আমাদের কিভাবে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা উচিত?
যখন এক শিষ্য প্রার্থনা সম্বন্ধে নির্দেশ চেয়েছিল, যীশু তাকে সেটি দিতে প্রত্যাখ্যান করেননি। লূক ১১:২-৪ পদ অনুসারে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: “তোমরা যখন প্রার্থনা কর, বলো: পিতঃ, তোমার নাম পবিত্র বলে মান্য হোক। তোমার রাজ্য আসুক। আমাদের প্রত্যেকদিনের খাদ্য আমাদের প্রতিদিন দাও। আর আমাদের পাপ সকল ক্ষমা কর, কারণ আমাদের প্রতি যারা অন্যায় করে তাদের সকলকেই আমরাও ক্ষমা করি। আর আমাদের পরীক্ষাতে এনো না।” (ক্যাথলিক ডুয়ে সংস্করণ) এটি সাধারণভাবে প্রভুর প্রার্থনা হিসাবে সুপরিচিত। এটি অনেক তথ্য জ্ঞাপন করে।
প্রাথমিকভাবে, সবচেয়ে প্রথম শব্দটিই আমাদের বলে যে আমাদের প্রার্থনা অবশ্যই কার প্রতি সম্বোধন করে হবে—আমাদের পিতার প্রতি। লক্ষ্য করুন যীশু কোনভাবেই অন্য কোন ব্যক্তি, মূর্তি, “সাধু,” অথবা এমনকি তাঁর প্রতিও প্রার্থনা করা অনুমোদন করেননি। সর্বোপরি, ঈশ্বর ঘোষণা করেছিলেন: “আমি আপন গৌরব অন্যকে, কিম্বা আপন প্রশংসা ক্ষোদিত বস্তুকে দেব না।” (যিশাইয় ৪২:৮, ডুয়ে সংস্করণ) তাই প্রার্থনা আমাদের স্বর্গীয় পিতা ছাড়া অন্য কিছু বা কারও উদ্দেশ্যে করা হলে তা তিনি শোনেন না, উপাসকেরা যত নিষ্ঠাবানই হোক না কেন। বাইবেলে একমাত্র যিহোবা ঈশ্বরকে “প্রার্থনা শ্রবণকারী” হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।—গীতসংহিতা ৬৫:২.
অনেকে হয়ত বলতে পারেন যে “সাধুরা” কেবলমাত্র ঈশ্বরের সাথে সংযোগের মধ্যস্থ হিসাবে কাজ করে থাকে। কিন্তু যীশু নিজে নির্দেশ দিয়েছিলেন: “আমিই পথ ও সত্য ও জীবন; আমা দিয়া না আসিলে কেহ পিতার নিকটে আইসে না। আর তোমরা আমার নামে যাহা কিছু যাচ্ঞা করিবে, তাহা আমি সাধন করিব, যেন পিতা পুত্ত্রে মহিমান্বিত হন।” (যোহন ১৪:৬, ১৩) যীশু এই ধারণচাটিকে বর্জন করেছিলেন যে সাধু হিসাবে আখ্যাত কোন ব্যক্তি মধ্যস্থতার ভূমিকা নিতে পারে। এটিও লক্ষ্য করুন যে প্রেরিত পৌল খ্রীষ্ট সম্বন্ধে কী বলেছিলেন: “খ্রীষ্ট যীশু কেবলমাত্র আমাদের জন্য মরেননি—তিনি মৃতদের মধ্যে থেকে উত্থাপিতও হয়েছেন আর তিনিই ঈশ্বরের দক্ষিণে আছেন, এবং আমাদের পক্ষে অনুরোধ করছেন।” “যারা তাঁর মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে উপস্থিত হয়, তাদের জন্য অনুরোধ করণার্থে তিনি সতত জীবিত আছেন।”—রোমীয় ৮:৩৪; ইব্রীয় ৭:২৫, ক্যাথলিক যিরূশালেম বাইবেল।
সেই নাম যা অবশ্যই পবিত্র বলে মান্য হবে
যীশুর প্রার্থনার পরবর্তী শব্দগুলি ছিল: “তোমার নাম পবিত্র বলে মান্য হোক।” কিভাবে একজন তা পবিত্র করতে পারত, যা ঈশ্বরের নামকে শুদ্ধ অথবা পৃথকভাবে স্থাপন করা বোঝায়, যদি সে তা না জানত ও সেটি ব্যবহার না করত? “পুরাতন নিয়ম”-এ ৬,০০০ এরও বেশি বার ঈশ্বর তাঁর ব্যক্তিগত নাম যিহোবা দ্বারা শনাক্তিকৃত হয়েছেন।
ঈশ্বরের নাম সম্বন্ধে, ক্যাথলিক ডুয়ে সংস্করণে, যাত্রাপুস্তক ৬:৩ পদের উপর একটি পাদটীকা বলে: “কিছু আধুনিক সংস্করণ যিহোবা নামটিকে বিন্যস্ত করেছে . . . কারণ নামটির [ঈশ্বরের] প্রকৃত উচ্চারণ, যা ইব্রীয় শাস্ত্রে ছিল, দীর্ঘ অব্যবহারের ফলে এখন কিছুটা হারিয়ে গিয়েছে।” সুতরাং ক্যথলিক নিউ যিরূশালেম বাইবেল ইয়াওয়ে নামটি ব্যবহার করে। যদিও কিছু পণ্ডিতেরা ওই উচ্চারণটিকে পছন্দ করে, “যিহোবা” হচ্ছে ইংরাজিতে ঐশিক নামটি উচ্চারণের বৈধ ও সু-প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি। অন্যান্য ভাষায় ঐশিক নামটি উচ্চারণের জন্য তাদের নিজস্ব পদ্ধতি আছে। প্রধান বিষয়টি হল যে আমরা এমনভাবে নামটি ব্যবহার করব যা সেটিকে পবিত্র করে। আপনার গির্জা কি আপনাকে প্রার্থনায় যিহোবা নামটি ব্যবহার করতে শিখিয়েছে?
প্রার্থনার উপযুক্ত বিষয়গুলি
এরপর যীশু তাঁর শিষ্যদের প্রার্থনা করতে শিখিয়েছিলেন: “তোমার রাজ্য আসুক।” মথির সুসমাচার এর সাথে এই বাক্যগুলি যোগ করে: “তোমার ইচ্ছা যেমন স্বর্গে, তেমনি পৃথিবীতেও পূর্ণ হোক।” (মথি ৬:১০, ডুয়ে সংস্করণ) ঈশ্বরের রাজ্য যীশু খ্রীষ্টের অধীনে একটি সরকার। (যিশাইয় ৯:৬, ৭) বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী এটি শীঘ্রই সমস্ত মনুষ্য সরকারগুলিকে স্থানচ্যুত করবে এবং বিশ্বব্যাপী শান্তির এক যুগ নিয়ে আসবে। (গীতসংহিতা ৭২:১-৭; দানিয়েল ২:৪৪; প্রকাশিত বাক্য ২১:৩-৫) সত্য খ্রীষ্টানেরা তাই রাজ্যের এই আগমনকে তাদের প্রার্থনার এক পুনরাবৃত্ত বিষয়ে পরিণত করে। আপনার গির্জা কি আপনাকে তা করতে শিক্ষা দিয়েছে?
আগ্রহজনকভাবে, যীশু দেখিয়েছিলেন যে আমাদের প্রার্থনায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলিও যা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। তিনি বলেছিলেন: “আমাদের প্রত্যেকদিনের খাদ্য আমাদের প্রতিদিন দাও। আর আমাদের পাপ সকল ক্ষমা কর, কারণ আমাদের প্রতি যারা অন্যায় করে তাদের সকলকেই আমরাও ক্ষমা করি। আর আমাদের পরীক্ষাতে এনো না।” (লূক ১১:৩, ৪, ডুয়ে সংস্করণ) যীশুর বাক্যগুলি ইঙ্গিত করে যে আমরা আমাদের প্রত্যেকদিনের বিষয়ে ঈশ্বরের ইচ্ছার অনুসন্ধান করতে পারি, যেন আমরা যে কোন বিষয়ে যা আমাদের উদ্বিগ্ন করে অথবা আমাদের মানসিক শান্তিকে বিঘ্নিত করে, যিহোবার সমীপবর্তী হতে পারি। নিয়মিতভাবে ঈশ্বরের কাছে এইরূপে আবেদন জানান আমাদের সাহায্য করে তাঁর উপর আমাদের নির্ভরতাকে উপলব্ধি করতে। এইভাবে আমরা আমাদের জীবনে তাঁর প্রভাব সম্পর্কে আরও সচেতন হই। প্রত্যেকদিন ঈশ্বরের কাছে আমাদের অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করাও অনুরূপভাবে উপকারী। এইভাবে আমরা আমাদের দুর্বলতা সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হই—এবং অন্যদের অক্ষমতা সম্পর্কে আরও সহিষ্ণু হই। প্রলোভন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করা সম্বন্ধে যীশুর উপদেশও উপযুক্ত, বিশেষত এই পৃথিবীর অবক্ষয়িত নৈতিকতার পরিপ্রেক্ষিতে। এই প্রার্থনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমরা সেই পরিস্থিতি এবং অবস্থা এড়িয়ে চলার জন্য সতর্ক থাকব যা আমাদের অন্যায় করতে পারিচালিত করতে পারে।
তাই প্রশ্নাতীতভাবে, প্রভুর প্রার্থনা ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করে এমন প্রার্থনা অর্পণ করা সম্বন্ধে আমাদের অনেক কিছু বলে। কিন্তু যীশুর কি এই অভিপ্রায় ছিল যে আমরা এই প্রার্থনাটি গ্রহণ করি ও কেবলমাত্র সাধারণভাবে নিয়মিত এটিকে আবৃত্তি করি?
প্রার্থনা সম্পর্কে আরও পরামর্শ
প্রার্থনা সম্বন্ধে যীশু আরও নির্দেশাবলী দিয়েছিলেন। মথি ৬:৫, ৬ পদে আমরা পড়ি: “তোমরা যখন প্রার্থনা কর, তখন কপটীদের ন্যায় হইও না; কারণ তাহারা সমাজ-গৃহে ও পথের কোণে দাঁড়াইয়া লোক-দেখান প্রার্থনা করিতে ভাল বাসে; . . . কিন্তু তুমি যখন প্রার্থনা কর, তখন তোমার অন্তরাগারে প্রবেশ করিও, আর দ্বার রুদ্ধ করিয়া তোমার পিতা, যিনি গোপনে বর্ত্তমান, তাঁহার নিকটে প্রার্থনা করিও; তাহাতে তোমার পিতা, যিনি গোপনে দেখেন, তিনি তোমাকে ফল দিবেন।” এই বাক্যগুলি আমাদের শেখায় যে প্রার্থনা লোক দেখান, অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য হওয়া উচিৎ নয় যা একজনকে প্রভাবিত করে। বাইবেল যেমন উৎসাহ দেয় আপনি কি যিহোবার কাছে গোপনে আপনার হৃদয়ের কথা ভেঙে বলেন?—গীতসংহিতা ৬২:৮.
যীশু এই সাবধানবাণীও দিয়েছিলেন: “প্রার্থনাকালে তোমরা বিধর্মীদের মত অনর্থক পুনরুক্তি কর না, কারণ তারা মনে করে, বাক্যবাহুল্যে তাদের প্রার্থনার উত্তর পাবে।” (মথি ৬:৭, যিরূশালেম বাইবেল) স্পষ্টতই, যীশু মুখস্থ করা প্রার্থনা অনুমোদন করেননি—বা কোন বই থেকে তা পড়াও। তাঁর বাক্যগুলি রোজারির ব্যবহারকেও বর্জন করেছিল।
এক ক্যথলিক নিত্যকর্মসংক্রান্ত পুস্তক এই স্বীকারোক্তি করে: “আমাদের সর্বোত্তম প্রার্থনা হতে পারে আমাদের নিজস্ব স্বতঃস্ফূর্ত চিন্তাধারা, যখন আমরা কৃতজ্ঞতায় অথবা আমাদের প্রয়োজনে তাঁর দিকে ফিরি, আমাদের দুঃখের সময় অথবা তাঁর প্রতি আমাদের নিয়মিত দৈনন্দিন ভক্তি প্রদর্শন করার সময় তা প্রকাশ করি।” যীশুর নিজস্ব প্রার্থনা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, মুখস্থ করা নয়। উদাহরণস্বরূপ যোহন ১৭ অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ যীশুর প্রার্থনাটি পড়ুন। এটি আদর্শ প্রার্থনাকে অনুসরণ করে যা যিহোবার নামকে পবিত্রকৃত দেখবার জন্য যীশুর ইচ্ছাকে আলোকপাত করে। যীশুর প্রার্থনা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রগাঢ়ভাবে আন্তরিক।
যে প্রার্থনা ঈশ্বর শোনেন
যদি আপনি মুখস্থ করা প্রার্থনা, কোন “সাধু” বা মূর্তির কাছে অথবা রোজারির মত ধর্মীয় উপকরণ ব্যবহার করে প্রার্থনা করতে শিখে থাকেন, তাহলে যীশু প্রার্থনা সম্বন্ধে যে পদ্ধতির পরিলেখ দিয়েছিলেন তা হয়ত প্রথম প্রথম ভীতিজনক বলে মনে হতে পারে। তবুও, এর মাধ্যমেই ঈশ্বরকে—তাঁর নাম, তাঁর উদ্দেশ্যগুলি, তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে জানা যেতে পারে। আপনি এটি সম্পন্ন করতে পারেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাইবেল অধ্যয়নের মাধ্যমে। (যোহন ১৭:৩) যিহোবার সাক্ষীরা এই বিষয়ে আপনাকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত ও ইচ্ছুক। কারণ তারা পৃথিবীব্যাপী লক্ষ লক্ষ লোকেদের “আস্বাদন করিয়া দেখ, সদাপ্রভু মঙ্গলময়” এই বিষয়টি পরীক্ষা করতে সাহায্য করেছে! (গীতসংহিতা ৩৪:৮) যত বেশি আপনি ঈশ্বরকে জানবেন তত বেশি আপনি প্রার্থনায় তাঁর গৌরব করতে পরিচালিত হবেন। আর যিহোবার কাছে শ্রদ্ধাযুক্ত প্রার্থনার দ্বারা যত বেশি আপনি তাঁর নিকটবর্তী হবেন, তাঁর সাথে আপনার সম্পর্ক তত বেশি ঘনিষ্ঠ হবে।
সেই কারণে ঈশ্বরের সমস্ত সত্য উপাসকদের উৎসাহিত করা হয় “অবিরত প্রার্থনা” করতে। (১ থিষলনীকীয় ৫:১৭) আপনার প্রার্থনা প্রকৃতই যীশু খ্রীষ্টের নির্দেশাবলীসহ বাইবেলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কি না সেই বিষয়ে নিশ্চিত হোন। এইভাবে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে আপনার প্রার্থনার প্রতি ঈশ্বরের অনুমোদন আছে।
[৭ পৃষ্ঠার চিত্র]
যত বেশি আমরা যিহোবার সম্বন্ধে শিখি, ততই হৃদয় থেকে তাঁর কাছে প্রার্থনা করার জন্য আমরা পরিচালিত হই