আপনাদের ধৈর্যে ঈশ্বরীয় ভক্তি যোগান
“আপনাদের বিশ্বাসে . . . ধৈর্য্য, ও ধৈর্য্যে ঈশ্বরীয় ভক্তি . . . যোগাও।”—২ পিতর ১:৫, ৬, NW.
১, ২. (ক) যে সকল দেশে নাৎসি নিয়ন্ত্রণ ছিল সেখানে ১৯৩০ দশক থেকে যিহোবার সাক্ষীগণের কী হয়, এবং কেন? (খ) এই বর্বর আচরণ যিহোবার লোকেরা কিরূপে সহ্য করে?
বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে সেটি এক অন্ধকারময় যুগ ছিল। উনিশশো তিরিশ দশক থেকে শুরু করে নাৎসি নিয়ন্ত্রণাধীন দেশগুলিতে হাজার হাজার যিহোবার সাক্ষীদের অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে রাখা হয়। কেন? কারণ তারা নিরপেক্ষ থাকতে সাহস দেখিয়েছিল এবং হেইল হিটলার বলতে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদের সাথে কিরূপ আচরণ করা হয়? “বাইবেল ছাত্রদের [যিহোবার সাক্ষীদের] মত আর কোন বন্দীই . . . এস্. এস্. সৈনিকদের এই ধরনের বর্বরতার স্বীকার হয়নি। এটি এক বর্বরতা যা দৈহিক ও মানসিক অত্যাচারের দ্বারা চিহ্নিত হয়েছিল, যা জগতের কোন ভাষা দ্বারা প্রকাশ করা অসম্ভব।”—কার্ল উইটিগ্, জার্মান দেশীয় এক প্রাক্তন সরকারী সচিব।
২ এই ক্ষেত্রে সাক্ষীগণের কী হয়েছিল? ডা. ক্রিস্টিন্ ই. কিং তার বই দ্যা নাৎসি স্টেট অ্যাণ্ড দ্যা নিউ রিলিজিয়ানস্: ফাইভ্ কেস্ স্টাডিজ ইন নন্-কন্ফর্মিটি নামক বইতে বলেন: “একমাত্র সাক্ষীদের প্রতি [অন্যান্য ধর্মীয় দলের বিপরীতে] সরকার অকৃতকার্য হয়।” হ্যাঁ, যিহোবার সাক্ষীগণ একটি দল হিসাবে দৃঢ় থাকে, যদিও শত শত সাক্ষীর জন্য এর অর্থ হয় মৃত্যু পর্যন্ত সহ্য করা।
৩. যিহোবার সাক্ষীগণকে প্রচণ্ড পরীক্ষা সহ্য করতে কী সক্ষম করেছে?
৩ শুধুমাত্র জার্মানীতেই নয়, কিন্তু অন্যান্য দেশেতেও এইরূপ পরীক্ষা সহ্য করতে যিহোবার সাক্ষীগণকে কী সাহায্য করেছে? তাদের ঈশ্বরীয় ভক্তির জন্য স্বর্গীয় পিতা তাদের সহ্য করতে সাহায্য করেছেন। “প্রভু ভক্তদিগকে পরীক্ষা হইতে উদ্ধার করিতে . . . জানেন,” প্রেরিত পিতর বিবরণ দেন। (২ পিতর ২:৯) পূর্বে, এই একই পত্রে পিতর খ্রীষ্টীয় ব্যক্তিদের পরামর্শ দেন: “আপনাদের বিশ্বাসে . . . ধৈর্য্য, ও ধৈর্য্যে ঈশ্বরীয় ভক্তি . . . যোগাও।” (২ পিতর ১:৫, ৬) সুতরাং, ধৈর্য, ঈশ্বরীয় ভক্তির সাথে ঘনিষ্ঠরূপে সংযুক্ত। আসলে, শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে হলে আমাদের ‘ঈশ্বরীয় ভক্তির অনুধাবন করা’ এবং তা প্রয়োগ করা দরকার। (১ তীমথিয় ৬:১১) কিন্তু ঈশ্বরীয় ভক্তি আসলে কী?
ঈশ্বরীয় ভক্তি আসলে কী
৪, ৫. ঈশ্বরীয় ভক্তি কী?
৪ “ঈশ্বরীয় ভক্তি”-র গ্রীক ভাষার বিশেষ্যকে (ইউ·সি’বি·য়া) আক্ষরিকরূপে অনুবাদ করলে হবে “উত্তম-শ্রদ্ধা।”a (২ পিতর ১:৬, কিংডম ইন্টারলিনিয়ার) এর অর্থ ঈশ্বরের প্রতি প্রীতিপূর্ণ আন্তরিক অনুভূতি। ডব্লু. ই. ভাইন অনুসারে ইউ·সি·বিস’ বিশেষণের আক্ষরিক অর্থ “উত্তম-শ্রদ্ধাশীল,” যা প্রদর্শন করে যে “ঈশ্বরের প্রতি পবিত্র সশ্রদ্ধ ভয়ের জন্য যে শক্তি ভক্তিপূর্ণ কার্যাবলীতে প্রকাশ পায়।”—২ পিতর ২:৯, ইন্টারলিনিয়ার।
৫ তাই, “ঈশ্বরীয় ভক্তি” এই অভিব্যক্তিটির অর্থ হল যিহোবার প্রতি শ্রদ্ধা বা ভক্তি যেটি তাঁকে যা সন্তুষ্ট করে তা করতে আমাদের পরিচালিত করে। এমনকি এটি কষ্টকর পরীক্ষার সময়েও করা হয় কারণ আমরা যিহোবাকে আমাদের হৃদয় থেকে ভালবাসি। এটি হল যিহোবার প্রতি বিশ্বস্ত, ব্যক্তিগত সম্পর্ক যা আমরা যেভাবে জীবনযাপন করি তার দ্বারা প্রকাশিত হয়। সত্য খ্রীষ্টানদের উদ্দীপিত করা হয় প্রার্থনা করার জন্য যাতে তারা “সম্পূর্ণ ভক্তিতে ও ধীরতায় নিরুদ্বেগ ও প্রশান্ত জীবন যাপন করিতে” পারে। (১ তীমথিয় ২:১, ২) অভিধান-রচক জে. পি. লোউ এবং ই. এ. নাইডা অনুসারে, “বেশ কয়েকটি ভাষায় [ইউ·সি’বি·য়া] ১ তীম ২.২ পদ উপযুক্তরূপে অনুবাদ করা হয় ‘ঈশ্বর যেমন চান সেইরূপে জীবন যাপন করা’ অথবা ‘ঈশ্বর যেমনভাবে বলেছেন সেইরূপে জীবন যাপন করা।’”
৬. ধৈর্য ও ঈশ্বরীয় ভক্তির মধ্যে সম্বন্ধ কী?
৬ ধৈর্য ও ঈশ্বরীয় ভক্তির মধ্যে সম্বন্ধটি আমরা এখন আরও ভালভাবে উপলব্ধি করতে পারব। যেহেতু আমরা ঈশ্বর যেমন চান সেইরূপে জীবন যাপন করি—ঈশ্বরীয় ভক্তির সাথে—আমরা জগতের কাছে ঘৃণাস্পদ হই যে জন্য অবশম্ভাবীরূপে আমাদের বিশ্বাসের পরীক্ষা আসে। (২ তীমথিয় ৩:১২) যদি আমাদের স্বর্গীয় পিতার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক না থাকত তাহলে আমরা কোনরূপেই সেই রকম পরীক্ষা সহ্য করতে প্রেরণা পেতাম না। এছাড়া, যিহোবা এইরূপ আন্তরিক ভক্তির প্রতি সাড়া দেন। তার প্রতি ভক্তির জন্য যারা সমস্ত রকমের বাধা সহ্য করে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছে তাদের স্বর্গ থেকে দেখে তিনি কিরূপ বোধ করেন তা একবার ধারণা করুন। তাই আশ্চর্যের নয় যে তিনি “ভক্তদিগকে পরীক্ষা হইতে উদ্ধার করিতে” জানেন!
৭. ঈশ্বরীয় ভক্তি কেন অর্জন করতেই হবে?
৭ যাইহোক, আমরা ঈশ্বরীয় ভক্তি নিয়ে জন্মাইনি বা আমরা আপনা-আপনি ঈশ্বরীয় পিতামাতার কাছ থেকে তা অর্জন করিনি। (আদিপুস্তক ৮:২১) পরিবর্তে, এটি অর্জন করার দরকার হয়। (১ তীমথিয় ৪:৭, ১০) আমাদের ধৈর্য ও বিশ্বাসে ঈশ্বরীয় ভক্তি যোগাতে আমাদের চেষ্টা করতেই হবে। পিতর এই সম্পর্কে বলেন যে “যত্ন প্রয়োগের”-র প্রয়োজন। (২ পিতর ১:৫) তাহলে, আমরা কিরূপে ঈশ্বরীয় ভক্তি অর্জন করতে পারি?
আমরা কিরূপে ঈশ্বরীয় ভক্তি অর্জন করতে পারি?
৮. প্রেরিত পিতর অনুসারে, ঈশ্বরীয় ভক্তি অর্জন করার চাবিকাঠি কী?
৮ ঈশ্বরীয় ভক্তি অর্জনের চাবিকাঠি সম্পর্কে প্রেরিত পিতর বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: “ঈশ্বরের এবং আমাদের প্রভু যীশুর তত্ত্বজ্ঞানে অনুগ্রহ ও শান্তি প্রচুররূপে তোমাদের প্রতি বর্ত্তুক। কারণ যিনি নিজ গৌরবে ও সদ্গুণে আমাদিগকে আহ্বান করিয়াছেন, তাঁহার তত্ত্বজ্ঞান দ্বারা তাঁহার ঈশ্বরীয় শক্তি আমাদিগকে জীবন ও ভক্তি সম্বন্ধীয় সমস্ত বিষয় প্রদান করিয়াছে।” (২ পিতর ১:২, ৩) সুতরাং আমাদের বিশ্বাসে ও ধৈর্যে ঈশ্বরীয় ভক্তি যোগাতে হলে আমাদের যথার্থ জ্ঞানে বৃদ্ধি পেতে হবে, যা হল যিহোবা এবং যীশু খ্রীষ্ট সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান।
৯. ঈশ্বর ও খ্রীষ্ট সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান থাকার অর্থ তারা কারা, শুধুমাত্র তা জানা ছাড়াও আরও কিছু, সেটি কিভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে?
৯ ঈশ্বর ও খ্রীষ্ট সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান থাকার অর্থ কী? স্পষ্টতই, তারা কে, শুধুমাত্র সেই সম্বন্ধে জানা ছাড়াও আরও কিছু জড়িত আছে। উদাহরণস্বরূপ: আপনি হয়ত আপনার প্রতিবেশী কে জানেন এবং তার নাম উল্লেখ করেও হয়ত তাকে নমস্কার জানান। কিন্তু আপনি কি তাকে বেশ মোটা অঙ্কের টাকা ধার দেবেন? সে কী প্রকৃতির ব্যক্তি তা না জানা পর্যন্ত আপনি তাকে টাকা দেবেন না। (তুলনা করুন হিতোপদেশ ১১:১৫.) অনুরূপে, যিহোবা ও যীশুকে সঠিকরূপে বা সম্পূর্ণরূপে জানার অর্থ, তাদের অস্তিত্বকে বিশ্বাস করা এবং তাদের নাম জানা থেকেও আরও কিছু। তাদের জন্য এমন কি মৃত্যু পর্যন্ত পরীক্ষা সহ্য করতে ইচ্ছুক হতে হলে আমাদের ঘনিষ্ঠরূপে তাদের জানতে হবে। (যোহন ১৭:৩) এতে কী জড়িত আছে?
১০. যিহোবা এবং যীশুর সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান থাকার সঙ্গে কোন্ দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে এবং কেন?
১০ যিহোবা ও যীশু সম্পর্কে যথার্থ বা সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকার সাথে দুটি বিষয় জড়িত আছে: (১) ব্যক্তি হিসাবে তাদের জানা—তাদের গুণাবলি, অনুভূতি এবং পথগুলি—এবং (২) তাদের উদাহরণগুলি অনুকরণ করা। ঈশ্বরীয় ভক্তির সাথে জড়িত রয়েছে যিহোবার প্রতি এক আন্তরিক ব্যক্তিগত সম্পর্ক যা আমরা যেভাবে জীবন-যাপন করি তার দ্বারা প্রতিফলিত হয়। সুতরাং, সেটি অর্জন করতে আমাদের যিহোবাকে ব্যক্তিগতরূপে জানতে হবে এবং মানুষ হিসাবে যতদূর সম্ভব সম্পূর্ণরূপে তাঁর ইচ্ছা এবং পথ সম্পর্কে পরিচিত হতে হবে। যাঁর প্রতিমূর্তিতে আমরা সৃষ্ট, সেই যিহোবাকে প্রকৃতই জানতে হলে আমাদের সেই প্রকৃতির জ্ঞান ব্যবহার করতে হবে এবং তাঁর মত হতে প্রচেষ্টা করতে হবে। (আদিপুস্তক ১:২৬-২৮; কলসীয় ৩:১০) আর যেহেতু যীশু কথা ও কার্যের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে যিহোবাকে অনুকরণ করেছেন তাই যীশুকে সঠিকরূপে জানা হবে ঈশ্বরীয় ভক্তি বৃদ্ধিতে এক মূল্যবান সহায়ক।—ইব্রীয় ১:৩.
১১. (ক) ঈশ্বর ও খ্রীষ্ট সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান আমরা কিভাবে অর্জন করতে পারি? (খ) আমরা যা পড়ি সেই সম্বন্ধে চিন্তা করা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১১ কিন্তু, কিভাবে আমরা ঈশ্বর ও খ্রীষ্ট সম্পর্কে সেই প্রকৃতির যথার্থ জ্ঞান পেতে পারি? অধ্যবসায়ের সাথে বাইবেল ও বাইবেল-ভিত্তিক প্রকাশনা অধ্যয়ন করে।b যাইহোক, আমাদের ব্যক্তিগত অধ্যয়ন করার উদ্দেশ্য যদি ঈশ্বরীয় ভক্তি অর্জন করার জন্য হয় তাহলে গভীর চিন্তা করতে আমাদের সময় দেওয়া দরকার অর্থাৎ আমরা যা পড়ি সেই সম্পর্কে ভাবা বা বিবেচনা করা। (তুলনা করুন যিহোশূয় ১:৮.) কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? স্মরণে রাখুন ঈশ্বরীয় ভক্তি হল ঈশ্বরের প্রতি প্রীতিপূর্ণ আন্তরিক এক অনুভূতি। শাস্ত্রে, ধ্যান করার সাথে রূপক হৃদয়কে—অন্তরের ব্যক্তিকে বারংবার জড়িত করা হয়েছে। (গীতসংহিতা ১৯:১৪; ৪৯:৩; হিতোপদেশ ১৫:২৮) আমরা যা পড়ি সেই সম্বন্ধে যখন আমরা উপলব্ধিসহকারে চিন্তা করি, তখন সেটি অন্তরের ব্যক্তিতে প্রবেশ করে ফলে আমাদের অনুভূতি ও আবেগকে উদ্দীপিত করে এবং আমাদের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। একমাত্র তখনই অধ্যয়ন, আমাদের সঙ্গে যিহোবার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে দৃঢ় করবে এবং চ্যালেঞ্জের মত পরিস্থিতি বা কষ্টকর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েও ঈশ্বরের সন্তুষ্টিজনক পথে জীবন-যাপন করতে পরিচালিত করবে।
গৃহে ঈশ্বরীয় ভক্তির অভ্যাস করা
১২. (ক) পৌলের বাক্য অনুযায়ী, এক খ্রীষ্টীয় ব্যক্তি গৃহে কিভাবে ঈশ্বরীয় ভক্তির অভ্যাস করতে পারে? (খ) সত্য খ্রীষ্টানেরা কেন বয়স্ক পিতামাতাদের যত্ন নেন?
১২ গৃহেতে প্রথমে ঈশ্বরীয় ভক্তি অভ্যাস করা দরকার। প্রেরিত পৌল বলেন: “যদি কোন বিধবার পুত্ত্র কি পৌত্ত্রগণ থাকে, তবে তাহারা প্রথমতঃ নিজ বাটীর লোকদের প্রতি ভক্তি প্রকাশ করিতে ও পিতামাতার প্রত্যুপকার করিতে শিক্ষা করুক; কেননা তাহাই ঈশ্বরের সাক্ষাতে গ্রাহ্য।” (১ তীমথিয় ৫:৪) যেমন পৌল বলেন, বয়স্ক পিতামাতাদের যত্ন নেওয়া হল ঈশ্বরীয় ভক্তির এক অভিব্যক্তি। সত্য খ্রীষ্টানরা শুধুমাত্র কর্তব্য পালনের জন্য সেইরূপ যত্ন নেন না কিন্তু পিতামাতাদের প্রতি তাদের প্রেমের জন্য করেন। এছাড়াও, পরিবারকে দেখাশোনা করা সম্বন্ধে যিহোবা কতটা গুরুত্ব দেন তা তারা উপলব্ধি করেন। প্রয়োজনের সময় পিতামাতাকে সাহায্য না করলে তা ‘বিশ্বাসকে অস্বীকার করা হবে’ বলে তারা সম্পূর্ণরূপে জানে।—১ তীমথিয় ৫:৮.
১৩. গৃহে ঈশ্বরীয় ভক্তির অভ্যাস করা কেন এক প্রকৃত চ্যালেঞ্জস্বরূপ, কিন্তু বয়স্ক পিতামাতাদের যত্ন নেওয়াতে কোন্ তৃপ্তি আসে?
১৩ অবশ্য, গৃহে সব সময় ঈশ্বরীয় ভক্তি অভ্যাস করা সহজ নয়। পরিবারের সদস্যেরা হয়ত বেশ অনেক দূরে বসবাস করে। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা হয়ত নিজেদের পরিবারের ভরণপোষণ করছেন এবং আর্থিকরূপে স্বচ্ছল হওয়ার জন্য হয়ত অত্যন্ত পরিশ্রম করছেন। পিতামাতাদের যে প্রকৃতির বা যতটা পরিমাণে যত্নের প্রয়োজন, তা যারা প্রদান করে তাদের দৈহিক, মানসিক এবং আবেগজনিত স্বাস্থ্যের প্রতি তা বোঝাস্বরূপ হতে পারে। যাইহোক, এটি জেনে প্রকৃতই তৃপ্তি হয় যে পিতামাতাকে যত্ন করা শুধুমাত্র “প্রত্যুপকার” করাই হবে না কিন্তু তাঁকে সন্তুষ্ট করা হবে, “স্বর্গস্থ ও পৃথিবীস্থ সমস্ত পিতৃকুল যাঁহা হইতে নাম পাইয়াছে।”—ইফিষীয় ৩:১৪, ১৫.
১৪, ১৫. ঈশ্বরের মতানুযায়ী, সন্তানেরা পিতার যত্ন নেয় এমন এক উদাহরণ দিন।
১৪ মর্মস্পর্শী একটি উদাহরণ বিবেচনা করুন। এলিস্ ও তার পাঁচ ভাই তাদের বাবাকে ঘরে দেখাশোনা করার জন্য এক প্রকৃত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। “আমার বাবার ১৯৮৬ সালে স্ট্রোক হয়, যার জন্য তিনি সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে যান,” এলিস্ বর্ণনা করে। ছয় জন ছেলেমেয়ে বাবাকে দেখতে দায়িত্বভার নেয়, তাকে স্নান করান থেকে তাকে নিয়মিত পাশ ফিরিয়ে দেওয়ার ভার নেওয়া হয় যাতে তার শয্যাক্ষত না হয়। “আমরা তাকে পড়ে শুনাই, তার সাথে কথা বলি, তার জন্য সঙ্গীত বাজাই। আমরা নিশ্চিত নই যে তার চারপাশে যা চলছে সেই সম্বন্ধে তিনি ওয়াকিবহাল আছেন কি না, কিন্তু আমরা তার সাথে এমন ব্যবহার করি যেন তিনি সমস্ত কিছু সম্বন্ধে বুঝতে পারছেন।”
১৫ কেন ছেলেমেয়েরা এইভাবে তাদের বাবার যত্ন নেয়? এলিস্ আরও বলেন: “উনিশশো চৌঁষট্টি সালে আমার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আমাদের একা মানুষ করেন। সেই সময় আমরা ৫ থেকে ১৪ বছরের ছিলাম। তখন তিনিই একমাত্র আমাদের সাহায্যের জন্য ছিলেন; আজ তার সাহায্যের জন্য আমরা আছি।” স্পষ্টতই, এই প্রকৃতির যত্ন নেওয়া সহজ নয় এবং সন্তানেরা অনেক সময় নিরুৎসাহী হয়ে পড়ে। “কিন্তু আমরা বুঝতে পারি যে বাবার অবস্থাটি ক্ষণকালের সমস্যা,” এলিস্ বলেন। “আমরা সেই সময়ের আশা করে আছি যখন বাবা সুন্দর স্বাস্থ্য ফিরে পাবেন এবং মায়ের সাথে আমাদের পুনর্মিলন হবে।” (যিশাইয় ৩৩:২৪; যোহন ৫:২৮, ২৯) নিশ্চয়ই, এই প্রকৃতির পিতামাতার যত্ন তাঁর হৃদয়কে প্রীতিপূর্ণ করে তোলে যিনি পিতামাতাকে শ্রদ্ধা করতে হবে বলে সন্তানদের আজ্ঞা দেন!c—ইফিষীয় ৬:১, ২.
ঈশ্বরীয় ভক্তি এবং পরিচর্যা
১৬. আমরা পরিচর্যায় যা কিছু করি তার প্রধান কারণ কী হওয়া উচিৎ?
১৬ যখন আমরা ‘ক্রমাগত তাঁর পশ্চাদ্গামী হতে,’ যীশুর আমন্ত্রণ গ্রহণ করি তখন আমরা রাজ্যের সুসমচার প্রচার করার এবং শিষ্যকরণের ঐশিক কার্যভারের অধীনে আসি। (মথি ১৬:২৪; ২৪:১৪; ২৮:১৯, ২০) এই “শেষ কালে” পরিচর্যায় অংশ নেওয়া এক খ্রীষ্টীয় ব্যক্তির অবশ্যকরণীয় কাজ। (২ তীমথিয় ৩:১) যাইহোক, আমাদের প্রচার করা ও শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র এক কর্তব্যপালন নয় বা আবশ্যকতাও নয়। আমরা পরিচর্যায় যা করি ও যতটা করি তার জন্য যিহোবার প্রতি গভীর প্রেমই যেন মুখ্য কারণ হয়। “হৃদয় হইতে যাহা ছাপিয়া উঠে, মুখ তাহাই বলে,” যীশু বলেন। (মথি ১২:৩৪) হ্যাঁ, যখন আমাদের হৃদয় যিহোবার প্রেমে পূর্ণ হয়ে ওঠে তখন আমরা অপরকে তাঁর সম্বন্ধে সাক্ষ্য দিতে প্রবৃত্ত হই। ঈশ্বরের প্রতি প্রেম যখন আমাদের উদ্দেশ্য হয়, তখন পরিচর্যা হয় আমাদের ঈশ্বরীয় ভক্তির এক অর্থপূর্ণ অভিব্যক্তি।
১৭. পরিচর্যা সম্পর্কে আমরা কিভাবে সঠিক মনোভাব অর্জন করতে পারি?
১৭ পরিচর্যার জন্য আমরা কিভাবে সঠিক উদ্দেশ্য পোষণ করতে পারি? তাঁকে প্রেম করতে যিহোবা যে তিনটি কারণ আমাদের দিয়েছেন সেগুলি উপলব্ধিসহকারে বিবেচনা করুন। (১) যিহোবা আমাদের জন্য ইতিমধ্যে যা কিছু করেছেন তার জন্য আমরা যিহোবাকে প্রেম করি। মুক্তির মূল্য প্রদান করা ছাড়া এর চেয়ে মহান প্রেম তিনি আর কী দেখাতে পারেন। (মথি ২০:২৮; যোহন ১৫:১৩) (২) যিহোবা আমাদের জন্য এখন যা করছেন তার জন্য আমরা তাঁকে প্রেম করি। যিহোবার সাথে আমরা সহজে বাক্যালাপ করতে পারি, যিনি আমাদের প্রার্থনার উত্তর দেন। (গীতসংহিতা ৬৫:২; ইব্রীয় ৪:১৪-১৬) রাজ্যের আগ্রহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সাথে সাথে আমরা জীবনের প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলি সম্পর্কে তৃপ্ত হই। (মথি ৬:২৫-৩৩) আমরা নিয়মিত আত্মিক খাদ্য পেয়ে থাকি যা আমরা যে সমস্যার সম্মুখীন হই তার মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। (মথি ২৪:৪৫) আর জগদ্ব্যাপী খ্রীষ্টীয় ভ্রাতৃত্বের অংশ হয়ে আমরা আশীর্বাদপ্রাপ্ত, যা আমাদের অবশিষ্ট জগতের থেকে প্রকৃতই আলাদা করে। (১ পিতর ২:১৭) (৩) তিনি আমাদের জন্য যা করতে যাবেন তার জন্যও আমরা যিহোবাকে প্রেম করি। তাঁর প্রেমের জন্য, আমরা “প্রকৃতরূপে জীবন, তাহাই ধরে রাখতে” পেরেছি—ভবিষ্যতের অনন্ত জীবন। (১ তীমথিয় ৬:১২, ১৯) যখন আমরা আমাদের প্রতি যিহোবার প্রেম সম্পর্কে বিবেচনা করি তখন তাঁর সম্বন্ধে এবং তাঁর মূল্যবান উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অপরকে বলার জন্য আমাদের হৃদয় নিশ্চয় একাগ্রভাবে অংশ গ্রহণ করতে পরিচালিত করে! অন্যদের আর অমাদের বলার দরকার পড়ে না যে পরিচর্যায় আমাদের কী করতে হবে অথবা কতটা করতে হবে। যতটা সবে তা করতে আমাদের হৃদয় আমাদের পরিচালিত করবে।
১৮, ১৯. পরিচর্যায় অংশ গ্রহণ করার জন্য এক ভগ্নী কী বাধা অতিক্রম করেন?
১৮ এমন কি চ্যালেঞ্জ প্রদান করে এমন পরিস্থিতিতেও ঈশ্বরীয় ভক্তির দ্বারা উদ্দীপিত হৃদয় কথা বলতে প্রবৃত্ত হয়। (তুলনা করুন যিরমিয় ২০:৯.) স্টেলার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি দেখা যায়, যিনি এক অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির খ্রীষ্টান ভদ্রমহিলা। যখন প্রথম তিনি বাইবেল অধ্যয়ন করতে আরম্ভ করেন তখন তিনি ভাবেন যে, ‘আমি কখনই ঘরে ঘরে যেতে পারব না!’ তিনি বিবরণ দেন: “আমি সব সময় একটু চুপচাপ থাকতাম। আমি নিজে থেকে কারুর সাথে কথা আরম্ভ করতে পারতাম না।” অধ্যয়ন করার সাথে সাথে যিহোবার প্রতি তার প্রেম বৃদ্ধি পায় এবং লোকেদের তাঁর সম্বন্ধে বলার জন্য তার প্রচণ্ড ইচ্ছা জাগে। “আমার বাইবেল শিক্ষককে আমি এই বলেছিলাম বলে মনে পড়ে, ‘আমি এত কথা বলতে চাই কিন্তু বলতে পারি না, আর সেটিই আমাকে বিব্রত করে।’ তিনি আমাকে যা বলেছিলেন তা আমি কখনই ভুলে যাব না: ‘স্টেলা, তুমি যে কথা বলতে চাও তার জন্য কৃতজ্ঞ থাক।’”
১৯ খুব শীঘ্রই স্টেলা তার প্রতিবাসী ভদ্রমহিলাকে সাক্ষ্য দিতে আরম্ভ করেন। তারপর তার জন্য যেটি পর্বতসমান পদক্ষেপ ছিল তা তিনি গ্রহণ করেন—তিনি প্রথমবার গৃহে গৃহে পরিচর্যায় অংশ নেন। (প্রেরিত ২০:২০, ২১) তিনি স্মরণ করেন: “আমি যা বলব, তা লিখে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি এতই ভয় পাচ্ছিলাম যে আমার সামনে পাতাটা খোলা থাকলেও তা আমি দেখার সাহস করতে পারিনি!” এখন, ৩৫ বছর পরও স্টেলা লাজুক প্রকৃতির। তবুও, ক্ষেত্রের পরিচর্যা সে ভালবাসে এবং এতে অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ করে।
২০. কোন্ উদাহরণ দেখায় যিহোবার ভক্ত সাক্ষীগণের মুখ নির্যাতন অথবা কারারুদ্ধ অবস্থাও বন্ধ করতে পারেনি?
২০ ভক্ত যিহোবার সাক্ষীদের মুখ এমন কি নির্যাতন বা কারাগারবদ্ধ অবস্থাও বন্ধ করতে পারেনি। জার্মানীর আর্নস্ট এবং হিলডেগার্ট সেলিগার-এর উদাহরণ বিবেচনা করুন। তাদের বিশ্বাসের জন্য তারা দুজনে মিলে ৪০ বছরেরও বেশি সময় নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ও কমিউনিস্ট কারাগারগুলিতে কাটান। এমন কি কারাগারে থাকাকালীনও তারা অপর বন্দীদের সাক্ষ্য দিতেই থাকেন। হিলডেগার্ট স্মরণ করেন: “কারাগারের কর্মকর্তারা আমাকে বিশেষভাবে বিপজ্জনক বলে, কারণ যেমন এক নারী রক্ষক বলে, আমি সারা দিন বাইবেল সম্বন্ধেই কথা বলি। তাই আমাকে একেবারে নীচের কক্ষে রাখা হয়।” তারপর অবশেষে যখন তাদের স্বাধীন করা হয়, ভাই ও বোন সেলিগার তাদের পূর্ণ সময় খ্রীষ্টীয় পরিচর্যায় ব্যয় করেন। তারা দুজনেই মৃত্যু পর্যন্ত বিশ্বস্তভাবে সেবা করেন, ভাই সেলিগার ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এবং তার স্ত্রী ১৯৯২ সাল পর্যন্ত।
২১. আমাদের ধৈর্যে ঈশ্বরীয় ভক্তি যোগাতে আমাদের কী করতে হবে?
২১ ঈশ্বরের বাক্য অধ্যবসায়ের সাথে অধ্যয়ন করে এবং আমরা যা শিখেছি সে সম্বন্ধে উপলব্ধি সহকারে চিন্তা করে, আমরা যিহোবা ঈশ্বর ও খ্রীষ্টের সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞানে বৃদ্ধি পাব। এর ফলে আমরা সেই মূল্যবান গুণ সম্পূর্ণরূপে অর্জন করব—ঈশ্বরীয় ভক্তি। খ্রীষ্টান হওয়ার জন্য আমাদের প্রতি যে বিভিন্ন পরীক্ষাগুলি আসে, ঈশ্বরীয় ভক্তি ব্যতিরেকে আমরা তা সহ্য করতে পারব না। সুতরাং, আসুন আমরা প্রেরিত পিতরের পরামর্শটি অনুসরণ করি, ক্রমাগত ‘আপনাদের বিশ্বাসে ধৈর্য্য, ও ধৈর্য্যে ভক্তি যোগাই।’—২ পিতর ১:৫, ৬. (w93 9/15)
[পাদটীকাগুলো]
a ইউ·সি’বি·য়া সম্পর্কে, উইলিয়াম্ বার্কলে বলেন: “শব্দের সিব অংশটির [মূল অংশটি] অর্থ শ্রদ্ধা অথবা উপাসনা। ইউ হল গ্রীক শব্দ যার অর্থ হল উত্তম; সুতরাং ইউসিবিয়া হল উপাসনা, উত্তম শ্রদ্ধা যা সঠিকরূপে দেওয়া হয়।”—নিউ টেস্টামেন্ট ওয়ার্ডস্।
b ঈশ্বরের বাক্যের প্রতি জ্ঞান আরও গভীর করতে কিভাবে অধ্যয়ন করা যায় সেই সম্পর্কে আলোচনার জন্য প্রহরীদুর্গ, আগস্ট ১৫, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১২-১৭ দেখুন।
c বয়স্ক পিতামাতার প্রতি কিরূপে ঈশ্বরীয় ভক্তি প্রদর্শন করা যেতে পারে, এই সম্বন্ধে সম্পূর্ণ আলোচনার জন্য প্রহরীদুর্গ ডিসেম্বর ১, ১৯৮৭, পৃষ্ঠা ১৩-১৮ দেখুন।
আপনার উত্তর কী?
▫ ঈশ্বরীয় ভক্তি কী?
▫ ধৈর্য ও ঈশ্বরীয় ভক্তির মধ্যে সম্পর্ক কী?
▫ ঈশ্বরীয় ভক্তি অর্জনের চাবিকাঠি কী?
▫ একজন খ্রীষ্টীয় ব্যক্তি গৃহে কিভাবে ঈশ্বরীয় ভক্তি অভ্যাস করতে পারে?
▫ পরিচর্যায় আমরা যা করি তার প্রধান কারণ কী হওয়া উচিৎ?
[৩০ পৃষ্ঠার চিত্র]
র্যাভেন্স্ব্রূকে নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী থাকার সময়ে যিহোবার সাক্ষীরা ধৈর্য এবং ঐশিক ভক্তি পকাশ করেছিলেন