প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপে গিয়ে সেবা করা!
অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন ও সিডনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪৬ জন লোক খুবই উত্তেজিত ছিলেন। কারণ তারা প্রশান্ত মহাসাগরের এক সুন্দর দ্বীপ সামোয়ায় যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন যেখানে তারা নিউ জীল্যান্ড, হাওয়াই এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা আরও ৩৯ জনকে পাবেন। আর অবাক হওয়ার মতো বিষয় হল যে তারা সঙ্গে করে হাতুড়ি, করাত এবং ড্রিলের মতো যন্ত্রপাতি নিয়ে যাচ্ছিলেন। সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপে কেউ এই রকমের জিনিসপাতি সঙ্গে নিয়ে যায় না। কিন্তু তারা কেন যাচ্ছিলেন? কিছু বিশেষ কারণে।
আসলে যিহোবার সাক্ষিদের অস্ট্রেলিয়া শাখার রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ার অফিস এই লোকেদের দুসপ্তার জন্য সেখানে এক নির্মাণ কাজের জন্য পাঠিয়েছিল। তারা নিজেদের পয়সা খরচ করেই সেখানে গিয়েছিলেন। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপে যিহোবার সাক্ষিরা দিন দিন বেড়ে ওঠায় এখানে কিংডম হল, এসেম্বলি হল, মিশনারি গৃহ, শাখা ও অনুবাদ কেন্দ্র বানানো দরকার হয়ে পড়ে। এই সব কাজের খরচ লোকেদের স্বেচ্ছায় দেওয়া দানের দ্বারা করা হচ্ছে। আসুন আমরা এখন এখানে কাজ করছেন এমন কয়েকজন ভাইবোনের সঙ্গে কথা বলে দেখি যারা তাদের দেশেও কিংডম হল বানানোর দলের সঙ্গে কাজ করেছেন।
ম্যাক্স অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের কাওরা শহর থেকে এসেছেন। তিনি ছাত বানান। তিনি বিবাহিত ও তার পাঁচটা ছেলেমেয়ে আছে। আরনল্ড হাওয়াই থেকে আসেন। তার দুটো ছেলে আছে। তিনি একজন অগ্রগামী বা পূর্ণ-সময়ের প্রচারক। ম্যাক্স ও আরনল্ড এই দুজনই তাদের মণ্ডলীর প্রাচীন। এই ভাইয়েরা ও যারা এখানে এসেছেন তাদের হাতে যে অনেক সময় ছিল বলে তারা এখানে এসেছেন তা নয়। তারা সবাই খুব ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু তারা ও তাদের পরিবারের লোকেরা প্রয়োজনের কথা বোঝেন আর সাধ্যমতো যতটুকু সাহায্য তারা করতে পারেন তা করেন।
নানা দেশের স্বেচ্ছাসেবকেরা জরুরি প্রয়োজন মেটান
প্রশান্ত মহাসাগরের টুভালু দ্বীপে এইরকম প্রয়োজন ছিল। এই দ্বীপ সামোয়ার উত্তরপশ্চিমে ইকুয়াটরের কাছে রয়েছে আর এখানে ১০,৫০০ জন লোক বাস করে। এখানকার দ্বীপগুলোর প্রত্যেকটার আয়তন প্রায় ২.৫ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৯৪ সালের মধ্যে টুভালুতে সাক্ষিদের সংখ্যা ৬১-তে দাঁড়ায় আর এতে সেখানে নতুন কিংডম হল ও একটা বড় ট্রান্সলেশন অফিসের খুবই দরকার হয়ে পড়ে।
টুভালু খুবই গরম দ্বীপ। এই এলাকাটাতে সবসময়ই প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হয়, তাই এখানকার ঘর-বাড়ি খুব মজবুত করে বানানো দরকার। কিন্তু মজবুত ঘর-বাড়ি বানানোর জন্য এখানে ভাল মানের জিনিসপাতি পাওয়া যায় না। তাহলে কিংডম হল বানানোর জন্য কী করা হয়েছিল? ছাত ও আসবাবপত্র বানানোর জন্য সমস্ত কিছু এমনকি স্ক্রু ও পেরেক পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া থেকে জাহাজে করে নিয়ে আসা হয়েছিল।
জিনিসপত্র পৌঁছানোর আগেই, একটা ছোট দল সেখানে জায়গা ঠিক করে হলের ভীত খোঁড়ে। এরপর নানা দেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবকের দল সেখানে পৌঁছায় ও হল বানানোর কাজ শুরু করে।
কিন্তু টুভালুতে এই কাজ দেখে সেখানকার পাদ্রি খুব চটে যান আর তিনি রেডিও-তে ঘোষণা করেন যে সাক্ষিরা “বাবিলের উচ্চ দুর্গ” বানাচ্ছে! কিন্তু সত্যিই কী কোন দুর্গ বানানো হচ্ছিল? একজন স্বেচ্ছাসেবক গ্রামী বলেন, “যখন লোকেরা বাবিলের দুর্গ বানাচ্ছিল তখন ঈশ্বর তাদের ভাষা ভেদ করেছিলেন। ফলে তারা একে অন্যের ভাষা বুঝতে না পেরে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল আর তাই দুর্গ বানানোর কাজ শেষ হয়নি।” (আদিপুস্তক ১১:১-৯) “কিন্তু যিহোবার কাজ এর থেকে একেবারে আলাদা। তাঁর কাজ নানা ভাষার ও জাতির লোকেরা করলেও তা সবসময়ই সম্পূর্ণ হবে।” তাই টুভালুর কিংডম হল বানানোর কাজও শেষ হয়েছিল আর মাত্র দুসপ্তায়। হলের উৎসর্গীকরণের দিন ১৬৩ জন এসেছিলেন যাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীও ছিলেন।
ভাই ডগ, যিনি কাজের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন, তিনি বলেন: “আলাদা আলাদা দেশের ভাইদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করা খুবই আনন্দের ছিল। আমাদের প্রত্যেকের কাজ করার ধরন আলাদা, আমাদের প্রত্যেকের ভাষা এমনকি মাপজোপ করার ধরনও আলাদা ছিল। কিন্তু তবুও এগুলোর কোনটাই আমাদের কাজে বাধা দিতে পারেনি। আমরা আমাদের কাজ শেষ করেছি।” ভাই ডগ ইতিমধ্যেই বেশ কিছু নির্মাণ কাজ করেছেন, তাই তিনি বলেন: “আমি বুঝেছি যে যিহোবার হাত যদি আমাদের সঙ্গে থাকে, তাহলে পৃথিবীর যে কোন জায়গাতেই আমরা ঘর তৈরি করতে পারি। সেখানে পৌঁছানো যত কঠিনই হোক না কেন যিহোবা তাঁর কাজ শেষ করেন। এ কথা ঠিক যে আমাদের ভাইবোনেরা অনেকেই দক্ষ কারীগর কিন্তু যিহোবার পবিত্র আত্মাই সমস্ত কাজ করে।”
এছাড়া ঈশ্বরের পবিত্র আত্মা দ্বীপের সাক্ষি পরিবারগুলোর ওপরও ছিল আর সেইজন্য তারা এই স্বেচ্ছাসেবক ভাইদের খাওয়া-দাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। এটা সত্যিই তাদের জন্য একটা বড় ত্যাগ। আর স্বেচ্ছাসেবক ভাইয়েরাও এর জন্য খুবই কৃতজ্ঞ ছিলেন। কেন্ যিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলব্রোন শহর থেকে এসেছেন তিনি এর আগে ফ্রেন্চ পলিনেসিয়ায় এরকম একটা নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করেছেন। তিনি বলেন: “আমরা এখানে দাস হয়ে এসেছিলাম কিন্তু আমরা রাজার মতো ব্যবহার পেয়েছি।” এছাড়া কোন কোন জায়গায় দ্বীপের সাক্ষি ভাইবোনেরা আমাদের কাজে সাহায্য করেছেন। যেমন সলোমন দ্বীপে বোনেরা হাতে করে চুন, বালি, সুরকি মিশিয়েছেন। একশ জন বোন ও ভাইরা মিলে বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ে চড়ে সেখান থেকে ৪০ টনেরও বেশি ভারি কাঠ বয়ে নিয়ে এসেছেন। বাচ্চারাও পিছিয়ে থাকেনি। নিউ জীল্যান্ড থেকে আসা একজন ভাই বলেন: “আমি দ্বীপের সেই ছোট্ট ছেলের কথা কখনও ভুলব না যে একসাথে দুতিনটে সিমেন্টের বস্তা বয়ে নিয়ে যেত। আর প্রচণ্ড রোদ ও বৃষ্টিতে সারাদিন ধরে বেলচা দিয়ে নুড়ি-পাথর সরাতো।”
দ্বীপের ভাইয়েরা যখন এই কাজে সাহায্য করে তখন তাতে আরেক লাভ হয়। যেমন ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির সামোয়া শাখা অফিস জানায়: “দ্বীপের ভাইয়েরা কিংডম হল তৈরির কাজে এতই দক্ষ হয়ে উঠেছেন যে এখন কোন নতুন কিংডম হল বানাতে হোক বা ঝড়ে নষ্ট হওয়া বিল্ডিং মেরামত করতে হোক, এই ভাইরা নিজেরাই তা করতে পারবেন। এছাড়া এই এলাকায় যেখানে রুজি-রোজগার জোটানো খুবই মুশকিল, সেখানে ভাইয়েরা তাদের এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে রোজগার করতে পারেন।”
তাদের কাজ ভাল সাক্ষ্য দেয়
হনিয়ারায় যখন সলোমন দ্বীপের এসেম্বলি হল তৈরির কাজ চলছিল তখন আরুলিগো গ্রামের ভাই কলিন সেখানে এসেছিলেন। তিনি সেখানকার এই কাজ দেখে এতখানিই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে সেখানকার শাখা অফিসে তিনি লেখেন: “তাদের মধ্যে এমন একতা ছিল যে মনে হচ্ছিল তারা সকলে যেন একই পরিবারের লোক। আমি তাদের মধ্যে কখনও ঝগড়াঝাটি বা মনোমালিন্য হতে দেখিনি।” এর কিছুদিন পর, তিনি ৪০ কিলোমিটার দূরে, তার নিজের গ্রামে ফিরে যান আর তিনি ও তার পরিবার মিলে তাদের নিজস্ব কিংডম হল বানান। এরপর তারা আবার সোসাইটির অফিসকে লেখেন: “আমাদের কিংডম হল ও স্টেজ তৈরি, আমরা কি এখানে সভা শুরু করতে পারি?” উত্তর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সভা শুরুর সমস্ত ব্যবস্থা করা হয় আর সেখানে নিয়মিতভাবে ৬০ জনের বেশি সভায় আসতে থাকেন।
ইউরোপের এক ইউনিয়ন উপদেষ্টা টুভালুতে এই কাজ দেখে একজন ভাইকে বলেন: “আমার মনে হয় যে সকলেই আপনাদের খুব প্রশংসা করবে আর আমার তো মনে হয় যে এ যেন এক অলৌকিক ঘটনা!” একজন মহিলা যিনি টেলিফোন এক্সচেঞ্জে কাজ করেন তিনি আমাদের এক বোনকে জিজ্ঞেস করেন: “আপনারা কী করে এত খুশিতে থাকেন? এখানে এত গরম!” তারা এর আগে কখনও কাউকে এইভাবে ত্যাগস্বীকার করে কাজ করতে দেখেননি।
ত্যাগস্বীকার করে তারা পস্তাননি
বাইবেলের ২ করিন্থীয় ৯:৬ পদ বলে: “যে ব্যক্তি আশীর্ব্বাদের সহিত বীজ বুনে, সে আশীর্ব্বাদের সহিত শস্যও কাটিবে।” প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপে সাক্ষি ভাইবোনদের সাহায্য করে এই কর্মী ভাইয়েরা, তাদের পরিবার এবং তাদের মণ্ডলীগুলো প্রচুরভাবে বীজ বুনে চলেছেন। সিডনির কাছাকাছি কিনকুমবার মণ্ডলীর প্রাচীন রোস বলেন: ‘আমার মণ্ডলীর ভাইবোনেরা আমাকে তিনভাগের এক ভাগ প্লেনের ভাড়া দিয়েছিলেন আর আমার শালা যিনি আমার সঙ্গে এসেছিলেন তিনি আরও ৫০০ ডলার দিয়েছিলেন।” আরেকজন ভাই তার গাড়ি বিক্রি করে তার আসাযাওয়ার খরচ জোগাড় করেন। আরেকজন ভাই তার জমি বিক্রি করেন। কেভিনের আরও ৯০০ ডলারের দরকার ছিল, তাই তিনি তার দুবছর বয়সের ১৬টা পায়রা বিক্রি করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। তার চেনাজানা একজনকে তিনি পান যার কাছে তিনি ঠিক ৯০০ ডলারে পায়রাগুলোকে বিক্রি করেন!
ড্যানি ও চার্লিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে: “আপনারা বিমানের ভাড়া আর মজুরি নেননি। অর্থাৎ আপনারা ৬০০০ ডলার খরচ করেছেন। কিন্তু এতখানি খরচ করা কি ঠিক? উত্তরে তারা বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই। আর আমাদের যদি এর দ্বিগুণও খরচ করতে হতো, তবুও আমাদের কোন আপশোস থাকত না। আ্যলেন যিনি নিউ জীল্যান্ডের নেলসন শহর থেকে এসেছিলেন তিনি বলেন: “টুভালুতে আসার জন্য আমি যত পয়সা খরচ করেছি, সেই পয়সায় আমি ইউরোপ যেতে পারতাম আর আমার কিছু পয়সা বেঁচেও যেত। কিন্তু ইউরোপ গেলে আমি কি এত আশীর্বাদ পেতাম কিংবা নানা জায়গা ও ভাষার এত বন্ধু পেতাম অথবা অন্যের জন্য কিছু করতে পারতাম যা আমি টুভালুতে এসে করেছি? না! কখনই নয়। আমি দ্বীপের এই ভাইবোনদেরকে যা দিয়েছি তার থেকে তারা আমাকে অনেক বেশি দিয়েছেন।”
এই কাজে সফল হওয়ার পিছনে পরিবারেরও অনেক বড় হাত আছে। কিছু স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের পাশে থেকে কাজে সাহায্য করেছেন কিন্তু কিছু স্ত্রীরা আবার তা করে উঠতে পারেননি কারণ তাদের বাচ্চারা স্কুলে যায় বা তাদের এমন কাজ করতে হয় যা ছেড়ে আসা মুশকিল। ক্লে বলেন, ‘আমি যখন ছিলাম না আমার স্ত্রী একা একাই খুশি মনে ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করেছে ও ঘরদোরের সব কাজ সামলেছে। আমার স্ত্রী যতখানি করেছে আমার ত্যাগস্বীকার তার কাছে কিছুই না।’ সত্যিই যে স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারেননি, তারা সবাই ভাই ক্লের কথায় অন্তর থেকে “আমেন” বলবেন।
টুভালুতে হল তৈরির কাজ শেষ করার পর, ভাইরা ফিজি, টোঙ্গা, পাপুয়া নিউ গিনি, নিউ কলিডনিয়া এবং অন্যান্য জায়গায় কিংডম হল, মিশনারি হোম এবং ট্রান্সলেশন অফিস বানানোর কাজ করেছেন। এখন দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কিছু জায়গায় কিংডম হল বানানোর কথা ভাবা হচ্ছে। এগুলোর জন্য কি অনেক কর্মী পাওয়া যাবে?
অবশ্যই পাওয়া যাবে। হাওয়াইয়ের শাখা অফিস থেকে বলা হয়: ‘যে ভাইরা নির্মাণ কাজ করেছিলেন তারা সকলে বলেছিলেন যে পরে যখন এরকম কোন কাজ হাতে নেওয়া হবে তখন যেন তাদেরকে মনে করা হয়। আর তাই তারা দেশে ফিরে গিয়ে এর জন্য পয়সা জমাতে শুরু করেন।’ ভাইরা যখন এইরকম ত্যাগস্বীকার করার জন্য তৈরি থাকেন আর তার সঙ্গে যখন যিহোবার আশীর্বাদ থাকে তখন কোন কাজ কি সফল না হয়ে থাকতে পারে? কখনই নয়!
[৯ পৃষ্ঠার চিত্র]
হল তৈরির নানা জিনিসপাতি
[৯ পৃষ্ঠার চিত্রগুলো]
কাজের জায়গায় কর্মীরা
[১০ পৃষ্ঠার চিত্রগুলো]
যখন হল তৈরির কাজ শেষ হয়েছিল আমরা খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম কারণ যিহোবার পবিত্র আত্মার সাহায্যে তা হয়েছিল