রক্ষা পাওয়ার চাবিকাঠি
আপনি যদি খবর পান যে একজন খুনী আপনার পাড়ায় আত্মগোপন করে আছে, আপনি কি নিজেকে ও আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার জন্য পদক্ষেপ নেবেন না? আপনি হয়ত আপনার দরজায় খিল দিয়ে তালা লাগাবেন যাতে সহজে কেউ ঢুকতে না পারে। কোন সন্দেহজনক অচেনা লোককে দেখা যাচ্ছে কি না তাও দেখবেন এবং সেই সম্বন্ধে তৎক্ষণাৎ রিপোর্ট করবেন।
প্রাণঘাতী রোগ স্তন ক্যানসার সম্বন্ধে মহিলারা কি কিছু কম পদক্ষেপ নেবে? নিজেদের রক্ষা করার জন্য এবং বেঁচে থাকার সুযোগকে বাড়িয়ে তোলার জন্য তারা কী পদক্ষেপ নিতে পারে?
প্রতিরোধ এবং ভোজনপ্রণালী
অনুমান করা হয় যে যুক্তরাষ্ট্রে ৩টি ক্যানসারের মধ্যে ১টি ক্যানসার ভোজনপ্রণালীর জন্য হয়ে থাকে। ভাল ভোজনপ্রণালী যা আপনার দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে সেটিই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা। পরিচিত কোন খাদ্য ক্যানসার সারাতে না পারলেও, নির্দিষ্ট খাদ্য খেলে এবং অন্যান্য খাদ্য খাওয়া বর্জন করলে প্রতিরোধের কাজ করতে পারে। “সঠিক খাদ্য গ্রহণ করলে স্তন ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা পঞ্চাশ শতাংশ কমে যায়,” বলেন নিউ ইয়র্ক, ভাল্হালা-র আ্যমেরিকান হেলথ্ ফাউন্ডেশন-এর ডা. লিওনার্ড কোহন্।
যে সকল খাদ্যে প্রচুর পরিমাণে তন্তু আছে যেমন শস্য কণা দিয়ে তৈরি রুটি এবং খাদ্য (cereal), তা প্রল্যাক্টিন ও এস্ট্রোজেনের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে, হয়ত এই হরমোনগুলিকে শুষে নিয়ে দেহের বাইরে বর্জন করার দ্বারা। পুষ্টি ও ক্যানসার পত্রিকা (ইংরাজি) অনুসারে, “এটি কারসিনোজেনেসিসের বৃদ্ধিকে রোধ করতে পারে।”
কঠিন চর্বি খাওয়া কমিয়ে দিলে বিপদ কম হতে পারে। প্রতিষেধক পত্রিকা পরামর্শ দেয় যে ক্রীমযুক্ত দুধ থেকে ক্রীমবিহীন দুধ খেলে, মাখন খাওয়া কম করলে, কম চর্বিযুক্ত মাংস খেলে এবং মুরগীর মাংস থেকে ছাল ছাড়ালে কঠিন চর্বি গ্রহণকে এক বিপদহীন মাত্রায় নিয়ে আসা যায়।
যে সকল তরিতরকারি ভিটামিন-এ দ্বারা সমৃদ্ধ যেমন গাজর, স্কোয়াশ, রাঙ্গা আলু এবং পালং-শাক, এক প্রকার বাঁধাকপি ও সরষে শাক জাতীয় গাঢ় সবুজ শাক সাহায্যকারী হতে পারে। মনে করা হয় যে ভিটামিন-এ ক্যানসার-সৃষ্টিকারী মিউটেশনকে রোধ করে। আর সবুজ ফুলওয়ালা ফুলকপি, গাছকপি, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও পিঁয়াজকলির মত সবজিতে এমন রাসায়নিক পদার্থ আছে যা সুরক্ষাকারী এনজাইম্কে উদ্দীপিত করে।
স্তন ক্যানসার—প্রত্যেক স্ত্রীর যা জানা দরকার বইটিতে (ইংরাজি) ডা. পল্ রড্রিগেজ্ বলেন, প্রতিরোধ ব্যবস্থা যা অস্বাভাবিক কোষগুলিকে চিনতে পারে ও ধ্বংস করে সেটিকে ভোজনপ্রণালীর দ্বারা শক্তিশালী করা যেতে পারে। যে সকল খাদ্যে প্রচুর পরিমাণে লৌহ আছে যেমন চর্বিহীন মাংস, শাক, শামুক ও ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি, তিনি খেতে বলেন। জাতীয় ক্যানসর ইনস্টিটিউটের পত্রিকা (ইংরাজি) বলে ভিটামিন-সি ভরপুর ফল ও তরি-তরকারি স্তন ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। সয়াবীন্ ও গেঁজে না ওঠা সয়াবীনে জেনিস্টিন আছে, লেবরেটরীর পরীক্ষা থেকে জানা গেছে যে তা টিউমারকে বাড়তে দেয় না তবে মানুষের উপর তা কতটা কার্যকারী হবে তা এখনও প্রমাণ সাপেক্ষ।
প্রারম্ভেই পরীক্ষা করে নির্ণয়
“স্তন ক্যানসারের গতিপথ পরিবর্তন করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল প্রারম্ভেই পরীক্ষা করে তার নির্ণয়,” উত্তর আ্যমেরিকার রেডিওলজিক ক্লিনিকস্ প্রকাশনাটি (ইংরাজি) বলে। এই ক্ষেত্রে তিনটি প্রতিষেধকমূলক পদক্ষেপ হল, নিয়মিত স্তনের স্ব-পরীক্ষা, ডাক্তারের দ্বারা বাৎসরিক পরীক্ষা এবং ম্যামোগ্র্যাফি।
প্রতি মাসে নিয়মিত স্ব-পরীক্ষা করা দরকার, স্তনের গঠনে বা অনুভবে কোন সন্দেহজনক কিছু দেখা যাচ্ছে কি না যেমন শক্তভাব বা স্ফীতি সেই সম্বন্ধে কোন স্ত্রীয়ের সতর্ক থাকা উচিত। সে যত ছোট কিছুই খুঁজে পাক না কেন, তার তৎক্ষণাৎ ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা দরকার। যত শীঘ্র স্ফীতিকে পরীক্ষা করে নির্ণয় করা হবে ততই ভবিষ্যতের প্রতি সেই স্ত্রীয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। সুইডেন থেকে এক রিপোর্ট দেখায় যে স্থানান্তরিত হয় না এমন স্তন ক্যানসার যদি দেড় ইঞ্চির থেকে একটু বড় বা ছোট হয় আর যদি সেটিকে শল্য-চিকিৎসার মাধ্যমে বার করে দেওয়া হয়, তাহলে ১২ বছর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৯৪ শতাংশ সম্ভব হয়।
ডা. প্যাট্রিশিয়া কেলী মন্তব্য করেন: “যদি সাড়ে বারো বছরের মধ্যে আবার স্তন ক্যানসারের উদ্ভব না হয় তাহলে তা আর হয়ত নাও হতে পারে। . . . আর এক সেন্টিমিটারের থেকেও ছোট স্তন ক্যানসার খুঁজে পেতে স্ত্রীদের শিখানো যেতে পারে।”
এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অথবা চিকিৎসকের দ্বারা প্রতি বছর নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত বলে সুপারিশ করা হয়, বিশেষ করে যখন কোন স্ত্রীর ৪০ বছর বয়স হয়ে যায়। যদি স্ফীতি পাওয়া যায় তাহলে স্তন বিশেষজ্ঞ অথবা শল্য-চিকিৎসকের কাছ থেকে দ্বিতীয় মন্তব্য নেওয়া ভাল।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট বলে যে স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভাল অস্ত্র হল নিয়মিত ম্যামোগ্রাম করা। এই ধরনের এক্স-রে কোন টিউমার অনুভব করার প্রায় দুই বছর আগেই হয়ত তা নির্ণয় করতে পারে। যে সকল মহিলা ৪০ বছরের উর্দ্ধে তাদের এটি করতে সুপারিশ করা হয়। কিন্তু, ডা. ড্যানিয়েল কোপানস্ আমাদের বলেন: “এটি সম্পূর্ণ নিখুঁত কাজ করে না।” ম্যামোগ্রাফি সব স্তন ক্যানসার নির্ণয় করতে পারে না।
নিউ ইয়র্কের স্তন চিকিৎসালয়ের ডা. ওয়েন্ডি লোগান-ইয়ং আওয়েক!-কে জানান যে যদি কোন মহিলা বা তার চিকিৎসক কোন অস্বাভাবিক কিছু পায় কিন্তু ম্যামোগ্রামে তার কোন লক্ষণ দেখা না যায় তাহলে সাধারণত দেহে যা পাওয়া গেছে সেটিকে অবজ্ঞা করে এক্স-রেকে বিশ্বাস করার প্রবণতা দেখা যায়। তিনি বলেন এটি হল “সবচেয়ে বড় ভুল যা আমরা বর্তমানে দেখে থাকি।” তিনি পরামর্শ দেন যে ক্যানসার নির্ণয় করতে ম্যামোগ্র্যাফির ক্ষমতার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করতে এবং স্তন পরীক্ষার উপর প্রচুররূপে নির্ভর করতে।
ম্যামোগ্র্যাফি টিউমার নির্ণয় করতে পারলেও, সেটি মৃদু প্রকৃতির (benign) অথবা সংক্রামক (malignant) (ক্যানসার জাতীয়) তা বলতে পারে না। সেটি একমাত্র দেহ কোষ নিয়ে পরীক্ষার (biopsy) মাধ্যমে জানা যেতে পারে। আইরীনের বিষয়টি বিবেচনা করুন, যিনি ম্যামোগ্রাম করতে যান। এক্স-রে দেখে তার ডাক্তার স্ফীতিটিকে মৃদু প্রকৃতির বলে নির্ণয় করেন এবং বলেন: “আমি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত যে আপনার ক্যানসার হয়নি।” যে নার্সটি ম্যামোগ্রাম করেছিলেন তিনি চিন্তিত ছিলেন, কিন্তু আইরীন বলেন: “আমি মনে করি যে যখন ডাক্তার এই বিষয়ে নিশ্চিত, আমি হয়ত একটু বেশি ভয় পাচ্ছি।” শীঘ্রই স্ফীতি আরও বড় হতে থাকে, তাই আইরীন আর একটি ডাক্তারের পরামর্শ নেন। বায়প্সি নেওয়া হয় আর তাতে দেখা যায় যে তার জ্বলনশীল কারসিনোমা, দ্রুত বর্দ্ধনশীল ক্যানসার হয়েছে। টিউমারটি মৃদু প্রকৃতির (১০টির মধ্যে প্রায় ৮টি হয়) অথবা সংক্রামক তা নির্ণয় করতে বায়প্সি নেওয়া দরকার। যদি স্ফীতিটিকে লক্ষণ অনুযায়ী সন্দেহজনক লাগে বা তা বৃদ্ধি পেতে থাকে তাহলে বায়প্সি নিতেই হবে।
চিকিৎসা
বর্তমানে, শল্য-চিকিৎসা, রশ্মি বিচ্ছুরণ (radiation) ও রাসায়নিক দ্রব্যের চিকিৎসা (chemotherapy) হল স্তন ক্যানসারের প্রচলিত চিকিৎসা। টিউমারের প্রকৃতি, তার সাইজ, সংক্রমণ হওয়ার প্রবণতা, লসিকা গ্রন্থিতে ছড়িয়ে গেছে কি না এবং স্ত্রীয়ের রজোনিবৃত্তির অবস্থা সম্পর্কে তথ্যগুলি আপনাকে ও আপনার ডাক্তারকে চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নিতে সাহায্য করবে।
শল্য-চিকিৎসা। বহু দশক ধরে সম্পূর্ণ স্তন ব্যবচ্ছেদ (mastectomy), যা হল স্তনের নিচের পেশী ও লসিকা গ্রন্থিসহ স্তন ব্যবচ্ছেদ করা, ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি বছরগুলিতে স্তন-সংরক্ষণ চিকিৎসাতে শুধুমাত্র টিউমার ও লসিকা গ্রন্থি ব্যবচ্ছেদ করা এবং রশ্মি বিচ্ছুরণ করা হয়ে থাকে, এতে স্তন ব্যবচ্ছেদেরই মত বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে। এর ফলে ছোট টিউমার ব্যবচ্ছেদ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে কিছু মহিলাদের মনে শান্তি যোগায় কারণ এর অর্থ হল সৌন্দর্য কম নষ্ট হয়। কিন্তু শল্য-চিকিৎসার ব্রিটিশ পত্রিকা (ইংরাজি) বলে, যে সব কমবয়সী মহিলার একই স্তনে বহু জায়গায় ক্যানসার থাকে অথবা এক ইঞ্চিরও বড় টিউমার থাকে তাদের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ চিকিৎসাতে সেটির পুনরুৎপত্তি হওয়ার বেশি সম্ভাবনা থাকতে পারে।
ক্লীভ্ল্যান্ড ক্লিনিক জার্নাল অফ্ মেডিসিন পুনরুৎপত্তি-বিনা বেঁচে থাকা সম্পর্কে একটি বিশেষ বিষয় লক্ষ্য করে: “ঈষৎ পরিবর্তিত সম্পূর্ণ স্তন ব্যবচ্ছেদে . . . বেঁচে থাকার এবং পুনরুৎপত্তির উপর রক্ত-গ্রহণ এক বিপরীত প্রতিক্রিয়া করে।” বিবরণ দেখায়, যে দলটি রক্তগ্রহণ করে তাদের পাঁচ বছর বেঁচে থাকার ক্ষমতার হার হয় ৫৩ শতাংশ কিন্তু বিপরীতে যারা রক্তগ্রহণ করেনি তাদের বেঁচে থাকার ক্ষমতার হার হয় ৯৩ শতাংশ।
বেঁচে থাকার আর একটি সহায়ক সম্বন্ধে দ্যা ল্যান্সেট-এ বলা হয়, যেখানে ডা. আর. এ. ব্যাডউই মন্তব্য করেন: “রজোনিবৃত্তির পূর্বকালীন স্ত্রীদের যাদের স্তন ক্যানসার আছে তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ-কালীন প্রতিফলের উপর ঋতুচক্রের কাল অনুসারে অপারেশন করার সময়কাল প্রচুর প্রভাব ফেলে।” রিপোর্ট বলে যে এস্ট্রোজেন উদ্রেক হওয়াকালীন যে সকল মহিলারা টিউমার অপারেশন করেছে তাদের প্রতিফল ভাল হয়নি সেই সকল মহিলাদের চাইতে যারা ঋতুচক্রের অন্য কালে অপারেশন করেছে—৫৪ শতাংশ দশ বছর বেঁচে ছিল আর পরবর্তী দলটির ৮৪ শতাংশ বেঁচে ছিল। রজোনিবৃত্তির পূর্বকালীন স্ত্রীদের যাদের স্তন ক্যানসার আছে তাদের বলা হয় যে শেষ ঋতুস্রাবের অন্তত ১২ দিন পর হল তাদের অপারেশন করার সর্বাধিক অনুকূল সময়।
রশ্মি বিচ্ছুরণ চিকিৎসা। রশ্মি বিচ্ছুরণ চিকিৎসা ক্যানসার কোষকে ধ্বংস করে দেয়। সংরক্ষণ চিকিৎসাতে, শল্য-চিকিৎসক স্তনকে রক্ষা করার সময়ে হয়ত কিছু ক্ষুদ্রতম ক্যানসার বীজগুলি তার ছুরি এড়িয়ে যেতে পারে। সেই অবশিষ্ট কোষগুলিকে রশ্মি বিচ্ছুরণ চিকিৎসা নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু রশ্মি বিচ্ছুরণের ফলে দ্বিতীয় স্তনে ক্যানসার হওয়ার একটু ভয় থাকতে পারে। ডা. বেনেডিক্ ফ্রাস্ বলেন বিপরীত স্তনে যেন যতটা সম্ভব কম রশ্মি বিচ্ছুরণ হয়। তিনি বলেন: “মূল স্তনে রশ্মি বিচ্ছুরনের সময়ে কিছু সাধারণ পদ্ধতির দ্বারা বিপরীত স্তনে বিচ্ছুরনের মাত্রা বৈশিষ্ট্যমূলকরূপে কম করা যেতে পারে।” তিনি বলেন যে এক ইঞ্চি পুরু সীসের আস্তরণ দ্বিতীয় স্তনের উপর রাখতে হবে।
রাসায়নিক দ্রব্যের চিকিৎসা। (drug therapy) অপারেশনের মাধ্যমে স্তন ক্যানসারকে নির্মূল করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, মহিলাদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ, যাদের স্তন ক্যানসার হয়েছে বলে পরীক্ষা করে প্রথম পাওয়া গেছে তাদের স্তনে লুক্কায়িত স্থানান্তকরণকারী ক্যানসার থাকে, যা প্রথমে লক্ষণ প্রদর্শন করার জন্য খুবই ছোট হয়। রাসায়নিক দ্রব্যের চিকিৎসা হল এমন চিকিৎসা যাতে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয় সেই সব কোষকে নষ্ট করার চেষ্টা করতে যা দেহের অন্যান্য অংশকে আক্রমণ করে।
রাসায়নিক দ্রব্যের চিকিৎসার ফলাফলও সীমিত কারণ ক্যানসার জাতীয় টিউমার বিভিন্ন ধরনের কোষ দিয়ে তৈরি যাদের ওষুধের প্রতি নিজস্ব প্রতিক্রিয়া আছে। যে সকল কোষ চিকিৎসা করা সত্ত্বেও থেকে যায় সেগুলি হয়ত ঔষধ-প্রতিরোধকারী টিউমারের নতুন বংশের সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু দ্যা ল্যান্সেট-এর ১৯৯২ সালের জানুয়ারীর সংখ্যা প্রমাণ দেয় যে রাসায়নিক দ্রব্যের চিকিৎসা কোন স্ত্রীয়ের বয়সের উপর নির্ভর করে, তার আরও দশ বছর বাঁচার ক্ষমতা ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।
রাসায়নিক দ্রব্যের চিকিৎসার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হল বমি-বমিভাব, বমি হওয়া, চুল পড়ে যাওয়া, রক্তপাত, হৃদপিণ্ডের ক্ষতি, স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা দমন, নির্বীজকরণ ও লিউকিমিয়া। জন্ কেয়ার্নস্, সায়েন্টিফিক আ্যমেরিকান-এ লেখার সময় মন্তব্য করেন: “যে সকল রোগী ক্যানসারে রীতিমত আক্রান্ত ও যার ক্যানসার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে এইগুলি আপাতদৃষ্টিতে খুব সামান্য সমস্যা, কিন্তু যে সকল মহিলার এক সেন্টিমিটারের মত ছোট ও সম্ভবত স্থানীয় স্তন ক্যানসার আছে তার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অপারেশনের পর সে কোন অতিরিক্ত চিকিৎসা গ্রহণ না করলেও পাঁচ বছরের মধ্যে ক্যানসারে তার মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ থাকে।”
হরমোন চিকিৎসা। আ্যন্টিএস্ট্রোজেন চিকিৎসা এস্ট্রোজেনের বৃদ্ধি-উদ্দীপক ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। রজোনিবৃত্তির পূর্বকালীন স্ত্রীদের ক্ষেত্রে অপারেশনের দ্বারা ডিম্বাশয়গুলিকে বার করে দিয়ে অথবা ঔষধের মাধ্যমে এস্ট্রোজেনের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া হয়। দ্যা ল্যান্সেট রিপোর্ট করে দুই প্রকারেরই চিকিৎসাপ্রাপ্ত ১০০ জন মহিলার মধ্যে প্রতি ৮ থেকে ১০ জন মহিলা দশ বছর বেঁচে থাকতে পারে।
যে সকল মহিলাদের স্তন ক্যানসার চিকিৎসা হয়েছে, ক্রমাগত যত্ন নেওয়া হল তাদের আজীবন প্রচেষ্টা। ভালভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যেতেই হবে কারণ যদি এক ধরনের চিকিৎসা ব্যর্থ হয় এবং রোগের পুনরাক্রমণ হয় তাহলে অন্য প্রকারের চিকিৎসা হয়ত প্রয়োজনীয় অস্ত্র প্রদান করবে।
আরেক প্রকারের ক্যানসার চিকিৎসা যা অন্যভাবে করা হয় সেটি ক্যাকেসিয়া (cachexia) নামক লক্ষণে করা হয়ে থাকে। ক্যানসর রিসার্চ পত্রিকাটি বলে যে দুই তৃতীয়াংশ ক্যানসারে মৃত্যুই ক্যাকেসিয়ার কারণে হয়ে থাকে, পেশী ও টিস্যু নষ্ট হওয়াকে ক্যাকেসিয়া বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাইরাকস্ ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডা. জোসেফ গোল্ড আওয়েক!-কে বলেন: “আমরা মনে করি ক্যাকেসিয়ার জন্য জীবরাসায়নিক পথগুলি খোলা না থাকলে টিউমার নিজে থেকে দেহের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে না।” একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরীক্ষা বিষহীন ওষুধ হাইড্রোজাইন সালফেট ব্যবহার করে দেখায় যে এই পথগুলির কিছু বন্ধ করা যায়। বহুদিন ধরে আক্রান্ত নির্বাচিত স্তন ক্যানসার রোগীদের ৫০ শতাংশ অবস্থা সুস্থির রাখা সম্ভব হয়েছে।
কিছু মহিলারা বিকল্প চিকিৎসা যা অপ্রচলিত ঔষধ হিসাবে পরিচিত তা গ্রহণ করতে চান যা স্তন ক্যানসার চিকিৎসায় অপারেশন বা বিষহীন চিকিৎসা ব্যতীত চিকিৎসা করা যায়। চিকিৎসার মধ্যে পার্থক্য থাকে, কেউ ভোজনপ্রণালী ও ভেষজ পদার্থ ব্যবহার করে, যেমন হক্সি চিকিৎসায় করা হয়। কিন্তু একজনকে এই চিকিৎসাগুলির কার্যকারিতা নির্ণয় করতে সাহায্য করার জন্য প্রকাশিত গবেষণাগুলি খুব কমই আছে।
রক্ষা পাওয়ার চাবিকাঠি প্রদর্শন করতে এই প্রবন্ধটি লিখিত হলেও কোন এক চিকিৎসা সুপারিশ করা আওয়েক!-এর নীতি নয়। আমরা সকলকে উৎসাহ দিই যে এই রোগের চিকিৎসা করার সময় সর্বদিকে নজর দিয়ে চিকিৎসার বিভিন্ন উপায়গুলিকে দেখতে।
মানসিক চাপ এবং স্তন ক্যানসার
আ্যক্টা নিউরোলজিকা পত্রিকায় ডা. এইচ্. বল্ট্রাশ বলেন যে প্রচণ্ড ও দীর্ঘদিনব্যাপী মানসিক চাপ টিউমারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতাকে হয়ত কমিয়ে দিতে পারে। যে সকল মহিলারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, মানসিক চাপে ভোগে এবং যাদের মানসিক সমর্থনের অভাব থাকে, তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্তত ৫০ শতাংশ বিপদাপন্ন হয়।
তাই, ডা. বসিল স্টল্, মন ও ক্যানসার পূর্বাভাস-এ (ইংরাজি) লেখার সময় জোর দেন: “প্রত্যেক ক্যানসার রোগীর চিকিৎসার সময়ে ও পরে দৈহিক ও মানসিক কোন চাপ যাতে না হয় তার জন্য প্রতিটি চেষ্টা করতে হবে।” কিন্তু কী প্রকৃতির সমর্থনের প্রয়োজন? (g94 4/8)
পরিচিত কোন খাদ্য ক্যানসার সারাতে না পারলেও, নির্দিষ্ট খাদ্য খেলে এবং অন্যান্য খাদ্য খাওয়া বর্জন করলে প্রতিরোধের কাজ করতে পারে। “সঠিক খাদ্য গ্রহণ করলে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা পঞ্চাশ শতাংশ কমে যায়,” বলেন ডা. লিওনার্ড কোহন্
“স্তন ক্যানসারের গতিপথ পরিবর্তন করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল প্রারম্ভেই পরীক্ষা করে তার নির্ণয়,” “উত্তর আ্যমেরিকার রেডিওলজিক ক্লিনিকস্” প্রকাশনাটি বলে। এই ক্ষেত্রে তিনটি প্রতিষেধকমূলক পদক্ষেপ হল: নিয়মিত স্তনের স্ব-পরীক্ষা, ডাক্তারের দ্বারা বাৎসরিক পরীক্ষা এবং ম্যামোগ্র্যাফি
যে সকল মহিলারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, মানসিক চাপে ভোগে এবং যাদের মানসিক সমর্থনের অভাব থাকে, তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্তত ৫০ শতাংশ বিপদাপন্ন হয়
স্ব-পরীক্ষা—এক মাসিক পরীক্ষা
ঋতুচক্র শেষ হওয়ার চার থেকে সাত দিন পর স্তনের স্ব-পরীক্ষা করা দরকার। যাদের রজোনিবৃত্তি হয়ে গেছে তাদেরও প্রতি মাসে একই দিনে পরীক্ষা করতে হবে।
প্রতি মাসে একই দিনে যে লক্ষণগুলি দেখতে হবে
• যে কোন আকারের স্ফীতি (ছোট অথবা বড়) অথবা স্তনে পুরুভাব।
• স্তনের চামড়া কুঞ্চিত, খাঁজ অথবা বিবর্ণ হওয়া।
• স্তনবৃন্ত পিছনে সরে যায় অথবা ভিতরে ঢুকে যাওয়া।
• স্তনবৃন্তে ফুসকুড়ি হওয়া বা ছাল ওঠা অথবা রস বার হওয়া।
• বাহুর নিচে গ্রন্থি বড় হওয়া।
• স্তনের আঁচিল বা কাটা ক্ষতের পরিবর্তন।
• স্তনের লক্ষণীয় অপ্রতিসাম্য অবস্থা যা স্বাভাবিক অবস্থার থেকে পরিবর্তন।
স্ব-পরীক্ষা
দাঁড়িয়ে বাঁ বাহুটি উপরে উঠান। ডান হাত দিয়ে স্তনের বাইরের ধার থেকে শুরু করে স্তনের চারিপাশে ও বৃন্তে আঙ্গুলের সমতল অংশ দিয়ে গোল গোল করে আস্তে আস্তে ঘুরান। বাহুর নিচ ও স্তনের মধ্যবর্তী যে স্থানটি আছে তার প্রতিও নজর দিন।
সোজা শুয়ে বাঁ বাহুর নিচে বালিশ রাখুন এবং বাঁ বাহুটি মাথার উপর অথবা নিচে রাখুন। উপরে বর্ণিত সেই একইভাবে গোল গোল করে ঘুরান। ডান দিকের ক্ষেত্রেও একই জিনিস করুন।
কোন রস নিঃসৃত হচ্ছে কি না তা পরীক্ষা করার জন্য মৃদুভাবে স্তনবৃন্তে চাপ দিন। ডান স্তনের জন্য একই জিনিস করুন।