পাঠকদের থেকে প্রশ্নসকল
যীশু পরামর্শ দিয়েছিলেন: “সঙ্কীর্ণ দ্বার দিয়া প্রবেশ করিতে প্রাণপণ কর; কেননা আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, অনেকে প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিবে, কিন্তু পারিবে না।” (লূক ১৩:২৪) এটি বলার দ্বারা তিনি কী বুঝিয়েছিলেন এবং আজকে এটি কিভাবে প্রযোজ্য?
এটির পটভূমি বিবেচনা করার দ্বারা আমরা এই আগ্রহজনক বাক্যাংশটিকে ভালভাবে বুঝতে পারি। যীশু তাঁর মৃত্যুর প্রায় ছয় মাস আগে মন্দির পুনরুৎসর্গীকরণ বার্ষিকীর সময়ে যিরূশালেমে ছিলেন। তিনি নিজেকে ঈশ্বরের মেষেদের পালক হিসাবে পরিচিত করিয়েছিলেন আর স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে সাধারণভাবে সমস্ত যিহূদীরা এই মেষেদের অন্তর্ভুক্ত নয় কারণ তারা শুনতে অস্বীকার করেছিল। তিনি যখন বলেছিলেন যে তিনি ও তাঁর পিতা “এক,” তখন যিহূদীরা তাঁকে পাথর মারার জন্য পাথর তুলেছিল। তিনি যর্দনের ওপারে পিরিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিলেন।—যোহন ১০:১-৪০.
সেখানে একজন লোক জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “প্রভু, যাহারা পরিত্রাণ পাইতেছে, তাহাদের সংখ্যা কি অল্প?” (লূক ১৩:২৩) সেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা তার পক্ষে উপযুক্ত ছিল, কারণ ওই সময়ের যিহূদীরা এই ধারণা পোষণ করত যে কেবল এক সীমিত সংখ্যক লোক পরিত্রাণ অর্জন করবে। তারা যে মনোভাব দেখিয়েছিল তাতে সেই অল্প সংখ্যক কাদের নিয়ে গঠিত হবে বলে তারা মনে করেছিল তা অনুমান করা কঠিন নয়। তারা কতই না ভুল করেছিল যেমন পরবর্তী বিষয়গুলি দেখায়!
প্রায় দুই বছরের জন্য যীশু তাদের মাঝে ছিলেন, শিক্ষা দিয়েছিলেন, অলৌকিক কাজ করেছিলেন এবং স্বর্গীয় রাজ্যের উত্তরাধিকারী হওয়া সম্বন্ধীয় তাদের সম্ভাবনাকে প্রসারিত করেছিলেন। ফল কী হয়েছিল? তারা এবং বিশেষভাবে তাদের নেতারা অব্রাহামের বংশধর এবং ঈশ্বরের ব্যবস্থা প্রাপ্ত হওয়ায় গর্বিত ছিল। (মথি ২৩:২; যোহন ৮:৩১-৪৪) কিন্তু তারা উত্তম মেষপালকের স্বর শনাক্ত করতে পারেনি ও সেটির প্রতি সাড়া দেয়নি। তাদের সামনে যেন একটি খোলা দরজা ছিল যার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে সর্বোচ্চ পুরস্কার হিসাবে রাজ্যের সদস্যপদ পাওয়া যেত কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। তুলনামূলকভাবে এক অল্পসংখ্যক, প্রধানত নিম্ন শ্রেণী থেকে লোকেরা যীশুর সত্যের বার্তা শুনেছিলেন, সাড়া দিয়েছিলেন এবং তাঁর প্রতি অনুগত ছিলেন।—লূক ২২:২৮-৩০; যোহন ৭:৪৭-৪৯.
সাধারণ কাল ৩৩ সালের পঞ্চাশত্তমীর দিনে, এই শেষের ব্যক্তিরা আত্মায় অভিষিক্ত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। (প্রেরিত ২:১-৩৮) তারা যীশুর দ্বারা উল্লেখিত অধর্মাচারীদের মধ্যে ছিলেন না যারা তাদের জন্য প্রাপ্তিসাধ্য সুযোগটি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় রোদন এবং দন্তঘর্ষণ করবে।—লূক ১৩:২৭, ২৮.
ফলস্বরূপ, প্রথম শতাব্দীতে সেই “অনেকে” ছিলেন সর্বসাধারণ যিহূদীরা এবং বিশেষভাবে ধর্মীয় নেতারা। এরা ঈশ্বরের অনুগ্রহ পাওয়ার দাবি করেছিলেন—কিন্তু কেবল নিজেদের মান ও উপায় অনুযায়ী, ঈশ্বরের নয়। বিপরীতে, তুলনামূলকভাবে “অল্প” যারা রাজ্যের অংশ হওয়ার জন্য আন্তরিক আগ্রহের কারণে সাড়া দিয়েছিলেন তারা খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীর অভিষিক্ত সদস্য হয়েছিলেন।
এখন আরও ব্যাপক প্রয়োগ সম্বন্ধে বিবেচনা করুন যা আমাদের দিনে হয়ে চলেছে। খ্রীষ্টীয় জগতের গির্জাগুলিতে যোগ দেন এমন অগণিত লোকেরা শিক্ষা পেয়ে এসেছেন যে তারা স্বর্গে যাবেন। কিন্তু, এই আকাঙ্ক্ষা শাস্ত্রের সঠিক শিক্ষাগুলির উপর ভিত্তি করে নয়। প্রাথমিক যিহূদীদের মত, এরা কেবল এদের নিজেদের উপায়ে ঈশ্বরের অনুগ্রহ চান।
আমাদের দিনেও তুলনামূলকভাবে অল্প লোক রয়েছেন যারা রাজ্যের বার্তার প্রতি নম্রভাবে সাড়া দেন, যিহোবার প্রতি নিজেদের উৎসর্গীকৃত করেন এবং তাঁর অনুগ্রহ লাভের উপযুক্ত হন। এটি তাদের “রাজ্যের সন্তানগণ” হওয়ার দিকে পরিচালিত করেছে। (মথি ১৩:৩৮) এইধরনের অভিষিক্ত “সন্তানগণ” এর আমন্ত্রণ সা.কা. ৩৩ সালের পঞ্চাশত্তমীর দিনে শুরু হয়েছিল। যিহোবার সাক্ষীরা দীর্ঘদিন যাবৎ এই ধারণা পোষণ করেছেন যে তাঁর লোকেদের সঙ্গে ঈশ্বরের ব্যবহার ইঙ্গিত করে যে মূলত স্বর্গীয় শ্রেণীর সদস্যদের ইতিমধ্যেই আহ্বান করা হয়ে গিয়েছে। অতএব, যারা সম্প্রতি বছরগুলিতে বাইবেলের সত্য শিখেছেন তারা বুঝতে পেরেছেন যে পরমদেশ পৃথিবীতে অনন্ত জীবনের আশা এখন প্রসারিত হচ্ছে। এদের সংখ্যা অভিষিক্ত খ্রীষ্টানদের হ্রাসপ্রাপ্ত অবশিষ্টাংশকে ছাড়িয়ে গিয়েছে যাদের বাস্তবিকপক্ষে স্বর্গে যাওয়ার আশা রয়েছে। লূক ১৩:২৪ পদ মূলত তাদের প্রতি প্রযোজ্য নয় যারা স্বর্গে যাওয়ার প্রত্যাশা রাখেন না কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এটি তাদের জন্য বিজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে থাকে।
আমাদের প্রাণপণ করতে পরামর্শ দেওয়ার দ্বারা যীশু এটি বলছিলেন না যে তিনি কিংবা তাঁর পিতা আমাদের বাধা দেওয়ার জন্য আমাদের পথে প্রতিবন্ধকতাগুলি রাখেন। কিন্তু লূক ১৩:২৪ পদ থেকে আমরা বুঝি যে ঈশ্বরের চাহিদাগুলি অযোগ্য ব্যক্তিদের প্রবেশ করতে বাধা দেয়। “প্রাণপণ কর” সংগ্রাম করা, নিজেদের প্রসারিত করাকে ইঙ্গিত করে। অতএব আমরা হয়ত নিজেদের জিজ্ঞাসা করতে পারি, ‘আমি কি নিজেকে প্রসারিত করছি?’ লূক ১৩:২৪ পদকে শব্দান্তরিত করা যেতে পারে, ‘সঙ্কীর্ণ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করার জন্য আমার প্রাণপণ করা প্রয়োজন কারণ অনেকে প্রবেশ করতে চেষ্টা করবে কিন্তু পারবে না। অতএব আমি কি প্রকৃতই প্রাণপণ করছি? আমি কি প্রাচীন খেলার মাঠের একজন দৌড়বিদের মত যিনি পুরস্কার লাভ করার জন্য সর্বান্তকরণে চেষ্টা করেন? এইধরনের কোন দৌড়বিদই উৎসাহশূন্য এবং উদ্যমহীন নন। আমি কি?’
যীশুর বাক্যগুলি ইঙ্গিত করে যে কিছুজন হয়ত ‘দ্বারে প্রবেশ করিতে’ চেষ্টা করতে পারেন কেবল তাদের নিজেদের সুবিধামত, ধীর পায়ে যা তারা পছন্দ করেন। এইধরনের এক মনোভাব প্রত্যেক সাক্ষীকে প্রভাবিত করতে পারে। কেউ কেউ হয়ত যুক্তি দেখাতে পারেন, ‘আমি এমন উৎসর্গীকৃত খ্রীষ্টানদের জানি যারা বহু বছর ধরে নিজেদের প্রসারিত ও অনেক ত্যাগস্বীকার করেছিলেন; তবুও, তাদের মৃত্যুর সময় পর্যন্তও এই দুষ্ট বিধিব্যবস্থার শেষ আসেনি। সুতরাং আমি ধীর গতিতে চললে এবং আরও স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেই ভাল করব।’
এইভাবে চিন্তা করাটা সহজ কিন্তু এটি কি প্রকৃতই বিজ্ঞতাপূর্ণ? উদাহরণস্বরূপ, প্রেরিতেরা কি এইভাবে চিন্তা করেছিলেন? অবশ্যই নয়। সত্য উপাসনার জন্য তারা তাদের সমস্তই করেছিলেন—তাদের মৃত্যু পর্যন্ত। দৃষ্টান্তস্বরূপ, পৌল বলতে পেরেছিলেন: “[খ্রীষ্টকেই] আমরা ঘোষণা করিতেছি . . . আর তাঁহার যে কার্য্যসাধক শক্তি আমাতে সপরাক্রমে নিজ কার্য্য সাধন করিতেছে, তদনুসারে প্রাণপণ করিয়া আমি সেই অভিপ্রায়ে পরিশ্রমও করিতেছি।” পরে তিনি লিখেছিলেন: “ইহারই নিমিত্ত আমরা পরিশ্রম ও প্রাণপণ করিতেছি; কেননা যিনি সমস্ত মনুষ্যের, বিশেষতঃ বিশ্বাসীবর্গের ত্রাণকর্ত্তা, আমরা সেই জীবন্ত ঈশ্বরের প্রত্যাশা করিয়া আসিতেছি।”—কলসীয় ১:২৮, ২৯; ১ তীমথিয় ৪:১০.
আমরা জানি যে প্রাণপণ করার ক্ষেত্রে পৌল একেবারে সঠিক বিষয়টি করেছিলেন। পৌল যেমন বলেছিলেন তেমনই আমরা যদি বলতে পারি তাহলে আমরা প্রত্যেকে কতই না সন্তুষ্টি লাভ করব: “আমি উত্তম যুদ্ধে প্রাণপণ করিয়াছি, নিরূপিত পথের শেষ পর্য্যন্ত দৌড়িয়াছি, বিশ্বাস রক্ষা করিয়াছি।” (২ তীমথিয় ৪:৭) সুতরাং লূক ১৩:২৪ পদে লিপিবদ্ধ যীশুর বাক্যগুলির সঙ্গে মিল রেখে, আমাদের প্রত্যেকে নিজেদের জিজ্ঞাসা করতে পারি, ‘আমি কি অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের সঙ্গে চেষ্টা করছি? আমি কি পর্যাপ্ত ও নিয়মিত প্রমাণ দিই যে আমি যীশুর এই পরামর্শের প্রতি মনোযোগী: “সঙ্কীর্ণ দ্বার দিয়া প্রবেশ করিতে প্রাণপণ কর”?