স্বার্থত্যাগ-মূলক মনোভাবের সাথে যিহোবার পরিচর্যা
“কেহ যদি আমার পশ্চাৎ আসিতে ইচ্ছা করে, তবে সে আপনাকে অস্বীকার করুক, আপন ক্রুশ তুলিয়া লউক, এবং আমার পশ্চাদ্গামী হউক।”—মথি ১৬:২৪.
১. তাঁর আসন্ন মৃত্যু সম্বন্ধে যীশু কিভাবে তাঁর শিষ্যদের জানিয়েছিলেন?
তুষারাবৃত হর্মোণ পর্বতের ছায়ায়, যীশু খ্রীষ্ট তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেচেন। এক বছরেরও কিছু কম সময় আর বাকি আছে তাঁর জীবনের। তিনি তা জানেন; তাঁর শিষ্যেরা জানে না। এখন সময় এসেছে তাদের জানবার। সত্য, যীশু তাঁর আসন্ন মৃত্যু সম্বন্ধে পূর্বে পরোক্ষে উল্লেখ করেন, কিন্তু এইবার প্রথম তিনি এ সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে বললেন। (মথি ৯:১৫; ১২:৪০) মথির বিবরণ বলে: “সেই সময় অবধি যীশু আপন শিষ্যদিগকে স্পষ্টই বলিতে লাগিলেন যে, তাঁহাকে যিরূশালেমে যাইতে হইবে, এবং প্রাচীনবর্গের, প্রধান যাজকদের ও অধ্যাপকদের হইতে অনেক দুঃখ ভোগ করিতে হইবে, ও হত হইতে হইবে, আর তৃতীয় দিবসে উঠিতে হইবে।”—মথি ১৬:২১; মার্ক ৮৩১, ৩২.
২. যীশুর ভবিষ্যৎ কষ্টের কথা শুনে পিতরের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল এবং যীশু কিভাবে উত্তর দিয়েছিলেন?
২ যীশুর মৃত্যুর আর অল্প দিনই বাকি আছে। পিতর কিন্তু, এরূপ আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক চিন্তার জন্য রেগে উঠেছেন। তিনি গ্রহণ করতে পারছেন না যে মশীহকে প্রকৃতই হত্যা করা হবে। তাই, পিতর তার প্রভুকে তিরষ্কার করতে সাহস পান। সদিচ্ছা প্রণোদিত হয়ে, তিনি আবেগের সাথে অনুরোধ করেন: “প্রভু, ইহা আপনা হইতে দূরে থাকুক, ইহা আপনার প্রতি কখনও ঘটিবে না।” কিন্তু যীশু তৎক্ষণাৎ পিতরের অনুচিত মমতাকে প্রত্যাখ্যান করেন, ঠিক যেমন নিশ্চিতভাবে কেউ কোন বিষধর সর্পের মস্তক চূর্ণ করে। “আমার সম্মুখ হইতে দূর হও, শয়তান, তুমি আমার বিঘ্নস্বরূপ; কেননা যাহা ঈশ্বরের, তাহা নয়, কিন্তু যাহা মনুষ্যের, তাহাই তুমি ভাবিতেছ।”—মথি ১৬:২২, ২৩.
৩. (ক) কিভাবে পিতর না জেনেই নিজেকে শয়তানের একজন প্রতিনিধি করে তুলেছিলেন? (খ) পিতর কিরূপে স্বার্থত্যাগী এক জীবনের বিঘ্নস্বরূপ ছিলেন?
৩ পিতর না জেনেই নিজেকে শয়তানের একজন প্রতিনিধি করে ফেলেছে। যীশুর জবাব, প্রান্তরে শয়তানকে যেমন দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনই দৃঢ় ছিল। সেখানে শয়তান যীশুকে এক সুন্দর জীবন সম্বন্ধে প্রলোভিত করার চেষ্টা করেছিল, দুঃখকষ্ট বিনা এক রাজত্ব। (মথি ৪:১-১০) এখন পিতর তাঁকে নিজের প্রতি কঠোর না হতে উৎসাহ দিচ্ছেন। যীশু জানেন যে তার পিতার ইচ্ছা তা নয়। তার জীবন অবশ্যই হতে হবে আত্মত্যাগ-মূলক, আত্মতুষ্টি-মূলক নয়। (মথি ২০:২৮) পিতর এরূপ এক পথের সামনে বিঘ্নস্বরূপ হয়েছেন; তার সদভিপ্রায়যুক্ত সমবেদনা হয়েছে এক ফাঁদ।a যদিও, যীশু স্পষ্টরূপে দেখতে পাচ্ছেন যে যদি তিনি স্বার্থত্যাগ বিনা অন্য কোনরূপ জীবনের চিন্তাও মনে পোষণ করেন, তাহলে শয়তানের মৃত্যু কবলে ধরা পড়ে ঈশ্বরের অনুগ্রহ হারাবেন।
৪. যীশু ও তাঁর অনুগামীদের জন্য জীবন ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তিকারী স্বাচ্ছন্দ্যের ছিল না কেন?
৪ পিতরের চিন্তাধারায় সুতরাং, পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। যীশুর প্রতি তার বাক্য ঈশ্বরের নয়, মানুষের চিন্তাধারা ছিল। ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তিকারী স্বাচ্ছন্দ্যের, দুঃখকষ্ট মুক্ত সহজ, এক জীবন যীশুর জন্য ছিল না; তাঁর অনুগামীদের জন্যও নয়, কারণ ঠিক পরেই যীশু পিতর ও বাকি শিষ্যদের বলেন: “কেহ যদি আমার পশ্চাৎ আসিতে ইচ্ছা করে, তবে সে আপনাকে অস্বীকার করুক, আপন ক্রুশ তুলিয়া লউক, এবং আমার পশ্চাদ্গামী হউক।”—মথি ১৬:২৪.
৫. (ক) খ্রীষ্টীয় জীবন যাপনের চ্যালেঞ্জ কী? (খ) তিনটি কী প্রয়োজনীয় বিষয়ের জন্য একজন খ্রীষ্টানকে অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে?
৫ বারবার, যীশু এই মূল বিষয়ে ফিরে আসেন: খ্রীষ্টীয় জীবনযাপনের সেই চ্যালেঞ্জে। যীশুর অনুগামী হতে হলে, খ্রীষ্টানদের, তাদের নেতার মতই, আত্ম-ত্যাগমূলক মনোভাবের সাথে অবশ্যই যিহোবাকে সেবা করতে হবে। (মথি ১০:৩৭-৩৯) এইভাবে, তিনি তিনটি প্রয়োজনীয় বিষয় লিপিবদ্ধ করেন যা একজন খ্রীষ্টান অবশ্যই করতে প্রস্তুত থাকবেন: (১) আপনাকে অস্বীকার, (২) আপন যাতনা দণ্ড তুলিয়া লওয়া, এবং (৩) তাঁর পশ্চাদ্গামী হওয়া।
“কেহ যদি আমার পশ্চাৎ আসিতে ইচ্ছা করে”
৬. (ক) কিভাবে একজন ব্যক্তি নিজেকে অস্বীকার করেন? (খ) নিজেদের চেয়ে অধিক আমরা কাকে অবশ্যই সন্তুষ্ট করব?
৬ নিজেকে অস্বীকার করার অর্থ কি? এর অর্থ কোন ব্যক্তির নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করা, নিজের জন্য এক মৃত্যুস্বরূপ। যে গ্রীক শব্দের অনুবাদ করা হয়েছে “অস্বীকার” তার মূল অর্থ “না বলা”; যা বোঝায় “সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করা।” সুতরাং, যদি আপনি খ্রীষ্টীয় জীবনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন, আপনি স্বেচ্ছায় নিজের উচ্চাকাঙ্খা, স্বাচ্ছন্দ্য, কামনাবাসনা, সুখ, আনন্দ ত্যাগ করবেন। মূলতঃ, আপনি আপনার সমস্ত জীবন এবং যা কিছু তার সাথে জড়িত আছে সব চিরকালের জন্য যিহোবাকে দেন। নিজেকে অস্বীকার করার অর্থ কখনও কখনও কিছু সুখআনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার চেয়েও আরও অধিক কিছু। বরং, বোঝায় যে একজন অবশ্যই নিজের অধিকার যিহোবার হাতে ছেড়ে দিয়েছে। (১ করিন্থীয় ৬:১৯, ২০) কোন ব্যক্তি যে নিজেকে অস্বীকার করেছে সে জীবনযাপন করে, নিজেকে নয়, কিন্তু ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করার জন্য। (রোমীয় ১৪:৮; ১৫:৩) এর অর্থ তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, স্বার্থপর বাসনাগুলিকে সে বলে না, কিন্তু যিহোবাকে হ্যাঁ।
৭. একজন খ্রীষ্টানের যাতনা দণ্ড কী এবং কিভাবে তিনি তা বহন করেন?
৭ সুতরাং, আপন যাতনা দণ্ড তুলিয়া লওয়ার গূঢ় ভাবার্থ রয়েছে। দণ্ড বহন করা একটি বোঝা এবং মৃত্যুর এক চিহ্ন। যীশু খ্রীষ্টের অনুগামী হওয়ার কারণে যদি প্রয়োজন হয়, একজন খ্রীষ্টান কষ্ট সহ্য করতে, অথবা লজ্জিত হতে অথবা নির্যাতিত হতে অথবা এমনকি মৃত্যু বরণ করতেও ইচ্ছুক। যীশু বলেছিলেন: “যে কেহ আপন ক্রুশ তুলিয়া লইয়া আমার পশ্চাৎ না আইসে, সে আমার যোগ্য নয়।” (মথি ১০:৩৮) যারা কষ্ট পায় তারা সকলেই যাতনা দণ্ড বহন করছে না। দুষ্টদের অনেক “যাতনা” আছে কিন্তু যাতনা দণ্ড নেই। (গীতসংহিতা ৩২:১০) যাইহোক, একজন খ্রীষ্টানের জীবন যিহোবার প্রতি আত্মত্যাগী সেবার যাতনা দণ্ড বহন করার এক জীবন।
৮. যীশু তাঁর অনুগামীদের জন্য কী ধরনের জীবনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন?
৮ শেষ যে প্রয়োজনটির যীশু উল্লেখ করেছিলেন তা হল আমাদের তাঁর পশ্চাদ্গামী হওয়া। যীশু যা শিখিয়েছিলেন শুধু তা গ্রহণ ও বিশ্বাস করা নয় কিন্তু তিনি চান আরও যেন আমাদের সমগ্র জীবনে, অবিরতভাবে তাঁর স্থাপিত নমুনা আমরা অনুসরণ করে চলি। এবং তাঁর জীবনের দৃষ্টান্তে কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য কি দেখা গিয়েছিল? যখন তাঁর অনুগামীদের তাদের শেষ কর্মভার দেন, তিনি বলেছিলেন: “অতএব তোমরা গিয়া সমুদয় জাতিকে শিষ্য কর . . . , আমি তোমাদিগকে যাহা যাহা আজ্ঞা করিয়াছি, সে সমস্ত পালন করিতে তাহাদিগকে শিক্ষা দেও।” (মথি ২৮:১৯, ২০) যীশু রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করেছিলেন ও তা শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর প্রথম শিষ্যরা এবং বাস্তবিক, সমগ্র প্রাথমিক খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীও তাই করেছিল। এই প্রবল আগ্রহপূর্ণ তৎপরতা ও তাদের জগতের কোন অংশ না হওয়া, একসাথে যুক্ত হয়ে তাদের উপর এনেছিল জগতের ঘৃণা ও বিদ্বেষ, যার ফলে তাদের যাতনা দণ্ড বহন আরও অধিক ভারী হয়েছিল।—যোহন ১৫:১৯, ২০; প্রেরিত ৮:৪.
৯. যীশু কিভাবে অন্য লোকেদের সাথে ব্যবহার করতেন?
৯ যীশুর জীবনের আর একটি সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য দেখা যায় অন্য লোকেদের প্রতি তাঁর আচরণে। তিনি দয়ালু এবং “মৃদুশীল ও নম্রচিত্ত” ছিলেন। তাই, তাঁর শ্রোতারা মনে নতুন শক্তি পেত এবং তাঁর উপস্থিতিতে উৎসাহ লাভ করত। (মথি ১১:২৯) তাঁর অনুগামী হতে তিনি তাদের ভয় দেখাতেন না বা নিয়মের পর নিয়ম স্থাপন করতেন না যে কিভাবে তাঁকে অনুকরণ করতে হবে; অথবা তাঁর শিষ্য হতে বাধ্য করতে তাদের মনে অপরাধবোধ আনতে প্ররোচিত করতেন না। আত্মত্যাগ-মূলক জীবন হওয়া সত্ত্বেও, তারা প্রকৃত আনন্দ বিকিরণ করত। কি তীব্র বৈসাদৃশ্য তাদের সাথে যাদের রয়েছে ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তিকারী জাগতিক মনোভাব যা “শেষকাল”-কে চিহ্নিত করে!—২ তীমথিয় ৩:১-৪.
যীশুর মত আত্মত্যাগ-মূলক মনোভাব গড়ে তুলুন ও বজায় রাখুন
১০. (ক) ফিলিপীয় ২:৫-৮ অনুসারে, খ্রীষ্ট কিভাবে নিজেকে অস্বীকার করেছিলেন? (খ) যদি আমরা খ্রীষ্টের অনুগামী হই, আমাদের অবশ্যই কি মনোভাব প্রদর্শন করা উচিৎ?
১০ যীশু নিজেকে অস্বীকার করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনি তাঁর যাতনা দণ্ড তুলে নিয়েছিলেন ও তাঁর পিতার ইচ্ছা পালন করার দ্বারা অবিরতভাবে তা বহন করেছিলেন। পৌল ফিলিপীর খ্রীষ্টানদের লিখেছিলেন: “খ্রীষ্ট যীশুতে যে ভাব ছিল, তাহা তোমাদিগেতেও হউক। ঈশ্বরের স্বরূপবিশিষ্ট থাকিতে তিনি ঈশ্বরের সহিত সমান থাকা ধরিয়া লইবার বিষয় জ্ঞান করিলেন না, কিন্তু আপনাকে শূন্য করিলেন, দাসের রূপ ধারণ করিলেন, মনুষ্যদের সাদৃশ্যে জন্মিলেন; এবং আকার প্রকারে মনুষ্যবৎ প্রত্যক্ষ হইয়া আপনাকে অবনত করিলেন; মৃত্যু পর্যন্ত, এমন কি, ক্রুশীয় মৃত্যু পর্যন্ত আজ্ঞাবহ হইলেন।” (ফিলিপীয় ২:৫-৮) এর চেয়ে অধিক পূর্ণরূপে আর কে নিজেকে অস্বীকার করতে পারে? আপনি যদি খ্রীষ্ট যীশুর হন এবং তাঁর অনুগামীদের একজন হন, আপনাকে অবশ্যই এই একই মনোভাব রাখতে হবে।
১১. আত্মত্যাগ-মূলক জীবন যাপনের অর্থ কার ইচ্ছানুযায়ী জীবন যাপন?
১১ আরেকজন প্রেরিত, পিতর আমাদের বলেন যে যেহেতু আমাদের জন্য যীশু কষ্ট ও মৃত্যু ভোগ করেছিলেন, খ্রীষ্টানদের উত্তমরূপে-প্রস্তুত সৈন্যদের মত নিজেদের সজ্জিত করা উচিৎ, একই মনোভাবসহ যা খ্রীষ্টের ছিল। তিনি লেখেন: “অতএব খ্রীষ্ট মাংসে দুঃখভোগ করিয়াছেন বলিয়া তোমরাও সেইভাবে আপনাদিগকে সজ্জীভূত কর—কেননা মাংসে যাহার দুঃখভোগ হইয়াছে, সে পাপ হইতে বিরত হইয়াছে—যেন আর মনুষ্যদের অভিলাষে নয়, কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছায় মাংসবাসের অবশিষ্ট কাল যাপন কর।” (১ পিতর ৩:১৮; ৪:১, ২) যীশুর আত্মত্যাগ-মূলক জীবন ঈশ্বরের ইচ্ছার প্রতি তাঁর মনোভাবকে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছিল। সর্বদা তাঁর পিতার ইচ্ছাকে নিজের ইচ্ছার উপরে স্থাপন করে, এমনকি এক অপবাদজনক মৃত্যুও বরণ করে, তিনি তাঁর ঈশ্বরভক্তিতে একাগ্রচিত্ত ছিলেন।—মথি ৬:১০; লুক ২২:৪২.
১২. আত্মত্যাগী জীবন কি যীশুর কাছে বিরক্তিকর ছিল? ব্যাখ্যা করুন।
১২ যদিও যীশুর আত্মত্যাগ-মূলক জীবন তাঁর পক্ষে অনুসরণ করা বেশ কঠিন ও চ্যালেঞ্জের ছিল, তিনি তা বিরক্তিকর মনে করেননি। বরং, ঐশ্বরিক ইচ্ছার প্রতি বশ্যতাস্বীকার তাঁর কাছে আনন্দজনক ছিল। পিতার কার্য সাধন করা তাঁর কাছে খাদ্যের মত ছিল। তিনি তা থেকে প্রকৃত তৃপ্তি পেতেন যেমন কেউ কোন উত্তম খাদ্য থেকে পায়। (মথি ৪:৪; যোহন ৪:৩৪) তাই, যদি আপনি জীবনে প্রকৃতই পূর্ণতা পেতে চান, যীশুর মনোভাব গড়ে তুলে তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার চেয়ে আর ভাল কিছু করতে পারেন না।
১৩. প্রেম কিভাবে আত্মত্যাগী মনোভাবের পিছনে পরিচালনাকারী শক্তি?
১৩ বাস্তবিক, আত্মত্যাগী মনোভাবের পিছনে কি শক্তি কাজ করে? একটি কথায়, প্রেম। যীশু বলেছিলেন: “‘তোমার সমস্ত অন্তঃকরণ, তোমার সমস্ত প্রাণ ও তোমার সমস্ত মন দিয়া তোমার ঈশ্বর প্রভুকে প্রেম করিবে।’ এইটি মহৎ ও প্রথম আজ্ঞা। আর দ্বিতীয়টী ইহার তুল্য; ‘তোমার প্রতিবাসীকে আপনার মত প্রেম করিবে।’” (মথি ২২:৩৭-৩৯) একজন খ্রীষ্টান স্বার্থান্বেষী হবেন, আবার একই সঙ্গে, ওই বাক্যগুলি পালন করবেন, তা হতে পারে না। তার নিজের সুখ ও সুবিধা অবশ্যই পরিচালিত হবে প্রথম এবং সর্বাগ্রে যিহোবার প্রতি তার প্রেম দ্বারা ও তারপরে তার প্রতিবাসীর প্রতি তার প্রেম দ্বারা। এইভাবেই যীশু তাঁর জীবন কাটান, আর এটাই তিনি তাঁর অনুগামীদের থেকে আশা করেন।
১৪. (ক) ইব্রীয় ১৩:১৫, ১৬ পদে কি কি দায়িত্বের ব্যাখ্যা করা হয়েছে? (খ) উদ্যমের সাথে সুসমাচার প্রচার করতে কি আমাদের উৎসাহ দেয়?
১৪ প্রেরিত পৌল প্রেমের এই নীতি বুঝেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন: “অতএব আইস, আমরা তাঁহারই দ্বারা ঈশ্বরের উদ্দেশে নিয়ত স্তব-বলি, অর্থাৎ তাঁহার নাম স্বীকারকারী ওষ্ঠাধরের ফল, উৎসর্গ করি। আর উপকার ও সহভাগিতার কার্য্য ভুলিও না, কেননা সেই প্রকার যজ্ঞে ঈশ্বর প্রীত হন।” (ইব্রীয় ১৩:১৫, ১৬) খ্রীষ্টানরা যিহোবার উদ্দেশ্যে পশু অথবা ঐ জাতীয় কিছু বলি উৎসর্গ করে না; তাই, তাদের উপাসনায় পার্থিব কোন মন্দিরে পুরোহিতদের প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজন হয় না। খ্রীষ্ট যীশুর মাধ্যমে আমাদের স্তব-বলি উৎসর্গ করা হয়। এবং প্রধানতঃ ঐ স্তব-বলির দ্বারা, জনগণের কাছে তাঁর নাম স্বীকার দ্বারা, আমরা ঈশ্বরের প্রতি আমাদের প্রেম প্রদর্শন করি। বিশেষভাবে প্রেমে বদ্ধমূল আমাদের নিঃস্বার্থ মনোভাব, উদ্যমের সাথে সুসমাচার প্রচার করতে আমাদের উৎসাহ দেয়, সর্বদা ঈশ্বরের প্রতি আমাদের ওষ্ঠাধরের ফল উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকতে প্রচেষ্টা করায়। এইভাবে আমরা প্রতিবাসীর প্রতিও প্রেম দেখাই।
স্বার্থ-ত্যাগ প্রভূত আশীর্বাদ আনে
১৫. স্বার্থত্যাগ সম্পর্কে কোন পরীক্ষামূলক প্রশ্নগুলি আমরা নিজেদের করতে পারি?
১৫ একটু থামুন ও নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উপর চিন্তা করুন: আমার বর্তমান জীবনাদর্শ কি স্বার্থত্যাগের এক পথ প্রদর্শন করে? আমার লক্ষ্যসকল কি এইরূপ এক জীবনকে নির্দেশ করে? আমার পরিবারের সদস্যরা কি আমার উদাহরণ থেকে আত্মিক লভ্যাংশের ভাগ পাচ্ছে? (তুলনা করুন ১ তিমথীয় ৫:৮.) পিতৃমাতৃহীন ও বিধবাদের সম্বন্ধে কি বলা যায়? তারাও কি আমার স্বার্থত্যাগী মনোভাব থেকে উপকার পায়? (যাকোব ১:২৭) সর্বসাধারণের কাছে আমার স্তব-বলির জন্য যে সময় ব্যয় করি তা কি বাড়াতে পারি? অগ্রগামী, বেথেল অথবা মিশনারী পরিচর্যা কাজের সুযোগ নিতে এগিয়ে আসতে পারি কি, বা যেখানে রাজ্য ঘোষণাকারীদের অধিক প্রয়োজন রয়েছে সেরকম কোন অঞ্চলে পরিচর্যায় যেতে পারি কি?
১৬. উদ্ভাবনীশক্তি কিভাবে স্বার্থত্যাগী এক জীবনযাপনে সাহায্য করতে পারে?
১৬ কখনও কখনও স্বার্থত্যাগী মনোভাব নিয়ে যিহোবার পরিচর্যায় আমাদের পূর্ণ ক্ষমতায় পৌঁছাতে শুধু অল্প একটু উদ্ভাবনীশক্তির প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ, জ্যানেট্, ইকোয়েডরের এক নিয়মিত অগ্রগামী, পূর্ণসময় চাকরি করতেন। শীঘ্রই, তার কাজের সময়সূচী, আনন্দের সাথে নিয়মিত-অগ্রগামীর প্রয়োজনীয় ঘন্টা পূরণ করা তার পক্ষে কষ্টকর করে তোলে। তাই সে ঠিক করে তার নিয়োগকর্তার কাছে এই সমস্যা ব্যাখ্যা করে কাজের সময় কমিয়ে দিতে অনুরোধ করবে। যেহেতু মালিক তার কাজের সময় কমিয়ে দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না, তাই পরে সে মারিয়াকে, যে অগ্রগামী হওয়ার জন্য আংশিক-সময়ের কাজ খুঁজছিল, তাকে সঙ্গে নিয়ে আসে। দুজনেই অর্ধেক দিন কাজ করার প্রস্তাব দেয়, দুজনে মিলে পূর্ণ দিনের কাজ দেবে বলে। মালিক প্রস্তাব মেনে নেন। এখন দুজন বোনই নিয়মিত অগ্রগামী। এই অপূর্ব ফল দেখে, কাফা, যে ঐ একই কোম্পানিতে পূর্ণ-সময় কাজ করে ক্লান্ত হওয়ার দরুণ তার অগ্রগামীর সময় পূর্ণ করতে হিমশিম খাচ্ছিল, সেও মাগালিকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ঐ একই প্রস্তাব দেয়। সেটিও গৃহীত হয়। এইভাবে, চারজন ভগ্নী অগ্রগামীর কাজ করতে সক্ষম হন, যেখানে দুজনে তাদের পূর্ণ-সময়ের পরিচর্যা ছাড়তে প্রস্তুত হয়েছিলেন। উদ্ভাবনীশক্তি ও উদ্যম উত্তম ফল দিয়েছিল।
১৭-২১. কিভাবে এক বিবাহিত দম্পতি তাদের জীবনের উদ্দেশ্যকে পুনর্বিবেচনা করেছিলেন এবং কি ফল হয়েছিল?
১৭ আরও, বিগত দশ বছর ধরে ইভন্ যে স্বার্থত্যাগী পথ অনুসরণ করেছিল তা বিবেচনা করুন। মে ১৯৯১ সালে ওয়াচ্ টাওয়ার সোসাইটিকে সে এইভাবে লেখে:
১৮ “অক্টোবর ১৯৮২ সালে, আমার পরিবার ও আমি ব্রুকলিন বেথেল পরিদর্শন করেছিলাম। সব দেখে সেখানে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে কাজ করার খুব ইচ্ছা হয়েছিল আমার। আমি একটি আবেদনপত্র পড়ি, যেখানে খুবই উল্লেখযোগ্য একটি প্রশ্ন ছিল, ‘গত ছমাসে ক্ষেত্র পরিচর্যায় গড়ে কত ঘন্টা দিয়েছেন আপনি? গড় দশ ঘন্টার কম হলে, ব্যাখ্যা করুন কেন।’ কোন উপযুক্ত কারণ আমি চিন্তা করতে পারিনি, তাই একটি লক্ষ্য স্থাপন করি ও পরপর পাঁচ মাস তাতে পৌঁছাই।
১৯ “অগ্রগামীর কাজ না করার অল্প কয়েকটি অজুহাত চিন্তা করতে পারলেও, যখন আমি ১৯৮৩ ইয়ারবুক অফ যিহোভাজ্ উইট্নেসেস্ পড়েছিলাম, আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম যে অগ্রগামীর কাজ করতে অনেকে আমার চেয়েও অনেক বড় বড় বাধা জয় করেছেন। তাই এপ্রিল ১, ১৯৮৩ সালে, আমি আমার লোভনীয় পূর্ণ-সময়ের চাকরি ছেড়ে দিই ও সহায়ক অগ্রগামী হই এবং ১৯৮৩, ১লা সেপ্টেম্বর থেকে নিয়মিত অগ্রগামীদের দলে যোগ দিই।
২০ “পরে, ১৯৮৫ এপ্রিলে এক উত্তম পরিচারক দাসকে বিবাহ করে আমি খুবই সুখী হই। তিন বছর পর, জেলা সম্মেলনে অগ্রগামীর কাজ সম্বন্ধীয় একটি বক্তৃতা আমার স্বামীকে আমার প্রতি ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞাসা করতে প্রেরণা দেয়, ‘তোমার কি মনে হয় ১লা সেপ্টেম্বর থেকে অগ্রগামীর কাজ শুরু না করার আমার কোন কারণ আছে?’ তিনি পরবর্তী দুবছর এই কাজে আমার সাথে যোগ দিয়েছিলেন।
২১ “আমার স্বামী দুসপ্তাহের জন্য ব্রুকলিন বেথেলেও স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে নির্মাণকাজে যোগ দিয়েছিলেন এবং ইন্টারন্যাশানাল কন্সট্রাক্শন্ প্রোগ্রামের জন্যও আবেদন করেন। তাই মে ১৯৮৯ সালে আমরা এক মাসের জন্য নাইজিরিয়া যাই সেখানে শাখা নির্মাণকাজে সাহায্য করতে। আগামীকাল আমরা জার্মানী যাত্রা করব, যেখানে পোল্যান্ডে প্রবেশ করার জন্য আমাদের ভিসার ব্যবস্থা করা হবে। এইরূপ এক ইতিহাস-রচনাকারী নির্মাণ প্রকল্পে জড়িত এবং পূর্ণ-সময় পরিচর্যার এই নুতন দিকে অংশীদার হতে পেরে আমরা রোমাঞ্চিত বোধ করছি।”
২২. (ক) আমরা কিভাবে, পিতরের মত, না জেনে এক বিঘ্নস্বরূপ হতে পারি? (খ) আত্মত্যাগী মনোভাবসহ যিহোবার পরিচর্যা কিসের উপর নির্ভর করে না?
২২ যদি আপনি নিজে অগ্রগামী নাও হতে পারেন, যারা পূর্ণ-সময় পরিচর্যায় আছেন তাদের সেই সুযোগ ধরে রাখতে উৎসাহ দিতে এবং এমনকি হয়ত তাদের তা করে যেতে সাহায্যও করতে পারেন কি? অথবা আপনি সদিচ্ছা-সম্পন্ন কোন পারিবারিক সদস্য বা বন্ধুর মত হবেন যারা, পিতরের মত, একজন পূর্ণ-সময় পরিচারককে বলবেন সহজভাবে নিতে, নিজের প্রতি সদয় হতে, না বুঝে যে তা কিভাবে বিঘ্নস্বরূপ হতে পারে? সত্য, যদি কোন অগ্রগামীর স্বাস্থ্য খুবই ভেঙ্গে পড়ে অথবা সে যদি খ্রীষ্টীয় দায়িত্বসকল অবহেলা করে, তাকে কিছু সময়ের জন্য পূর্ণ-সময় পরিচর্যা ত্যাগ করতে হতে পারে। আত্মত্যাগী মনোভাব নিয়ে যিহোবার পরিচর্যা কোন লেবেল, যেমন অগ্রগামী, বেথেল সেবক অথবা অন্য কিছুর উপর নির্ভর করে না। বরং, তা নির্ভর করে ব্যক্তিরূপে আমরা কিরূপ তার উপর—আমরা কি চিন্তা করি, আমরা কি করি, অপরের সাথে কিভাবে ব্যবহার করি, কিভাবে আমরা জীবন কাটাই।
২৩. (ক) ঈশ্বরের সাথে সহকার্যকারী হওয়ার আনন্দ কিভাবে আমরা বজায় রাখতে পারি? (খ) ইব্রীয় ৬:১০-১২ পদে আমরা কি আশ্বাসবাণী পাই?
২৩ যদি আমাদের প্রকৃতই স্বার্থত্যাগী মনোভাব থাকে, ঈশ্বরের সহকার্যকারী হওয়ার আনন্দ আমরা পাব। (১ করিন্থীয় ৩:৯) এই জেনে আমরা তৃপ্তিলাভ করব যে যিহোবার চিত্তকে আমরা আনন্দিত করছি। (হিতোপদেশ ২৭:১১) এবং আমাদের এই আশ্বাসবাণী রয়েছে যে যতদিন পর্যন্ত আমরা তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকব যিহোবা কখনই আমাদের ভুলবেন না অথবা ত্যাগ করবেন না।—ইব্রীয় ৬:১০-১২. (w93 6⁄1)
[পাদটীকাগুলো]
a গ্রীক ভাষায়, “বিঘ্ন” (σκάνδαλον, স্ক্যান্΄ডে·লন্) মূলতঃ “কোন ফাঁদের যে অংশতে টোপটি লাগানো থাকত তাকে বলা হত, অর্থাৎ, ফাঁদ বা জালটি স্বয়ং।”—ভাইন্স এক্সপোজিটোরি ডিক্শনারি অফ্ ওল্ড অ্যান্ড নিউ টেস্টামেন্ট ওয়ার্ডস।
আপনি কি মনে করেন?
▫ পিতর কিভাবে না জেনে স্বার্থত্যাগী জীবনপথের এক বিঘ্নস্বরূপ হয়েছিলেন?
▫ নিজেকে অস্বীকার করার অর্থ কি?
▫ একজন খ্রীষ্টান কিভাবে তার যাতনা দণ্ড বহন করেন?
▫ কিভাবে আমরা এক স্বার্থত্যাগী মনোভাব গড়ে তুলতে ও রক্ষা করতে পারি?
▫ স্বার্থত্যাগী মনোভাবের পিছনে কোন্ পরিচালনাশক্তি রয়েছে?
[Pictures on page 9]
আপনি কি নিজেকে অস্বীকার করতে, আপনার যাতনা দণ্ড তুলে নিতে এবং অবিরত যীশুর পশ্চাদ্গামী হতে ইচ্ছুক?