মাইমোনাইডস্—একজন ব্যক্তি যিনি যিহূদী ধর্মের এক নতুন ব্যাখ্যা দেন
“এক মোশির থেকে আরম্ভ করে আরেক মোশি পর্যন্ত এমন কেউ ছিল না যার সাথে মোশির তুলনা করা যায়।” অনেক যিহূদীরা এই সাঙ্কেতিক অভিব্যক্তিটির সাথে পরিচিত যা একজনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনার্থে করা হয়েছিল যিনি ছিলেন দ্বাদশ-শতাব্দীর যিহূদী দার্শনিক, সঙ্কেতলিপির উদ্ধারকর্তা এবং তালমুড ও শাস্ত্রের সমালোচক, মোসেস্ বেন্ মাইমন্—যিনি মাইমোনাইডস্ ও রামবাম হিসাবেও পরিচিত ছিলেন।a যদিও আজকে অনেকে মাইমোনাইডসের সাথে পরিচিত নয় কিন্তু তার জীবন কালে তার ব্যক্তিগত লেখা যিহূদী, মুসলিম এবং গির্জার চিন্তাধারার উপরে এক গভীর প্রভাব এনেছিল। তিনি মৌলিকভাবে যিহূদী ধর্মের এক নতুন সংজ্ঞা দেন। কে এই মাইমোনাইডস্ এবং কেন অনেক যিহূদীরা তাকে “দ্বিতীয় মোশি” বলে মনে করে?
মাইমোনাইডস্ কে ছিলেন?
মাইমোনাইডসের জন্ম হয় কর্ডোবা, স্পেনে, ১১৩৫ সালে। তার পিতা মাইমোন, যিনি তাকে তার প্রাথমিক ধর্মীয় অনুশীলন দেন, তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ রব্বি কুলের অন্তর্ভুক্ত এক বিখ্যাত পণ্ডিত। ১১৪৮ সালে, যখন আলমোহাডেরা কর্ডোবা অধিকার করে তখন যিহূদীদের সামনে নির্ণয় নেওয়ার এক পরিস্থিতি উপস্থিত হয়, হয় তাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে হবে নয়তো বা সেই দেশ ছেড়ে তাদের পালিয়ে যেতে হবে। সেই সময় থেকে মাইমোনাইডসের পরিবারের জন্য শুরু হয় বহুদিন ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর এক অধ্যায়। ১১৬০ সালে তারা ফেজ্, অর্থাৎ মরোক্কোতে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করে, যেখানে তিনি একজন চিকিৎসক হিসাবে শিক্ষা লাভ করেন। ১১৬৫ সালে তার পরিবারকে আবার প্যালেস্টাইনে পালিয়ে যেতে হয়।
কিন্তু, সেই সময় ইস্রায়েলের পরিস্থিতি ছিল টলমান। মুষ্টিমেয় যিহূদী সম্প্রদায় খ্রীষ্টজগতের ধর্মযোদ্ধাদের এবং মুসলমান শক্তির কাছ থেকে আসা এক বিশেষ বিপদের সম্মুখীন হয়। ছয়-মাসেরও কম এই “পবিত্র দেশে” থাকার পর মাইমোনাইডস্ ও তার পরিবার ফস্টাটে আশ্রয় নেন যা মিশরের এক পুরনো শহর কাইরোতে অবস্থিত। এখানেই মাইমোনাইডসের প্রতিভা সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়। ১১৭৭ সালে, তিনি যিহূদী সম্প্রদায়ের প্রধান ব্যক্তি হিসাবে পরিগণিত হন এবং ১১৮৫ সালে, বিখ্যাত মুসলমান নেতা সালাদিনের দরবারে চিকিৎসক হিসাবে মনোনীত হন। ১২০৪ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই উভয় স্থানটি বজায় রেখেছিলেন। তার চিকিৎসাগত দক্ষতার খ্যাতি এতই ছিল যে একসময় নাকি ইংল্যান্ডের রাজা, সিংহ-হৃদয় রিচার্ড চেষ্টা করেছিলেন মাইমোনাইডস্কে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক করতে।
তিনি কী লেখেন?
মাইমোনাইডস্ ছিলেন একজন ফলপ্রসূ লেখক। মুসলমানদের তাড়না থেকে বাঁচবার জন্য তিনি যখন পলাতক ছিলেন, তখন তিনি তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, মিশ্নার সম্বন্ধে মন্তব্য (ইংরাজি)-এর অধিকাংশ ভাগই সঙ্কলন করেন।b আরবি ভাষায় লিখিত এই বইটি, মিশ্নার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত অনেক ধারণা ও শব্দের বিশদ ব্যাখ্যা দেয় এবং এক এক সময় অপ্রাসঙ্গিকভাবে যিহূদী ধর্মের উপর মাইমোনাইডসের দর্শন ব্যাখ্যা করে। একটি অংশে যেখানে মহাসভা (ইংরাজি) প্রণালীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেখানে মাইমোনাইডস্ যিহূদী বিশ্বাসের ১৩টি মৌলিক নীতির প্রবর্তন করেন। যিহূদী ধর্মকে কখনও এক বাহ্যিক ধর্মবিশ্বাস হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এখন মাইমোনাইডসের ১৩টি বিশ্বাসের নীতি যিহূদী ধর্মবিশ্বাসের এক আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়।—পৃষ্ঠা ২৩, বাক্সটি দেখুন।
মাইমোনাইডস্ সমস্ত কিছুর মধ্যে এক যুক্তিগত ধারাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, তা সে দৈহিক অথবা আধ্যাত্মিক যাই হোক না কেন। তিনি অন্ধ বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করেন, যা কিছু তিনি যুক্তি ও ন্যায়সঙ্গত প্রমাণের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন তারই ব্যাখ্যা তিনি দাবি করেন। এই সহজাত প্রবৃত্তিই তাকে তার বিরাট সাহিত্যকর্ম—মিশ্নে টোরা রচনা করতে প্ররোচিত করে।c
মাইমোনাইডসের সময় যিহূদীরা মনে করত যে “টোরা” অর্থাৎ “নিয়ম” কেবল মাত্র মোশির দ্বারা লিখিত বাক্যের প্রতিই প্রযোজ্য নয় কিন্তু তা শতাব্দী ধরে এই নিয়ম সম্বন্ধে রব্বিদের যে সমস্ত ব্যাখ্যা প্রচলিত ছিল তার প্রতিও প্রযোজ্য। এই ধারণাগুলি তালমুডে এবং তালমুড সম্বন্ধীয় রব্বিদের সহস্রাধিক সিদ্ধান্ত ও লেখনির মধ্যে নথিভুক্ত ছিল। মাইমোনাইডস্ উপলব্ধি করেছিলেন যে এই তথ্যের দৈর্ঘতা ও অসংলগ্নতা এতই ব্যাপক ছিল যে একজন সাধারণ যিহূদীর পক্ষে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়াই সম্ভব ছিল না যা তার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করত। এদের মধ্যে অধিকাংশেরই সময় ছিল না সারা জীবন ধরে রব্বিদের সাহিত্যগুলিকে পড়া, যেগুলির বেশির ভাগই কঠিন অরামিয় ভাষায় লেখা হয়েছিল। এর প্রতিকার হিসাবে মাইমোনাইডসের প্রস্তাব ছিল এই তথ্যের সংস্করণ করা, বাস্তবধর্মী সিদ্ধান্তগুলির আলোকপাত করা এবং এটিকে বিষয়বস্তু অনুসারে ১৪টি সঙ্কলিত বইয়ের মধ্যে সংগঠিত করা। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিষ্কার ও সহজ ইব্রীয় ভাষায় এটিকে লেখেন।
মিশ্নে টোরা এতই বাস্তবধর্মী পথপ্রদর্শক ছিল যে অনেক যিহূদী নেতারা ভয় পেয়েছিল যে এটি হয়ত সম্পূর্ণরূপে তালমুডের স্থানটি দখল করবে। তবুও, যারা এর বিরোধী ছিল, এমনকি তারাও এর অভূতপূর্ব কর্ম পাণ্ডিত্যকে স্বীকার করে। এই অতি সুসংগঠিত সঙ্কলনটি হল এক বৈপ্লবিক কীর্তি, যা যিহূদী ধর্মীয় ব্যবস্থাকে এক নতুন জীবন দেয়, যে ব্যবস্থাকে সাধারণ লোকেরা কোন রকমভাবেই সম্বন্ধযুক্ত বা অঙ্গীভূত করতে পারছিল না।
এরপর, মাইমোনাইডস্ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ লেখেন—বিভ্রান্তদের জন্য পথপ্রদর্শন। (ইংরাজি) গ্রীক সাহিত্যাদি আরবি ভাষায় অনুবাদিত হওয়ার ফলে, আরও অধিক সংখ্যায় যিহূদীরা অ্যারিস্টটেল্ ও অন্যান্য দার্শনিকদের সাথে পরিচিত হতে আরম্ভ করে। কিছু লোক বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল, তাদের পক্ষে বাইবেলের শব্দগুলির সাথে দর্শনের সংমিশ্রন করা কঠিন হয়ে উঠে। বিভ্রান্তদের জন্য পথপ্রদর্শন নামক গ্রন্থটিতে, মাইমোনাইডস্, যিনি অ্যারিস্টটেলের এক বিশেষ ভক্ত ছিলেন, তিনি বাইবেল ও যিহূদী ধর্মের সারাংশকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন যা দর্শন এবং যুক্তিপূর্ণ চিন্তাধারার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারে।—তুলনা করুন ১ করিন্থীয় ২:১-৫, ১১-১৬.
এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলি ও অন্যান্য ধর্মীয় লেখা ছাড়াও, মাইমোনাইডস্ পাণ্ডিত্যের সাথে চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে অনেক কিছু লেখেন। তার ফলপ্রসূ লেখনির আরেকটি দিক যা কখনও উপেক্ষা করা চলে না। এনসাইক্লোপিডিয়া জুডাইকা মন্তব্য করে: “মাইমোনাইডসের পত্র, চিঠি লেখার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগারম্ভের সূচনা করে। তিনি হচ্ছেন প্রথম যিহূদী পত্রলেখক যার অধিকাংশ চিঠি সংরক্ষিত রয়েছে। . . . তার চিঠিগুলি সেইসব ব্যক্তিদের মন ও হৃদয়কে স্পর্শ করত যাদের কাছে তিনি তা লিখতেন এবং তিনি তাদের ইচ্ছানুযায়ী লেখার ধারাকে পরিবর্তন করতেন।”
তিনি কী শিক্ষা দেন?
তার দ্বারা প্রবর্তিত বিশ্বাসের ১৩টি নীতির মধ্যে, মাইমোনাইডস্ বিশ্বাসের এক সংক্ষিপ্ত পরিলেখ দেন, যার অন্তর্ভুক্ত কয়েকটির মূল পাওয়া যায় শাস্ত্রের মধ্যে। কিন্তু, মশীহ হিসাবে যীশুতে বিশ্বাস সম্বন্ধীয় শাস্ত্রীয় ভিত্তির যে সারাংশ তার সাথে সপ্তম ও নবম নীতিটির বৈসাদৃশ্য দেখা যায়।d খ্রীষ্টজগতের ধর্মবিরোধী শিক্ষা, যেমন ত্রিত্ব এবং ধর্মযুদ্ধের অন্তর্ভুক্ত রক্তস্নানের মাধ্যমে প্রকাশিত স্পষ্ট ভণ্ডামির পরিপ্রেক্ষিতে, এটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে মাইমোনাইডস্, যীশুর মশীহত্বকে কেন্দ্র করে যে সব প্রশ্ন রয়েছে তার বেশি গভীরে যাননি।—মথি ৭:২১-২৩; ২ পিতর ২:১, ২.
মাইমোনাইডস্ লেখেন: “[খ্রীষ্টতত্ত্বের] চাইতে বেশি আর কী বিঘ্নিত হওয়ার বিষয় থাকতে পারে? সমস্ত ভাববাদীরা ইস্রায়েলের মুক্তিদাতা ও রক্ষাকর্তা হিসাবে মশীহের কথা বলে গেছেন . . . [এর বিপরীতে, খ্রীষ্টতত্ত্ব] খড়্গের দ্বারা যিহূদীদের হত্যা করিয়েছে, তাদের অবশিষ্টাংশদের ছিন্নভিন্ন ও অবমানিত করিয়েছে, টোরার পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং জগতের অধিকাংশকে প্রভুর পরিবর্তে অন্য দেবতার সেবা করানোর দ্বারা তাদের ভুল পথে পরিচালিত করেছে।”—মিশ্নে টোরা, “রাজাদের নিয়মাবলি ও তাদের যুদ্ধসকল” (ইংরাজি), ১১ অধ্যায়।
তবুও, তার প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখানো সত্ত্বেও, অনেক যিহূদীরা মাইমোনাইডস্কে উপেক্ষা করে বিশেষ করে যখন তিনি কোন বিশেষ বিষয়ের উপর তার স্পষ্ট মন্তব্য রাখেন। যিহূদী ধর্মের মধ্যে গুপ্তরহস্যের (কাবালা) প্রভাব যতই বাড়তে থাকে, ততই জ্যোতিষিবিদ্যা যিহূদীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। মাইমোনাইডস্ লিখেছিলেন: “যে কেউ জ্যোতিষিবিদ্যার সাথে যুক্ত এবং যে তার কাজ ও ভ্রমণ করার পরিকল্পনা তাদের দেওয়া নির্ধারিত সময়ের ভিত্তিতে করে থাকে যারা নক্ষত্রের পরীক্ষা করে, সে অবশ্যই বেত্রাঘাত পাওয়ার যোগ্য . . . এই সমস্ত বিষয়গুলি হল মিথ্যা ও ছলনাপূর্ণ . . . যারা এগুলি বিশ্বাস করে . . . তারা মূর্খ ও অজ্ঞান।”—মিশ্নে টোরা, “পৌত্তলিকতার নিয়মাবলি” (ইংরাজি), ১১ অধ্যায়; তুলনা করুন লেবীয়পুস্তক ১৯:২৬; দ্বিতীয় বিবরণ ১৮:৯-১৩.
এছাড়াও মাইমোনাইডস্ খুব স্পষ্টভাবে আরেকটি অভ্যাসের সমালোচনা করেন: “[রব্বিরা] কিছু ব্যক্তিবিশেষ ও সম্প্রদায়ের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অর্থ দাবি করার প্রথা বলবৎ করেছিল এবং লোকেদের মধ্যে নির্বোধের মতো এই ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে এটি বাধ্যতামূলক ও সঠিক . . . এগুলি সব ভুল ছিল। টোরা অথবা [টালমুডে] লিখিত সাধুদের কথার মধ্যে এমন একটি শব্দও পাওয়া যায় না যেখানে অর্থদানের পক্ষে কোন সমর্থন জানানো হয়েছে।” (মিশ্না সম্বন্ধে মন্তব্য, অ্যাভোট ৪:৫) এই রব্বিদের বিপরীতে, মাইমোনাইডস্ নিজের ভরনপোষণ করার জন্য চিকিৎসক হিসাবে কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং কখনও ধর্মীয় কাজের জন্য অর্থ গ্রহণ করতেন না।—তুলনা করুন ২ করিন্থীয় ২:১৭; ১ থিষলনীকীয় ২:৯.
কিভাবে যিহূদী ধর্ম ও অন্যান্য বিশ্বাসগুলি প্রভাবিত হয়েছিল?
যিরূশালেমের, ইব্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়েসাইহু লিবোভিটস্, মন্তব্য করেন: “যিহূদী ধর্মের ইতিহাসে মাইমোনাইডস্ হলেন সবচাইতে প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিশেষ করে পূর্বপুরুষ ও ভাববাদীদের সময় থেকে আরম্ভ করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত।” এনসাইক্লোপিডিয়া যুডাইকা মন্তব্য করে: “যিহূদী ধর্মের ভবিষ্যৎ উন্নতির উপর মাইমোনাইডসের প্রভাব হিসাব করা যায় না। . . . সি. সিরনোভিটস্ এমনকি এও বলেন যে যদি মাইমোনাইডস্ না থাকতেন তাহলে যিহূদী ধর্ম বিভিন্ন সম্প্রদায় ও বিশ্বাসের দ্বারা বিভক্ত হয়ে পড়ত . . . এই বিভিন্ন গতিপ্রবাহকে একত্র করার যে প্রচেষ্টা, এটাই ছিল তার মহান কীর্তি।”
তার নিজস্ব চিন্তাধারা ও যুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে যিহূদী চিন্তাধারাকে সংগঠিত করার মাধ্যমে, মাইমোনাইডস্ যিহূদী ধর্মকে এক নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। পণ্ডিতেরা ও জনসাধারণ নির্বিশেষে সকলে এই নতুন সংজ্ঞাকে বাস্তবধর্মী ও আকর্ষণীয় বলে মনে করেছিল। এমনকি তার বিরোধীরাও শেষ পর্যন্ত মাইমোনাইডসের এই পথকে গ্রহণ করে। যদিও তার লেখার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল অবিরাম মন্তব্যগুলির উপর নির্ভর করার থেকে যিহূদীদের মুক্তি দেওয়া, কিন্তু শীঘ্রই তার নিজের লেখাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘকায় মন্তব্য লিখন শুরু হয়।
এনসাইক্লোপিডিয়া যুডাইকা জানায়: “মাইমোনাইডস্ ছিলেন মধ্যযুগের এক সবচাইতে তাৎপর্যপূর্ণ দার্শনিক এবং তার লেখা বিভ্রান্তদের জন্য পথপ্রদর্শন এক যিহূদীর দ্বারা প্রকাশিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক কর্ম।” যদিও আরবি ভাষায় লিখিত, বিভ্রান্তদের জন্য পথপ্রদর্শন, মাইমোনাইডসের জীবনকালের মধ্যেই ইব্রীয় ভাষায় অনুবাদিত হয় এবং তার কিছুদিন পরেই ল্যাটিন ভাষায়, যার ফলে সমগ্র ইউরোপে এই বইটি অধ্যয়ন করা সম্ভবপর হয়। এর ফলস্বরূপ মাইমোনাইডসের দ্বারা সম্পাদিত অ্যারিস্টটেলের দর্শনের সাথে যিহূদী চিন্তাধারার অভূতপূর্ব সমন্বয়সাধন তড়িৎ গতিতে খ্রীষ্টজগতের প্রধান চিন্তাধারার মধ্যে নিজেদের স্থান করে নেয়। তৎকালীন খ্রীষ্টজগতের পণ্ডিতেরা, যেমন এলবার্টটেস্ ম্যাগনাস্ এবং থমাস অ্যাকুইনাস্ প্রায়ই মাইমোনাইডসের দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখ করতেন। ইসলাম ধর্মের পণ্ডিতেরাও প্রভাবিত হয়েছিল। মাইমোনাইডসের দার্শনিক মতবাদ পরবর্তীকালের দার্শনিকদের, যেমন বারুক স্পিনোজাকে প্রভাবিত করে গোঁড়া যিহূদী ধর্মের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সম্পর্ক ছেদ করতে।
কঠোর বুদ্ধিদীপ্ত কার্যকলাপের জন্য মাইমোনাইডস্কে এক বিশিষ্ট পুরুষ হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে যিনি পুনরভ্যুদয় অর্থাৎ রানেইস্ন্সের পূর্বে জীবিত ছিলেন। বিশ্বাসের সাথে যুক্তির সামঞ্জস্যের উপর তিনি যে জোর দেন তা আজও এক বৈধ মান হিসাবে বিবেচিত। এই মানদণ্ডই তাকে প্ররোচিত করে প্রবলতার সাথে ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলতে। তথাপি, খ্রীষ্টজগতের খারাপ উদাহরণ এবং অ্যারিস্টটেলের দার্শনিক প্রভাব প্রায়ই তাকে বাইবেলের সত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধা দিয়েছিল। যদিও মাইমোনাইডসের কবরের উপর খচিত মন্তব্যের সাথে অনেকেই হয়ত একমত হবে না যা বলে—“এক মোশির থেকে আরম্ভ করে আরেক মোশি পর্যন্ত, এমন কেউ ছিল না যার সাথে মোশির তুলনা করা যায়”—কিন্তু এটা স্বীকার করতেই হবে যে তিনি যিহূদী ধর্মের ধারা ও কাঠামোকে এক নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
[পাদটীকাগুলো]
a “রামবাম” হল ইব্রীয় আদ্যক্ষর, অর্থাৎ এই নামটি শব্দের প্রথম বর্ণগুলির সাহায্যে গঠিত যেমন, “রব্বি মোসেস্ বেন্ মাইমোন্।”
b মিশ্না হল রব্বিদের যে মন্তব্য তার এক সংগৃহীত সঙ্কলন যা সেই ভিত্তির উপর রচিত যাকে যিহূদীরা মৌখিক নিয়ম বলে থাকে। এটি লিখিত হয় সা.শ. দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষের দিকে এবং তৃতীয় শতাব্দীর শুরুতে, যা তালমুডের সূত্রপাত ঘটায়। আরও তথ্য পাওয়ার জন্য ওয়াচটাওয়ার বাইবেল অ্যান্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটি অফ নিউ ইয়র্ক ইনক্এর দ্বারা প্রকাশিত কখনও যুদ্ধবিহীন পৃথিবী কী আসবে? (ইংরাজি) নামক ব্রোশারটির ১০ পৃষ্ঠা দেখুন।
c মিশ্নে টোরা এই নামটি হল একটি ইব্রীয় শব্দ যা দ্বিতীয় বিবরণ ১৭:১৮, পদ থেকে নেওয়া হয়েছে, যার অর্থ হল প্রতিলিপি, অথবা নিয়মের পুনরাবৃত্তি।
d যীশু যে প্রতিজ্ঞাত মশীহ ছিলেন সে সম্বন্ধে আরও কিছু প্রামাণিক তথ্য পাওয়ার জন্য, ওয়াচটাওয়ার বাইবেল অ্যান্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটি অফ্ নিউ ইয়র্ক ইনক্ কর্তৃক প্রকাশিত কখনও যুদ্ধবিহীন পৃথিবী কী আসবে? নামক ব্রোশারটির পৃষ্ঠা ২৪-৩০ দেখুন।
[২৩ পৃষ্ঠার বাক্স]
মাইমোনাইডসের দ্বারা প্রবর্তিত বিশ্বাসের ১৩টি নীতিe
১. সমস্ত কিছুর সৃষ্টি ও শাসনকর্তা হলেন ঈশ্বর। তিনি একাই সবকিছু করেছিলেন, করছেন এবং করবেন।
২. ঈশ্বর এক। তাঁর মতো একক আর কেউ নেই।
৩. ঈশ্বরের কোন দেহ নেই। দৈহিক চিন্তাধারা তাঁর প্রতি প্রযোজ্য নয়।
৪. ঈশ্বরই প্রথম ও শেষ।
৫. ঈশ্বরের কাছেই প্রার্থনা করা যথার্থ। কেউ যেন অন্য কারও কাছে বা বস্তুর কাছে প্রার্থনা না করে।
৬. ভাববাদীদের সমস্ত বাক্যই সত্য।
৭. মোশির ভাববাণী সম্পূর্ণরূপে সত্য। তার পূর্বে ও পরে আগত সমস্ত ভাববাদীদের মধ্যে তিনিই প্রধান।
৮. সমগ্র টোরা যা এখন আমাদের কাছে আছে, এটি মোশিকে দেওয়া হয়েছিল।
৯. টোরার কোনও পরিবর্তন হবে না এবং কখনও ঈশ্বর আরেকটি দেবেন না।
১০. ঈশ্বর সমস্ত লোকের কর্ম ও চিন্তাধারা জানেন।
১১. ঈশ্বর তাদের পুরস্কার দেন যারা তাঁর আদেশ মেনে চলে এবং তাদের শাস্তি দেন যার তাঁর বিরুদ্ধে পাপ করে।
১২. মশীহ আসবেন।
১৩. মৃতদের জীবনে ফিরিয়ে আনা হবে।
[পাদটীকাগুলো]
e মাইমোনাইডস্ এই নীতিগুলির ব্যাখ্যা করেন মিশ্না সম্বন্ধে মন্তব্য, (স্যান্হাড্রিন্ ১০:১) নামক তার বইয়ে। পরবর্তীকালে যিহূদী ধর্ম এটিকে আধিকারিক ধর্মবিশ্বাস হিসাবে গ্রহণ করে। যিহূদী প্রার্থনা বইয়ে যেভাবে লেখা আছে উপরোক্ত বিষয়গুলি হল তারই সারমর্ম।
[২১ পৃষ্ঠার চিত্র সৌজন্যে]
Jewish Division / The New York Public Library / Astor, Lenox, and Tilden Foundations