি নির্দ্বিধায় যিহোবাকে জানাতে পারেন, আপনি তাঁর কাছ থেকে ঠিক কী চান। সমস্যার সময়ে ধৈর্য ধরার জন্য আপনি যিহোবার কাছে তাঁর পবিত্র শক্তি চাইতে পারেন। এ ছাড়া, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাঁর কাছে প্রজ্ঞাও চাইতে পারেন। কিন্তু, এটা মনে রাখবেন যে, সবসময় আপনি যেটা চাইছেন, সেই অনুযায়ী যিহোবা হয়তো আপনার প্রার্থনার উত্তর না-ও দিতে পারেন। (ইফি. ৩:২০) হতে পারে, যিহোবা তাঁর স্বর্গদূতদের মাধ্যমে বা ভাই-বোনদের মাধ্যমে আপনাকে সাহায্য করবেন। (গীত. ৩৪:৭) তাই, যিহোবার কাছে সাহায্য চাওয়ার পর, এটা লক্ষ করুন যে, তিনি কীভাবে আপনার প্রার্থনার উত্তর দিচ্ছেন এবং নম্রভাবে সেই সাহায্য গ্রহণ করুন। যিহোবা উদারভাবে তাঁর পবিত্র শক্তি আমাদের দেন। তাই, নিশ্চিত থাকুন, যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য যিহোবা আপনাকে শক্তি দেবেন।—পড়ুন, ফিলিপীয় ৪:১৩.
১৫. সমস্যার সময়ে আমাদের কী করতে হবে? (ছবিও দেখুন।)
১৫ যিহোবার সেবার সঙ্গে জড়িত কাজে ব্যস্ত থাকুন। সমস্যার সময় আপনি হয়তো আগের মতো সমস্ত কিছু করতে পারবেন না। কিন্তু, ‘বিপদ ও সমস্যার সময়ে’ আরও বেশি করে যিহোবার মতো চিন্তা করা গুরুত্বপূর্ণ। (গীত. ১১৯:১৪৩, NW) তাই, প্রতিদিন বাইবেল পড়ুন, অধ্যয়ন করুন এবং সেই বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্যদের কাছে সুসমাচার জানানোর চেষ্টা করুন। সভাগুলোতে উপস্থিত থাকুন এবং সেখানে অংশ নিন। ভাই-বোনদের সঙ্গে মেলামেশা করুন। অনেকসময় আপনার হয়তো একা থাকতে ইচ্ছা করবে, কিন্তু অন্যদের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন না।—হিতো. ১৮:১.
আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী যিহোবার সেবার সঙ্গে জড়িত কাজগুলো করে যান (১৫ অনুচ্ছেদ দেখুন)
১৬. সমস্যার সময়ে আমাদের মনে কোন প্রশ্নগুলো আসতে পারে এবং তখন আমরা কী করতে পারি? (২ করিন্থীয় ১০:৪, ৫)
১৬ সন্দেহ দূর করুন। আমাদের সঙ্গে যখন খারাপ কিছু হয়, তখন আমরা হয়তো নিজেদের বিষয়ে বা যিহোবার বিষয়ে এমন কিছু চিন্তা করি, যেটা ঠিক নয়। এইরকম পরিস্থিতিতে আমাদের মন থেকে সেই “দূর্গের মতো দৃঢ় বিষয়গুলো ভেঙে ফেলা” উচিত। (পড়ুন, ২ করিন্থীয় ১০:৪, ৫.) এটা আমরা কীভাবে করতে পারি? ‘ঈশ্বর সম্বন্ধে জানার’ মাধ্যমে। আর এই জ্ঞান আমরা তাঁর বাক্য বাইবেল এবং তাঁর সংগঠনের প্রকাশনাগুলো থেকে পাই। আপনার কি মনে হয় যে, যিহোবা আপনার উপর খুশি নন? তা হলে, প্রেরিত পৌলের বিষয়ে অধ্যয়ন করুন। পৌল উদ্যোগের সঙ্গে প্রচার করেছিলেন, তা সত্ত্বেও তার জীবনে অনেক বড়ো বড়ো সমস্যা এসেছিল। কিন্তু, এত কিছু হওয়ার পরও তিনি থেমে থাকেননি, যিহোবা ক্রমাগত তাকে শক্তি জুগিয়েছিলেন। তাই, তিনি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন, যিহোবা ও যিশু তার উপর সন্তুষ্ট। (২ করি. ১১:২৩-২৭) আপনার কি কখনো কখনো মনে হয়, যিহোবা আপনার পাপ ক্ষমা করেননি? তা হলে, এমন কিছু পদ লিখে রাখুন, যেগুলো দেখায় যে, যিহোবা যখন একবার ক্ষমা করে দেন, তখন তিনি সেটা আর মনে রাখেন না এবং কাউকে এর জন্য শাস্তিও দেন না। (যিশা. ৪৩:২৫) এই পদগুলো পড়ুন এবং সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। (গীত. ১১৯:৯৭) কোনোরকম কষ্ট অথবা দুর্ঘটনার কারণে আপনার মনে কি এই সন্দেহ আসে যে, যিহোবা তাঁর লোকদের রক্ষা করেন না? তা হলে, এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করুন, কেন যিহোবা আমাদের জীবনে দুঃখকষ্ট আসার অনুমতি দেন এবং কীভাবে তিনি সমস্ত পরিস্থিতিতে আমাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে সুরক্ষিত রাখেন। (গীত. ৯১:৯-১২) এ ছাড়া, সেই সমস্ত ভাই-বোনের অভিজ্ঞতাগুলো পড়ুন, যারা বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করার পাশাপাশি আনন্দ সহকারে যিহোবার সেবা করে যাচ্ছে।a
১৭. সমস্যার সময়ে আমাদের কী করা উচিত?
১৭ বর্তমানে আপনি হয়তো কোনো বড়ো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন না এবং আপনার দিন খুব ভালো কাটছে। তাই, এরজন্য যিহোবাকে ধন্যবাদ দিন এবং এমন কিছু করুন, যেটা তাঁর নামের গৌরব নিয়ে আসে। (উপ. ৭:১৪) কিন্তু, যদি কোনো সমস্যা আসে, তা হলে সেগুলোর বিষয়ে এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখুন এবং যিহোবার উপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখুন। এমনটা করলে যিহোবা আপনার জন্য ‘রক্ষার পথও করে দেবেন, যেন আপনি তা সহ্য করতে পারেন।’ (১ করি. ১০:১৩) কিন্তু, আমাদের প্রিয় ভাই-বোনেরা যখন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তখন আমরা তাদের জন্য কী করতে পারি? এই বিষয়ে আমরা পরের প্রবন্ধে জানব।
গান ১৫০ পরিত্রাণ পেতে ঈশ্বরের খোঁজ করেই চলো
a উদাহরণ স্বরূপ, আপনি jw.org ওয়েবসাইটে দেওয়া “A Happy Family, Shattered and Rebuilt” শিরোনামের জীবনকাহিনি পড়তে পারেন, যেখানে বলা হয়েছে, সন্তানকে মৃত্যুতে হারানোর পর ভাই ডেভিড মাজা এবং তার পরিবার কীভাবে এই শোকের সঙ্গে মোকাবিলা করেছিলেন।