এথোস পর্বত—কি এক “পবিত্র পর্ব্বত”?
এথোস পর্বত উত্তর গ্রিসে সমুদ্রের ধারে অবস্থিত এবড়ো খেবড়ো এক পাথুরে এলাকা। প্রায় ২২ কোটিরও বেশি অর্থোডক্স গির্জার সদস্যদের কাছে এটা “সবচেয়ে পবিত্র জায়গা।” আর তাদের অনেকেরই স্বপ্ন যে তারা এই ‘পবিত্র পর্ব্বতে’ তীর্থযাত্রা করেন। কেন এটাকে “পবিত্র পর্ব্বত” বলা হয়? কীভাবে এটা এত বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল? আর ঈশ্বর-ভয়শীল লোকেদের কি আধ্যাত্মিক নির্দেশনা ও সত্য উপাসনা করার জন্য এই পর্বতে যাওয়া উচিত?
“পবিত্র পর্ব্বত” শব্দগুলো বাইবেলে আছে। আর এটা সবসময় সত্য ঈশ্বর যিহোবার পবিত্র, বিশুদ্ধ ও উচ্চীকৃত উপাসনাকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাচীন যিরূশালেমে সিয়োন পর্বতে রাজা দায়ূদ যখন নিয়মসিন্দুক নিয়ে এসেছিলেন তখন তা ‘পবিত্র পর্ব্বত’ হয়ে উঠেছিল। (গীতসংহিতা ১৫:১; ৪৩:৩; ২ শমূয়েল ৬:১২, ১৭) শলোমন যখন মোরিয়া পর্বতে মন্দির বানিয়েছিলেন তখন “সিয়োন” পর্বতের সঙ্গে সঙ্গে এই পাহাড়ও ‘পবিত্র পর্ব্বত’ হয়ে উঠেছিল। (গীতসংহিতা ২:৬: যোয়েল ৩:১৭) ঈশ্বরের মন্দির যিরূশালেমে ছিল বলে কখনও কখনও এই শহরকেও ঈশ্বরের “পবিত্র পর্ব্বত” বলা হতো।—যিশাইয় ৬৬:২০; দানিয়েল ৯:১৬, ২০.
কিন্তু আমাদের দিন সম্বন্ধে কী বলা যায়? এথোস পর্বত বা অন্য কোন উঁচু জায়গা কি সেই “পবিত্র পর্ব্বত,” যেখানে ঈশ্বরকে খুশি করে এমনভাবে উপাসনা করার জন্য লোকেদের যাওয়া উচিত?
সন্ন্যাসীদের “পবিত্র পর্ব্বত”
এথোস পর্বত কলসিডিসি উপদ্বীপের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। এই উপদ্বীপ আজকের থেসালোনিকির ঠিক পূর্ব দিকে অবস্থিত যেটা ইজিয়ান সাগরে গিয়ে মিশেছে। এটা খুব সুন্দর মার্বেল পাথরের একটা চূড়া, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা প্রায় ২,০৩২ মিটার।
অনেক দিন ধরেই এথোস পর্বতকে পবিত্র জায়গা বলে মনে করা হয়। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী অলিম্পাস পর্বতকে তাদের বাসস্থান করার আগে দেবতারা এখানে থাকতেন। মহান কনস্টানটাইনের কিছু সময় পর (সা.কা. চতুর্থ শতাব্দী), এথোস পর্বত খ্রীষ্টান গির্জাগুলোর কাছেও এক পবিত্র জায়গা হয়ে ওঠে। এইরকম একটা কাহিনী প্রচলিত আছে যে “কুমারী” মরিয়ম সুসমাচারের লেখক যোহনের সঙ্গে লাসারকে দেখার জন্য সাইপ্রাসে যাওয়ার পথে হঠাৎ এক প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে পড়ে যাওয়ায় এথোস পর্বতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই পর্বতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি যীশুর কাছ থেকে এটা চেয়ে নিয়েছিলেন। তাই, এথোস পর্বতকে “পবিত্র কুমারীর বাগান” বলা হয়। বাইজানটাইন আমলের মাঝামাঝি সময় থেকে পুরো পাথুরে জায়গাটা পবিত্র পর্বত হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। আর সম্রাট কনস্টানটাইন ৯ম মনোন্যাকোসের আদেশে একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই নাম সরকারিভাবে অনুমোদন পায়।
বৈরাগীরা নিরালা ও এবড়ো খেবড়ো জায়গা পছন্দ করায় এথোস পর্বত তাদের তপস্যার জন্য একেবারে উপযুক্ত জায়গা। শত শত বছর ধরে অর্থোডক্স ধর্ম মানেন এমন অনেক গ্রিক, সাইবেরিয়, রোমানীয়, বুলগেরীয়, রুশ এবং অন্যান্য ধর্মপ্রাণ লোকেরা এসে এখানে তাদের গির্জা ও সমাজের অনেক মঠ বানিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে প্রায় ২০টা মঠ আজও আছে।
আজকে এথোস পর্বত
আজকে এথোস পর্বত আর কোন সরকারের অধীনে নেই আর ১৯২৬ সালে এটা আইনত এই স্বাধীনতা পেয়েছে। বছরের পর বছর ধরে যদিও সন্ন্যাসীদের সংখ্যা কমে গিয়েছিল কিন্তু এখন তা বেড়ে ২,০০০ জনেরও বেশিতে গিয়ে পৌঁছেছে।
মঠবাসী সকলের নিজস্ব খামার, উপাসনার জায়গা ও ঘর আছে। সন্ন্যাসীদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র জায়গা এথোস পর্বতের একেবারে প্রান্তে অবস্থিত, কারৌলিয়া মঠ। এই মঠ খাড়া ও উঁচু পাথরের ওপর অবস্থিত। এখানে শুধু কয়েকটা ছোট ছোট কুটির আছে আর সেগুলোতে পৌঁছাতে গেলে অনেক বাঁকাচোরা, এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে ও লোহার কাঁটা তার পার হয়ে পায়ে হেঁটে যেতে হয়। এথোস পর্বতের সন্ন্যাসীরা এখনও তাদের পুরনো রীতি অনুযায়ী পূজা-পাঠ করার জন্য বাইজানটাইন আমলের ঘড়ি (যেটাতে সূর্যাস্ত থেকে দিন শুরু হয়) এবং জুলিয়ান ক্যালেন্ডার (যা গ্রেগরিয় ক্যালেন্ডারের চেয়ে ১৩ দিন পিছনে) ব্যবহার করেন।
যদিও কথিত আছে যে এই ধর্মীয় জায়গাটাকে একজন নারীর জন্যই “পবিত্র” বলা হয়, তবুও গত ১০০০ বছর ধরে এখানকার সন্ন্যাসী ও তপস্বীরা পুরো উপদ্বীপেই স্ত্রীদের আসা একেবারে নিষিদ্ধ করেছেন, এমনকি স্ত্রী পশুপাখিদেরও। নপুংসক ও দাড়ি ছাড়া পুরুষেরাও সেখানে যেতে পারতেন না। কিছুদিন আগে, দাড়ি ছাড়া পুরুষ ও কিছু স্ত্রী পশুপাখিদের যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে কিন্তু এখনও এথোস পর্বতের ৫০০ মিটারের মধ্যে স্ত্রীলোকের যাওয়া নিষেধ।
সকলের জন্য এক “পবিত্র পর্ব্বত”
এথোস পর্বত কি সেই “পবিত্র পর্ব্বত” যেখানে ঈশ্বর-ভয়শীল খ্রীষ্টানদের উপাসনা করার জন্য যাওয়া উচিত? একজন শমরীয় স্ত্রীলোক যিনি বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বরকে গরিষীম পর্বতে উপাসনা করা উচিত কিন্তু যীশু তাকে পরিষ্কারভাবে বলেছিলেন যে এখন আর কোন পর্বতে ঈশ্বরের উপাসনা করা হবে না। তিনি বলেছিলেন, “এমন সময় আসিতেছে, যখন তোমরা না [গরিষীম পর্বতে], না যিরূশালেমে পিতার ভজনা করিবে।” কেন? কারণ “ঈশ্বর আত্মা; আর যাহারা তাঁহার ভজনা করে, তাহাদিগকে আত্মায় ও সত্যে ভজনা করিতে হইবে।” (বাঁকা অক্ষরে মুদ্রণ আমাদের।)—যোহন ৪:২১, ২৪.
আমাদের সময়ের কথা বলতে গিয়ে, ভাববাদী যিশাইয় এক রূপক পর্বতের কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “সদাপ্রভুর গৃহের পর্ব্বত পর্ব্বতগণের মস্তকরূপে স্থাপিত হইবে; এবং উপপর্ব্বতগণ হইতে উচ্চীকৃত হইবে” ও সমস্ত জাতির লোকেরা স্রোতের মতো এর দিকে ছুটে আসবে।—যিশাইয় ২:২, ৩.
যে পুরুষ এবং নারীরা ঈশ্বরের সঙ্গে এক সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান তাদেরকে “আত্মায় ও সত্যে” যিহোবাকে উপাসনা করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। সারা পৃথিবী থেকে লাখ লাখ লোকেরা ‘সদাপ্রভুর পর্বতে’ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন। আর তারা এমন অনুভব করেন যেমন এথোস পর্বত সম্বন্ধে এক গ্রিক আইনবিদ বলেছিলেন: “আমার মনে হয় না যে আধ্যাত্মিকতা চার দেওয়ালের গণ্ডির মধ্যে অথবা এই মঠবাসীদের মধ্যে সীমিত।”—প্রেরিত ১৭:২৪ পদের সঙ্গে তুলনা করুন।
[৩১ পৃষ্ঠার বাক্স]
অনেক দিন ধরে লুকিয়ে থাকা গুপ্তধনের ভাণ্ডার
কয়েকশ বছর ধরে এথোস পর্বতের সন্ন্যাসীরা এক গুপ্তধনের ভাণ্ডারকে জমা করে এসেছেন যার মধ্যে প্রায় ১৫,০০০ পাণ্ডুলিপি রয়েছে। কারও কারও মতে এই পাণ্ডুলিপিগুলো চতুর্থ শতাব্দীরও পুরনো আর তাই এগুলোকে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান পাণ্ডুলিপি বলে মনে করা হয়। এই পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে কিছু গুটানো লিপি আছে, সম্পূর্ণ সুসমাচার খণ্ড ও কিছু পাতা আছে, গীত ও স্তোত্র আছে, এছাড়াও পুরনো কিছু চিত্রকর্ম, প্রতিমা, ভাস্কর্য এবং ধাতুর জিনিসপত্র রয়েছে। মনে করা হয় যে এথোস পর্বতেই বিশ্বের এক চতুর্থাংশ গ্রিক পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়, যদিও এর মধ্যে অনেকগুলোকেই এখনও ঠিক করে তালিকাবদ্ধ করতে হবে। ১৯৯৭ সালে সন্ন্যাসীরা প্রথমবারের মতো থেসলোনিকির সংগ্রহশালায় তাদের কিছু কিছু মূল্যবান গুপ্তধন রাখার অনুমতি দিয়েছেন।
[৩১ পৃষ্ঠার চিত্র সৌজন্যে]
Telis/Greek National Tourist Organization