সময় ও কাল যিহোবার হাতে
“যে সকল সময় কি কাল পিতা নিজ কর্ত্তৃত্বের অধীন রাখিয়াছেন, তাহা তোমাদের জানিবার বিষয় নয়।”—প্রেরিত ১:৭.
১. যীশু কিভাবে তাঁর প্রেরিতদের সময়সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন?
খ্রীষ্টীয়জগৎ এবং সমগ্র পৃথিবীতে “কৃত ঘৃণার্হ কার্য্যের বিষয়ে” যারা “দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করে ও কোঁকায়,” তাদের পক্ষে এই দুষ্ট ব্যবস্থা কখন শেষ হবে এবং এর জায়গায় কখন ঈশ্বরের ধার্মিক নতুন জগৎ আসবে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা ছাড়া আর কীই বা স্বাভাবিক হতে পারে? (যিহিষ্কেল ৯:৪; ২ পিতর ৩:১৩) যীশুর প্রেরিতগণ তাঁর মৃত্যুর ঠিক আগে এবং পুনরুত্থানের পরে সময়সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলেন। (মথি ২৪:৩; প্রেরিত ১:৬) উত্তরে যীশু কিন্তু তাদের তারিখ গণনা করার পদ্ধতিগুলি বলেননি। একবার তিনি তাদের একটি যৌগিক চিহ্ন দিয়েছিলেন এবং আরেকবার তিনি বলেছিলেন, ‘যে সকল সময় কি কাল পিতা নিজ কর্ত্তৃত্বের অধীন রাখিয়াছেন, তাহা তাহাদের জানিবার বিষয় ছিল না।’—প্রেরিত ১:৭.
২. কেন এটি বলা যেতে পারে যে শেষকালে ঘটবে এমন ঘটনাবলির জন্য তাঁর পিতার সময় সম্বন্ধে যীশু সবসময় জানতেন না?
২ যীশু যদিও যিহোবার একজাত পুত্র, তিনি নিজেও সবসময় ঘটনাবলি সম্বন্ধে তাঁর পিতার সময়সূচি জানতেন না। শেষকাল সম্বন্ধে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীতে, যীশু নম্রভাবে স্বীকার করেছিলেন: “সেই দিনের ও সেই দণ্ডের তত্ত্ব কেহই জানে না, স্বর্গের দূতগণও জানেন না, পুত্ত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।” (মথি ২৪:৩৬) যীশু ধৈর্যপূর্বক সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে ইচ্ছুক ছিলেন যতক্ষণ না তাঁর পিতা তাঁকে এই দুষ্ট বিধিব্যবস্থার ধ্বংসের সঠিক সময় সম্বন্ধে জানান।a
৩. ঈশ্বরের উদ্দেশ্য সম্বন্ধীয় প্রশ্নগুলির উত্তরে যীশু যা বলেছিলেন তার থেকে আমরা কী জানতে পারি?
৩ ঈশ্বরের উদ্দেশ্যের পরিপূর্ণতায় কখন ঘটনাগুলি ঘটবে সেই সম্বন্ধীয় প্রশ্নগুলির উত্তরে যীশু যা বলেছিলেন তার থেকে দুটি বিষয় নির্ণয় করা যেতে পারে। প্রথমটি হল যে, যিহোবার নিজের একটি সময়সূচি আছে; এবং দ্বিতীয়টি, তিনি একা তা নির্ধারণ করেন ফলে তাঁর দাসেরা তাঁর সময় কী কাল সম্বন্ধে সঠিক তথ্য আগে থেকে জানার আশা করতে পারেন না।
যিহোবার সময় এবং কাল
৪. প্রেরিত ১:৭ পদে যে গ্রীক শব্দগুলিকে “সময়” ও “কাল” হিসাবে অনুবাদ করা হয়েছে সেগুলির অর্থ কী?
৪ “সময়” এবং “কাল” বলতে কী বোঝায়? প্রেরিত ১:৭ পদে লিপিবদ্ধ যীশুর বক্তব্যে সময়ের দুটি দিক রয়েছে। যে গ্রীক শব্দটি “সময়” হিসাবে অনূদিত হয়েছে তার অর্থ “সময়কাল,” কিছুটা সময় (দীর্ঘ কিংবা সংক্ষিপ্ত)। “কাল” এমন একটি শব্দের অনুবাদ যা একটি নির্ধারিত, একটি নিরূপিত সময়, এক নির্দিষ্ট কাল কিংবা সময়সীমাকে বোঝায় যার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই মূল শব্দ দুটি সম্বন্ধে ডব্লিউ. ই. ভাইন উল্লেখ করেন: “প্রেরিত ১:৭ পদে, সময় (ক্রনোস) অর্থাৎ সময়সীমার দৈর্ঘ এবং কাল (কাইরোস) অর্থাৎ নির্দিষ্ট ঘটনাবলির দ্বারা বৈশিষ্ট্যযুক্ত যুগারম্ভ উভয়ই ‘পিতা তাঁর নিজ কর্তৃত্বাধীনে স্থির করেছেন।’”
৫. কলুষিত জগতের ধ্বংস সম্বন্ধে তাঁর উদ্দেশ্যটি যিহোবা কখন নোহকে জানিয়েছিলেন এবং কোন্ দুটি কাজ নোহ করেছিলেন?
৫ জলপ্লাবনের আগে, মানুষ এবং মনুষ্যদেহ ধারণকারী বিদ্রোহী দূতেদের তৈরি কলুষিত জগতের জন্য ঈশ্বর ১২০ বছর সময় নির্ধারণ করেছিলেন। (আদিপুস্তক ৬:১-৩) সেই সময়ে ধার্মিক নোহের বয়স ছিল ৪৮০ বছর। (আদিপুস্তক ৭:৬) তখনও তিনি নিঃসন্তান এবং পরবর্তী ২০ বছর পর্যন্ত তেমনই ছিলেন। (আদিপুস্তক ৫:৩২) অনেক পরে, নোহের পুত্রেরা প্রাপ্তবয়স্ক হলে এবং তারপর তারা বিবাহ করার পরে ঈশ্বর পৃথিবী থেকে দুষ্টতা দূর করা সম্বন্ধে তাঁর উদ্দেশ্যটি নোহকে জানিয়েছিলেন। (আদিপুস্তক ৬:৯-১৩, ১৮) তখন যদিও নোহকে জাহাজ নির্মাণ এবং তার সমসাময়িকদের কাছে প্রচার করা এই দুটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তবুও যিহোবা তার কাছে তাঁর নিজস্ব সময় তালিকা প্রকাশ করেননি।—আদিপুস্তক ৬:১৪; ২ পিতর ২:৫.
৬. (ক) কিভাবে নোহ দেখিয়েছিলেন যে তিনি সময়সংক্রান্ত বিষয়গুলি যিহোবার হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন? (খ) কিভাবে আমরা নোহের উদাহরণ অনুসরণ করতে পারি?
৬ কয়েক দশক ধরে—সম্ভবত অর্ধ শতাব্দী—“নোহ . . . ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারেই সকল কর্ম্ম করিলেন।” কোন নির্দিষ্ট তারিখ না জেনেই নোহ “বিশ্বাসে” তা করেছিলেন। (আদিপুস্তক ৬:২২; ইব্রীয় ১১:৭) জলপ্লাবন শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত যিহোবা তাকে ঘটনাবলির সঠিক সময় জানাননি। (আদিপুস্তক ৭:১-৫) যিহোবার উপর নোহের পূর্ণ আস্থা এবং বিশ্বাস তাকে সময়সংক্রান্ত বিষয়গুলি ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দিতে সমর্থ করেছিল। আর নোহ কতই না কৃতজ্ঞ হয়েছিলেন যখন তিনি জলপ্লাবনের সময় যিহোবার সুরক্ষা অনুভব করেছিলেন ও পরে এক পরিচ্ছন্ন পৃথিবীতে জাহাজ থেকে বের হয়ে এসেছিলেন! রক্ষা পাওয়ার একই আশা থাকায়, আমাদের কি ঈশ্বরের প্রতি এইধরনের বিশ্বাস অনুশীলন করা উচিত নয়?
৭, ৮. (ক) কিভাবে জাতি এবং বিশ্বশক্তিগুলি অস্তিত্বে এসেছিল? (খ) কিভাবে যিহোবা “তাহাদের নির্দ্দিষ্ট কাল ও নিবাসের সীমা স্থির করিয়াছেন”?
৭ জলপ্লাবনের পর, নোহের অধিকাংশ বংশধরই যিহোবার সত্য উপাসনা পরিত্যাগ করেছিল। একই জায়গায় থাকার লক্ষ্য নিয়ে, তারা মিথ্যা উপাসনার জন্য একটি নগর ও একটি দুর্গ নির্মাণ করতে শুরু করেছিল। যিহোবা স্থির করেছিলেন যে সেটিই ছিল হস্তক্ষেপ করার উপযুক্ত সময়। তিনি তাদের ভাষাভেদ করেছিলেন এবং “[বাবিল] হইতে সমস্ত ভূমণ্ডলে তাহাদিগকে ছিন্নভিন্ন করিলেন।” (আদিপুস্তক ১১:৪, ৮, ৯) পরে, বিভিন্ন ভাষার দলগুলি জাতিতে পরিণত হয়েছিল, যেগুলির কয়েকটি অন্য জাতিগুলিকে নিজেদের অধিকারে নিয়ে এসে প্রাদেশিক শক্তি আর এমনকি বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।—আদিপুস্তক ১০:৩২.
৮ ঈশ্বর তাঁর উদ্দেশ্য সম্পাদনের সঙ্গে সংগতি রেখে, কখনও কখনও জাতিগত সীমানা ঠিক করেছেন এবং কোন্ সময় পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট জাতি স্থানীয়ভাবে কিংবা বিশ্বশক্তি হিসাবে কর্তৃত্ব করবে তা নির্ধারণ করেছিলেন। (আদিপুস্তক ১৫:১৩, ১৪, ১৮-২১; যাত্রাপুস্তক ২৩:৩১; দ্বিতীয় বিবরণ ২:১৭-২২; দানিয়েল ৮:৫-৭, ২০, ২১) যিহোবার সময় ও কালের এই দিক সম্বন্ধে প্রেরিত পৌল উল্লেখ করেছিলেন যখন তিনি আথীনীর গ্রীক বুদ্ধিজীবীদের বলেছিলেন: “ঈশ্বর, যিনি জগৎ ও তন্মধ্যস্থ সমস্ত বস্তু নির্ম্মাণ করিয়াছেন, . . . এক ব্যক্তি হইতে মনুষ্যদের সকল জাতিকে উৎপন্ন করিয়াছেন, যেন তাহারা সমস্ত ভূতলে বাস করে; তিনি তাহাদের নির্দ্দিষ্ট কাল ও নিবাসের সীমা স্থির করিয়াছেন।”—প্রেরিত ১৭:২৪, ২৬.
৯. রাজাদের বিষয়ে কিভাবে যিহোবা ‘কাল ও ঋতু পরিবর্ত্তন করেছেন’?
৯ কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে যিহোবা সমস্ত রাজনৈতিক বিজয় এবং জাতিগুলির পরিবর্তনের জন্য দায়ী। তবুও, তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য তিনি তাঁর ইচ্ছানুযায়ী হস্তক্ষেপ করতে পারেন। তাই, ভাববাদী দানিয়েল, যাকে বাবিলনীয় বিশ্বশক্তির পতন এবং সেটির জায়গায় মাদীয়-পারস্য আসার বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে হয়েছিল, তিনি যিহোবা সম্বন্ধে বলেছিলেন: “তিনিই কাল ও ঋতু পরিবর্ত্তন করেন; রাজাদিগকে পদভ্রষ্ট করেন, ও রাজাদিগকে পদস্থ করেন; তিনি জ্ঞানীদিগকে জ্ঞান দেন, বিবেচকদিগকে বিবেচনা দেন।”—দানিয়েল ২:২১; যিশাইয় ৪৪:২৪–৪৫:৭.
‘সময় সন্নিকট হচ্ছিল’
১০, ১১. (ক) দাসত্ব থেকে অব্রাহামের বংশধরদের মুক্ত করার সময়টি যিহোবা কত দিন আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন? (খ) কী ইঙ্গিত করে যে ইস্রায়েলীয়রা জানত না ঠিক কখন তারা মুক্ত হতে চলেছে?
১০ চার শতাব্দীরও বেশি আগে থেকে যিহোবা সেই নির্দিষ্ট বছরটি স্থির করেছিলেন যে কখন তিনি মিশরীয় বিশ্বশক্তির রাজাকে অবনত করবেন আর অব্রাহামের বংশধরদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করবেন। অব্রাহামের কাছে তাঁর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে, ঈশ্বর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন: “নিশ্চয় জানিও, তোমার সন্তানগণ পরদেশে প্রবাসী থাকিবে, এবং বিদেশী লোকদের দাস্যকর্ম্ম করিবে, ও লোকে তাহাদিগকে দুঃখ দিবে—চারি শত বৎসর পর্য্যন্ত; আবার তাহারা যে জাতির দাস হইবে, আমিই তাহার বিচার করিব; তৎপরে তাহারা যথেষ্ট সম্পত্তি লইয়া বাহির হইবে।” (আদিপুস্তক ১৫:১৩, ১৪) মহাসভার সামনে ইস্রায়েলের ইতিহাস সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়, স্তিফান এই ৪০০ বছরের বিষয়ে উল্লেখ করেছিলেন এবং বলেছিলেন: “ঈশ্বর অব্রাহামের নিকটে যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, সেই প্রতিজ্ঞা ফলিবার সময় সন্নিকট হইলে, লোকেরা মিসরে বৃদ্ধি পাইয়া বহুসংখ্যক হইয়া উঠিল। অবশেষে মিসরের উপরে এমন আর এক জন রাজা উৎপন্ন হইলেন, যিনি যোষেফকে জানিতেন না।”—প্রেরিত ৭:৬, ১৭, ১৮.
১১ এই নতুন ফরৌণ ইস্রায়েলীয়দের দাসে পরিণত করেছিলেন। মোশি তখনও আদিপুস্তক লেখেননি কিন্তু সম্ভবত অব্রাহামের কাছে কৃত যিহোবার প্রতিজ্ঞাগুলি মৌখিক কিংবা লিখিত আকারে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবুও, এটি স্পষ্ট যে, ইস্রায়েলীয়দের কাছে যে তথ্য ছিল তার দ্বারা তাদের নিপীড়ন থেকে মুক্তির নির্দিষ্ট দিন গণনা করতে দেওয়া হয়নি। ঈশ্বর কখন তাদের মুক্ত করতে যাচ্ছেন তা তিনি জানতেন কিন্তু স্পষ্টতই দুর্দশাগ্রস্ত ইস্রায়েলীয়দের তিনি তা জানাননি। আমরা পড়ি: “অনেক দিন পরে মিসর-রাজের মৃত্যু হইল, এবং ইস্রায়েল-সন্তানগণ দাস্যকর্ম্ম প্রযুক্ত কাতরোক্তি ও ক্রন্দন করিল, এবং দাস্যকর্ম্ম জন্য তাহাদের আর্ত্তনাদ ঈশ্বরের নিকটে উঠিল। আর ঈশ্বর তাহাদের আর্ত্তস্বর শুনিলেন, এবং ঈশ্বর অব্রাহামের, ইস্হাকের ও যাকোবের সহিত কৃত আপনার নিয়ম স্মরণ করিলেন; ফলতঃ ঈশ্বর ইস্রায়েল-সন্তানদের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন; আর ঈশ্বর তাহাদের তত্ত্ব লইলেন।”—যাত্রাপুস্তক ২:২৩-২৫.
১২. কিভাবে স্তিফান দেখিয়েছিলেন যে মোশি যিহোবার নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?
১২ ইস্রায়েলের মুক্তির সঠিক সময় সম্বন্ধে জ্ঞানের অভাবের বিষয়টি স্তিফানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকেও নির্ণয় করা যেতে পারে। মোশির সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন: “তাঁহার প্রায় সম্পূর্ণ চল্লিশ বৎসর বয়ঃক্রম হইলে নিজ ভ্রাতৃগণের, ইস্রায়েল-সন্তানগণের, তত্ত্বাবধান করিবার ইচ্ছা তাঁহার হৃদয়ে উঠিল। তখন এক জনের প্রতি অন্যায় করা হইতেছে দেখিয়া তিনি তাহার পক্ষ হইলেন, সেই মিস্রীয় ব্যক্তিকে আঘাত করিয়া উপদ্রুতের পক্ষে অন্যায়ের প্রতিকার করিলেন। তিনি মনে করিতেছিলেন, তাঁহার ভ্রাতৃগণ বুঝিয়াছে যে, তাঁহার হস্ত দ্বারা ঈশ্বর তাহাদিগকে পরিত্রাণ দিতেছেন; কিন্তু তাহারা বুঝিল না।” (বাঁকা অক্ষরে মুদ্রণ আমাদের।) (প্রেরিত ৭:২৩-২৫) এক্ষেত্রে মোশি ঈশ্বরের নির্ধারিত সময়ের ৪০ বছর আগেই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। স্তিফান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করেছিলেন যে ঈশ্বর ‘তাঁহার হস্ত দ্বারা ইস্রায়েলীয়দের পরিত্রাণ দেওয়ার’ আগে মোশিকে আরও ৪০ বছর অপেক্ষা করতে হত।—প্রেরিত ৭:৩০-৩৬.
১৩. কিভাবে আমাদের অবস্থা মিশর থেকে মুক্তির পূর্বে ইস্রায়েলীয়দের অবস্থার মত একইরকম?
১৩ যদিও ‘প্রতিজ্ঞা ফলিবার সময় সন্নিকট হচ্ছিল’ এবং ঈশ্বর সেই নির্দিষ্ট বছর ঠিক করেছিলেন, তবুও মোশি ও সমস্ত ইস্রায়েলকে বিশ্বাস অনুশীলন করতে হয়েছিল। স্পষ্টতই এটি আগে থেকে গণনা করতে পারা ছাড়াই, তাদেরকে যিহোবার নিরূপিত সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আমরাও নিশ্চিত যে দুষ্ট বিধিব্যবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি সন্নিকট। আমরা জানি যে আমরা “শেষ কালে” বাস করছি। (২ তীমথিয় ৩:১-৫) তাহলে আমাদের কি বিশ্বাস প্রদর্শন করতে ইচ্ছুক হওয়া এবং যিহোবার মহাদিনের জন্য তাঁর নিরূপিত সময়ের অপেক্ষা করা উচিত নয়? (২ পিতর ৩:১১-১৩) অতএব, মোশি ও ইস্রায়েলীয়দের মত, আমরা হয়ত যুক্তিসংগতভাবেই যিহোবার প্রশংসার্থে মুক্তি সম্বন্ধীয় একটি মহিমা গীত গাইতে পারি।—যাত্রাপুস্তক ১৫:১-১৯.
“কাল সম্পূর্ণ হইলে”
১৪, ১৫. কিভাবে আমরা জানি যে ঈশ্বর তাঁর পুত্রের পৃথিবীতে আসার জন্য একটি সময় ঠিক করেছিলেন এবং ভাববাদী ও এমনকি দূতগণও কিসের প্রতি সতর্ক ছিলেন?
১৪ মশীহ হিসাবে পৃথিবীতে আসতে যিহোবা তাঁর একজাত পুত্রের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করেছিলেন। পৌল লিখেছিলেন: “কাল সম্পূর্ণ হইলে ঈশ্বর আপনার নিকট হইতে আপন পুত্ত্রকে প্রেরণ করিলেন; তিনি স্ত্রীজাত, ব্যবস্থার অধীনে জাত হইলেন।” (গালাতীয় ৪:৪) এটি ছিল একটি বংশ পাঠানোর বিষয়ে ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞার পরিপূর্ণতা, যিনি “শীলো, . . . জাতিগণ যাঁহারই আজ্ঞাবহতা স্বীকার করিবে।”—আদিপুস্তক ৩:১৫; ৪৯:১০.
১৫ ঈশ্বরের ভাববাদীগণ—এমনকি দূতগণও—সেই ‘কালের’ প্রতি সতর্ক ছিলেন যখন পৃথিবীতে মশীহের আবির্ভাব হবে এবং পাপী মানবজাতির জন্য পরিত্রাণ সম্ভব করা হবে। পিতর বলেছিলেন, “সেই পরিত্রাণের বিষয় ভাববাদিগণ সযত্নে আলোচনা ও অনুসন্ধান করিয়াছিলেন, তাঁহারা তোমাদের জন্য নিরূপিত অনুগ্রহের বিষয়ে ভাববাণী বলিতেন। তাঁহারা এই বিষয় অনুসন্ধান করিতেন, খ্রীষ্টের আত্মা, যিনি তাঁহাদের অন্তরে ছিলেন, তিনি যখন খ্রীষ্টের জন্য নিরূপিত বিবিধ দুঃখভোগ ও তদনুবর্ত্তী গৌরবের বিষয়ে সাক্ষ্য দিতেছিলেন, তখন তিনি কোন্ ও কি প্রকার সময়ের প্রতি লক্ষ্য করিয়াছিলেন। . . . স্বর্গদূতেরা হেঁট হইয়া তাহা দেখিবার আকাঙ্ক্ষা করিতেছেন।”—১ পিতর ১:১-৫, ১০-১২.
১৬, ১৭. (ক) কোন্ ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যমে যিহোবা প্রথম শতাব্দীর যিহূদীদের মশীহের জন্য প্রতীক্ষা করতে সাহায্য করেছিলেন? (খ) কিভাবে দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীটি মশীহের জন্য যিহূদীদের প্রতীক্ষাকে প্রভাবিত করেছিল?
১৬ অটল বিশ্বাসী ব্যক্তি—ভাববাদী দানিয়েলের মাধ্যমে যিহোবা “সত্তর সপ্তাহ” সম্বন্ধে একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ওই ভবিষ্যদ্বাণীটি প্রথম শতাব্দীর যিহূদীদের এটি জানিয়েছিল যে প্রতিজ্ঞাত মশীহের আবির্ভাব সন্নিকট। আংশিকভাবে, ভবিষ্যদ্বাণীটি উল্লেখ করেছিল: “যিরূশালেমকে পুনঃস্থাপন ও নির্ম্মাণ করিবার আজ্ঞা বাহির হওয়া অবধি অভিষিক্ত ব্যক্তি, নায়ক, পর্য্যন্ত সাত সপ্তাহ আর বাষট্টি সপ্তাহ হইবে।” (দানিয়েল ৯:২৪, ২৫) যিহূদী, ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট পণ্ডিতেরা সকলেই একমত যে এখানে উল্লেখিত “সপ্তাহ” এর একটি দিন এক বছরের সমান। তাই দানিয়েল ৯:২৫ পদের ৬৯ “সপ্তাহ” (৪৮৩ বছর) সা.কা.পূ. ৪৫৫ সালে শুরু হয় যখন পারস্য রাজ অর্তক্ষস্ত “যিরূশালেমকে পুনঃস্থাপন ও নির্ম্মাণ করিবার” জন্য নহিমিয়কে অনুমতি দিয়েছিলেন। (নহিমিয় ২:১-৮) তা ৪৮৩ বছর পর—সা.কা. ২৯ সালে সমাপ্ত হয়েছিল যখন যীশু বাপ্তিস্মিত এবং পবিত্র আত্মার দ্বারা অভিষিক্ত হয়েছিলেন আর এভাবেই তিনি মশীহ কিংবা খ্রীষ্ট হয়েছিলেন।—মথি ৩:১৩-১৭.
১৭ কখন থেকে ৪৮৩ বছর শুরু হয়েছে সেই বিষয়টি প্রথম শতাব্দীর যিহূদীরা সঠিকভাবে জানতেন কি না তা জানা যায় না। কিন্তু যোহন বাপ্তাইজক যখন তার পরিচর্যা শুরু করেছিলেন, তখন “লোকেরা . . . অপেক্ষায় ছিল, এবং যোহনের বিষয়ে সকলে মনে মনে এই তর্ক বিতর্ক করিতেছিল, কি জানি, ইনিই বা সেই খ্রীষ্ট।” (লূক ৩:১৫) কিছু বাইবেল পণ্ডিতেরা এই প্রতীক্ষাকে দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে যুক্ত করেন। এই পদের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে, ম্যাথিউ হেনরি লিখেছিলেন: “এখানে আমাদের বলা হয়েছে . . . কিভাবে লোকেরা যোহনের পরিচর্যা ও বাপ্তিস্ম থেকে মশীহ এবং খুব শীঘ্রই যে তাঁর আবির্ভাব হতে যাচ্ছে সেই সম্বন্ধে চিন্তা করার ভিত্তি পেয়েছিলেন। . . . দানিয়েলের সত্তর সপ্তাহ তখন শেষ হচ্ছিল।” ভিগুরু, বেকওয়েস ও ব্র্যাসাক প্রণীত ফরাসি ম্যানুয়েল বিবলিক মন্তব্য করেছিল: “লোকেরা জানত যে দানিয়েলের দ্বারা নির্ধারিত সত্তর সপ্তাহ নিকটবর্তী হচ্ছে; ঈশ্বরের রাজ্য যে সন্নিকট সেই বিষয়ে যোহন বাপ্তাইজকের ঘোষণা শুনে কেউই আশ্চর্য হননি।” যিহূদী পণ্ডিত আব্বা হিলেল সিলভার লিখেছিলেন, তখনকার দিনের “জনপ্রিয় কালপরম্পরা” অনুযায়ী, “মশীহ প্রথম শতাব্দীর দুই চতুর্থাংশ সময়ের মধ্যে আসবেন বলে আশা করা হয়েছিল।”
ঘটনাবলি—সময় গণনা নয়
১৮. দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণী যিহূদীদেরকে মশীহের আবির্ভাবের সময়টি চিনতে সাহায্য করলেও, যীশুর মশীহপদের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কী ছিল?
১৮ যদিও কালপরম্পরা স্পষ্টতই যিহূদী লোকেদের, কখন মশীহের আবির্ভাব হবে সেই সম্বন্ধে সাধারণ ধারণা পেতে সাহায্য করেছিল, তবুও পরের ঘটনাবলি দেখায় যে এটি তাদের অধিকাংশকেই যীশুর মশীহপদের বিষয়ে দৃঢ়প্রত্যয়ী হতে সহায়তা করেনি। মৃত্যুর এক বছরেরও কম সময় আগে, যীশু তাঁর শিষ্যদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “আমি কে, এ বিষয়ে লোকসমূহ কি বলে?” তারা উত্তর দিয়েছিলেন: “যোহন বাপ্তাইজক; কিন্তু কেহ কেহ বলে, আপনি এলিয়; আর কেহ কেহ বলে, পূর্ব্বকালীন ভাববাদিগণের এক জন উঠিয়াছেন।” (লূক ৯:১৮, ১৯) তিনিই যে মশীহ তা প্রমাণ করার জন্য যীশু কখনও প্রতীক সপ্তাহ সম্বন্ধীয় ভবিষ্যদ্বাণীটি উদ্ধৃত করেছিলেন কি না সেই সম্বন্ধে আমাদের কোন লিখিত প্রমাণ নেই। কিন্তু একটি উপলক্ষে, তিনি বলেছিলেন: “যোহনের দত্ত সাক্ষ্য অপেক্ষা আমার গুরুতর সাক্ষ্য আছে; কেননা পিতা আমাকে যে সকল কার্য্য সম্পন্ন করিতে দিয়াছেন, যে সকল কার্য্য আমি করিতেছি, সেই সকল আমার বিষয়ে এই সাক্ষ্য দিতেছে যে, পিতা আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন।” (যোহন ৫:৩৬) প্রকাশিত কোন কালপরম্পরার পরিবর্তে, যীশুর প্রচার, তাঁর অলৌকিক কাজ এবং মৃত্যু সংক্রান্ত ঘটনাবলি (অলৌকিক অন্ধকার, মন্দিরের তিরস্করিণী চিরে যাওয়া এবং ভূমিকম্প) প্রমাণ করেছিল যে তিনিই ঈশ্বরের প্রেরিত মশীহ ছিলেন।—মথি ২৭:৪৫, ৫১, ৫৪; যোহন ৭:৩১; প্রেরিত ২:২২.
১৯. (ক) কিভাবে খ্রীষ্টানেরা জানতে পেরেছিলেন যে যিরূশালেমের ধ্বংস নিকটে? (খ) যিরূশালেম থেকে যে প্রাথমিক খ্রীষ্টানেরা পালিয়ে গিয়েছিলেন তাদের কেন অনেক বেশি বিশ্বাসের প্রয়োজন ছিল?
১৯ একইভাবে, যীশুর মৃত্যুর পর প্রাথমিক খ্রীষ্টানদের যিহূদী বিধিব্যবস্থার আসন্ন শেষ সম্বন্ধে গণনা করার কোন সূত্রই দেওয়া হয়নি। এটি সত্য যে, প্রতীক সপ্তাহ সম্বন্ধীয় দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণী ওই ব্যবস্থার ধ্বংসের বিষয়ে উল্লেখ করেছিল। (দানিয়েল ৯:২৬খ, ২৭খ) কিন্তু তা “সত্তর সপ্তাহ” (সা.কা.পূ. ৪৫৫-সা.কা. ৩৬ সাল) শেষ হওয়ার পর ঘটবে। অন্য কথায়, সা.কা. ৩৬ সালে প্রথম পরজাতীয়রা যীশুর অনুসারী হওয়ার পর, দানিয়েল ৯ অধ্যায় কালপরম্পরা সম্বন্ধে খ্রীষ্টানদের আর কোন সংকেত দেয়নি। তাদের জন্য, কালপরম্পরা নয় কিন্তু ঘটনাবলি দেখিয়েছিল যে যিহূদী ব্যবস্থা শীঘ্রই শেষ হবে। যীশুর ভাববাণীকৃত ওই ঘটনাবলি সা.কা. ৬৬ সাল থেকে চরম অবস্থায় যেতে শুরু করেছিল যখন রোমীয় সৈন্যবাহিনী যিরূশালেমকে আক্রমণ করেছিল এবং তারপর ফিরে গিয়েছিল। এটি যিরূশালেম এবং যিহূদার বিশ্বস্ত ও সতর্ক খ্রীষ্টানদের “পাহাড় অঞ্চলে পলায়ন” করার সুযোগ দিয়েছিল। (লূক ২১:২০-২২) কোন কাল নিরূপণ করার জন্য নির্দেশক না থাকায়, ওই প্রাথমিক খ্রীষ্টানেরা জানতেন না যে যিরূশালেমের ধ্বংস কখন ঘটবে। তাদের ঘর, খামার ও কর্মক্ষেত্রগুলি ছাড়া এবং যিহূদী ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে সা.কা. ৭০ সালে রোমীয় সৈন্যবাহিনীর ফিরে আসা পর্যন্ত চার বছর যিরূশালেমের বাইরে থাকার জন্য কী বিশ্বাসই না তাদের প্রদর্শন করতে হয়েছিল!—লূক ১৯:৪১-৪৪.
২০. (ক) নোহ, মোশি এবং যিহূদার প্রথম শতাব্দীর খ্রীষ্টানদের উদাহরণগুলি থেকে আমরা কিভাবে উপকার পেতে পারি? (খ) পরবর্তী প্রবন্ধে আমরা কী আলোচনা করব?
২০ নোহ, মোশি এবং যিহূদার প্রথম শতাব্দীর খ্রীষ্টানদের মত আজকে আমরাও দৃঢ়বিশ্বাসের সঙ্গে সময় ও কাল যিহোবার হাতে ছেড়ে দিতে পারি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আমরা শেষ কালে বাস করছি এবং আমাদের মুক্তি নিকটবর্তী হচ্ছে, কেবল কাল গণনার উপর নয় কিন্তু বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীগুলির পরিপূর্ণতাস্বরূপ বাস্তব জীবনের ঘটনাবলির উপর নির্ভর করে। অধিকন্তু, আমরা যদিও খ্রীষ্টের উপস্থিতিকালে বাস করছি, তবুও আমরা বিশ্বাস অনুশীলন এবং সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা থেকে মুক্ত নই। শাস্ত্রে ভাববাণীকৃত রোমাঞ্চকর ঘটনাবলির জন্য ঐকান্তিক প্রতীক্ষায় আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। এটিই হবে পরবর্তী প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু।
[পাদটীকাগুলো]
a ১৯৯৬ সালের ১লা আগস্ট সংখ্যার প্রহরীদুর্গ এর ৩০-১ পৃষ্ঠা দেখুন।
পুনরালোচনার মাধ্যমে
◻ যিহোবার সময় ও কাল সম্বন্ধে, যীশু তাঁর প্রেরিতদের কী বলেছিলেন?
◻ কখন জলপ্লাবন শুরু হতে চলেছে তা নোহ কত দিন আগে জানতে পেরেছিলেন?
◻ কী ইঙ্গিত করে যে মোশি এবং ইস্রায়েলীয়রা জানত না ঠিক কখন তারা মিশর থেকে মুক্তি পেতে চলেছিল?
◻ যিহোবার সময় ও কাল সংক্রান্ত বাইবেলের উদাহরণগুলি থেকে আমরা কিভাবে উপকৃত হতে পারি?
[১১ পৃষ্ঠার চিত্র]
নোহের বিশ্বাস তাকে সময়সংক্রান্ত বিষয়গুলি যিহোবার হাতে ছেড়ে দিতে সমর্থ করেছিল