অধ্যয়ন প্রবন্ধ ৪৯
গান ৪৪ হতাশ লোকের প্রার্থনা
ইয়োবের বই থেকে পরামর্শ দিতে শিখুন
“হে ইয়োব, দয়া করে আমার কথা শুনুন।”—ইয়োব ৩৩:১, NW.
আমরা কী শিখব?
ইয়োবের বই থেকে আমরা জানতে পারব, কীভাবে আমরা কার্যকরী উপায়ে পরামর্শ দিতে পারি।
১-২. ইয়োবকে দেখে তার তিন জন সঙ্গী এবং ইলীহূ কোন সমস্যায় পড়েছিল?
ইয়োব খুবই ধনী ছিলেন এবং সবাই তাকে চিনত। তাই তিনি যখন তার সমস্ত কিছু হারিয়ে ফেলেছিলেন, তখন এই খবরটা পূর্বদিকে বসবাসকারী লোকদের কাছে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। যখন ইয়োবের তিন জন সঙ্গী অর্থাৎ ইলীফস, বিল্দদ এবং সোফর এই খবরটা শোনে, তখন তারা ইয়োবকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ঊষ দেশের দিকে রওনা হয়। কিন্তু, তাদের কোনো ধারণাই ছিল না যে, তারা যখন পৌঁছাবে, তখন তারা সেখানে কী দেখতে পাবে।
২ একটু কল্পনা করুন, ইয়োবের কাছে যা-কিছু ছিল, সেই সমস্ত কিছু হারিয়ে গিয়েছে। তার মেষ, ষাঁড়, উট ও গাধা সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তার সন্তানদের এবং বেশিরভাগ দাস-দাসীকে মেরে ফেলা হয়েছে। যে-বাড়িতে তার সন্তানেরা খাওয়া-দাওয়া করছিল, সেটা তাদের উপর ভেঙে পড়েছে। শুধু তা-ই নয়, এক যন্ত্রণাদায়ক রোগে ইয়োব আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তার শরীর ফোঁড়ায় ভরে গিয়েছে। তার তিন জন সঙ্গী যখন সেখানে পৌঁছায়, তখন তারা দেখে যে, ইয়োব দুঃখ ভরা মুখে ছাইয়ের উপর বসে আছেন। এটা দেখার পর তার সঙ্গীরা কী করে? যদিও তারা দেখে যে, ইয়োব খুবই কষ্ট পাচ্ছেন, তবুও সাত দিন পর্যন্ত তারা ইয়োবের সঙ্গে একটা কথাও বলে না। (ইয়োব ২:১২, ১৩) এর কিছু সময় পর, ইলীহূ নামে একজন যুবক ইয়োবের কাছে এসে বসেন। এতদিন ধরে চুপ থাকার পর ইয়োব আর নিজেকে আটকাতে পারেন না এবং কথা বলতে শুরু করেন। তিনি সেই দিনটাকে অভিশাপ দিতে লাগেন, যে-দিন তার জন্ম হয়েছে এবং নিজের মৃত্যু কামনা করেন। (ইয়োব ৩:১-৩, ১১) ইয়োবের কথা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তার সান্ত্বনার প্রয়োজন। এই ব্যক্তিরা ইয়োবকে যা বলবে এবং যেভাবে বলবে, সেটা থেকে বোঝা যাবে যে, তারা সত্যিই ইয়োবের বন্ধু কি না এবং তারা সত্যিই ইয়োবের জন্য চিন্তা করে কি না।
৩. এই প্রবন্ধে আমরা কী জানতে পারব?
৩ ইয়োবের তিন জন সঙ্গী এবং ইলীহূ তাকে যা-কিছু বলে ও করে, সেই বিষয়গুলো যিহোবা মোশির মাধ্যমে বাইবেলে লিখিয়েছেন। এটা জানা যায়, এক মন্দ স্বর্গদূতের প্ররোচনায় ইলীফস কিছু কথা বলেছিলেন। অন্য দিকে, ইলীহূ যা-কিছু বলেছিলেন, সেগুলো যিহোবার অনুপ্রেরণায় বলেছিলেন। (ইয়োব ৪:১২-১৬; ৩৩:২৪, ২৫) এই কারণে ইয়োব বইয়ে এক দিকে যেমন অনেক উত্তম পরামর্শের বিষয়ে জানা যায়, অন্যদিকে আবার বেশ কিছু খারাপ পরামর্শের বিষয়েও জানা যায়। এই প্রবন্ধে আমরা ইয়োবের বই থেকে জানতে পারব, কীভাবে আমরা অন্যদের কার্যকরী উপায়ে পরামর্শ দিতে পারি। প্রথমে আমরা ইলীফস, বিল্দদ এবং সোফরের কাছ থেকে শিখব যে, পরামর্শ দেওয়ার সময় আমাদের কী বলা উচিত নয় এবং কী করা উচিত নয়। এরপর, আমরা ইলীহূর কাছ থেকে শিখব, পরামর্শ দেওয়ার সময় আমাদের কী বলা উচিত এবং কীভাবে বলা উচিত। আমরা এটাও জানব, ইজরায়েলীয়েরা ইয়োবের তিন জন সঙ্গীর কাছ থেকে এবং ইলীহূর কাছ থেকে কোন শিক্ষা লাভ করতে পারত এবং আজ আমরা কোন শিক্ষা লাভ করতে পারি।
ইয়োবের তিন জন সঙ্গী তাকে কীভাবে পরামর্শ দিয়েছিল?
৪. ইয়োবের তিন জন সঙ্গী তাকে সান্ত্বনা দিতে কেন ব্যর্থ হয়? (ছবিও দেখুন।)
৪ ইয়োবের উপর যে-বিপদ এসেছিল, সেটা শুনে ইয়োবের তিন জন সঙ্গী তার প্রতি ‘সহানুভূতি দেখানোর এবং তাকে সান্ত্বনা’ দেওয়ার জন্য তার কাছে এসেছিল। (ইয়োব ২:১১, NW) কিন্তু, তারা এটা করতে ব্যর্থ হয়। কেন আমরা এমনটা বলতে পারি? তিনটে বিষয়ের উপর মনোযোগ দিন। প্রথমত, তারা ইয়োবের কথা শোনেনি এবং তার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেনি। এর পরিবর্তে, তারা এটা ধরে নিয়েছিল যে, ইয়োব নিশ্চয়ই কোনো ভুল করেছেন আর তাই ঈশ্বর তাকে শাস্তি দিচ্ছেন।a (ইয়োব ৪:৭; ১১:১৪) দ্বিতীয়ত, তাদের বেশিরভাগ কথা কোনো কাজের ছিল না বরং আঘাতদায়ক ছিল, যেগুলো ইয়োবের হৃদয়কে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল। যেমন, ইয়োবের সেই তিন জন সঙ্গী এমন কিছু বলেছিল, যেগুলো হয়তো শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু সেই কথাগুলোর কোনো মূল্য ছিল না। এর ফলে, ইয়োব কোনো সান্ত্বনা পাননি। (ইয়োব ১৩:১২) এমনকী বিল্দদ দু-বার ইয়োবকে বলেন যে, তিনি বড্ড বেশি কথা বলছেন। (ইয়োব ৮:২; ১৮:২) আর সোফর তো তাকে “মূর্খ ব্যক্তি” বলেন। (ইয়োব ১১:১২, NW) আর তৃতীয়ত, যদিও ইয়োবের তিন জন সঙ্গী তার সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলেনি, কিন্তু তারা তাদের কথার মাধ্যমে ইয়োবকে ছোটো করে, তাকে টিটকারি দেয় এমনকী তাকে দোষী সাব্যস্তও করে। (ইয়োব ১৫:৭-১১) একটু চিন্তা করে দেখুন, তাদের কথাগুলো শুনে ইয়োবের কতই-না খারাপ লেগেছিল! ইয়োবকে সান্ত্বনা দেওয়ার এবং তার বিশ্বাসকে দৃঢ় করার পরিবর্তে, সেই তিন জন শুধুমাত্র তাকে দোষ দেওয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিল।
পরামর্শ দেওয়ার সময় আপনি যেভাবে কথা বলেন, সেটা যেন অন্যকে নীচু না করে। এর পরিবর্তে, আপনি সেই ব্যক্তিকে সাহায্য করার চেষ্টা করুন (৪ অনুচ্ছেদ দেখুন)
৫. ইয়োবের সঙ্গীরা তাকে যা বলেছিল, সেটা ইয়োবের উপর কেমন প্রভাব ফেলেছিল?
৫ নিশ্চিতভাবেই, ইয়োব তার তিন জন সঙ্গীর পরামর্শ থেকে কোনো সান্ত্বনা পাননি বরং তারা তাদের কথার মাধ্যমে ইয়োবকে সম্পূর্ণভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল। (ইয়োব ১৯:২) তাই, ইয়োব নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করতে শুরু করেন। তিনি এতটাই মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন যে, তিনি কিছুই ভেবে উঠতে পারছিলেন না আর তার মুখ থেকে উলটোপালটা কথা বের হয়ে আসছিল। (ইয়োব ৬:৩, ২৬) ইয়োবের তিন জন সঙ্গী যে-কথাগুলো বলেছিল, সেগুলো ঈশ্বরের চিন্তাভাবনা থেকে একেবারে আলাদা ছিল। এ ছাড়া, তারা ইয়োবের প্রতি প্রেম ও সমবেদনার সঙ্গে আচরণ করেনি। এক অর্থে, তারা অজান্তেই শয়তানের হাতের পুতুল হয়ে গিয়েছিল। (ইয়োব ২:৪, ৬) এই বিবরণ থেকে ইজরায়েলীয়েরা কী শিখতে পারত এবং আজ আমরা কী শিখতে পারি?
৬. ইজরায়েলের নেতারা ইয়োবের তিন জন সঙ্গীর কাছ থেকে কোন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করতে পারত?
৬ ইজরায়েলীয়েরা এই বিবরণ থেকে কী শিখতে পারত? ইজরায়েল জাতি গঠিত হওয়ার পর, যিহোবা কিছু যোগ্য ব্যক্তিকে নেতা হিসেবে নিযুক্ত করেন, যারা যিহোবার মান অনুযায়ী লোকদের ন্যায়বিচার করত। (দ্বিতীয়. ১:১৫-১৮; ২৭:১) যিহোবা এটাই চেয়েছিলেন যে, এই নেতারা যেন কোনো কিছু পরামর্শ দেওয়ার এবং বিচার করার আগে লোকদের কথা মন দিয়ে শোনে। (২ বংশা. ১৯:৬) শুধু তা-ই নয়, এই নেতাদের যেকোনো মামলার সম্পূর্ণ তথ্য জানার জন্য লোকদের প্রশ্ন করা খুবই প্রয়োজন ছিল এবং তাদের এটা ধরে নেওয়া উচিত ছিল না যে, তারা সমস্ত কিছু জানে। (দ্বিতীয়. ১৯:১৮) আর যে-ইজরায়েলীয়েরা এই নেতাদের কাছে সাহায্য চাইতে আসত, তাদের সঙ্গে তারা কখনো কঠোরভাবে কথা বলত না। কেন? কারণ এই নেতারা যদি লোকদের উপর বিরক্ত হত বা রেগে যেত, তা হলে সেই লোকেরা কখনোই মন খুলে তাদের কথা নেতাদের জানাতে পারত না। (যাত্রা. ২২:২২-২৪) নিশ্চিতভাবেই, ইজরায়েলের নেতারা ইয়োবের বই থেকে কত কিছুই-না শিখতে পারত!
৭. (ক) ইজরায়েলের নেতারা ছাড়াও আর কারা একে অপরকে পরামর্শ দিতে পারত? (খ) ইজরায়েলীয়েরা ইয়োবের বিবরণ থেকে কী শিখতে পারত? (হিতোপদেশ ২৭:৯)
৭ ইজরায়েলের নেতারা ছাড়া, অন্যান্য ইজরায়েলীয়েরাও একে অপরকে পরামর্শ দিতে পারত, তা তারা বয়স্ক বা যুবক, পুরুষ বা নারী যে-ই হোক না কেন। যেমন, কোনো ইজরায়েলীয় ব্যক্তিকে যদি উপাসনার বিষয়ে অথবা নিজের আচার-আচরণ পরিবর্তন করার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার প্রয়োজন হত, তা হলে তার কোনো বন্ধু তাকে এই বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারত। (গীত. ১৪১:৫) প্রকৃত বন্ধুরা এমনটাই করে। (পড়ুন, হিতোপদেশ ২৭:৯.) যদি ইজরায়েলীয়েরা এই বিষয়ে চিন্তা করত যে, ইলীফস, বিল্দদ ও সোফর ইয়োবের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেছিল, তা হলে তারা এটা বুঝতে পারত, পরামর্শ দেওয়ার সময় তাদের কী বলা উচিত নয় এবং কী করা উচিত নয়।
৮. অন্যদের পরামর্শ দেওয়ার সময় আমাদের কোন বিষয়গুলো মনে রাখা উচিত? (ছবিগুলোও দেখুন।)
৮ আমরা এই বিবরণ থেকে কী শিখি? যখন আমাদের ভাই-বোনেরা কোনো বিপদের মধ্যে পড়ে, তখন আমরা তাদের সাহায্য করতে চাই। কিন্তু, আমাদের কখনোই ইয়োবের সেই তিন সঙ্গীর মতো ভাই-বোনদের সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রথমত, আমাদের সমস্ত তথ্য ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত এবং তারপর কিছু বলা উচিত। তাই, আমাদের সম্পূর্ণ তথ্য না জেনে, কোনো সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, আমাদের পরামর্শ যেন সবসময় নিজেদের অভিজ্ঞতা বা ধারণার উপর নয় বরং বাইবেলের সত্যের উপর ভিত্তি করে হয়। ইলীফস এই ভুলটাই করেছিলেন। তিনি যা-কিছু বলেছিলেন, সেটা তিনি তার নিজের চিন্তাধারার উপর ভিত্তি করেই বলেছিলেন। (ইয়োব ৪:৮; ৫:৩, ২৭) তৃতীয়ত, আমরা যেন কখনো কাউকে আঘাত দিয়ে কথা না বলি বরং আমাদের কথা যেন অন্যদের গেঁথে তোলে। চিন্তা করে দেখুন, ইলীফস ও তার সঙ্গীরা যে-কথাগুলো বলেছিল, সেগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় সত্যি ছিল। পরবর্তী সময়ে একজন বাইবেল লেখক তাদের বলা একটা কথার উদ্ধৃতি করেছেন। (ইয়োব ৫:১৩ পদের সঙ্গে ১ করিন্থীয় ৩:১৯ পদ তুলনা করুন।) তবুও যিহোবা বলেছিলেন, ইয়োবের সঙ্গীরা মিথ্যা কথা বলেছে। কেন তিনি এটা বলেছিলেন? কারণ তারা যিহোবা সম্বন্ধে সত্য কথা বলেনি বরং নিজেদের কথার মাধ্যমে ইয়োবকে অনেক দুঃখ দিয়েছিল। (ইয়োব ৪২:৭, ৮) কাউকে পরামর্শ দেওয়ার সময় আমাদের মনে রাখা উচিত, আমরা এমন কোনো কথা বলব না, যাতে তার মনে হতে পারে যে, যিহোবা তার প্রতি খুব কঠোর এবং সে যিহোবার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নয়। এখন আসুন, আমরা দেখি ইলীহূর কাছ থেকে আমরা কী শিখতে পারি।
পরামর্শ দেওয়ার সময় (১) সমস্ত তথ্য ভালোভাবে জেনে নিন, (২) যিহোবার বাক্য বাইবেলের উপর ভিত্তি করে পরামর্শ দিন এবং (৩) প্রেমের সঙ্গে কথা বলুন (৮ অনুচ্ছেদ দেখুন)
ইলীহূ কীভাবে ইয়োবকে পরামর্শ দিয়েছিলেন?
৯. ইয়োবের সঙ্গীরা তাকে এত কিছু বলার পরও, কেন ইয়োবের সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছিল এবং যিহোবা কীভাবে তাকে সাহায্য করেছিলেন?
৯ ইয়োব এবং তার সঙ্গীরা যতক্ষণ তর্কবির্তক করছিল, ততক্ষণ পরিবেশ খুবই গম্ভীর ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে এত কথা বলেছিল যে, বাইবেলের ২৮টা অধ্যায় তাদের কথাতেই ভরে গিয়েছে। সেই তিন জন সঙ্গী বেশিরভাগ কথা রাগের মাথায় বলেছিল, তাই ইয়োব তাদের পরামর্শ থেকে কোনো সান্ত্বনা পাননি এবং এরপরও ইয়োব খুবই নিরুৎসাহিত ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ইয়োবকে সংশোধন করারও প্রয়োজন ছিল। তখন যিহোবা কীভাবে ইয়োবকে সাহায্য করেছিলেন? তিনি ইলীহূর মাধ্যমে তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু, ইলীহূ কিছু বলার জন্য কেন এতটা অপেক্ষা করেছিলেন? তিনি বলেছিলেন: “আপনারা আমার চেয়ে বয়সে বড়ো আর আমি আপনাদের চেয়ে ছোটো, তাই আপনারা যখন কথা বলছিলেন, তখন আমি মাঝখানে কথা বলিনি।” (ইয়োব ৩২:৬, ৭, NW) ইলীহূ জানতেন যে, বয়স্ক ব্যক্তিরা জীবনে অনেক কিছু দেখেছে এবং সেখান থেকে অনেক কিছু শিখেছে। তাই, তাদের কাছে এমন প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে, যেটা যুবকদের কাছে নেই। এই কারণে যখন ইয়োব ও তার সঙ্গীরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলছিল, তখন ইলীহূ ধৈর্য ধরে চুপচাপ তাদের কথা শুনছিলেন। কিন্তু, এরপর তিনি আর নিজেকে আটকাতে পারেননি। ইলীহূ বলেছিলেন, “বয়স মানুষকে নিজে থেকেই বিজ্ঞ করে তোলে না আর কেবল বয়স্করাই যে কোনটা সঠিক, তা বোঝে, এমন নয়।” (ইয়োব ৩২:৯) এখন আসুন, আমরা দেখি এরপর ইলীহূ কী বলেছিলেন এবং কীভাবে বলেছিলেন।
১০. ইয়োবকে পরামর্শ দেওয়ার আগে ইলীহূ কী করেছিলেন? (ইয়োব ৩৩:৬, ৭)
১০ ইয়োবকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য ইলীহূ সঠিক সময়ের অপেক্ষা করেছিলেন। ইলীহূ চেয়েছিলেন, ইয়োব যেন শান্ত মনে তার কথা শোনেন। এর জন্য তিনি কী করেছিলেন? ইয়োব এবং তার তিন জন সঙ্গীর কথাবার্তা শুনে ইলীহূ খুব রেগে গিয়েছিলেন। (ইয়োব ৩২:২-৫) তাই, সবচেয়ে প্রথমে তিনি তার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি ইয়োবকে কোনো উলটোপালটা কথা বলেননি বরং একজন বন্ধুর মতো তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। ইলীহূ ইয়োবকে বলেছিলেন, “দেখুন! সত্য ঈশ্বরের সামনে আমিও আপনারই মতো।” (পড়ুন, ইয়োব ৩৩:৬, ৭, NW.) এরপর ইলীহূ এটা স্পষ্ট করেন যে, তিনি ইয়োবের কথা মন দিয়ে শুনেছিলেন। তিনি এমনকী ইয়োবের বলা ছ-টা উক্তি থেকে কিছু মূল বিষয়ও তুলে ধরেছিলেন। (ইয়োব ৩২:১১; ৩৩:৮-১১) পরে ইয়োবকে পরামর্শ দেওয়ার সময় ইলীহূ আবারও ইয়োবের কথাগুলো উল্লেখ করেছিলেন।—ইয়োব ৩৪:৫, ৬, ৯; ৩৫:১-৪.
১১. ইলীহূ ইয়োবকে কীভাবে পরামর্শ দিয়েছিলেন? (ইয়োব ৩৩:১)
১১ যিহোবার বিশ্বস্ত সেবক ইয়োবকে পরামর্শ দেওয়ার সময় ইলীহূ তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আচরণ করেছিলেন। তিনি কথা বলার সময় ইয়োবের নাম নিয়েছিলেন, যেটা হয়তো তার তিন জন সঙ্গী করেনি। (পড়ুন, ইয়োব ৩৩:১.) এ ছাড়া, ইয়োব এবং তার সঙ্গীরা যখন একে অপরের সঙ্গে তর্ক করছিল, তখন নিশ্চয়ই ইলীহূরও কিছু বলতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু তিনি সেটা বলার কোনো সুযোগ পাননি। তাই, তিনি যখন ইয়োবকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন, তখন তিনি নিজেই শুধু কথা বলে যাননি বরং ইয়োবকেও কথা বলার সুযোগ দিয়েছিলেন। (ইয়োব ৩২:৪; ৩৩:৩২) ইলীহূ স্পষ্টভাবে ইয়োবকে বলেছিলেন, তার কিছু কথা সত্য নয়। তিনি ইয়োবকে এটাও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, যিহোবা অনেক বেশি প্রজ্ঞাবান, শক্তিশালী এবং তিনি সবসময় ন্যায়বিচার করেন ও সেইসঙ্গে তাঁর প্রেম হল অটল। (ইয়োব ৩৬:১৮, ২১-২৬; ৩৭:২৩, ২৪) ইলীহূ ইয়োবকে এত সুন্দরভাবে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, যিহোবার কথা শোনার জন্য নিশ্চয়ই ইয়োব মন থেকে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন। (ইয়োব ৩৮:১-৩) ইলীহূর কাছ থেকে ইজরায়েলীয়েরা কী শিখতে পারত এবং আজ আমরা কী শিখতে পারি?
১২. যিহোবা কেন ইজরায়েলে ভাববাদীদের নিযুক্ত করেছিলেন এবং ইজরায়েলীয়েরা ইলীহূর কাছ থেকে কী শিখতে পারত?
১২ ইজরায়েলীয়েরা এই বিবরণ থেকে কী শিখতে পারত? যিহোবা ইজরায়েলে ভাববাদীদের নিযুক্ত করেছিলেন, যাতে তারা তাঁর লোকদের নির্দেশনা দিতে পারে এবং তাদের সংশোধন করতে পারে। যেমন, বিচারকদের দিনে যিহোবা দবোরাকে ভাববাদিনী হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন, যাতে তিনি একজন মায়ের মতো ইজরায়েলীয়দের সঠিক পথ দেখাতে পারেন। আর যখন শমূয়েল ছোটো ছিলেন, তখন যিহোবা তার মাধ্যমে নিজের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। (বিচার. ৪:৪-৭; ৫:৭; ১ শমূ. ৩:১৯, ২০) এ ছাড়া, রাজাদের দিনেও যিহোবা একের-পর-এক ভাববাদীদের নিযুক্ত করেন, যাতে তারা তাঁর লোকদের সত্য উপাসনার বিষয়ে উৎসাহ দিতে এবং তাদের সংশোধন করতে পারে। (২ শমূ. ১২:১-৪; প্রেরিত ৩:২৪) ইয়োবের বইয়ে উল্লেখিত ইলীহূর উদাহরণ থেকে ভাববাদীরা এবং যিহোবার অন্য বিশ্বস্ত সেবকেরা এটাই শিখতে পারত যে, পরামর্শ দেওয়ার সময় এবং সংশোধন করার সময় কী বলা উচিত এবং কীভাবে বলা উচিত।
১৩. আমরা ইলীহূর উদাহরণ থেকে কী শিখতে পারি?
১৩ আমরা এই বিবরণ থেকে কী শিখতে পারি? সেই ভাববাদীদের মতো আজ আমরাও লোকদের ঈশ্বরের বাক্য থেকে তাঁর ইচ্ছা সম্বন্ধে জানাই। এ ছাড়া, আমরা আমাদের কথার মাধ্যমে ভাই-বোনদের উৎসাহ ও সান্ত্বনা দিই। (১ করি. ১৪:৩) তাই, সেই ভাববাদীদের মতো আমরাও ইলীহূর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি। বিশেষ করে, প্রাচীনদের এই বিষয়টা খেয়াল রাখতে হয় যে, যখন তারা ভাই-বোনদের উৎসাহ দেবে, তখন যেন তারা তাদের কথার মাধ্যমে ‘সান্ত্বনা দেয়’ এবং প্রেমের সঙ্গে কথা বলে, এমনকী তখনও যখন কেউ কোনো মানসিক চাপের ফলে “উলটোপালটা” কথা বলে ফেলে।—১ থিষল. ৫:১৪; ইয়োব ৬:৩.
১৪-১৫. একজন প্রাচীন পরামর্শ দেওয়ার সময় কীভাবে ইলীহূর উদাহরণ অনুকরণ করতে পারেন? বুঝিয়ে বলুন।
১৪ একটু কল্পনা করুন, একজন প্রাচীন জানতে পেরেছেন যে, তার মণ্ডলীর এক বোন খুবই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছেন। এরপর তিনি আরেকজন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে সেই বোনকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য তার বাড়িতে যান। বোন বলেন, যদিও তিনি সভাতে যান এবং নিয়মিতভাবে প্রচার করেন, তবুও তার জীবনে আনন্দ নেই। এইরকম পরিস্থিতিতে সেই প্রাচীন কী করবেন?
১৫ প্রথমত, সেই প্রাচীন এটা বোঝার চেষ্টা করবেন, বোন কেন এত নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছেন। এর জন্য সেই প্রাচীন হয়তো বোনকে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন এবং মন দিয়ে তার কথা শুনতে পারেন। প্রাচীন এটা জানার চেষ্টা করবেন, সেই বোন কি নিজেকে যিহোবার ভালোবাসা পাওয়ার অযোগ্য বলে মনে করছেন, না কি তিনি “জীবনের উদ্বিগ্নতার” কারণে ভারগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। (লূক ২১:৩৪) দ্বিতীয়ত, সেই প্রাচীন এটাও চিন্তা করবেন যে, কোন বিষয়গুলোর জন্য তিনি বোনকে প্রশংসা করতে পারেন। হতে পারে, সেই প্রাচীন হয়তো তাকে এটার জন্য প্রশংসা করতে পারেন যে, এত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বোন নিয়মিতভাবে সভাতে আসছেন এবং প্রচার কাজ করছেন। তৃতীয়ত, বোনের পরিস্থিতি বোঝার পর সেই প্রাচীন বাইবেল থেকে তাকে উৎসাহিত করবেন এবং এই নিশ্চয়তা দেবেন যে, যিহোবা তাকে খুব ভালোবাসেন।—গালা. ২:২০.
ইয়োবের বই থেকে শিখতে থাকুন
১৬. ইয়োবের বই থেকে আরও কিছু শেখার জন্য আমরা কী করতে পারি?
১৬ ইয়োবের বই থেকে আমরা কত কিছুই না শিখতে পারি! আমরা আগের প্রবন্ধে শিখেছিলাম, কেন ঈশ্বর দুঃখকষ্ট থাকতে দিয়েছেন এবং কষ্টের সময়ে আমরা কীভাবে ধৈর্য ধরতে পারি। আর এই প্রবন্ধে আমরা জেনেছি যে, যদি আমরা কার্যকরী উপায়ে পরামর্শ দিতে চাই, তা হলে আমরা ইয়োবের তিন জন সঙ্গীকে নয় বরং ইলীহূর উদাহরণ অনুকরণ করব। তাই, পরবর্তী সময়ে কাউকে পরামর্শ দেওয়ার আগে সেই বিষয়গুলোর উপর মনোযোগ দিন, যেগুলো আপনি ইয়োবের বই থেকে শিখেছেন। আপনি যদি এই রোমাঞ্চকর বইটা অনেক দিন আগে পড়ে থাকেন, তা হলে এটা কি আবারও পড়ার লক্ষ্য রাখতে পারেন? এই বইটা পড়লে আপনি নিশ্চয়ই অনেক ভালো বিষয় শিখতে পারবেন।
গান ১২৫ খুশি যারা দয়াময়!
a এমনটা জানা যায় যে, একজন মন্দ স্বর্গদূত ইলীফসকে এটা বিশ্বাস করাতে চেয়েছিল যে, যিহোবার দৃষ্টিতে কেউই ধার্মিক নয় এবং আমরা যিহোবাকে খুশি করতে পারি না। ইলীফস তার কথা বিশ্বাস করেছিলেন। এরপর ইয়োবের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বার বার এই কথাগুলো উল্লেখ করেছিলেন।—ইয়োব ৪:১৭, ১৮; ১৫:১৫, ১৬; ২২:২.