অদৃষ্টের উপর বিশ্বাস কি আপনার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে?
১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দুর্বিপাকের সূচনা ঘটে। ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা নদীর মুখস্থিত ব-দ্বীপগুলির প্লাবিত জল প্রায় ৯ মিটার উচ্চে উঠে যায় ও নিষ্ঠুরভাবে বাংলাদেশের তিন চতুর্থাংশকে গ্রাস করে ফেলে। হাজার হাজার ব্যক্তি জলে ডুবে মারা যায়। প্রায় ৩৭,০০০,০০০ ব্যক্তি গৃহহীন হয়ে পড়েন। ৬০,০০০ কিলোমিটারেরও অধিক রাস্তাঘাট অদৃশ্য হয়ে যায়।
যেহেতু এই ধরণের বন্যা বাংলাদেশকে বারংবার বিপর্যস্ত করে দেয়, সেইজন্য একটি সংবাদপত্র এই দেশটির নামকরন করে “নিয়তির ব-দ্বীপ।” এই চিত্রটি সেই বিহ্বলতার দুর্ভাগ্যকে প্রতিফলিত করে যেটা বহু ব্যক্তি মনে করেন: অপরিবর্তনীয় ভাগ্য, অথবা অদৃষ্ট।
যদিও অন্যান্য ব্যক্তিরা হয়তো ভাবতে পারেন যে ভাগ্য মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেনা, তবুও দেখা যায় যে প্রকৃতপক্ষে অদৃষ্টবাদ পৃথিবীকে ছেয়ে ফেলেছে। কেন বহু ব্যক্তি অদৃষ্ট বিশ্বাস করেন, এবং এই অদৃষ্টবাদ কি?
ধর্মের অবদান
“অদৃষ্ট” (Fate) শব্দটি লাটিন শব্দ ফ্যাটাম হতে এসেছে যার অর্থ হল “যা বলা হয়েছে।”a অদৃষ্টবাদীরা বিশ্বাস করেন সকল ঘটনাই পূর্বনির্ধারিত এবং ঘটনাকে পরিবর্তন করা মানুষের অসাধ্য। এই ধারণা বিভিন্ন ধর্মের মাধ্যমে প্রচার হয়ে আসছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করেছে। পৃথিবীর বৃহত্তম তিনটি ধর্মের দিকে এক পলক তাকালেই দেখা যায় যে ভাগ্য বহুমুখী রূপ নিয়েছে—যেমন হিন্দু মন্দিরসকল, ইসলামধর্মীয় মস্জিদগুলি ও খৃষ্টজগতের গির্জাগুলি বিভিন্ন আকারের।
উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর প্রায় ৯০ কোটি মুস্লিম বিশ্বাস করে যে অদৃষ্ট (কিস্মৎ) ঈশ্বরের ইচ্ছানুসারে পুর্বনির্ধারিত।b কোরান জানায়: “কোন অমঙ্গল পৃথিবীতে ঘটে না. . . , কিন্তু ইহা একটি বইতে লিপিবদ্ধ আছে আমরা তাকে অস্তিত্বে নিয়ে আসার আগে থেকেই।” “আর একটি প্রাণ কখনই মরিবে না, আল্লার বিনা অনুমতিতে; সময়কাল স্থিরীকৃত।”—সুরা ৫৭:২২; ৩:১৪৫।
কর্ম পরিণতি ও ফলাফলের নিয়মসকল—ভাগ্যের আর একটি দিক—যা সমস্ত পৃথিবীর প্রায় ৭০ কোটি হিন্দুদের জীবনকে প্রভাবিত করে। এটাই বলা হয়ে থাকে যে একজন হিন্দুর বর্ত্তমান জীবনে যে সব ঘটনা ঘটে, তা নির্ধারিত হয় পূর্ব জন্মের কৃত কর্মের দ্বারা। একটি অতি প্রাচীন হিন্দু পুস্তক গরুঢ় পুরাণ বলে: “একজনের পূর্বজন্মের নিজস্ব কার্যকলাপ তার পরবর্তী জন্মে, কোন প্রাণীর প্রকৃতি ও স্বভাব সে পাবে তা নির্ধারণ করে, কোন মানসিক ও শারীরিক ব্যাধির শিকার সে হবে. . .একজন মানুষ তার অদৃষ্টে যা আছে তাই পেয়ে থাকে।”
খ্রীষ্টিয় জগতের ১৭০ কোটিরও অধিক সদস্যদের সম্বন্ধেই বা কি বলা যেতে পারে? ধরে নেওয়া যাক, খ্রীষ্টিয় জগতের কিছু ব্যক্তিরা দাবী করতে পারেন যে তারা অদৃষ্টকে ঈশ্বর দ্বারা, এবং অদৃষ্টবাদকে পূর্বনির্ধারণ দ্বারা পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু এন্সাইক্লোপিডিয়া অফ্ রিলিজিয়ন এণ্ড্ এথিক্স্ স্বীকার করে যে:“এটা বলা যেতে পারে না যে খ্রীষ্টতত্ত্ব. . .সম্পূর্ণরূপে অদৃষ্টবাদের বিশ্বাস হতে মুক্ত।” ইহার কিছু সম্প্রদায় এখনও ১৬শ শতাব্দীর সংস্কারক মার্টিন লুথারের বাক্যের প্রতিধ্বনি করে, যিনি এক সময়ে বলেছিলেন “মনুষ্য একটি কাঠের বা পাথরের পিণ্ডের মত অথবা একখণ্ড মাটির তাল বা নুনের ঢিবির মত পরাধীন।”
শূন্যে মূদ্রা নিক্ষেপ এবং গ্রহ গণনা
যদিও এ ধরনের অনমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি এখন খ্রীষ্টিয় জগতের বিরাট অংশের বিশ্বাস হতে অনেক দূরে সরে গেছে, কিন্তু একজন ধর্ম-তত্ত্ববিদ স্বীকার করেন যে এখনও ইহার অনেক সদস্যরাই এই বিশ্বাসকে গ্রহণ করে “ধর্মের প্রভাবমুক্তরূপে।” যেখানে অদৃষ্টকে হয়তো ভাগ্য বলে ধরা হয়। সম্ভবত অনেককেই আপনি জানেন যারা হয়তো সময় বিশেষে শূন্যে মূদ্রা নিক্ষেপ করেন ভাগ্য বা অদৃষ্ট জানবার ইচ্ছা নিয়ে। যদিও হয়তো তারা এটাকে শুধুমাত্র একটা প্রথা বলে চালাতে চায়, তারা ক্রমাগত করে যায়, এবং সময়বিশেষে তাদের কাছে মনে হয় যে এটা কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস্ পত্রিকা জানায় সম্প্রতিকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন বাসিন্দা সামনে মাথার দিক করা একটি মুদ্রা খুঁজে পান কিছু লটারীর টিকিট কেনার পরেই। তিনি বলেন: “প্রতিবার যখনই আমি এরূপ মাথার দিক করা মুদ্রা পাই, ততোবারই কিছু না কিছু ভাল ঘটনা আমার জীবনে ঘটে।” এই ক্ষেত্রে তিনি ২৫.৭ মিলিয়ন ডলার লটারীতে জিতে পেয়েছিলেন। আপনি কি মনে করেন যে অদৃষ্ট বা নিয়তিতে তার বিশ্বাস কি কমেছে?
কিছু ব্যক্তি মূদ্রা নিক্ষেপে মুচকি হাসে। তবুও, তারাই হয়তো বিশ্বাস করেন যে তাদের অদৃষ্ট গ্রহের গতিবিধির দ্বারা পূর্বনির্ধারিত—অদৃষ্টের আর একটি দিক। শুধুমাত্র উত্তর আমেরিকায়, প্রায় ১,২০০ পত্রিকা জ্যোতিষবিদ্যার জন্য একটি বিশেষ স্থান রাখে। একটি মতগ্রহণ দেখায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫৫ শতাংশ যুবক-যুবতীরা বিশ্বাস করে যে জ্যোতিষবিদ্যা কার্যকরী।
হাঁ, তা এটিকে কিস্মৎ, কর্ম, ঈশ্বর, অদৃষ্ট অথবা গ্রহ যাই বলুন না কেন, অদৃষ্টে বিশ্বাস পৃথিবীতে ছেয়ে আছে এবং যুগযুগান্ত ধরে তাই হয়ে আসছে। আপনি কি জানেন, উদাহরণস্বরূপ, যে এখানে যে সব ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে, তাদের মধ্যে শুধুমাত্র একজন অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস করেন নি? কে তা করেননি? আর অদৃষ্ট সম্পর্কে তার মনোভাব আপনাকে কি ভাবে প্রভাবিত করতে পারে?
[পাদটীকাগুলো]
a দি এনসাইক্লোপিডিয়া অফ রিলিজিয়ন, ৫ম ভলিউম, ২৯০ পৃষ্ঠা বলে: “FATE. (অদৃষ্ট) ল্যাটিন ফ্যাটাম থেকে অদৃষ্ট উদ্ভূত হয়েছে (কিছু বলা হয়েছে, এক ভাববাণীমূলক ঘোষণা, এক দৈববাণী, এক ঐশ্বরিক নির্ধারণ)।”
b “কিস্মৎ অদৃষ্টের সঙ্গে একটিমাত্র স্থানে পার্থক্য দেখায় এবং তা হল সর্বশক্তিমান ইচ্ছা; দুটির বিরুদ্ধেই সমস্ত মানুষের আবেদন নিরর্থক।”—হেস্টিংস্ এনসাইক্লোপিডিয়া অফ রিলিজিয়ন এণ্ড্ এথিক্স্, ভলিউম ৫, পৃষ্ঠা ৭৭৪।
[৪ পৃষ্ঠার বাক্স]
কারা অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস করতেন?
মাস্কারিপুত্র গোশালা যীশু খ্রীষ্ট
ভারতীয় যোগী, সাধারণ শতকের খ্রীষ্ট ধর্মের প্রবর্তক,
৬ষ্ঠ/৫ম শতাব্দী পূর্বে ১ম শতাব্দী
সিটিয়ামের যেনো সাফওয়ানের পুত্র যাহম
গ্রীক দার্শনিক, মুসলিম শিক্ষক,
সাধারণ শতকের ৪র্থ/৩য় শতাব্দী পূর্বে ৮ম শতাব্দী
পাব্লিয়াস্ ভারজিলিয়াস্ মারো জন ক্যালভিন
রোমান কবি, ফরাসী ধর্মতত্ত্ববিদ ও সংস্কারক,
সাধারণ শতকের ১ম শতাব্দী পূর্বে ১৬শ শতাব্দী