আমার কাছে যিহোবা হলেন একজন প্রেমময় ও দয়াময় ঈশ্বর
জন আনড্রোনিকোস দ্বারা কথিত
সেই ১৯৫৬ সালের কথা। আমার বিয়ের মাত্র নয় দিনের মাথায়, আমাকে উত্তর গ্রিসের কোমোতিনির আপিল কোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল। আমি আশা করেছিলাম যে ঈশ্বরের রাজ্য প্রচার করার জন্য আমায় যে বারো মাসের জেল দেওয়া হয়েছিল তা তুলে নেওয়া হবে। কিন্তু আপিল কোর্ট আমাকে ছয় মাসের জেল দিয়েছিল আর তা আমার সব আশাকে চুরমার করে আরও বড় বড় পরীক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিল। কিন্তু, এই সমস্তকিছুর মধ্যে দিয়ে, আমি দেখেছি যে আমার কাছে যিহোবা একজন প্রেমময় ও দয়াময় ঈশ্বর হয়েছেন।
উনিশশো একত্রিশ সালের ১লা অক্টোবর যখন আমার জন্ম হয় তখন আমরা ম্যাসিডোনিয়ার নেপোলিসের কাভাল্লা শহরে থাকতাম যেখানে প্রেরিত পৌল তার দ্বিতীয় মিশনারি যাত্রার সময়ে এসেছিলেন। আমার পাঁচ বছর বয়সে, আমার মা একজন যিহোবার সাক্ষি হন। মা যদিও বেশি লেখাপড়া জানতেন না, তবুও তিনি আমার মধ্যে ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও ভয় গড়ে তোলার জন্য তার সাধ্য মতো চেষ্টা করেছিলেন। আমার বাবা ছিলেন খুবই রক্ষণশীল ব্যক্তি যিনি গ্রিক অর্থোডক্স রীতি রেওয়াজের মধ্যে ভীষণভাবে ডুবে ছিলেন। বাইবেলের সত্যকে তিনি একটুও পছন্দ করতেন না আর তাই তিনি মাকে বাধা তো দিতেনই আর মারধোরও করতেন।
এইজন্য আমি এমন এক বিচ্ছিন্ন পরিবারে বড় হয়ে উঠি যেখানে বাবা আমার মাকে মারধোর ও গালাগালি করতেন এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের ফেলে চলে গিয়েছিলেন। আমার ছেলেবেলা থেকেই মা আমায় ও আমার ছোট বোনকে নিয়ে খ্রীষ্টীয় সভাগুলোতে যেতেন। কিন্তু আমি যখন পনেরো বছরে পা দিই তখন তরুণ বয়সের চঞ্চলতা ও স্বাধীনচেতা মনোভাবই আমাকে যিহোবার সাক্ষিদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু আমার বিশ্বাসী মা আমার জন্য অনেক চোখের জল ফেলেছিলেন আর আমাকে শুধরানোর জন্য অক্লান্ত চেষ্টা করেছিলেন।
অভাব ও নোংরা জীবনযাপনের কারণে, আমি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ি আর তাই তিন মাসেরও বেশি সময় আমাকে বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। আর তখন একজন নম্র ভাই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, তিনিই আমার মাকে সত্য শিখতে সাহায্য করেছিলেন আর আমার মধ্যেও ঈশ্বরের জন্য আন্তরিক প্রেম গড়ে তুলেছিলেন। আমায় দেখে তার এমন মনে হয়েছিল যে আমাকে যদি সাহায্য করা যায়, তাহলে আমি আধ্যাত্মিকভাবে সুস্থ হতে পারব। অন্যেরা তাকে বলেছিলেন: “আপনি জনকে সাহায্য করার চেষ্টায় শুধু শুধু আপনার সময় নষ্ট করছেন; আধ্যাত্মিক ব্যাপারে সে আর কখনোই গরজ দেখাবে না।” কিন্তু আমাকে সাহায্য করার ব্যাপারে এই ভাইয়ের ধৈর্য আর দৃঢ়তা ফল দিয়েছিল। তাই তো ১৯৫২ সালের ১৫ই আগস্ট, ২১ বছর বয়সে আমি জলে বাপ্তিস্ম নিয়ে যিহোবার প্রতি আমার উৎসর্গকে সকলের সামনে প্রকাশ করেছিলাম।
নববিবাহিত অথচ জেলখানায়
তিন বছর পর, সর্ব গুণে গুণান্বিতা, আধ্যাত্মিক-মনা বোন মার্থার সঙ্গে আমার আলাপ হয় আর এরপর আমরা বেশ তড়িঘড়ি আমাদের মধ্যে বাগ্দানের পর্বটা সেরে নিই। একদিন আমি সত্যিই খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যখন মার্থা আমায় বলেছিল: “আজ আমি ঘরে ঘরে প্রচার করব বলে ঠিক করেছি। তুমি কি আমার সঙ্গে আসবে?” এর আগে পর্যন্ত আমি কখনও এমনভাবে ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার কাজ করিনি তবে বেশির ভাগ সময় এখানে ওখানে সুযোগ পেলে প্রচার করতাম। এছাড়াও সেই সময় গ্রিসে প্রচার কাজ নিষিদ্ধ ছিল আর তাই আমাদেরকে গোপনে প্রচার চালিয়ে যেতে হতো। এই কারণেই তখন অসংখ্য লোককে গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল, মামলা-মকদ্দমা চলছিল আর জেলে দেওয়া হচ্ছিল। তবুও, আমি আমার ভাবী-বধুকে না করতে পারিনি!
১৯৫৬ সালে আমি মার্থাকে বিয়ে করি। এই সময়েই আমাদের বিয়ের ঠিক নয় দিনের মাথায়, কোমোতিনির আপিল কোর্ট আমাকে ছয় মাসের জেল দিয়েছিল। এইসময়ই সেই প্রশ্নটা আমার মনে পড়েছিল, যেটা আমি আমার মায়ের এক বান্ধবী অর্থাৎ একজন খ্রীষ্টান বোনের কাছে বেশ কিছুদিন আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম: “আমি কীভাবে সম্পূর্ণভাবে দেখাতে পারি যে আমি যিহোবার একজন সত্য সাক্ষি? আমি তো কখনোই আমার বিশ্বাসকে প্রমাণ করার সুযোগ পাইনি।” এরপর সেই বোন যখন আমাকে জেলখানায় দেখতে এসেছিলেন, তখন তিনি আমায় সেই প্রশ্নটার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন: “যিহোবাকে তুমি কতটা ভালবাস তা এখনই তুমি দেখাতে পার। আর এটাই হল তোমার কাজ।”
আমি যখন জানতে পারি যে আমার উকিল পয়সা দিয়ে আমাকে জামিনে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে তখন আমি তাকে বলেছিলাম যে আমার শাস্তির শেষ দিনটা পর্যন্ত আমি জেলখানায় থাকতে চাই। ছয় মাস কারাদণ্ডের পর আমার দুজন জেলের সঙ্গীকে সত্যকে নিজের করে নিতে দেখে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম! এর পরের কয়েক বছরের মধ্যে, সুসমাচারের জন্য আমাকে অনেক মামলা-মকদ্দমায় জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল।
আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর জন্য আমরা কখনও আফশোস করিনি
১৯৫৯ সালে, আমার ছাড়া পাওয়ার কয়েক বছর পর আমি যখন মণ্ডলীর দাস অথবা পরিচালক অধ্যক্ষ হিসেবে সেবা করছিলাম, তখন কিংডম মিনিস্ট্রি স্কুলে যোগ দেওয়ার জন্য আমায় ডাকা হয়। এই স্কুলে মণ্ডলীর প্রাচীনদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু, ঠিক ওই একই সময়ে আমি একটা হাসপাতালে একটা স্থায়ী চাকরির প্রস্তাব পাই যেটা আমাকে ও আমার পরিবারকে জীবনভর আর্থিক নিরাপত্তা এনে দিতে পারবে। আমি কোন্টা বেছে নেব? তাছাড়া ইতিমধ্যেই আমি ওই হাসপাতালে তিন মাস ধরে সাময়িকভাবে কাজ করছিলাম আর ওখানকার ডিরেক্টর আমার কাজে খুব সন্তুষ্টও ছিলেন কিন্তু প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য স্কুল থেকে যখন আমার ডাক আসে তখন ছুটি চাওয়াতে তিনি নাকচ করে দেন, এমনকি বেতন কেটে রাখতে বলায়ও তিনি ছুটি দিতে রাজি হননি। এই উভয় সংকটকে কাটিয়ে ওঠার জন্য মনেপ্রাণে প্রার্থনা করার পর, আমি পুরোপুরি ঠিক করে ফেলি যে রাজ্যের কাজকেই আমি আমার জীবনে প্রথম স্থান দেব আর তাই আমি ওই চাকরির প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করি।—মথি ৬:৩৩.
সম্ভবত ওই একই সময়ের দিকে, জেলা ও সীমা অধ্যক্ষ আমাদের মণ্ডলী পরিদর্শন করার জন্য আসেন। তখন গ্রিক অর্থোডক্স পাদ্রি ও সরকারি কর্তাদের চরম একগুঁয়ে বিরোধিতার কারণে আমাদের সভাগুলো আমাদের নিজেদের ঘরে ঘরে গোপনে করতে হতো। এমন একটা সভার পরে জেলা অধ্যক্ষ আমার কাছে এসে আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন যে পূর্ণ-সময়ের পরিচর্যা করার কথা আমি কখনও ভেবেছি কি না। তার কথা যেন আমার হৃদয়ে সুরের ঝংকার তুলেছিল কারণ সেই বাপ্তিস্মের সময় থেকে এটাই ছিল আমার স্বপ্ন। আমি উত্তর দিই: “সত্যিই, আমি করতে চাই।” কিন্তু এছাড়াও আমাদের মেয়েকে দেখাশোনা করার দায়িত্বও আমার ছিল। সেই ভাই বলেছিলেন: “যিহোবাতে নির্ভর করুন, তাহলে তিনি আপনাকে সাহায্য করবেন।” এইজন্য, আমি ও আমার স্ত্রী মিলে আমাদের পারিবারিক দায়িত্বগুলোকে অবহেলা না করে, পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম যার জন্য ১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি পূর্ব ম্যাসিডোনিয়ায় বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে সেবা করতে শুরু করেছিলাম আর তখন ওই দেশে মাত্র পাঁচজন বিশেষ অগ্রগামীর মধ্যে আমি ছিলাম একজন।
এক বছর ধরে একজন বিশেষ অগ্রগামীর কাজ করার পর এথেন্সের শাখা অফিস আমায় একজন ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করার জন্য ডাকে। এই পরিচর্যার জন্য এক মাসের প্রশিক্ষণ সেরে বাড়ি ফেরার পর, আমি যখন মার্থাকে আমার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলছিলাম তখন এক বিরাট ম্যাঙ্গানিজ খনির ডিরেক্টর এসেছিলেন এবং শোধনাগার বিভাগের ম্যানেজার হয়ে কাজ করার জন্য আমাকে বলেছিলেন। আর তিনি আমার সঙ্গে পুরোপুরি পাঁচ বছর মেয়াদের চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। তাছাড়া আমাকে একটা সুন্দর বাড়ি ও একটা গাড়ি দেওয়ার কথাও তিনি বলেছিলেন। এই বিষয়ে আমার মতামতের জন্য তিনি আমায় দুদিন সময় দেন। এবারও, একেবারে নির্দ্বিধায় আমি যিহোবার কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলাম: “এই আমি, আমাকে পাঠাও।” (যিশাইয় ৬:৮) আমার স্ত্রীও আমার এই সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ একমত ছিল। ঈশ্বরের ওপর আস্থা রেখে, আমরা আমাদের ভ্রমণ কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম আর যিহোবাও তাঁর প্রেম ও দয়া থেকে আমাদের কখনও বঞ্চিত করেননি।
সমস্ত বাধা-বিঘ্নের মধ্যেও সেবা করা
আর্থিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, আমরা হার না মেনে যিহোবার সেবা করে চলেছি আর তাই তিনিও আমাদের প্রয়োজনগুলো মিটিয়েছেন। প্রথম দিকে আমি একটা ছোট্ট মোটর সাইকেলে করে ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরের পথ পার হয়ে মণ্ডলীগুলো পরিদর্শন করতাম। অনেকবার আমি অনেক অসুবিধার মধ্যে পড়েছি আর বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনাও ঘটেছিল। একবার শীতের সময়ে একটা মণ্ডলী পরিদর্শন সেরে ফেরার পথে, আমি যখন আমার মোটর সাইকেলটা নিয়ে একটা জলা জায়গা পার হচ্ছিলাম তখন সেটা জলে ডুবে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায় আর আমার হাঁটু অবধি ভিজে চুপচুপে হয়ে যায়। তারপর মোটর সাইকেলের চাকার হাওয়া বেরিয়ে যায়। ওই সময় একজন পথিক আমাকে তার হাওয়া ভরার পাম্প দিয়ে সাহায্য করেছিলেন বলে আমি কাছাকাছি একটা গাঁয়ে পৌঁছাতে পারি এবং সেখান থেকে আমার সাইকেলের চাকাটা সারিয়ে নিই। সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমার ভোর তিনটে হয়ে যায়, ততক্ষণে আমার সমস্ত শরীর ঠাণ্ডায় একেবারে জমে যায় আর আমি বড়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ি।
আরেকবার, আমি যখন একটা মণ্ডলী থেকে আরেকটাতে যাচ্ছিলাম তখন মোটর সাইকেলটা পিছলে গিয়ে, ছিটকে এসে আমার হাঁটুর ওপর পড়ে। এতে আমার পরনের প্যান্ট ছিঁড়ে গিয়ে রক্তে ভিজে একাকার হয়ে যায়। আমার আর কোন প্যান্ট ছিল না বলে ওই সন্ধ্যায় আমি অন্য একজন ভাইয়ের প্যান্ট যেটা কিনা আমার মাপের চেয়ে অনেক বড় ছিল, সেটা পরে সভায় বক্তৃতা দিয়েছিলাম। তারপরও, কোন অসুবিধাই আমাকে যিহোবা ও আমার প্রিয় ভাইদের সেবা করার জন্য আমার আকাঙ্ক্ষাকে নষ্ট করতে পারেনি।
আরেক দুর্ঘটনায়, আমি গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলাম, আমার হাত ও সামনের দাঁতগুলো ভেঙে গিয়েছিল। আর ওই সময়ে আমার ন-সাক্ষি ছোট বোন যে আমেরিকায় থাকত আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসেছিল। সে আমায় একটা গাড়ি কিনতে সাহায্য করেছিল যা আমার জন্য এক বিরাট পাওয়া ছিল! এথেন্স শাখার ভাইরা যখন আমার দুর্ঘটনার কথা জেনেছিলেন, তারা আমায় একটা উৎসাহজনক চিঠি পাঠিয়েছিলেন আর অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে রোমীয় ৮:২৮ পদটা জুড়ে দিয়েছিলেন যার কিছুটা অংশ বলে: “যাহারা ঈশ্বরকে প্রেম করে, . . . তাহাদের পক্ষে সকলই মঙ্গলার্থে একসঙ্গে কার্য্য করিতেছে।” এই আশ্বাসবাণী বার বার আমার জীবনে সত্যি হয়েছে!
অবাক হয়ে যাওয়ার মতো এক ঘটনা
১৯৬৩ সালে, আমি একজন বিশেষ অগ্রগামীর সঙ্গে একটা গ্রামে প্রচার করছিলাম কিন্তু সেখানকার লোকেদের একেবারেই আগ্রহ ছিল না। আমরা ঠিক করি যে আমরা আলাদা আলাদাভাবে কাজ করব, তাই আমরা দুজন রাস্তার দুপাশ ধরে চলতে থাকি। এমন সময় একটা ঘরের দরজায় কড়া নাড়তে না নাড়তেই একজন মহিলা দরজা খুলে ঝট করে আমাকে টেনে ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন ও আমার পিছনের দরজাটায় তালা লাগিয়ে দেন। আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম আর বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে সেখানে হচ্ছিলটা কী। একটুও দেরি না করে এরপরই তিনি আমার সঙ্গী বিশেষ অগ্রগামীকেও তাড়াতাড়ি ঘরের ভিতর ডেকে নেন। তারপর ভদ্রমহিলা আমাদের বলেন: “একদম চুপ করে থাকুন! একটুও নড়াচড়া করবেন না!” এর কিছুক্ষণ পরেই আমরা ঘরের বাইরে উত্তেজিত জনতার আওয়াজ শুনতে পাই। লোকেরা আমাদের খুঁজছিল। এরপর সবকিছু যখন শান্ত হয়ে যায় তখন ভদ্রমহিলা আমাদের বলেছিলেন: “আমি এই সবকিছু আপনাদেরই ভালর জন্য করেছি। আপনাদের আমি সম্মান করি কারণ আমি বিশ্বাস করি যে আপনারাই সত্য খ্রীষ্টান।” আমরা অন্তর থেকে তাকে ধন্যবাদ জানাই আর তাকে অনেক সাহিত্যাদি দিয়ে সেখান থেকে চলে আসি।
চোদ্দ বছর পর, আমি যখন গ্রিসে এক জেলা সম্মেলনে গিয়েছিলাম তখন সেখানে একজন মহিলা আমার কাছে এসে বলেন: “ভাই, আমার কথা কি আপনার মনে আছে? একবার আমাদের গ্রামে আপনি যখন প্রচার করতে এসেছিলেন তখন বিরোধীদের হাত থেকে আমিই আপনাকে বাঁচিয়েছিলাম।” পরে তিনি জার্মানিতে চলে আসেন আর সেখানে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করেন ও যিহোবার লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা করেন। এরপর তিনি ও তার পুরো পরিবার সত্যকে আপন করে নেন।
সত্যিই, এই বছরগুলোতে আমরা অনেক ‘সুখ্যাতি-পত্র’ পেয়েছি। (২ করিন্থীয় ৩:১) আমরা অনেক লোককে বাইবেলের সত্যের জ্ঞান নিতে সাহায্য করতে পেরেছি আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন প্রাচীন, পরিচারক দাস ও অগ্রগামী হিসেবে সেবা করছেন। ১৯৬০ দশকের গোড়ার দিকে আমি যে সীমাগুলোতে কাজ করেছি সেখানকার কিছু হাতেগোনা প্রকাশকদের সংখ্যা বেড়ে গিয়ে এখন ১০,০০০ জনেরও বেশি যিহোবার উপাসকদের দেখা যে কতই রোমাঞ্চকর বিষয়! এই সমস্ত কৃতিত্ব আমাদের প্রেমময় ও দয়াময় ঈশ্বরেরই যিনি আমাদেরকে তাঁর পথে কাজে লাগান।
“ব্যাধিশয্যাগত হইলে”
আমাদের ভ্রমণ কাজের বছরগুলোতে, মার্থা আমার একান্ত সহকারিণী হয়ে উঠেছিল আর সবসময় তার মুখে হাসি লেগেই থাকত। কিন্তু, ১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে ফলে এক বড় অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল। সেই থেকে তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে পঙ্গু হয়ে হুইল-চেয়ারেই কাটাতে হয়। আমরা কীভাবে এই আর্থিক ও মানসিক কষ্টকে সামলে নিয়েছিলাম? আমরা আবারও যিহোবাতে নির্ভর করে তাঁর প্রেমপূর্ণ ও উদার হাতের দানে উপকৃত হয়েছি। আমি যখন ম্যাসিডোনিয়ায় পরিচর্যার জন্য গিয়েছিলাম তখন মার্থা তার চিকিৎসার জন্য এথেন্সে এক ভাইয়ের বাসায় থাকে। সেই সময় সে এই উৎসাহজনক কথাগুলো আমাকে ফোনে জানাত: “আমি ভাল আছি। তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও আর দেখো, আবার যখন আমি একটু সুস্থ হয়ে নিজে নিজে চলাচল করতে পাবর তখন আমি হুইল-চেয়ারে বসেই তোমায় সঙ্গ দেব।” আর সে ঠিক তা-ই করেছিল। আমাদের প্রিয় ভাইরা বেথেল থেকে আমাদের অনেক উৎসাহজনক চিঠি পাঠিয়েছিলেন। মার্থা বার বার গীতসংহিতা ৪১:৩ পদের কথাগুলো মনে করে: “ব্যাধিশয্যাগত হইলে সদাপ্রভু তাহাকে ধরিয়া রাখিবেন; তাহার পীড়ার সময়ে তুমি তাহার সমস্ত শয্যা পরিবর্ত্তন করিয়াছ।”
এই নিদারুণ শারীরিক সমস্যাগুলোর কারণে, ১৯৮৬ সালে ঠিক করা হয়েছিল যে কাভাল্লায় যেখানে আমাদের আদরের মেয়ে থাকে তার কাছাকাছি থেকে একজন বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে কাজ করাই আমার জন্য ভাল হবে। গত মার্চ মাসে আমার প্রিয়তমা স্ত্রী মার্থা শেষ দিন পর্যন্ত বিশ্বস্ত থেকে মারা যায়। সে মারা যাওয়ার আগে ভাইরা এসে যখনই তাকে জিজ্ঞেস করতেন: “আপনি কেমন আছেন?” সে সাধারণত উত্তর দিত: “আমি যেহেতু যিহোবার সান্নিধ্যে আছি, তাই আমি খুবই ভাল আছি!” যখনই আমরা সভার জন্য তৈরি করতাম বা সেই সব এলাকায় গিয়ে কাজ করার জন্য ডাক পেতাম যেখানে শস্য প্রচুর, তখন মার্থা বলত: “জন, চলো আমরা সেখানে গিয়ে পরিচর্যা করি, যেখানে প্রয়োজন খুব বেশি।” সে কখনও তার উদ্যোগী আত্মাকে হারিয়ে যেতে দেয়নি।
কয়েক বছর আগে, আমাকেও কঠিন অসুখের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছিল। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে আমার হৃৎপিণ্ডে খুবই জটিল কিছু সমস্যা দেখা দেয় বলে আমাকে একান্ত বাধ্য হয়েই অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল। আবারও, আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি যে দুর্দশার সময়ে যিহোবার প্রেমপূর্ণ হাত আমায় সাহায্য করছে। আমি যখন হাসপাতালে বিশেষ যত্নের মধ্যে ছিলাম তখন আমার বিছানার পাশে বসে সীমা অধ্যক্ষ আমার জন্য যে প্রার্থনা করেছিলেন তা আর সেইসঙ্গে হাসপাতালে আমার ঘরে আরও যে চারজন রোগী ছিলেন যারা সত্যের প্রতি কিছুটা আগ্রহ দেখিয়েছিলেন তাদের নিয়ে যে আমি সেখানেই স্মরণার্থক সভা করেছিলাম সেইসব কথা আমি কখনও ভুলব না।
যিহোবা আমাদের সহায় হয়েছেন
সময় খুব তাড়াতাড়ি বয়ে গিয়েছে আর সেইসঙ্গে আমাদের স্বাস্থ্যও ভেঙে গিয়েছে কিন্তু অধ্যয়ন ও পরিচর্যা করে চলে আমারা উদ্যোগী থেকেছি। (২ করিন্থীয় ৪:১৬) সেই সময় থেকে আজ ৩৯ বছর পার হয়ে গেছে যখন আমি বলেছিলাম: “এই আমি, আমাকে পাঠাও।” আর আমি খুশিতে ভরা এক জীবন কাটিয়েছি। এটা ঠিক যে কখনও কখনও আমার মনে হয়েছে, “আমি দুঃখী ও দরিদ্র,” কিন্তু তারপরও আমি যিহোবার ওপর দৃঢ়বিশ্বাস রেখে বলতে পারি যে “তুমি আমার সহায় ও আমার নিস্তারকর্ত্তা।” (গীতসংহিতা ৪০:১৭) তিনি সত্যি সত্যি আমার কাছে একজন প্রেমময় ও দয়াময় ঈশ্বর হয়েছেন।
[২৫ পৃষ্ঠার চিত্র]
১৯৫৬ সালে মার্থার সঙ্গে
[২৬ পৃষ্ঠার চিত্র]
কাভাল্লায় বন্দর
[২৬ পৃষ্ঠার চিত্র]
১৯৯৭ সালে মার্থার সঙ্গে