কোথায় প্রকৃত সান্ত্বনা পাওয়া যেতে পারে?
“আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্টের ঈশ্বর ও পিতা . . . আমাদের সমস্ত ক্লেশের মধ্যে আমাদিগকে সান্ত্বনা করেন।”—২ করিন্থীয় ১:৩, ৪.
১. কোন পরিস্থিতিগুলোর কারণে হয়তো লোকেরা সান্ত্বনার অত্যন্ত প্রয়োজন বলে মনে করতে পারে?
মারাত্মক অসুস্থতার ফলে অক্ষম হয়ে গেছেন এমন একজন ব্যক্তি হয়তো মনে করতে পারেন যে, তার জীবন একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ভূমিকম্প, ঝড়, এবং দুর্ভিক্ষগুলো লোকেদের একেবারে নিঃস্ব করে দেয়। যুদ্ধের কারণে হয়তো পরিবারের সদস্যরা মারা যেতে পারে, বাড়িঘর ধ্বংস হতে পারে বা গৃহকর্তাদের নিজেদের সহায়সম্পদ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করতে পারে। অবিচারের কারণে লোকেরা হয়তো মনে করতে পারে যে, এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে তারা স্বস্তি পাওয়ার জন্য যেতে পারে। যারা এইধরনের দুঃখদুর্দশাগুলোর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের সান্ত্বনা অত্যন্ত প্রয়োজন। তা কোথায় পাওয়া যেতে পারে?
২. যিহোবা যে-সান্ত্বনা জোগান, তা কেন অদ্বিতীয়?
২ কিছু ব্যক্তি এবং সংগঠন সান্ত্বনা জোগানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে। দয়ালু কথাগুলোর প্রতি উপলব্ধি দেখানো হয়। বস্তুগত ত্রাণ প্রচেষ্টা স্বল্পমেয়াদী প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারে। কিন্তু, একমাত্র সত্য ঈশ্বর, যিহোবা সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করতে এবং প্রয়োজনীয় এমন সাহায্য জোগাতে পারেন, যাতে এইধরনের বিপর্যয়গুলো আর কখনও না ঘটে। তাঁর সম্বন্ধে বাইবেল বলে: “ধন্য আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্টের ঈশ্বর ও পিতা; তিনিই করুণা-সমষ্টির পিতা এবং সমস্ত সান্ত্বনার ঈশ্বর; তিনি আমাদের সমস্ত ক্লেশের মধ্যে আমাদিগকে সান্ত্বনা করেন, যেন আমরা নিজে ঈশ্বর-দত্ত যে সান্ত্বনায় সান্ত্বনাপ্রাপ্ত হই, সেই সান্ত্বনা দ্বারা সমস্ত ক্লেশের পাত্রদিগকে সান্ত্বনা করিতে পারি।” (২ করিন্থীয় ১:৩, ৪) যিহোবা কীভাবে আমাদের সান্ত্বনা দেন?
সমস্যাগুলোর একেবারে মূলে যাওয়া
৩. ঈশ্বর যে-সান্ত্বনা দেন, তা কীভাবে মানবজাতির সমস্যাগুলোর মূলে নিয়ে যায়?
৩ আদমের পাপের কারণে পুরো মানব পরিবার উত্তরাধিকারসূত্রে অসিদ্ধতা পেয়েছে আর এর ফলে অসংখ্য সমস্যা দেখা দিয়েছে, যেগুলো পরিশেষে মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে। (রোমীয় ৫:১২) পরিস্থিতি আরও প্রকোপ হয় এই কারণে যে, শয়তান দিয়াবল হল “এ জগতের অধিপতি।” (যোহন ১২:৩১; ১ যোহন ৫:১৯) মানবজাতি অপ্রীতিকর যে-পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, সেটার জন্য শুধু দুঃখ প্রকাশ করার চেয়ে যিহোবা আরও কিছু করেছেন। উদ্ধারের জন্য তিনি তাঁর একজাত পুত্রকে মুক্তির মূল্য হিসেবে পাঠিয়েছেন এবং তিনি আমাদের বলেছেন যে, যদি আমরা তাঁর পুত্রে বিশ্বাস অনুশীলন করি, তা হলে আদমের পাপের পরিণতিগুলো থেকে আমরা মুক্ত হতে পারি। (যোহন ৩:১৬; ১ যোহন ৪:১০) এ ছাড়া, ঈশ্বর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে যিশু খ্রিস্ট, যাঁকে স্বর্গে ও পৃথিবীতে সমস্ত কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি শয়তান ও তার সমগ্র দুষ্ট বিধিব্যবস্থাকে ধ্বংস করবেন।—মথি ২৮:১৮; ১ যোহন ৩:৮; প্রকাশিত বাক্য ৬:২; ২০:১০.
৪. (ক) স্বস্তি দেওয়ার বিষয়ে তাঁর প্রতিজ্ঞার ওপর আমাদের আস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য যিহোবা কী জুগিয়েছেন? (খ) স্বস্তি কখন আসবে তা বোঝার জন্য যিহোবা কীভাবে আমাদের সাহায্য করেন?
৪ ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞাগুলোর ওপর আমাদের আস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি যা কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করেন, সেগুলোর সবই যে পরিপূর্ণ হয়, সেই বিষয়ে তিনি অনেক প্রমাণ লিপিবদ্ধ করেছেন। (যিহোশূয়ের পুস্তক ২৩:১৪) মানুষের দৃষ্টিতে একেবারে অসম্ভব বলে মনে হয় এমন পরিস্থিতিগুলো থেকে তাঁর দাসদের উদ্ধার করার জন্য তিনি যা করেছেন, সেই ঘটনার এক নথি তিনি বাইবেলে লিপিবদ্ধ করিয়েছেন। (যাত্রাপুস্তক ১৪:৪-৩১; ২ রাজাবলি ১৮:১৩–১৯:৩৭) আর যিশু খ্রিস্টের মাধ্যমে যিহোবা দেখিয়েছিলেন যে, তাঁর উদ্দেশ্যের মধ্যে লোকেদের “সর্ব্বপ্রকার ব্যাধি” আরোগ্য করা, এমনকি মৃতদের পুনরুত্থিত করাও রয়েছে। (মথি ৯:৩৫; ১১:৩-৬) এই সমস্ত কিছু কখন হবে? উত্তরে, বাইবেল পুরনো বিধিব্যবস্থার শেষ দিনের এক বর্ণনা দেয়, যেটার পরে ঈশ্বরের নতুন আকাশমণ্ডল এবং নতুন পৃথিবী আসবে। আমরা যে-সময়ে বাস করছি, সেটার সঙ্গে যিশুর এই বর্ণনা মিলে যায়।—মথি ২৪:৩-১৪; ২ তীমথিয় ৩:১-৫.
দুর্দশাগ্রস্ত লোকেদের সান্ত্বনা দিন
৫. প্রাচীন ইস্রায়েলকে সান্ত্বনা দেওয়ার সময়, যিহোবা কীসের প্রতি তাদের মনোযোগ পরিচালিত করেছিলেন?
৫ প্রাচীন ইস্রায়েলের সঙ্গে যিহোবা যেভাবে আচরণ করেছেন সেটা থেকে আমরা শিখি যে, দুর্দশার সময়ে তিনি কীভাবে তাদের জন্য সান্ত্বনা নিয়ে এসেছিলেন। তিনি তাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি কীধরনের ঈশ্বর। এটা তাঁর প্রতিজ্ঞাগুলোর ওপর তাদের আস্থাকে শক্তিশালী করেছিল। সত্য এবং জীবন্ত ঈশ্বর হিসেবে তাঁর এবং প্রতিমাগণের মধ্যে, যারা নিজেদের বা তাদের উপাসকদের, কাউকেই সাহায্য করতে পারে না, স্পষ্ট পার্থক্যগুলো করার জন্য যিহোবা তাঁর ভাববাদীদের পরিচালিত করেছিলেন। (যিশাইয় ৪১:১০; ৪৬:১; যিরমিয় ১০:২-১৫) “সান্ত্বনা কর, আমার প্রজাদিগকে সান্ত্বনা কর,” যিশাইয়কে এই কথাগুলো বলার সময় যিহোবা তাঁর ভাববাদীকে একমাত্র সত্য ঈশ্বর হিসেবে যিহোবার মহানতার ওপর জোর দেওয়ার জন্য তাঁর সৃষ্টির কাজগুলোর দৃষ্টান্ত এবং বর্ণনাগুলো ব্যবহার করতে পরিচালিত করেছিলেন।—যিশাইয় ৪০:১-৩১.
৬. উদ্ধার কখন করা হবে, সেই বিষয়ে মাঝে মাঝে যিহোবা কোন ইঙ্গিতগুলো দিয়েছিলেন?
৬ একবার যিহোবা তাঁর লোকেদের কখন উদ্ধার করা হবে, সেই বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় কাছে না দূরে, তা বলার মাধ্যমে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। মিশর থেকে উদ্ধার যতই এগিয়ে আসে, তিনি নিপীড়িত ইস্রায়েলীয়দের বলেছিলেন: “আমি ফরৌণের ও মিসরের উপরে আর এক উৎপাত আনিব, তৎপরে সে তোমাদিগকে এ স্থান হইতে ছাড়িয়া দিবে।” (যাত্রাপুস্তক ১১:১) রাজা যিহোশাফটের সময়ে তিন জাতি মিলে যখন যিহূদা আক্রমণ করে, তখন যিহোবা তাদের বলেছিলেন যে, “কল্য” তিনি তাদের পক্ষে কাজ করবেন। (২ বংশাবলি ২০:১-৪, ১৪-১৭) অন্যদিকে, বাবিল থেকে তাদের উদ্ধারের বিষয়টা প্রায় ২০০ বছর আগে যিশাইয়ের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল এবং উদ্ধারের প্রায় একশ বছর আগে যিরমিয়ের মাধ্যমে আরও বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল। ঈশ্বরের দাসদের জন্য সেই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো কত উৎসাহজনকই না হয়েছিল, যখন মুক্ত হওয়ার সময় এগিয়ে এসেছিল!—যিশাইয় ৪৪:২৬-৪৫:৩; যিরমিয় ২৫:১১-১৪.
৭. উদ্ধারের প্রতিজ্ঞাগুলোর সঙ্গে প্রায়ই কী অন্তর্ভুক্ত ছিল আর ইস্রায়েলের বিশ্বস্ত লোকেদের তা কীভাবে প্রভাবিত করেছিল?
৭ এটা উল্লেখযোগ্য যে, যে-প্রতিজ্ঞাগুলো ঈশ্বরের লোকেদের জন্য সান্ত্বনা নিয়ে এসেছিল, সেগুলোর মধ্যে প্রায়ই মশীহের বিষয়েও তথ্য রয়েছে। (যিশাইয় ৫৩:১-১২) বংশ পরম্পরায়, তা বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের আশা দিয়েছিল যখন তারা অসংখ্য পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিল। লূক ২:২৫ পদে আমরা পড়ি: “দেখ, শিমিয়োন নামে এক ব্যক্তি যিরূশালেমে ছিলেন, তিনি ধার্ম্মিক ও ভক্ত, ইস্রায়েলের সান্ত্বনার [আসলে, মশীহের আসার] অপেক্ষাতে থাকিতেন, এবং পবিত্র আত্মা তাঁহার উপরে ছিলেন।” শিমিয়োন জানতেন যে, মশীহ সংক্রান্ত আশার কথা শাস্ত্রাবলিতে লিপিবদ্ধ আছে আর এর পরিপূর্ণতার প্রত্যাশা তার জীবনে ছাপ ফেলেছিল। তিনি বুঝতে পারেননি যে, তা কীভাবে পরিপূর্ণ হবে এবং সেই ভবিষ্যদ্বাণীকৃত পরিত্রাণ বাস্তবায়িত হতে দেখার জন্য তিনি বেঁচে ছিলেন না কিন্তু যিনি ঈশ্বরের “পরিত্রাণ” বলে প্রমাণিত হবেন, তাঁকে যখন তিনি শনাক্ত করতে পেরেছিলেন, তখন আনন্দিত হয়েছিলেন।—লূক ২:৩০.
খ্রিস্টের মাধ্যমে সান্ত্বনা জোগানো হয়
৮. যিশু যে-সাহায্য দিয়েছিলেন, তা অনেক লোক যে-সাহায্য তাদের প্রয়োজন বলে মনে করত, সেটা থেকে কীভাবে আলাদা ছিল?
৮ যিশু খ্রিস্ট তাঁর পার্থিব পরিচর্যা চালিয়ে যাওয়ার সময়, লোকেরা যে-সাহায্য তাদের প্রয়োজন বলে মনে করত, তা তিনি সবসময় জোগাতেন না। কেউ কেউ এমন একজন মশীহের অপেক্ষায় ছিল, যিনি তাদের রোমীয় ঘৃণ্য জোয়ালি থেকে স্বাধীন করবেন। কিন্তু, যিশু বিপ্লবের পক্ষ সমর্থন করেননি; তিনি তাদের বলেছিলেন, “কৈসরের যাহা যাহা, কৈসরকে দেও।” (মথি ২২:২১) ঈশ্বরের উদ্দেশ্যের মধ্যে লোকেদের কোনো রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার দ্বারা শাসিত হওয়া থেকে স্বাধীন করার চেয়ে আরও বেশি কিছু জড়িত ছিল। লোকেরা যিশুকে রাজা বানাতে চেয়েছিল কিন্তু তিনি বলেছিলেন যে, তিনি “অনেকের পরিবর্ত্তে আপন প্রাণ মুক্তির মূল্যরূপে দিতে” এসেছেন। (মথি ২০:২৮; যোহন ৬:১৫) রাজা হওয়ার জন্য তাঁর সময় তখনও আসেনি এবং তাঁর শাসন করার ক্ষমতা যিহোবার দ্বারা নির্ধারিত হবে, কোনো অস্থির জনতার দ্বারা নয়।
৯. (ক) যিশু কোন সান্ত্বনার বার্তা ঘোষণা করেছিলেন? (খ) লোকেরা ব্যক্তিগতভাবে যে-পরিস্থিতিগুলোর মুখোমুখি হচ্ছিল, সেগুলোর সঙ্গে বার্তা যে-সম্পর্কযুক্ত তা কীভাবে যিশু দেখিয়েছিলেন? (গ) যিশুর পরিচর্যা কীসের জন্য ভিত্তি স্থাপন করেছিল?
৯ যিশু যে-সান্ত্বনা নিয়ে এসেছিলেন, সেটা ‘ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচারে’ বাস্তব রূপ নিয়েছিল। এই বার্তাই যিশু যেখানে গিয়েছিলেন, সেখানেই ঘোষণা করেছিলেন। (লূক ৪:৪৩) মশীহ শাসক হিসেবে মানবজাতির জন্য তিনি কী করবেন, তা দেখানোর মাধ্যমে তিনি লোকেদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোর সঙ্গে সেই বার্তার সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছিলেন। দুঃখভোগী ব্যক্তিদের দৃষ্টি এবং বাক্শক্তি ফিরিয়ে দিয়ে (মথি ১২:২২; মার্ক ১০:৫১, ৫২), শারীরিক দিক দিয়ে অক্ষম ব্যক্তিদের সুস্থ করে (মার্ক ২:৩-১২), জঘন্য রোগ থেকে সহ ইস্রায়েলীয়দের সুস্থ করে (লূক ৫:১২, ১৩) এবং তাদের অন্যান্য গুরুতর অসুস্থতা থেকে মুক্ত করে (মার্ক ৫:২৫-২৯) তিনি তাদের বেঁচে থাকার কারণকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। তিনি দুঃখার্ত পরিবারের সদস্যদের ছেলেমেয়েদের মৃত্যু থেকে উঠিয়ে তাদের জন্য অনেক স্বস্তি এনে দিয়েছিলেন। (লূক ৭:১১-১৫; ৮:৪৯-৫৬) তিনি বিপদজনক ঝড় নিয়ন্ত্রণ এবং বিরাট জনতার খাবারের চাহিদা পূরণ করার ব্যাপারে তাঁর ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন। (মার্ক ৪:৩৭-৪১; ৮:২-৯) এ ছাড়া, যিশু তাদের জীবনযাপনের বিভিন্ন নীতি সম্বন্ধে শিখিয়েছিলেন, যা বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে কার্যকারীভাবে মোকাবিলা করতে তাদের সাহায্য করেছিল এবং সেটা মশীহের অধীনে ধার্মিক শাসনব্যবস্থার আশা দিয়ে তাদের হৃদয় পূর্ণ করেছিল। এভাবে যিশু তাঁর পরিচর্যা চালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি শুধু যারা বিশ্বাস সহকারে শুনেছিল, তাদেরই সান্ত্বনা দেননি কিন্তু সেইসঙ্গে আসন্ন হাজার হাজার বছরের জন্য লোকেদের উৎসাহিত করার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
১০. যিশুর বলিদানের ফলে কী সম্ভবপর হয়েছে?
১০ যিশু তাঁর মনুষ্য জীবনকে বলিদান করার এবং স্বর্গীয় জীবনে পুনরুত্থিত হওয়ার ৬০ বছরেরও বেশি সময় পরে প্রেরিত যোহন লিখতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন: “হে আমার বৎসেরা, তোমাদিগকে এই সকল লিখিতেছি, যেন তোমরা পাপ না কর। আর যদি কেহ পাপ করে, তবে পিতার কাছে আমাদের এক সহায় আছেন, তিনি ধার্ম্মিক যীশু খ্রীষ্ট। আর তিনিই আমাদের পাপার্থক প্রায়শ্চিত্ত, কেবল আমাদের নয়, কিন্তু সমস্ত জগতেরও পাপার্থক।” (১ যোহন ২:১, ২) যিশুর সিদ্ধ মনুষ্য বলিদানের উপকারের জন্য আমরা অনেক সান্ত্বনা পেয়েছি। আমরা জানি যে আমরা পাপের ক্ষমা, এক শুদ্ধ বিবেক, ঈশ্বরের সঙ্গে এক অনুমোদনযোগ্য সম্পর্ক এবং অনন্তজীবনের আশা পেতে পারি।—যোহন ১৪:৬; রোমীয় ৬:২৩; ইব্রীয় ৯:২৪-২৮; ১ পিতর ৩:২১.
সান্ত্বনাকারী হিসেবে পবিত্র আত্মা
১১. যিশু তাঁর মৃত্যুর আগে সান্ত্বনার জন্য আরও কোন ব্যবস্থার বিষয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন?
১১ যিশু তাঁর বলিদানমূলক মৃত্যুর আগের শেষ সন্ধ্যায়, তাঁর প্রেরিতদের সঙ্গে থাকাকালীন আরেকটা ব্যবস্থা সম্বন্ধে বলেছিলেন, যা তাঁর স্বর্গীয় পিতা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য করেছেন। যিশু বলেছিলেন: “আমি পিতার নিকটে নিবেদন করিব, এবং তিনি আর এক সহায় [সান্ত্বনাকারী; গ্রিক, প্যারাক্লিটস] তোমাদিগকে দিবেন, যেন তিনি চিরকাল তোমাদের সঙ্গে থাকেন; তিনি সত্যের আত্মা।” যিশু তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন: “সেই সহায়, পবিত্র আত্মা, . . . সকল বিষয়ে তোমাদিগকে শিক্ষা দিবেন, এবং আমি তোমাদিগকে যাহা যাহা বলিয়াছি, সে সকল স্মরণ করাইয়া দিবেন।” (যোহন ১৪:১৬, ১৭, ২৬) কীভাবে পবিত্র আত্মা সত্যিই তাদের জন্য সান্ত্বনা নিয়ে এসেছিল?
১২. যিশুর শিষ্যদের স্মরণশক্তির এক সাহায্যকারী হিসেবে পবিত্র আত্মার ভূমিকা কীভাবে অনেকের জন্য সান্ত্বনা নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে?
১২ প্রেরিতরা যিশুর কাছ থেকে অনেক শিক্ষা পেয়েছিল। এটা নিশ্চিত যে তারা কখনও এই অভিজ্ঞতা ভুলে যাবে না কিন্তু তিনি যা কিছু বলেছিলেন, সেগুলো আসলেই কি তারা মনে রাখতে পেরেছিল? তাদের অসিদ্ধ স্মরণশক্তির জন্য তারা কি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো ভুলে গিয়েছিল? যিশু তাদের নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে, ‘তিনি তাহাদিগকে যাহা যাহা বলিয়াছিলেন,’ পবিত্র আত্মা তাদের ‘সে সকল স্মরণ করাইয়া দিবেন।’ এভাবে যিশুর মৃত্যুর প্রায় আট বছর পরে মথি প্রথম সুসমাচার লিখতে পেরেছিলেন, যেখানে তিনি পর্বতে দেওয়া যিশুর হৃদয়গ্রাহী উপদেশ, রাজ্যের বিষয়ে তাঁর অসংখ্য দৃষ্টান্ত এবং তাঁর উপস্থিতির চিহ্ন সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ৫০ বছরেরও বেশি সময় পরে, প্রেরিত যোহন যিশুর পার্থিব জীবনের শেষ দিনগুলো সম্বন্ধে এক নির্ভরযোগ্য বিবরণ বিস্তারিতভাবে লিখতে পেরেছিলেন। এই অনুপ্রাণিত বিবরণগুলো আমাদের দিন পর্যন্ত কত উৎসাহজনক হয়েছে!
১৩. কীভাবে পবিত্র আত্মা প্রাথমিক খ্রিস্টানদের কাছে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছিল?
১৩ শুধুমাত্র কথাগুলো তাদের মনে করিয়ে দেওয়া ছাড়াও, পবিত্র আত্মা ঈশ্বরের উদ্দেশ্য পুরোপুরিভাবে বোঝার জন্য শিষ্যদের শিক্ষা এবং নির্দেশনা দিয়েছিল। যিশু যখন তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে ছিলেন, তখন তিনি এমন কিছু বিষয় বলেছিলেন, যা তারা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেনি। কিন্তু, পরে পবিত্র আত্মার দ্বারা পরিচালিত হয়ে যোহন, পিতর, যাকোব, যিহূদা, এবং পৌল ঈশ্বরের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আরও অন্যান্য বিষয় ব্যাখ্যা দিয়ে লিখেছিলেন। এভাবে পবিত্র আত্মা একজন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছিল, ঐশিক নির্দেশনার মূল্যবান আশ্বাস দিয়েছিল।
১৪. কোন কোন উপায়ে পবিত্র আত্মা যিহোবার লোকেদের সাহায্য করেছিল?
১৪ এ ছাড়া, পবিত্র আত্মার অলৌকিক দানগুলো এটা স্পষ্ট করতে সাহায্য করেছিল যে, ঈশ্বর মাংসিক ইস্রায়েলদের কাছ থেকে তাঁর অনুগ্রহ খ্রিস্টীয় মণ্ডলীর প্রতি স্থানান্তরিত করেছেন। (ইব্রীয় ২:৪) বিভিন্ন ব্যক্তির জীবনে সেই আত্মার ফলগুলো তাদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যারা সত্যিই যিশুর শিষ্য। (যোহন ১৩:৩৫; গালাতীয় ৫:২২-২৪) এ ছাড়া, পবিত্র আত্মা সেই মণ্ডলীর সদস্যদের সাহসী এবং নির্ভীক সাক্ষি হতে শক্তি জুগিয়েছিল।—প্রেরিত ৪:৩১.
প্রচণ্ড চাপের মুখে সাহায্য করা হয়
১৫. (ক) অতীতের এবং বর্তমান সময়ের খ্রিস্টানরা কোন কোন চাপের মুখোমুখি হয়েছে? (খ) যারা উৎসাহ দেয়, তাদেরও কেন মাঝে মাঝে তা পাওয়ার দরকার হতে পারে?
১৫ যারা যিহোবার প্রতি উৎসর্গীকৃত এবং তাঁর প্রতি অনুগত, তারা সকলেই কোন না কোন তাড়না ভোগ করে। (২ তীমথিয় ৩:১২) কিন্তু, অনেক খ্রিস্টান প্রচণ্ড কষ্টকর চাপ ভোগ করেছে। আধুনিক দিনে, কেউ কেউ জনতার দ্বারা হয়রানি হয়েছে এবং অমানুষিক অবস্থায় কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, কারাগার ও শ্রমশিবিরগুলোতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সরকারগুলো অনেক নিষ্ঠুর তাড়নাকারীতে পরিণত হয়েছে বা তারা অবৈধ দলগুলোকে কোন শাস্তি না দিয়েই হিংস্র কাজগুলো করতে অনুমতি দিয়েছে। এ ছাড়া, খ্রিস্টানরা বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা পারিবারিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এ ছাড়া, একজন পরিপক্ব খ্রিস্টানও হয়তো চাপের মুখোমুখি হয়েছেন, যিনি অনেক সহ বিশ্বাসীকে কঠিন পরিস্থিতিগুলোর সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করেছেন। এইধরনের পরিস্থিতিতে যিনি উৎসাহ দেন, তারও হয়তো তা পাওয়ার দরকার হতে পারে।
১৬. দায়ূদ যখন প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিলেন, তখন তিনি কীভাবে সাহায্য পেয়েছিলেন?
১৬ রাজা শৌল যখন দায়ূদকে হত্যা করার চেষ্টা করছিলেন, তখন দায়ূদ তার সাহায্যকারী হিসেবে ঈশ্বরের নিকটবর্তী হয়েছিলেন: “হে ঈশ্বর, আমার প্রার্থনা শুন,” তিনি বিনতি করেছিলেন। “তোমার পক্ষের ছায়ায় আমি শরণ লইব।” (গীতসংহিতা ৫৪:২, ৪; ৫৭:১) দায়ূদ কি সাহায্য পেয়েছিলেন? হ্যাঁ, তিনি পেয়েছিলেন। সেই সময় দায়ূদকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য যিহোবা ভাববাদী গাদ ও যাজক অবিয়াথরকে এবং সেই যুবক ব্যক্তিকে শক্তিশালী করার জন্য শৌলের ছেলে যোনাথনকে ব্যবহার করেছিলেন। (১ শমূয়েল ২২:১, ৫; ২৩:৯-১৩, ১৬-১৮) এ ছাড়া, যিহোবা দেশের ওপর পলেষ্টীয়দের আকস্মিক আক্রমণ করার অনুমতি দিয়েছিলেন আর এভাবে শৌলকে তার কাজ থেকে নিবারিত করেছিলেন।—১ শমূয়েল ২৩:২৭, ২৮.
১৭. প্রচণ্ড চাপের মুখে, যিশু সাহায্যের জন্য কোথায় গিয়েছিলেন?
১৭ যিশু খ্রিস্টের পার্থিব জীবনের শেষ যখন ঘনিয়ে আসতে থাকে, তখন তিনি নিজেও প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিলেন। তিনি খুব ভাল করে জানতেন যে, কীভাবে তাঁর আচরণ তাঁর স্বর্গীয় পিতার নামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে আর তা সমস্ত মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য কী অর্থ বহন করতে পারে। তিনি আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করেছিলেন, এমনকি ‘মর্ম্মভেদী দুঃখে মগ্ন হইয়াছিলেন।’ ঈশ্বর লক্ষ রেখেছিলেন, যাতে যিশু সেই কঠিন সময়ে তাঁর প্রয়োজনীয় সাহায্য পান।—লূক ২২:৪১-৪৪.
১৮. যে সমস্ত প্রাথমিক খ্রিস্টানরা প্রচণ্ড তাড়িত হয়েছিল, তাদেরকে ঈশ্বর কোন সান্ত্বনা দিয়েছিলেন?
১৮ প্রথম শতাব্দীতে মণ্ডলী স্থাপিত হওয়ার পর খ্রিস্টানদের ওপর তাড়না এতটাই প্রচণ্ড হয়েছিল যে, প্রেরিতরা ছাড়া সকলে যিরূশালেমে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল। নারী-পুরুষ সকলকে তাদের বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ঈশ্বর তাদের কোন সান্ত্বনা দিয়েছিলেন? তাঁর বাক্য থেকে এই আশ্বাস যে, তাদের “আরও উত্তম . . . সম্পত্তি আছে, আর তাহা নিত্যস্থায়ী,” যা হল স্বর্গে খ্রিস্টের সঙ্গে এক নিশ্চিত উত্তরাধিকার। (ইব্রীয় ১০:৩৪; ইফিষীয় ১:১৮-২০) তারা যখন প্রচার চালিয়ে গিয়েছিল, তখন তারা প্রমাণ পেয়েছিল যে ঈশ্বরের আত্মা তাদের সঙ্গে আছে এবং তাদের অভিজ্ঞতাগুলো তাদের আনন্দ করার আরও কারণ জুগিয়েছিল।—মথি ৫:১১, ১২; প্রেরিত ৮:১-৪০.
১৯. প্রচণ্ড তাড়না ভোগ করা সত্ত্বেও, ঈশ্বরের দেওয়া সান্ত্বনার বিষয়ে পৌল কেমন মনে করেছিলেন?
১৯ পরে শৌল (পৌল), যিনি নিজে একজন প্রচণ্ড তাড়নাকারী ছিলেন, তিনি একজন খ্রিস্টান হয়েছিলেন বলে তাড়নার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। কুপ্র দ্বীপে একজন মায়াবী ছিলেন, যিনি ছলনা এবং বিপরীত কিছু ব্যবহারের মাধ্যমে পৌলের পরিচর্যায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। গালাতিয়াতে পৌলকে পাথর মারা হয়েছিল এবং মৃত মনে করে ফেলে যাওয়া হয়েছিল। (প্রেরিত ১৩:৮-১০; ১৪:১৯) মাকিদনিয়াতে তাকে বেত্রাঘাত করা হয়েছিল। (প্রেরিত ১৬:২২, ২৩) ইফিষে জনতার উচ্ছৃঙ্খলতার পরে তিনি লিখেছিলেন: “আত্যন্তিক দুঃখভারে আমরা শক্তির অতিরিক্তরূপে ভারগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম; এমন কি, জীবনের আশাও ছাড়িয়া দিয়াছিলাম; বরং আমরা আপনাদের অন্তরে এই উত্তর পাইয়াছিলাম যে, মৃত্যু আসিতেছে।” (২ করিন্থীয় ১:৮, ৯) কিন্তু, সেই একই চিঠিতে পৌল এই প্রবন্ধের ২ অনুচ্ছেদে বলা সান্ত্বনাজনক কথাগুলো লিখেছিলেন।—২ করিন্থীয় ১:৩, ৪.
২০. পরের প্রবন্ধে আমরা কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করব?
২০ আপনি কীভাবে এইধরনের সান্ত্বনা দেওয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেন? আমাদের দিনেও এমন অনেকের তা প্রয়োজন, যারা কোনো বিপর্যয়ের কারণে বহু লোক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অথবা ক্লেশের কারণে শুধু নিজেরা কষ্ট পাওয়ায় দুঃখ পায়। পরের প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব যে, উভয় ক্ষেত্রেই কীভাবে সান্ত্বনা দেওয়া যায়।
আপনি কি মনে করতে পারেন?
• ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া সান্ত্বনার কেন অনেক মূল্য রয়েছে?
• খ্রিস্টের মাধ্যমে কোন সান্ত্বনা জোগানো হয়েছিল?
• পবিত্র আত্মা কীভাবে এক সান্ত্বনাকারী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে?
• ঈশ্বরের দাসেরা যখন প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিল, তখন তাঁর জোগানো সান্ত্বনার উদাহরণগুলো দিন।
[১৫ পৃষ্ঠার চিত্রগুলো]
বাইবেল আমাদের দেখায় যে, যিহোবা তাঁর লোকেদের উদ্ধার করার মাধ্যমে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন
[১৬ পৃষ্ঠার চিত্রগুলো]
শিক্ষা দেওয়ার, আরোগ্য করার এবং মৃতদের পুনরুত্থিত করার মাধ্যমে যিশু সান্ত্বনা জুগিয়েছিলেন
[১৮ পৃষ্ঠার চিত্র]
যিশু ঊর্ধ্ব থেকে সাহায্য পেয়েছিলেন