যিরূশালেম—“মহান্ রাজার নগরী”
“যিরূশালেমের দিব্য করিও না, কেননা তাহা মহান্ রাজার নগরী।”—মথি ৫:৩৫.
১, ২. যিরূশালেম সম্বন্ধে কোন্ বিষয়টি কিছুজনকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে?
যিরূশালেম—এই নামটিই বিভিন্ন ধর্মের লোকেদের মনে এক জোরালো অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। প্রকৃতপক্ষে, আমরা কেউই এই প্রাচীন শহরের বিশেষত্বকে ছোট করে দেখতে পারি না যেহেতু এর কথা প্রায়ই সংবাদে উল্লেখিত হয়। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, অনেক বিবরণই জানায় যে যিরূশালেম সবসময়ই এক শান্তিপূর্ণ স্থান থাকেনি।
২ এটি হয়ত বাইবেলের পাঠকদের কিছুটা বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে। অতীতকালে যিরূশালেমের সংক্ষিপ্ত নাম ছিল শালেম যার অর্থ ‘শান্তি।’ (আদিপুস্তক ১৪:১৮; গীতসংহিতা ৭৬:২; ইব্রীয় ৭:১, ২) তাই, আপনি হয়ত ভাবতে পারেন যে, ‘তাহলে কেন যে নগরের নামই শান্তি সেখানে আজকে শান্তির এত অভাব রয়েছে?’
৩. যিরূশালেম সম্বন্ধে নির্ভরযোগ্য তথ্য আমরা কোথায় পেতে পারি?
৩ এই প্রশ্নটির উত্তর পেতে হলে আমাদের ইতিহাসের পাতায় ফিরে গিয়ে প্রাচীনকালের যিরূশালেম সম্পর্কে কিছু জানা দরকার। কিন্তু কেউ কেউ হয়ত মনে করতে পারেন ‘প্রাচীন ইতিহাস পড়ার মতো সময় আমাদের নেই।’ কিন্তু যিরূশালেমের প্রাচীন ইতিহাসকে জানা আমাদের সকলের জন্য উপকারী। কেন তা আমাদের জন্য উপকারী সেই বিষয়ে বাইবেল এইভাবে বলে: “পূর্ব্বকালে যাহা যাহা লিখিত হইয়াছিল, সে সকল আমাদের শিক্ষার নিমিত্তে লিখিত হইয়াছিল, যেন শাস্ত্রমূলক ধৈর্য্য ও সান্ত্বনা দ্বারা আমরা প্রত্যাশা প্রাপ্ত হই।” (রোমীয় ১৫:৪) যিরূশালেম সম্বন্ধে বাইবেল আমাদের যা জানাবে তা আমাদের সান্ত্বনা দিতে পারে—আর সত্যিই তা কেবল সেই নগরের জন্য নয় কিন্তু সারা পৃথিবীর জন্য শান্তির আশা দিতে পারে।
‘সদাপ্রভুর সিংহাসনের’ স্থান
৪, ৫. কিভাবে দায়ূদ যিরূশালেমকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য সম্পন্ন করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করতে সাহায্য করেছিলেন?
৪ সাধারণ কাল পূর্ব একাদশ শতাব্দীতে যিরূশালেম এক সুরক্ষিত ও শান্তিপূর্ণ জাতির রাজধানী হিসাবে জগদ্বিখ্যাত হয়েছিল। যিহোবা সেই প্রাচীন জাতি—ইস্রায়েলের উপর যুবক দায়ূদকে রাজা হিসাবে অভিষিক্ত করেছিলেন। সেইজন্য যিরূশালেমের রাজাসনে বসে দায়ূদ ও তার রাজকীয় বংশধরেরা “সদাপ্রভুর রাজসিংহাসনে” অথবা “সদাপ্রভুর সিংহাসনে” বসার অধিকারী হয়েছিলেন।—১ বংশাবলি ২৮:৫; ২৯:২৩.
৫ ঈশ্বর ভয়শীল পুরুষ দায়ূদ—যিহূদা বংশীয় এক ইস্রায়েলীয়—পৌত্তলিক যিবূষীয়দের হাত থেকে যিরূশালেমকে অধিকার করেছিলেন। তখন নগরটির সীমানার মধ্যে একমাত্র পর্বত ছিল সিয়োন আর এই নামটি যিরূশালেম শব্দটির সমার্থক ছিল। কালক্রমে, দায়ূদ ঈশ্বরের নিয়ম সিন্দুক যিরূশালেমে নিয়ে আসার জন্য সমস্ত ইস্রায়েলকে একত্র করেছিলেন যেখানে এটিকে একটি তাঁবুতে রাখা হয়েছিল। বহু বছর আগে ঈশ্বর সেই পবিত্র সিন্দুকের উপরে অবস্থিত মেঘের মধ্যে থেকে তাঁর ভাববাদী মোশির সঙ্গে কথা বলেছিলেন। (যাত্রাপুস্তক ২৫:১, ২১, ২২; লেবীয় পুস্তক ১৬:২; ১ বংশাবলি ১৫:১-৩) সিন্দুক ঈশ্বরের উপস্থিতিকে বোঝাতো কারণ ইস্রায়েলের প্রকৃত রাজা ছিলেন যিহোবা। তাই দুটি অর্থে বলা যেতে পারত যে যিরূশালেম নগর থেকে যিহোবা ঈশ্বরই শাসন করতেন।
৬. দায়ূদ ও যিরূশালেমের বিষয়ে যিহোবা কোন্ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন?
৬ যিহোবা দায়ূদের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তার রাজকীয় বংশের রাজ্য, সিয়োন বা যিরূশালেম যার প্রতিনিধিত্ব করে তা কখনও শেষ হবে না। এটি বুঝিয়েছিল যে দায়ূদের বংশধর ঈশ্বরের অভিষিক্ত ব্যক্তি—মশীহ অথবা খ্রীষ্টa হিসাবে চিরকাল রাজত্ব করার জন্য উত্তরাধিকারসূত্রে সেই অধিকার পাবেন। (গীতসংহিতা ১৩২:১১-১৪; লূক ১:৩১-৩৩) বাইবেল এটিও বলে যে ‘সদাপ্রভুর সিংহাসনের’ এই চিরস্থায়ী উত্তরাধিকারী কেবল যিরূশালেমের উপরই নয় কিন্তু সমস্ত জাতির উপর শাসন করবেন।—গীতসংহিতা ২:৬-৮; দানিয়েল ৭:১৩, ১৪.
৭. কিভাবে রাজা দায়ূদ যিরূশালেমে শুদ্ধ উপাসনাকে তুলে ধরেছিলেন?
৭ ঈশ্বরের অভিষিক্ত ব্যক্তি, রাজা দায়ূদকে সিংহাসনচ্যুত করার প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছিল। পরিবর্তে, শত্রু রাজ্যগুলি অধীনে এসেছিল আর প্রতিজ্ঞাত দেশের সীমানা সেগুলির ঈশ্বর নিরূপিত সীমা পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। দায়ূদ শুদ্ধ উপাসনাকে তুলে ধরার জন্য এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছিলেন। আর দায়ূদের অনেক গীত সিয়োনের প্রকৃত রাজা হিসাবে যিহোবার প্রশংসা করে।—২ শমূয়েল ৮:১-১৫; গীতসংহিতা ৯:১, ১১; ২৪:১, ৩, ৭-১০; ৬৫:১, ২; ৬৮:১, ২৪, ২৯; ১১০:১, ২; ১২২:১-৪.
৮, ৯. রাজা শলোমনের রাজত্বকালে কিভাবে সত্য উপাসনা যিরূশালেমে প্রসারলাভ করেছিল?
৮ দায়ূদের পুত্র শলোমনের রাজত্বকালে যিহোবার উপাসনা নতুন শিখরে পৌঁছেছিল। শলোমন যিরূশালেমকে উত্তর দিকে প্রসারিত করেছিলেন আর মোরিয়া পর্বতকে রাজ্যসীমার মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন (যে অঞ্চলে আজকে মসজিদ রয়েছে যেটি ডোম অফ দ্যা রক নামে পরিচিত)। সেই সুউচ্চ স্থানে তিনি যিহোবার প্রশংসার জন্য এক চমৎকার মন্দির তৈরি করার আশীর্বাদ লাভ করেছিলেন। নিয়ম সিন্দুক মন্দিরের অতি পবিত্র স্থানে রাখা হয়েছিল।—১ রাজাবলি ৬:১-৩৮.
৯ যখনই ইস্রায়েল জাতি যিরূশালেমে যিহোবার উপাসনায় তাদের মন প্রাণ ঢেলে দিয়েছিল, তারা শান্তি উপভোগ করেছিল। এই অবস্থাটিকে সুন্দরভাবে বর্ণনা করে শাস্ত্র বলে: “যিহূদা ও ইস্রায়েল সমুদ্রতীরস্থ বালুকার ন্যায় বহুসংখ্যক ছিল, তাহারা ভোজন পান ও আমোদ করিত। . . . আর তাঁহার [শলোমনের] চারিদিকের সমস্ত অঞ্চলে শান্তি ছিল। . . . যিহূদা ও ইস্রায়েল প্রত্যেক জন আপন আপন দ্রাক্ষালতার ও আপন আপন ডুমুর বৃক্ষের তলে নির্ভয়ে বাস করিত।”—১ রাজাবলি ৪:২০, ২৪, ২৫.
১০, ১১. শলোমনের রাজত্বকালে যিরূশালেমের অবস্থা সম্পর্কে বাইবেল যা বলে প্রত্নতত্ত্ব কিভাবে সেটিকে সমর্থন করে?
১০ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার শলোমনের সমৃদ্ধশালী রাজত্বের এই বিবরণকে সমর্থন করে। অধ্যাপক যোহানান আরোনী ইস্রায়েল দেশের প্রত্নতত্ত্ব (ইংরাজি) নামক তার বইতে বলেন: “রাজ দরবারে বিভিন্ন উৎস থেকে যে অর্থ আসত আর বাণিজ্যের যে প্রসার ঘটেছিল . . . তা বস্তুগত কৃষ্টির সমস্ত দিকে এক দ্রুত ও উল্লেখযোগ্য বিপ্লব নিয়ে এসেছিল। . . . বস্তুগত কৃষ্টিতে এই জোয়ার . . . কেবল বিলাসদ্রব্যের ক্ষেত্রেই নয় কিন্তু বিশেষভাবে মৃৎশিল্পের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল। . . . মাটির পাত্রের গুণগত মান ও সেগুলিকে পোড়ানোর কৌশলে কল্পনাতীত উন্নতি হয়েছিল।”
১১ একইভাবে জেরি এম. লেন্ডে লিখেছিলেন: “বিগত দুশো বছরে ইস্রায়েলের বস্তুগত কৃষ্টি যতখানি এগিয়েছিল তার তুলনায় শলোমনের শাসনাধীনের ত্রিশ বছরে তা অনেক বেশি উন্নতি করেছিল। মাটি খুঁড়ে পাওয়া নিদর্শন থেকে আমরা দেখতে পাই শলোমনের সময়কালের স্মৃতিসৌধের ধ্বংসাবশেষ, বিশাল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বড় বড় শহরগুলি, ধনী পরিবারগুলি বাস করত এমন অসংখ্য বিলাসবহুল বাড়ি, মাটির পাত্র ও সেগুলির উৎপাদন প্রণালীর প্রযুক্তিগত দক্ষতা অস্বাভাবিক উন্নতমানের ছিল। এছাড়াও দূর-দেশ থেকে আসা হস্তশিল্প সংক্রান্ত জিনিসপত্রগুলির ধ্বংসাবশেষ সেখানে পাওয়া গিয়েছিল যা আমাদের ব্যাপক আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্য সম্বন্ধে জানায়।”—দায়ূদের গৃহ (ইংরাজি)।
শান্তি থেকে ধ্বংস পর্যন্ত
১২, ১৩. কিভাবে যিরূশালেমে সত্য উপাসনা ক্রমাগতভাবে চলতেই থাকেনি?
১২ যিরূশালেম, যে নগরে যিহোবার মন্দির ছিল তার শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা প্রকৃতই উপযুক্ত ছিল। দায়ূদ লিখেছিলেন: “তোমরা যিরূশালেমের শান্তি প্রার্থনা কর; যাহারা তোমাকে প্রেম করে, তাহাদের কল্যাণ হউক। তোমার প্রাচীরের মধ্যে শান্তি হউক, তোমার অট্টালিকাসমূহের মধ্যে কল্যাণ হউক। আমার ভ্রাতাদের ও মিত্রগণের অনুরোধে আমি বলিব, তোমার মধ্যে শান্তি বর্ত্তুক।” (গীতসংহিতা ১২২:৬-৮) যদিও শলোমন সেই শান্তিপূর্ণ নগরে গৌরবময় মন্দির নির্মাণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি অনেক পরজাতীয় নারীকে বিবাহ করেছিলেন। তার বৃদ্ধ বয়সে তারা তাকে মিথ্যা দেবতাদের উপাসনাকে বাড়িয়ে তোলার জন্য প্রলুব্ধ করেছিলেন। এই ধর্মভ্রষ্টতার মন্দ প্রভাব সমস্ত জাতির উপর পড়েছিল যা নগর ও তার অধিবাসীদের প্রকৃত শান্তি হরণ করেছিল।—১ রাজাবলি ১১:১-৮; ১৪:২১-২৪.
১৩ শলোমনের পুত্র রহবিয়ামের রাজত্বের প্রথম দিকে দশ বংশ বিদ্রোহ করে ও ইস্রায়েলের উত্তরের রাজ্য গঠন করে। তাদের মূর্তি পূজার কারণে ঈশ্বর সেই রাজ্যকে অশূরীয়দের হাতে পরাজিত হতে দিয়েছিলেন। (১ রাজাবলি ১২:১৬-৩০) যিহূদার দক্ষিণ রাজ্যের দুই বংশ যিরূশালেমে উপাসনা করতে থাকে। কিন্তু কালক্রমে তারাও সত্য উপাসনা থেকে সরে যায় আর তাই ঈশ্বর সেই স্বেচ্ছাচারী নগরকে সা.কা.পূ. ৬০৭ সালে বাবিলনীয়দের দ্বারা ধ্বংস হতে অনুমতি দিয়েছিলেন। ৭০ বছর যিহূদী নির্বাসিত ব্যক্তিরা বাবিলনের বন্দিত্ব ভোগ করেছিল। তারপর ঈশ্বরের করুণায় তারা যিরূশালেমে ফিরে আসতে ও সত্য উপাসনাকে পুনর্স্থাপন করতে পেরেছিল।—২ বংশাবলি ৩৬:১৫-২১.
১৪, ১৫. বাবিলনীয় নির্বাসনের পর কিভাবে যিরূশালেম আবার এক মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল কিন্তু তখন কোন্ পরিবর্তন ঘটেছিল?
১৪ সত্তর বছর ধরে উৎসন্ন দশায় থাকার কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িগুলি নিশ্চয়ই আগাছায় ভরে গিয়েছিল। যিরূশালেমের প্রাচীর ভেঙে গিয়েছিল আর একসময় যেখানে নগরদ্বার ও দুর্গগুলি ছিল সেই জায়গাগুলি ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। তবুও ফিরে আসা যিহূদীরা সাহসী হয়েছিল। তারা আগে যেখানে মন্দির ছিল সেই জায়গায় একটি বেদী নির্মাণ করেছিল আর যিহোবার উদ্দেশে প্রতিদিন বলি উৎসর্গ করতে শুরু করেছিল।
১৫ এটি এক আশাজনক শুরু ছিল কিন্তু পুনর্স্থাপিত যিরূশালেম আর কখনও সেইরকম এক রাজ্যের রাজধানী হয়ে ওঠেনি যে সিংহাসনে রাজা দায়ূদের কোন বংশধর বসবেন। পরিবর্তে, বাবিলনীয় বিজেতাদের দ্বারা নিযুক্ত এক রাজ্যপাল যিহূদীদের উপর শাসন করতেন আর তাদের পারস্যের শাসককে কর দিতে হতো। (নহিমিয় ৯:৩৪-৩৭) যদিও যিরূশালেম “পদ-দলিত” অবস্থায় ছিল তবুও পৃথিবীতে একমাত্র যিরূশালেমই ছিল সেই নগর যার উপরই যিহোবা ঈশ্বরের বিশেষ অনুগ্রহ ছিল। (লূক ২১:২৪) বিশুদ্ধ উপাসনার কেন্দ্র হিসাবে এটি রাজা দায়ূদের এক বংশধরের মাধ্যমে পৃথিবীর উপর ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব অনুশীলন করার অধিকারকে চিত্রিত করেছিল।
মিথ্যা ধর্মীয় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বিরোধিতা
১৬. বাবিলন থেকে ফিরে আসা যিহূদীরা কেন যিরূশালেম পুনর্স্থাপনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল?
১৬ বাবিলনের নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পরেই যিহূদীরা এক নতুন মন্দিরের জন্য ভীত গাঁথতে শুরু করেছিল। কিন্তু মিথ্যা ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীরা তাদের উপর মিথ্যা দোষ দিয়ে পারস্য রাজ অর্তক্ষস্তের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল যাতে তারা দাবি করেছিল যে যিহূদীরা বিদ্রোহ করছে। ফলে অর্তক্ষস্ত যিরূশালেমে নির্মাণ কাজের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। আপনি কল্পনা করতে পারেন যে সেইসময়ে আপনি যদি ওই শহরে বাস করতেন, আপনি ভাবতে থাকতেন যে তাহলে যিরূশালেমের ভবিষ্যৎ কী। শেষ পর্যন্ত যিহূদীরা মন্দির নির্মাণ বন্ধ করে দিয়েছিল আর নিজেদের জন্য বস্তুগত সম্পদ অর্জনের পিছনে ছুটেছিল।—ইষ্রা ৪:১১-২৪; হগয় ১:২-৬.
১৭, ১৮. যিরূশালেম পুনর্নির্মিত হয়েছে তা দেখার জন্য যিহোবা কোন্ মাধ্যম ব্যবহার করেছিলেন?
১৭ তাদের ফিরে আসার প্রায় ১৭ বছর পর ঈশ্বর তাঁর লোকেদের চিন্তাধারাকে সংশোধন করার জন্য ভাববাদী হগয় ও সখরিয়কে ব্যবহার করেছিলেন। অনুতপ্ত হয়ে যিহূদীরা আবার মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেছিল। ইতিমধ্যে দারিয়াবস পারস্যের রাজা হন। তিনি যিরূশালেমের মন্দির পুনর্স্থাপনের বিষয়ে রাজা কোরসের আদেশকে নিশ্চিত করেছিলেন। দারিয়াবস যিহূদীদের প্রতিবেশীদের এই বিষয়ে সাবধান করে চিঠি পাঠিয়েছিলেন যে ‘তোমরা এখন যিরূশালেম হইতে দূরে থাক’ আর তিনি রাজকর থেকে অর্থ দিয়ে তাদের সাহায্য করতেও বলেছিলেন যাতে নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হতে পারে।—ইষ্রা ৬:১-১৩.
১৮ যিহূদীরা তাদের ফিরে আসার ২২তম বছরে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ করেছিল। আপনি বুঝতে পারেন যে এই উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি মহানন্দের সঙ্গে উদ্যাপন করার মতো। তবুও তখনও পর্যন্ত যিরূশালেম ও এর প্রাচীরের অনেকটা ধ্বংসাবস্থায় ছিল। “দেশাধ্যক্ষ নহিমিয়ের ও অধ্যাপক ইষ্রা যাজকের সময়ে” নগরটির প্রতি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। (নহিমিয় ১২:২৬, ২৭) স্পষ্টতই সা.কা.পূ. পঞ্চম শতাব্দীর শেষে যিরূশালেম সম্পূর্ণ পুনর্নির্মিত হয়েছিল।
মশীহের আবির্ভাব ঘটে!
১৯. মশীহ কিভাবে যিরূশালেমের অদ্বিতীয় মর্যাদাকে উপলব্ধি করেছিলেন?
১৯ আসুন এখন আমরা বেশ কিছু শতাব্দী পার হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যীশু খ্রীষ্টের জন্মের সময়ে আসি। যিহোবা ঈশ্বরের দূত যীশুর কুমারী মাকে বলেছিলেন: “প্রভু ঈশ্বর তাঁহার পিতা দায়ূদের সিংহাসন তাঁহাকে দিবেন; . . . ও তাঁহার রাজ্যের শেষ হইবে না।” (লূক ১:৩২, ৩৩) কিছু বছর পরে, যীশু তাঁর বিখ্যাত পার্বতীয় উপদেশ দিয়েছিলেন। এই উপদেশে তিনি অনেক বিষয়ে উৎসাহ ও পরামর্শ দিয়েছিলেন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে, তিনি তাঁর শ্রোতাদের ঈশ্বরের কাছে করা মানতকে পূর্ণ করতে উৎসাহিত করেছিলেন কিন্তু তিনি সাবধান করেছিলেন যে তারা যেন মিথ্যা শপথ না করে। যীশু বলেছিলেন: “তোমরা শুনিয়াছ, পূর্ব্বকালীয় লোকদের নিকটে উক্ত হইয়াছিল, ‘তুমি মিথ্যা দিব্য করিও না, কিন্তু প্রভুর উদ্দেশে তোমার দিব্য সকল পালন করিও।’ কিন্তু আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, কোন দিব্যই করিও না; স্বর্গের দিব্য করিও না, কেননা তাহা ঈশ্বরের সিংহাসন; এবং পৃথিবীর দিব্য করিও না, কেননা তাহা তাঁহার পাদপীঠ; আর যিরূশালেমের দিব্য করিও না, কেননা তাহা মহান্ রাজার নগরী।” (মথি ৫:৩৩-৩৫) এটি উল্লেখযোগ্য যে যীশু যিরূশালেমের অদ্বিতীয় মর্যাদাকে উপলব্ধি করেছিলেন—যা এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পেয়ে এসেছিল। হ্যাঁ, এটি সত্যিই যিহোবা ঈশ্বর—“মহান রাজার নগরী” ছিল।
২০, ২১. যিরূশালেমে বসবাসকারী অনেকের মনোভাবে কোন্ নাটকীয় পরিবর্তন এসেছিল?
২০ তাঁর পার্থিব জীবনের শেষ পর্যায়ে যীশু যিরূশালেমের অধিবাসীদের সামনে তাদের অভিষিক্ত রাজা হিসাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন। সেই রোমাঞ্চকর ঘটনার প্রতি সাড়া দিতে অনেকে আনন্দে উচ্চধ্বনি করে বলেছিল: “ধন্য তিনি, যিনি প্রভুর নামে আসিতেছেন! ধন্য যে রাজ্য আসিতেছে, আমাদের পিতা দায়ূদের রাজ্য।”—মার্ক ১১:১-১০; যোহন ১২:১২-১৫.
২১ কিন্তু তার এক সপ্তাহের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে জনতা যিরূশালেমের ধর্মীয় নেতাদের প্ররোচনায় যীশুর বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন। তিনি সাবধান করেছিলেন যে যিরূশালেম নগর ও সম্পূর্ণ জাতি ঈশ্বরের সামনে তার অনুগ্রহযুক্ত মর্যাদা হারাবে। (মথি ২১:২৩, ৩৩-৪৫; ২২:১-৭) উদাহরণস্বরূপ, যীশু বলেছিলেন: “হা যিরূশালেম, যিরূশালেম, তুমি ভাববাদিগণকে বধ করিয়া থাক, ও তোমার নিকটে যাহারা প্রেরিত হয়, তাহাদিগকে পাথর মারিয়া থাক! কুক্কুটী যেমন আপন শাবকদিগকে পক্ষের নীচে একত্র করে, তদ্রূপ আমিও কত বার তোমার সন্তানদিগকে একত্র করিতে ইচ্ছা করিয়াছি, কিন্তু তোমরা সম্মত হইলে না। দেখ, তোমাদের গৃহ তোমাদের নিমিত্ত উৎসন্ন পড়িয়া রহিল।” (মথি ২৩:৩৭, ৩৮) সা.কা. ৩৩ সালে নিস্তারপর্বের সময় যীশুর বিরোধীরা তাঁকে যিরূশালেমের বাইরে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। কিন্তু, যিহোবা তাঁর অভিষিক্ত ব্যক্তিকে পুনরুত্থিত করেছিলেন আর স্বর্গীয় সিয়োনে অমর আত্মিক জীবন দান করে তাঁকে গৌরবান্বিত করেছিলেন, এমন এক কার্যসিদ্ধি যা থেকে আমরা সকলে উপকৃত হই।—প্রেরিত ২:৩২-৩৬.
২২. যীশুর মৃত্যুর পর যিরূশালেমের বিষয়ে উল্লেখিত অনেক বিষয়ের অর্থ কী ছিল?
২২ সিয়োন বা যিরূশালেমের বিষয়ে যে সমস্ত ভবিষ্যদ্বাণী তখনও পর্যন্ত পূর্ণ হয়নি, বোঝা গিয়েছিল যে সেগুলি স্বর্গীয় ব্যবস্থা অথবা যীশুর অভিষিক্ত অনুগামীদের প্রতি প্রযোজ্য। (গীতসংহিতা ২:৬-৮; ১১০:১-৪; যিশাইয় ২:২-৪; ৬৫:১৭, ১৮; সখরিয় ১২:৩; ১৪:১২, ১৬, ১৭) যীশুর মৃত্যুর পর লেখা “যিরূশালেম” বা “সিয়োন” সম্পর্কে উল্লেখিত অনেক বিষয়ের এক রূপক অর্থ ছিল আর তা আক্ষরিক নগরটি বা তার অবস্থানের প্রতি প্রযোজ্য ছিল না। (গালাতীয় ৪:২৬; ইব্রীয় ১২:২২; ১ পিতর ২:৬; প্রকাশিত বাক্য ৩:১২; ১৪:১; ২১:২, ১০) যিরূশালেম যে আর “মহান রাজার নগরী” নেই তার চূড়ান্ত প্রমাণ সা.কা. ৭০ সালে পাওয়া গিয়েছিল যখন রোমীয় সৈন্যরা এটি জনশূন্য করে দিয়েছিল যেমন দানিয়েল ও যীশু খ্রীষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। (দানিয়েল ৯:২৬; লূক ১৯:৪১-৪৪) বাইবেল লেখকেরা বা যীশু নিজে কখনও ভাববাণী করেননি যে পার্থিব যিরূশালেম আবার পুনর্স্থাপিত হবে ও ঈশ্বরের অনুগ্রহ উপভোগ করবে।—গালাতীয় ৪:২৫; ইব্রীয় ১৩:১৪.
চিরস্থায়ী শান্তির পূর্বাভাস
২৩. কেন আমাদের এখনও যিরূশালেম সম্বন্ধে আগ্রহী হওয়া উচিত?
২৩ পার্থিব যিরূশালেমের প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একজন ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারবেন না যে নগরটি রাজা শলোমনের শান্তিপূর্ণ রাজত্বকালে তার নামের অর্থ—“দ্বিগুণ শান্তির অধিকারী [অথবা ভিত্তি]”—বজায় রেখেছিল। কিন্তু সেটি শান্তি ও সমৃদ্ধির এক পূর্বঝলক ছিল যা শীঘ্রই ঈশ্বরপ্রেমী লোকেরা উপভোগ করবেন যারা পৃথিবী পরমদেশে পরিণত হলে সেখানে বাস করবেন।—লূক ২৩:৪৩.
২৪. শলোমনের রাজত্বকালে যে অবস্থা বিরাজ করত তার থেকে আমরা কী শিখতে পারি?
২৪ শলোমনের রাজত্বকালের অবস্থা সম্বন্ধে ৭২ গীতটি বর্ণনা করে। কিন্তু এই সুন্দর গীতটি ছিল মশীহ যীশু খ্রীষ্টের অধীনে স্বর্গীয় শাসন যে আশীর্বাদ নিয়ে আসবে তার পূর্ববার্তা। তাঁর বিষয়ে গীতরচক গেয়েছিলেন: “তাঁহার সময়ে ধার্ম্মিক লোক প্রফুল্ল হইবে, চন্দ্রের স্থিতিকাল পর্য্যন্ত প্রচুর শান্তি হইবে। . . . তিনি আর্ত্তনাদকারী দরিদ্রকে, এবং দুঃখী ও নিঃসহায়কে উদ্ধার করিবেন। তিনি দীনহীন ও দরিদ্রের প্রতি দয়া করিবেন, তিনি দরিদ্রগণের প্রাণ নিস্তার করিবেন। তিনি চাতুরী ও দৌরাত্ম্য হইতে তাহাদের প্রাণ মুক্ত করিবেন, তাঁহার দৃষ্টিতে তাহাদের রক্ত বহুমূল্য হইবে; দেশমধ্যে পর্ব্বত-শিখরে প্রচুর শস্য হইবে, তাহার ফল লিবানোনের ন্যায় দোলায়মান হইবে; এবং নগরবাসীরা ভূমির তৃণের ন্যায় প্রফুল্ল হইবে।”—গীতসংহিতা ৭২:৭, ৮, ১২-১৪, ১৬.
২৫. কেন আমাদের যিরূশালেমের বিষয়ে আরও কিছু শিখতে চাওয়া উচিত?
২৫ যিরূশালেম বা পৃথিবীর যে কোন জায়গার ঈশ্বরপ্রেমী লোকেদের জন্য এই বাক্যগুলি কতই না সান্ত্বনা ও আশা দেয়! যারা ঈশ্বরের মশীহ রাজ্যের অধীনে পৃথিবী জুড়ে শান্তি উপভোগ করবেন আপনিও তাদের একজন হতে পারেন। অতীত যিরূশালেমের বিষয়ে জ্ঞান নেওয়া মানবজাতির জন্য ঈশ্বরের উদ্দেশ্যকে বুঝতে আমাদের সাহায্য করতে পারে। পরের প্রবন্ধগুলি আমাদের বাবিলনের নির্বাসন থেকে যিহূদীদের ফিরে আসার সাত, আট দশক পরে কোন্ ঘটনাগুলি ঘটেছিল সে বিষয়ে জানাবে। যারা আমাদের মহান রাজা যিহোবা ঈশ্বরকে গ্রহণযোগ্য উপাসনা দিতে চান তাদের সকলকে এটি সান্ত্বনা দিয়ে থাকে।
[পাদটীকাগুলো]
a “মশীহ” (ইব্রীয় শব্দ থেকে এসেছে) ও “খ্রীষ্ট” (গ্রীক শব্দ থেকে এসেছে) উপাধি দুটির অর্থ “অভিষিক্ত ব্যক্তি।”
আপনি কি স্মরণ করতে পারেন?
◻ কিভাবে যিরূশালেম “সদাপ্রভুর সিংহাসনে” পরিণত হয়েছিল?
◻ সত্য উপাসনাকে বাড়ানোর জন্য শলোমন কোন্ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন?
◻ আমরা কিভাবে জানতে পারি যে যিরূশালেম শেষ পর্যন্ত যিহোবার উপাসনার কেন্দ্র ছিল না?
◻ যিরূশালেমের বিষয়ে আরও জানার জন্য আমরা কেন আগ্রহী?
[১০ পৃষ্ঠার চিত্র]
দায়ূদনগর কেবল দক্ষিণ অঞ্চলে ছিল কিন্তু শলোমন এটিকে উত্তর দিকে বিস্তৃত করেছিলেন ও মন্দির নির্মাণ করেছিলেন
[সজন্যে]
Pictorial Archive (Near Eastern History) Est.
[৮ পৃষ্ঠার চিত্র সৌজন্যে]
Pictorial Archive (Near Eastern History) Est.