“আমাদিগকে প্রার্থনা করিতে শিক্ষা দিউন”
“প্রভু আমাদিগকে প্রার্থনা করিতে শিক্ষা দিউন।” এই অনুরোধটি যীশু খ্রীষ্টের এক শিষ্য করেছিলেন। (লূক ১১:১) এই নামহীন শিষ্যটি সুস্পষ্টভাবেই এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যার প্রার্থনা সম্পর্কে গভীর উপলব্ধিবোধ ছিল। সত্য উপাসকেরা আজকে অনুরূপভাবেই এর গুরুত্ব শনাক্ত করে। সর্বোপরি, প্রার্থনা হচ্ছে একটি মাধ্যম যার দ্বারা বিশ্বের সর্বোচ্চ বিশিষ্ট ব্যক্তি আমাদের বাক্য শ্রবণ করেন! আর কেবল চিন্তা করুন! “প্রার্থনা-শ্রবণকারী” আমাদের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্বেগ সম্বন্ধে ব্যক্তিগত মনোযোগ দিয়ে থাকেন। (গীতসংহিতা ৬৫:২) আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, প্রার্থনার মাধ্যমে আমরা ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও ঈশ্বরের প্রশংসা করতে পারি।—ফিলিপীয় ৪:৬.
তৎসত্ত্বেও, “আমাদিগকে প্রার্থনা করিতে শিক্ষা দিউন” কথাগুলি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ধর্মগুলি দ্বারা ঈশ্বরের সমীপবর্তী হওয়ার অসংখ্য পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু প্রার্থনা করার জন্য কি কোন সঠিক এবং ভুল পদ্ধতি আছে? উত্তরে, আসুন আমরা প্রথমে প্রার্থনার সাথে জড়িত কিছু জনপ্রিয় ধর্মীয় প্রথার প্রতি দৃষ্টি দিই। আমরা ল্যাটিন আমেরিকার কিছু অভ্যাসের প্রতি আলোকপাত করব।
মূর্তি এবং “বক্ষক সাধু”
সাধারণতঃ, ল্যাটিন-আমেরিকার দেশগুলি গভীর ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন। উদাহরণস্বরূপ, সমগ্র মেক্সিকো ব্যাপী “রক্ষক সাধুর” কাছে প্রার্থনা করার জনপ্রিয় অভ্যাস একজন লক্ষ্য করতে পারেন। সত্যই, মেক্সিকো শহরগুলির জন্য “রক্ষক সাধু” থাকা প্রথাসিদ্ধ, যার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট দিনগুলিতে উৎসব উদ্যাপন করা হয়। মেক্সিকোর ক্যাথলিকেরাও বিভিন্ন প্রকারের অসংখ্য মূর্তির কাছে প্রার্থনা করে থাকে। কোন্ “সাধুর” কাছে মন্ত্র উচ্চারণ করা হবে তা নির্ভর করে উপাসকেরা কিধরনের অনুরোধ করতে ইচ্ছা করেন তার উপর। যদি কেউ বিবাহ করার জন্য সাথী খুঁজছেন, তাহলে তিনি “সাধু” এন্থনীর কাছে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিবেদন করতে পারেন। কেউ হয়ত মোটরগাড়ি করে যাত্রা শুরু করবেন, তিনি সুরক্ষার জন্য ভ্রমণের রক্ষক, বিশেষত মোটরগাড়ির জন্য, “সাধু” ক্রিষ্টোফারের কাছে আবেদন জানাবেন।
কিন্তু, কোথা থেকে এইপ্রকার প্রথাগুলির উদ্ভব হয়েছিল? ইতিহাস দেখায় যখন স্পেনীয়রা মেক্সিকোয় এসেছিল, তারা দেখেছিল জনসাধারণ পৌত্তলিক দেবতাদের উপাসনায় নিজেদের উৎসর্গ করেছিল। লস আসটেকাস, হোমব্রে ই ট্রিবু (আসটেকাস, দ্যা ম্যান অ্যান্ড দ্যা ট্রাইব), নামক তার বইতে ভিক্টর ভল্ফগাঙ্গ ভন হেগেন বলেন: “ব্যক্তিগত দেবতারা ছিল, প্রত্যেক গাছের জন্য তার নিজস্ব দেবতা ছিল, প্রত্যেক কাজের জন্য দেবতা বা দেবী ছিল, এমনকি আত্মহত্যার জন্যও একজন ছিল। ইয়াকাটেকুটলে ছিল ব্যবসায়ীদের দেবতা। এই বহু-ঈশ্বরবাদী জগতে সমস্ত দেবতাদের স্পষ্টভাবে নির্ধারিত প্রবণতা ও কাজ ছিল।”
এই সমস্ত দেবতা ও ক্যাথলিক “সাধুদের” মধ্যে এত উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য ছিল যে যখন স্পেনীয় বিজয়ীরা দেশীয় লোকেদের “খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত” করেছিল, এই লোকেরা সহজেই তাদের মূর্তি থেকে গির্জার “সাধুদের” কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিল। ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল এর একটি প্রবন্ধ মেক্সিকোর কিছু অংশে অভ্যাস করা হয়ে থাকে এমন ক্যাথলিকবাদের অখ্রীষ্টীয় উৎস সম্বন্ধে স্বীকার করে। এটি উল্লেখ করে যে একটি এলাকায় ৬৪টি “সাধুর” অধিকাংশকেই জনসাধারণ শ্রদ্ধা করে যা “নির্দিষ্ট মায়া জাতীর দেবতার” সাথে মিলযুক্ত।
নিউ ক্যাথলিক বিশ্বকোষ মন্তব্য করে যে “সাধু ও পৃথিবীনিবাসীদের মধ্যে এক বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধন বিরাজ করেছে, যেমন বড় ও ছোট ভাইয়ের মধ্যে বিদ্যমান থাকে এমন এক বন্ধন যা খ্রীষ্টের সাথে এবং ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ককে হ্রাস করা থেকে অনেক দূরে ছিল, যা এটিকে সমৃদ্ধ ও গভীর করে।” কিন্তু কিভাবে এক বন্ধন যা স্পষ্টভাবে পৌত্তলিকতার সাক্ষ্য দেয়, সত্য ঈশ্বরের সাথে একজনের সম্পর্ককে গভীর করতে পারত? এইপ্রকার “সাধুদের” প্রতি প্রার্থনা নিবেদন কি প্রকৃতই ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করতে পারত?
রোজারির উৎস
আর একটি জনপ্রিয় প্রথা হল রোজারির ব্যবহার। ডিক্সিওনারিও এনসিক্লোপিডিকো হিসপ্যানো-আমেরিকানো (হিস্প্যানিক-আমেরিকান এনসাইক্লোপেডিক ডিক্সনারী) এইভাবে রোজারির বর্ণনা দেয় “পঞ্চাশ বা একশ পঞ্চাশটি পুঁতির একটি মালা, প্রতি দশটি পুঁতিকে পৃথক করার জন্য একটি বড় পুঁতি গাঁথা থাকে এবং শেষভাগ একটি ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মূর্তি দ্বারা যুক্ত যার পূর্বে তিনটি পুঁতি থাকে।”
রোজারি কিভাবে ব্যবহৃত হয় সেবিষয়ে এক ক্যাথলিক প্রকাশনা বলে: “পবিত্র রোজারি আমাদের মুক্তির রহস্যের কণ্ঠোচ্চারিত এবং মনে মনে প্রার্থনার একটি পদ্ধতি। এটি দশটি পুঁতিসহ পনেরোটি বিভাগ নিয়ে তৈরি হয়ে থাকে। প্রত্যেক দশটি পুঁতি গোনার অন্তর্ভুক্ত একবার প্রভুর প্রার্থনা, দশবার প্রণাম মেরী উচ্চারণ করা এবং একবার গ্লোরিয়া পেট্রি বলা। একটি গুপ্ত ধর্মীয় রহস্য দশটি পুঁতির একটি বিভাগ গোনার সময় ধ্যান করা হত।” গুপ্ত ধর্মীয় রহস্যগুলি হল যীশু খ্রীষ্টের জীবন, কষ্টভোগ এবং মৃত্যু সম্বন্ধীয় মতবাদ অথবা শিক্ষা যা ক্যাথলিকদের জানা উচিত।
বিশ্বকোষ (ইংরাজি) জানায়: “খ্রীষ্টতত্ত্বে রোজারিসহ প্রার্থনা করার প্রাথমিক পর্যায় শুরু হয়েছিল মধ্যযুগ থেকে, কিন্তু কেবলমাত্র ১৪০০ এবং ১৫০০ শতাব্দীর মধ্যে তা বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।” শুধুমাত্র ক্যাথলিকবাদেই কি রোজারির ব্যবহার করা হয়? না। ডিক্সিওনারিও এনসিক্লোপিডিকো হিসপ্যানো-আমেরিকানো মন্তব্য করে: “মুসলিম, লামাইষ্ট ও বৌদ্ধ উপাসনায় সমরূপ পুঁতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।” সত্যই, এনসাইক্লোপিডিয়া অফ রিলিজ্ন অ্যান্ড রিলিজ্নস্ উল্লেখ করে: “এটা বলা হয়ে থাকে যে মুসলিমরা বৌদ্ধদের কাছ থেকে এবং খ্রীষ্টানেরা মুসলিমদের কাছ থেকে ক্রুসেডের সময় রোজারি গ্রহণ করেছিল।”
অনেকে বিতর্ক করে থাকে যে যখন কিছু সংখ্যক প্রার্থনার পুনরুক্তির প্রয়োজন হয় তখন রোজারি কেবলমাত্র স্মৃতি সংরক্ষণের কাজ করে। কিন্তু ঈশ্বর কি এর ব্যবহারে সন্তুষ্ট হন?
আমাদের এইপ্রকার প্রথার উপযুক্ততা বা প্রয়োগযোগ্যতার বিষয়ে অনুমান করা অথবা বিতর্ক করার প্রয়োজন নেই। তাঁর অনুগামীদের অনুরোধে, কিভাবে প্রার্থনা করতে হয় তা শেখাতে যীশু এক কর্তৃত্বপূর্ণ সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি যা বলেছিলেন, তা কিছু পাঠকদের জ্ঞানালোকিত এবং সম্ভবত আশ্চর্যও করবে।
[৩ পৃষ্ঠার চিত্র]
ক্যাথলিকেরা সাধারণতঃ রোজারি পুঁতি ব্যবহার করে থাকে। এগুলির উৎস কী?