পাঠকদের থেকে প্রশ্নসকল
যীশু বলেছিলেন: “তোমরা যাহাদের পাপ মোচন করিবে, তাহাদের মোচিত হইল; যাহাদের পাপ রাখিবে, তাহাদের রাখা হইল।” এই কথাগুলির অর্থ কি এই যে খ্রীষ্টানেরা পাপ সকল ক্ষমা করতে পারে?
সাধারণভাবে খ্রীষ্টানদের অথবা এমনকি মণ্ডলীতে নিযুক্ত প্রাচীনদের পাপ সকল ক্ষমা করার ঐশিক অধিকার রয়েছে, এমন উপসংহারে আসার কোন শাস্ত্রীয় ভিত্তি নেই। কিন্তু, উপরে উদ্ধৃত যোহন ২০:২৩ পদে যীশু তাঁর শিষ্যদের যা বলেছিলেন, তা ইঙ্গিত করে যে ঈশ্বর এই বিষয়ে প্রেরিতদের বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করেছিলেন। আর স্বর্গীয় সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে মথি ১৮:১৮ পদে তিনি যা বলেছিলেন তার সাথে হয়ত যীশুর মন্তব্যটির যোগসূত্র আছে।
ইফিষীয় ৪:৩২ পদে লিপিবদ্ধ প্রেরিত পৌলের উপদেশের পরিপ্রেক্ষিতে খ্রীষ্টানেরা নির্দিষ্ট কিছু অপরাধকে ক্ষমা করতে পারে: “তোমরা পরস্পর মধুরস্বভাব ও করুণাচিত্ত হও, পরস্পর ক্ষমা কর, যেমন ঈশ্বরও খ্রীষ্টে তোমাদিগকে ক্ষমা করিয়াছেন।” পৌল এখানে খ্রীষ্টানদের মধ্যে ব্যক্তিগত সমস্যাগুলি, যেমন অসতর্ক কথাবার্তা সম্বন্ধে বলছিলেন। তাদের এই বিষয়গুলিকে মীমাংসার জন্য, একে অপরকে ক্ষমা করতে চেষ্টা করা উচিত। যীশুর বাক্যগুলি স্মরণ করুন: “অতএব তুমি যখন যজ্ঞবেদির নিকটে আপন নৈবেদ্য উৎসর্গ করিতেছ, তখন সেই স্থানে যদি মনে পড়ে যে, তোমার বিরুদ্ধে তোমার ভ্রাতার কোন কথা আছে, তবে সেই স্থানে বেদির সম্মুখে তোমার নৈবেদ্য রাখ, আর চলিয়া যাও, প্রথমে তোমার ভ্রাতার সহিত সম্মিলিত হও, পরে আসিয়া তোমার নৈবেদ্য উৎসর্গ করিও।”—মথি ৫:২৩, ২৪; ১ পিতর ৪:৮.
যাইহোক, যোহন ২০:২৩ পদের প্রসঙ্গটি ইঙ্গিত করে যে যীশু আরও গুরুতর পাপ সকলকে নির্দেশ করছিলেন, যেমন তা নির্দেশিত হয়েছে এই বিশেষ শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও যা বলেছিলেন তার দ্বারা। আসুন দেখি কেন।
যেদিন যীশু পুনরুত্থিত হয়েছিলেন, সেইদিনই তিনি যিরূশালেমের এক বন্ধ ঘরে শিষ্যদের কাছে আবির্ভূত হন। বিবরণটি বলে: “তখন যীশু আবার তাঁহাদিগকে কহিলেন, তোমাদের শান্তি হউক; পিতা যেমন আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন, তদ্রূপ আমিও তোমাদিগকে পাঠাই। ইহা বলিয়া তিনি তাঁহাদের উপরে ফুঁ দিলেন, আর তাঁহাদিগকে কহিলেন, পবিত্র আত্মা গ্রহণ কর; তোমরা যাহাদের পাপ মোচন করিবে, তাহাদের মোচিত হইল; যাহাদের পাপ রাখিবে, তাহাদের রাখা হইল।”—যোহন ২০:২১-২৩.
সম্ভবত, যে শিষ্যদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তারা মূলত ছিল বিশ্বস্ত প্রেরিতবর্গ। (তুলনা করুন ২৪ পদ।) তাদের উপরে ফুঁ দিয়ে এবং “পবিত্র আত্মা গ্রহণ কর” বলার দ্বারা যীশু প্রতীকভাবে তাদের জানিয়েছিলেন যে শীঘ্রই পবিত্র আত্মা তাদের উপর বর্ষিত হবে। যীশু আরও বলেছিলেন যে পাপ সকল ক্ষমা করার বিষয়ে তাদের অধিকার থাকবে। যুক্তিযুক্তভাবে, তাঁর দুটি মন্তব্যই সংযুক্ত, একটি অন্যটিকে পরিচালিত করে।
তাঁর পুনরুত্থান থেকে পঞ্চাশ দিন, পঞ্চাশত্তমীর দিনে, যীশু পবিত্র আত্মা বর্ষণ করেছিলেন। তা কী সম্পাদন করেছিল? একটি বিষয় সম্পাদন করেছিল, তা হল যারা আত্মা পেয়েছিল তারা খ্রীষ্টের সাথে স্বর্গে সহশাসক হওয়ার আশা নিয়ে ঈশ্বরের আত্মিক পুত্র হিসাবে পুনরায় জন্মগ্রহণ করেছিল। (যোহন ৩:৩-৫; রোমীয় ৮:১৫-১৭; ২ করিন্থীয় ১:২২) কিন্তু সেই বর্ষিত আত্মা আরও কিছু করেছিল। এই প্রাপকদের কিছুজন অলৌকিক ক্ষমতা লাভ করেছিল। তার দ্বারা কিছু ব্যক্তি বিদেশী ভাষায় কথা বলতে পেরেছিল যা তারা জানত না। অন্যেরা ভবিষ্যদ্বাণী বলতে পেরেছিল। কিন্তু অন্যেরা অসুস্থকে সুস্থ করতে অথবা মৃতকে জীবনে উত্থিত করতে পেরেছিল।—১ করিন্থীয় ১২:৪-১১.
যেহেতু যোহন ২০:২২ পদে যীশুর কথাগুলি শিষ্যদের উপরে এই পবিত্র আত্মার বর্ষণকে উল্লেখ করে, তাই পাপ সকল ক্ষমা সম্বন্ধীয় তাঁর সংযুক্ত কথাগুলি মনে হয় বুঝায় যে প্রেরিতদের পাপ সকল ক্ষমা করা অথবা ক্ষমা না করার ক্ষেত্রে আত্মার কাজের মাধ্যমে ঐশিকভাবে এক অদ্বিতীয় অধিকার প্রদান করা হয়েছিল।—দেখুন প্রহরীদুর্গ (ইংরাজি), মার্চ ১, ১৯৪৯, পৃষ্ঠা ৭৮.
প্রতিটি সময়ে প্রেরিতদের ব্যবহৃত এইধরনের কর্তৃত্বের সম্পূর্ণ বিবরণ বাইবেল আমাদের দেয় না, অথবা প্রতিটি ক্ষেত্রে যখন তারা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে, ভবিষ্যদ্বাণী করতে অথবা সুস্থ করতে অলৌকিক দানকে ব্যবহার করেছিল তারও কোন রেকর্ড নেই।—২ করিন্থীয় ১২:১২; গালাতীয় ৩:৫; ইব্রীয় ২:৪.
একটি ক্ষেত্র যেটি প্রেরিতদের পাপ সকল ক্ষমা করা অথবা ধরে রাখার অধিকারকে জড়িত করে তা হল অননিয় ও সাফীরার বিষয়টি, যারা পবিত্র আত্মার সাথে প্রবঞ্চনা করেছিল। পিতর, যিনি যীশুর উচ্চারিত বাক্যগুলি শুনেছিলেন, যা আমরা যোহন ২০:২২, ২৩ পদে পড়ি, অননিয় ও সাফীরাকে উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। পিতর প্রথমে অননিয়কে উল্লেখ করেছিলেন, যে সঙ্গে সঙ্গে মারা গিয়েছিল। পরে যখন সাফীরা আসে এবং মিথ্যা বলে, পিতর তার বিচার ঘোষণা করেছিলেন। পিতর তার পাপ ক্ষমা করেননি, কিন্তু বলেছিলেন: “দেখ, যাহারা তোমার স্বামীর কবর দিয়াছে, তাহারা দ্বারে পদার্পণ করিতেছে, এবং তোমাকে বাহিরে লইয়া যাইবে।” সেও তৎক্ষণাৎ মারা গিয়েছিল।—প্রেরিত ৫:১-১১.
এই ঘটনাটিতে প্রেরিত পিতর একটি নির্দিষ্ট পাপকে ক্ষমা না করাকে প্রকাশ করতে বিশেষ অধিকারকে ব্যবহার করেছিলেন, এক অলৌকিক জ্ঞান যা ঈশ্বর অননিয় ও সাফীরার পাপের ক্ষমা করবেন না। সেই ক্ষেত্রগুলিতে যেখানে তারা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে খ্রীষ্টের বলিদানের ভিত্তিতে পাপ সকল ক্ষমা করা হয়েছে সেখানেও প্রেরিতদের অতিমানবীয় অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ পেয়েছিল। তাই আত্মার অধিকারী প্রেরিতেরা পাপ ক্ষমা অথবা পাপ ক্ষমা না করা ঘোষণা করতে পারতেন।a
এর অর্থ এই নয় যে আত্মায়-অভিষিক্ত সমস্ত প্রাচীনদের তখন এইধরনের অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। করিন্থীয় মণ্ডলী থেকে এক ব্যক্তির সমাজচ্যুত হওয়া সম্বন্ধে প্রেরিত পৌল যা বলেছিলেন তা থেকে আমরা সেটি বুঝতে পারি। পৌল বলেননি, ‘আমি সেই ব্যক্তিটির পাপ ক্ষমা করিয়াছি, অথবা এমনকি, ‘আমি জানি যে স্বর্গে ব্যক্তিটির ক্ষমা হয়েছে, সুতরাং তাকে পুনরায় গ্রহণ কর।’ বরঞ্চ, পৌল সমগ্র মণ্ডলীকে উপদেশ দিয়েছিলেন এই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিটিকে ক্ষমা করতে এবং তার প্রতি ভালবাসা দেখাতে। পৌল আরও বলেছিলেন: “যাহার কোন দোষ তোমরা ক্ষমা কর, আমিও ক্ষমা করি।”—২ করিন্থীয় ২:৫-১১.
একবার যে ব্যক্তিকে মণ্ডলীতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়ছিল, সকল খ্রীষ্টীয় ভাই ও বোনেরা সে যা করেছিল তা ঘৃণা না করে, এই অর্থে তাকে ক্ষমা করতে পেরেছিল। কিন্তু, প্রথমে সে অনুতপ্ত হয়েছিল এবং তাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। কিভাবে তা ঘটেছিল?
কিছু গুরুতর পাপ যা মণ্ডলীর প্রাচীনদের দেখাশোনা করতে হয় যেমন চুরি করা, মিথ্যা বলা, অথবা গুরুতর অনৈতিকতা। তারা এইধরনের অন্যায়কারী ব্যক্তিদের সংশোধন করার এবং ভর্ৎসনা করার চেষ্টা করেন যা তাদের অনুতপ্ত হতে পরিচালিত করে। কিন্তু যদি অনুতাপহীনভাবে কেউ গুরুতর পাপ অভ্যাস করে চলে, তাহলে এই প্রাচীনেরা অন্যায়কারী ব্যক্তিকে সমাজচ্যুত করার জন্য ঐশিক নির্দেশনা প্রয়োগ করেন। (১ করিন্থীয় ৫:১-৫, ১১-১৩) যোহন ২০:২৩ পদে যীশু যা বলেছিলেন তা এই ক্ষেত্রগুলিতে প্রযোজ্য নয়। এই প্রাচীনদের আত্মার অলৌকিক দান নেই, যেমন শারীরিকভাবে অসুস্থকে সুস্থ করার অথবা মৃতকে উত্থাপিত করার ক্ষমতা; সেই দানগুলি প্রথম শতাব্দীতে তাদের উদ্দেশ্যে কাজ করেছিল আর এরপর শেষ হয়ে যায়। (১ করিন্থীয় ১৩:৮-১০) এছাড়া, আজকে প্রাচীনদের ঐশিক ক্ষমতা নেই গুরুতর খারাপ কাজকে ক্ষমা করার এই ঘোষণা করে যে যিহোবার চোখে গুরুতর পাপী ব্যক্তিটি পরিশুদ্ধ। এইধরনের ক্ষমা করা হবে মুক্তিরমূল্যরূপ বলিদানের ভিত্তিতে আর কেবল যিহোবাই তার ভিত্তিতে ক্ষমা করতে পারেন।—গীতসংহিতা ৩২:৫; মথি ৬:৯, ১২; ১ যোহন ১:৯.
প্রাচীন করিন্থে সেই ব্যক্তিটির ক্ষেত্রে যেমন হয়েছিল, যখন একজন গুরুতর পাপী, অনুতপ্ত হতে অস্বীকার করে, তাকে সমাজচ্যুত করা হয়। যদি সে পরে অনুতপ্ত হয় এবং অনুতপ্ত হওয়ার উপযুক্ত কাজ করে, তাহলে ঐশিক ক্ষমালাভ সম্ভব। (প্রেরিত ২৬:২০) এইধরনের পরিস্থিতিতে, শাস্ত্র প্রাচীনদের বিশ্বাস করার কারণ দেয় যে যিহোবা বাস্তবিকই সেই পাপী ব্যক্তিটিকে ক্ষমা করেছেন। তারপর, একবার যদি সেই ব্যক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে প্রাচীনেরা বিশ্বাসে দৃঢ় হতে তাকে আধ্যাত্মিকভাবে সাহায্য করতে পারেন। করিন্থীয় খ্রীষ্টানেরা সমাজচ্যুত ব্যক্তিটিকে, যে পরে পুনঃস্থাপিত হয়েছিল যেভাবে ক্ষমা করেছিল, একইভাবে মণ্ডলীর অন্যান্যেরা তাকে ক্ষমা করতে পারে।
এইভাবে বিষয়গুলি পরিচালনা করে, প্রাচীনেরা বিচারে তাদের নিজস্ব মান নির্ধারণ করেন না। তারা বাইবেলের নীতিগুলিকে প্রয়োগ করেন এবং নিপুণভাবে শাস্ত্রীয় প্রক্রিয়াগুলিকে যা যিহোবা নির্ধারণ করেছেন, অনুসরণ করেন। তাই, প্রাচীনদের ক্ষেত্রে কোন ক্ষমা করা অথবা না করা মথি ১৮:১৮ পদে যীশুর কথাগুলির অর্থের পরিপ্রেক্ষিতে হবে: “আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, তোমরা পৃথিবীতে যাহা কিছু বদ্ধ করিবে, তাহা স্বর্গে বদ্ধ হইবে; এবং পৃথিবীতে যাহা কিছু মুক্ত করিবে, তাহা স্বর্গে মুক্ত হইবে।” তাদের কাজগুলি সাধারণভাবে বিষয়গুলির প্রতি যিহোবার যে দৃষ্টিভঙ্গি তাকে প্রতিফলিত করবে যেমন বাইবেলে তুলে ধরা হয়েছে।
পরিণামস্বরূপ, যীশু যা বলেছিলেন, যেমন যোহন ২০:২৩ পদে লিপিবদ্ধ রয়েছে, তা বাকি শাস্ত্রপদগুলির সাথে মতবিরোধ ঘটায় না, কিন্তু এটি ইঙ্গিত করে যে খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীর প্রারম্ভে তাদের বিশেষ ভূমিকার পরিপ্রক্ষিতে ক্ষমা করার বিষয়ে প্রেরিতদের এক বিশেষ ক্ষমতা ছিল।
[পাদটীকাগুলো]
a এমনকি যীশুর মৃত্যু এবং প্রায়শ্চিত্ত প্রদানের পূর্বে, তাঁর বলার অধিকার ছিল যে একজনের পাপ সকল ক্ষমা করা হয়েছে।—মথি ৯:২-৬; তুলনা করুন ১৯৯৫ সালের জুন ১, প্রহরীদুর্গ এর “পাঠকদের থেকে প্রশ্নসকল।”