তারা যিহোবার ইচ্ছা পালন করেছিলেন
ক্ষমা পরিত্রাণের পথ খুলে দেয়
মিশরের প্রধানমন্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে যাকোবের দশ ছেলে এক ভয়ংকর গুপ্ত বিষয় জানতে পারে। অনেক বছর আগে তারা তাদের সৎ ভাই যোষেফকে দাস হিসাবে বিক্রি করে দিয়েছিল। আর তারপর তারা তাদের বাবাকে মিথ্যে কথা বলবে বলে ভেবেছিল যে যোষেফকে একটা হিংস্র জন্তু মেরে ফেলেছে।—আদিপুস্তক ৩৭:১৮-৩৫.
প্রায় ২০ বছর পর এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কারণে এই দশজন ছেলেকে শস্য কেনার জন্য মিশরে আসতে হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি খুব সহজ ছিল না। কারণ প্রধানমন্ত্রী, যার হাতে শস্য বিক্রি করার অধিকার ছিল তিনি তাদেরকে গুপ্তচর বলে অভিযুক্ত করেছিলেন। তিনি তাদের একজনকে বন্দি করে রেখেছিলেন এবং অন্যদের ঘরে ফিরে গিয়ে তাদের ছোট ভাই বিন্যামীনকে নিয়ে আসতে বলেছিলেন। যখন তারা বিন্যামীনকে নিয়ে এসেছিলেন তখন প্রধানমন্ত্রী বিন্যামীনকে বন্দি করে রাখার জন্য ফন্দি এঁটেছিলেন।—আদিপুস্তক ৪২:১–৪৪:১২.
যাকোবের এক ছেলে যিহূদা বাধা দিয়েছিল। সে বলেছিল: ‘আমাদের সঙ্গে যদি বিন্যামীন না থাকে তাহলে আমাদের পিতা মারা পড়বেন।’ এরপর এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল যা যিহূদা নিজে বা তার সঙ্গিদের কেউ কল্পনাই করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী শুধু যাকোবের ছেলেদের রেখে বাকি সবাইকে ঘর থেকে চলে যেতে বলেছিলেন আর তারপর তিনি উচ্চস্বরে কেঁদেছিলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বলেছিলেন: “আমি যোষেফ।”—আদিপুস্তক ৪৪:১৮–৪৫:৩.
মৃদুতা ও মুক্তি
যোষেফ তার সৎ ভাইদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমার পিতা কি এখনও জীবিত আছেন?” তারা কোন উত্তর দেয়নি। সত্যিই যোষেফের সৎ ভাইরা যেন বুঝে উঠতে পারছিল না যে তারা কী বলবে। তারা কী খুশি হবে না ভয় পাবে? ২০ বছর আগে তারা এই ব্যক্তিকে দাস হিসাবে বিক্রি করে দিয়েছিল। তাদেরকে বন্দি করে রাখার, তাদেরকে খাদ্য না দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়ার অধিকার যোষেফের আছে আর এমনকি তিনি তাদের মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারতেন! তাই যুক্তিসংগত কারণেই যোষেফের “ভাইরা তাঁহার সাক্ষাতে বিহ্বল হইয়া পড়িলেন, উত্তর করিতে পারিলেন না।”—আদিপুস্তক ৪৫:৩.
পরিস্থিতিকে যোষেফ নিজেই সহজ করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন “বিনয় করি, আমার নিকটে আইস।” তারা তার কথা শুনেছিল। তারপর তিনি তাদের বলেছিলেন: “আমি যোষেফ, তোমাদের ভাই, যাহাকে তোমরা মিসরগামীদের কাছে বিক্রয় করিয়াছিলে। কিন্তু তোমরা আমাকে এই স্থানে বিক্রয় করিয়াছ বলিয়া এখন দুঃখিত কি বিরক্ত হইও না; কেননা প্রাণ রক্ষা করিবার জন্যই ঈশ্বর তোমাদের অগ্রে আমাকে পাঠাইয়াছেন।”—আদিপুস্তক ৪৫:৪, ৫.
ভাইদেরকে দয়া দেখানোর জন্য যোষেফের উপযুক্ত কারণ ছিল। তারা যে অনুতপ্ত তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, যোষেফ যখন তার সৎ ভাইদের বলেছিলেন যে তারা গুপ্তচর তখন তিনি তাদের নিজেদের মধ্যে এই কথাবার্তা বলতে শুনেছিলেন: “নিশ্চয়ই আমরা আপনাদের ভাইয়ের বিষয়ে অপরাধী, . . . এই জন্য আমাদের উপরে এই সঙ্কট উপস্থিত হইয়াছে।” (আদিপুস্তক ৪২:২১) এছাড়াও বিন্যামীনের বদলে যিহূদা দাস হতে চেয়েছিল যাতে বিন্যামীন তার বাবার কাছে ফিরে যেতে পারে।—আদিপুস্তক ৪৪:৩৩, ৩৪.
তাই তাদেরকে দয়া দেখিয়ে যোষেফ সঠিক কাজ করেছিলেন। এছাড়াও তিনি বুঝেছিলেন যে তা করলে তার পুরো পরিবার বাঁচতে পারবে। সেইজন্য যোষেফ তার সৎ ভাইদের বলেছিলেন যে তারা যেন তাদের পিতা যাকোবের কাছে ফিরে গিয়ে বলেন: “তোমার পুত্ত্র যোষেফ এইরূপ কহিল, ঈশ্বর আমাকে সমস্ত মিসর দেশের কর্ত্তা করিয়াছেন; তুমি আমার নিকটে চলিয়া আইস, বিলম্ব করিও না। তুমি পুত্ত্র পৌত্ত্রাদির ও গোমেষাদি সর্ব্বস্বের সহিত গোশন প্রদেশে বাস করিবে; তুমি আমার নিকটেই থাকিবে। সে স্থানে আমি তোমাকে প্রতিপালন করিব, কেননা আর পাঁচ বৎসর দুর্ভিক্ষ থাকিবে; পাছে তোমার ও তোমার পরিজনের ও তোমার সকল লোকের দৈন্যদশা ঘটে।”—আদিপুস্তক ৪৫:৯-১১.
মহান যোষেফ
যীশু খ্রীষ্টকে মহান যোষেফ বলা যায় কারণ এই দুই ব্যক্তির মধ্যে অনেক মিল আছে। যোষেফের মতো যীশুর সঙ্গেও তাঁর ভাইরা অর্থাৎ অব্রহামের বংশের লোকেরা দুর্ব্যবহার করেছিল। (প্রেরিত ২:১৪, ২৯, ৩৭ পদগুলোর সঙ্গে তুলনা করুন।) দুজনের জীবনেই অনেক পরিবর্তনগুলো এসেছিল। একসময়ে যোষেফের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল। একজন দাস থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন এবং ফৌরণের পরেই তার স্থান ছিল। একইভাবে যিহোবা যীশুকে মৃতদের মধ্যে থেকে পুনরুত্থিত করেছিলেন আর তাঁকে ‘ঈশ্বরের দক্ষিণ হস্তে’ এক শ্রেষ্ঠ স্থান দিয়েছিলেন।—প্রেরিত ২:৩৩; ফিলিপীয় ২:৯-১১.
যোষেফ যেহেতু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাই যারা মিশরে খাদ্য কিনতে এসেছিলেন তাদের সবাইকে খাদ্য দেওয়ার ক্ষমতা তার ছিল। আজকে মহান যোষেফের পৃথিবীতে এক বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান দাস শ্রেণী রয়েছে যার মাধ্যমে তিনি “উপযুক্ত সময়ে” আধ্যাত্মিক খাদ্য দিয়ে চলেছেন। (মথি ২৪:৪৫-৪৭; লূক ১২:৪২-৪৪) সত্যিই যারা যীশুর কাছে আসেন তারা “আর কখনও ক্ষুধিত হইবে না, আর কখনও তৃষ্ণার্ত্তও হইবে না, . . . কারণ সিংহাসনের মধ্যস্থিত মেষশাবক ইহাদিগকে পালন করিবেন, এবং জীবন-জলের উনুইয়ের নিকটে গমন করাইবেন।”—প্রকাশিত বাক্য ৭:১৬, ১৭.
আমাদের জন্য শিক্ষা
যোষেফ দয়া দেখানোর ক্ষেত্রে এক সুন্দর উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। যারা তাকে দাস হিসাবে বিক্রি করেছিল কঠোর ন্যায়বিচার হয়ত তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানাত। কিংবা আবেগ হয়ত তাদের অপরাধকে একেবারে উপেক্ষা করতে পারত। কিন্তু যোষেফ এর কোনটাই করেননি। বরং তার সৎ ভাইরা অনুতপ্ত কি না যোষেফ তা পরীক্ষা করেছিলেন। তারপর যখন তিনি দেখেন যে তারা প্রকৃতই অনুতপ্ত তিনি তাদের ক্ষমা করেছিলেন।
আমরা যোষেফের মতো হতে পারি। আমাদের বিরুদ্ধে পাপ করেছেন এমন কেউ যখন সত্যিই অনুতপ্ত হন ও নিজেকে পরিবর্তন করেন আমাদের সেই ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। অবশ্যই আমরা আমাদের আবেগকে আগে জায়গা দিয়ে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না। অন্যদিকে আমরা এমন বিরূপ মনোভাব গড়ে তুলব না যার ফলে সত্যিকারের অনুতাপকে দেখতেই পাব না। সুতরাং আসুন আমরা ‘পরস্পর সহনশীল হই, এবং ক্ষমা করি।’ (কলসীয় ৩:১৩) যদি আমরা তা করি তাহলে আমরা আমাদের ঈশ্বর যিহোবার মতো হচ্ছি যিনি “ক্ষমাকারী।”—গীতসংহিতা ৮৬:৫; মীখা ৭:১৮, ১৯.