তারা যিহোবার ইচ্ছা পালন করেছিলেন
দানিয়েল অবিরত ঈশ্বরের সেবা করতেন
এক রাতের মধ্যে ইতিহাসের ধারা বদলে যাওয়া বিরল। তথাপি তা ঘটেছিল সা.শ.পূ. ৫৩৯ সালে, যখন মাদীয় ও পারসিকদের দ্বারা মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে বাবিল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। সেই বছর পর্যন্ত, যিহোবার ভাববাদী দানিয়েল প্রায় ৮০ বছর যাবৎ একজন যিহূদী নির্বাসিত ব্যক্তি হিসাবে বাবিলনে ছিলেন। দানিয়েল সম্ভবত তার ৯০ বছর বয়সে, ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বস্ততার অন্যতম কঠিন পরীক্ষাটির সম্মুখীন হতে যাচ্ছিলেন।
বাবিলের পতনের পর, প্রথম দিকে মনে হয়েছিল যে দানিয়েলের জন্য পরিস্থিতি ভালই চলছিল। নতুন রাজা মাদীয় দারিয়াবস, ৬২ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তি ছিলেন, যিনি দানিয়েলকে অনুগ্রহের চোখে দেখতেন। রাজা হিসাবে দারিয়াবসের প্রথম পদক্ষেপগুলির মধ্যে একটি ছিল ১২০ জন ক্ষিতিপাল নিযুক্ত করা এবং তিন জনকে উচ্চ অধ্যক্ষের পদে উন্নীত করা।a ঐ তিন অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে দানিয়েল ছিলেন একজন। দানিয়েলের অসাধারণ ক্ষমতা দেখে দারিয়াবস তাকে এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পদ দান করতে পরিকল্পনা করেছিলেন! কিন্তু, ঠিক তখনই এমন কিছু ঘটেছিল যা আকস্মিকভাবে রাজার পরিকল্পনাকে বদলে দিয়েছিল।
এক ধূর্ত পরিকল্পনা
দানিয়েলের সহ উচ্চপদস্থ অধ্যক্ষেরা, এক বিরাট সংখ্যক ক্ষিতিপালদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি ষড়যন্ত্রমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে রাজার কাছে উপস্থিত হয়। তারা দারিয়াবসের কাছে এই শর্তযুক্ত এক আইন স্থাপন করার জন্য বিনতি জানায়: “যদি কেহ ত্রিশ দিন পর্য্যন্ত মহারাজ ব্যতীত কোন দেবতার কিম্বা মানুষের কাছে প্রার্থনা করে, তবে হে রাজন্, সে সিংহদের খাতে নিক্ষিপ্ত হইবে।” (দানিয়েল ৬:৭) এতে দারিয়াবসের হয়ত মনে হয়েছিল যে এই লোকেরা তার প্রতি তাদের বিশ্বস্ততাকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করছে। এছাড়াও তিনি হয়ত এই বিষয়েও যুক্তি করেছিলেন যে এই আইন তার অর্থাৎ এক বিদেশীর পদকে সেই অঞ্চলের প্রধান হিসাবে আরও জোরালো করবে।
কিন্তু, উচ্চপদস্থ অধ্যক্ষ এবং ক্ষিতিপালেরা রাজার জন্য এই অনুশাসনের প্রস্তাব দেননি। তারা “রাজকর্ম্মের বিষয়ে দানিয়েলের দোষ ধরিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন, কিন্তু কোন দোষ বা অপরাধ পাইলেন না; কেননা তিনি বিশ্বস্ত ছিলেন, তাঁহার মধ্যে কোন ভ্রান্তি কিম্বা অপরাধ পাওয়া গেল না।” সুতরাং, এই ধূর্ত লোকেরা যুক্তি করেন: “আমরা ঐ দানিয়েলের অন্য কোন দোষ পাইব না; কেবল তাহার ঈশ্বরের ব্যবস্থা লইয়া যদি তাহার কোন দোষ পাই।” (দানিয়েল ৬:৪, ৫) দানিয়েল প্রতিদিন যিহোবার কাছে প্রার্থনা করতেন এই বিষয়টি অবগত হওয়ায় তারা এই বিষয়টিকেই মৃত্যুজনিত অপরাধ হিসাবে অবিহিত করতে চেষ্টা করেন।
সম্ভবত উচ্চপদস্থ অধ্যক্ষ এবং ক্ষিতিপালেরা দানিয়েলের প্রতি মনে মনে বিদ্বেষভাব পোষণ করতেন, কারণ তিনি “[তাহাদের] হইতে বিশিষ্ট ছিলেন, কেননা তাঁহার অন্তরে উৎকৃষ্ট আত্মা ছিল; আর রাজা তাঁহাকে সমুদয় রাজ্যের উপরে নিযুক্ত করিতে মনস্থ করিলেন।” (দানিয়েল ৬:৩) দানিয়েলের সততা হয়ত দুর্নীতি এবং অবৈধ সুবিধালাভের বিরুদ্ধে একটি অবাঞ্ছিত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, এই লোকেরা রাজাকে সেই অনুশাসনে স্বাক্ষর করার জন্য রাজি করেছিলেন এবং এইভাবে এটিকে ‘মাদীয়দের ও পারসীকদের অলোপ্য ব্যবস্থানুসারে অপরিবর্ত্তনীয় আইনের অংশে পরিণত করেছিলেন।’—দানিয়েল ৬:৮, ৯.
দানিয়েল দৃঢ় থাকেন
নতুন সংবিধি সম্বন্ধে জানার পর দানিয়েল কি যিহোবার কাছে প্রার্থনা করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন? কখনই না! তার গৃহের কুঠরীতে নতজানু হয়ে তিনি দিনে তিনবার ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন, “যেমন পূর্ব্বে করিতেন।” (দানিয়েল ৬:১০) তিনি যখন প্রার্থনা করছিলেন, তার শত্রুরা “সমাগত হইয়া দেখিলেন, দানিয়েল আপন ঈশ্বরের নিকটে অনুরোধ ও বিনতি করিতেছেন।” (দানিয়েল ৬:১১) যখন তারা বিষয়টি রাজার দৃষ্টিগোচরে এনেছিলেন, দারিয়াবস হতাশ হয়ে পড়েছিলেন কারণ তিনি যে আইনটি স্বাক্ষর করেছিলেন তা দানিয়েলকে অভিযুক্ত করে। বিবরণটি আমাদের জানায়, “সূর্য্যাস্ত পর্য্যন্ত তাঁহাকে রক্ষা করিতে অনেক যত্ন করিলেন।” কিন্তু এমনকি রাজাও, যে আইন তিনি স্থাপন করেছিলেন তা বাতিল করতে পারতেন না। সুতরাং দানিয়েলকে সিংহের খাতে, স্পষ্টতই একটি ঢালু বা ভূগর্ভস্থ স্থানে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। রাজা দানিয়েলকে আশ্বস্ত করেছিলেন, “তুমি অবিরত যাঁহার সেবা করিয়া থাক, তোমার সেই ঈশ্বর তোমাকে রক্ষা করিবেন।”—দানিয়েল ৬:১২-১৬.
একটি নিদ্রাহীন রাত এবং উপবাসের পর, দারিয়াবস ত্বরিতগতিতে সেই খাতের কাছে গিয়েছিলেন। দানিয়েল জীবিত এবং অক্ষত ছিলেন! রাজা অবিলম্বে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। প্রতিদানে তিনি দানিয়েলের শত্রুদের এবং তাদের পরিবারবর্গকে সিংহের খাতে নিক্ষেপ করেছিলেন। এছাড়াও দারিয়াবস সেই অঞ্চলের সর্বত্র জানিয়েছিলেন যে, “আমার রাজ্যের অধীন সর্ব্বস্থানে লোকেরা দানিয়েলের ঈশ্বরের সাক্ষাতে কম্পমান হউক ও ভয় করুক।”—দানিয়েল ৬:১৭-২৭.
আমাদের জন্য শিক্ষা
দানিয়েল বিশ্বস্ততার এক উত্তম উদাহরণ ছিলেন। এমনকি রাজা যিনি যিহোবার উপাসনা করতেন না, লক্ষ্য করেছিলেন যে দানিয়েল “অবিরত” তাঁর সেবা করতেন। (দানিয়েল ৬:১৬, ২০) যে মূল অরামিক শব্দটি “অবিরত” হিসাবে অনুবাদিত হয়েছে, মূলতঃ তার অর্থ হল “একটি চক্রের মধ্যে ঘোরা।” এটি ধারাবাহিকতাকে ইঙ্গিত করে। কত উত্তমভাবেই না এটি যিহোবার প্রতি দানিয়েলের অটুট বিশ্বস্ততার বর্ণনা দেয়!
সিংহের খাতে নিক্ষিপ্ত হবার বহু পূর্বেই দানিয়েল অবিরত সেবা করার আদর্শ গড়ে তুলেছিলেন। বাবিলে একজন যুবক বন্দী হিসাবে তিনি মোশির ব্যবস্থায় নিষিদ্ধ বা পৌত্তলিক আচার দ্বারা কলুষিত অনেক খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। (দানিয়েল ১:৮) পরবর্তীকালে, তিনি সাহসের সাথে বাবিলে রাজা নবূখদ্নিৎসরের কাছে ঈশ্বরের বার্তা ঘোষণা করেছিলেন। (দানিয়েল ৪:১৯-২৫) বাবিলের পতনের মাত্র কয়েক ঘন্টা পূর্বে, দানিয়েল নির্ভয়ে রাজা বেল্শৎসরের কাছে ঈশ্বরের বিচার ঘোষণা করেছিলেন। (দানিয়েল ৫:২২-২৮) সুতরাং দানিয়েল যখন সিংহের খাতের মুখোমুখি হন, তিনি সেই বিশ্বস্ত ধারা ক্রমাগত চালিয়ে যান যা তিনি ইতিমধ্যেই স্থাপন করেছিলেন।
আপনিও যিহোবাকে অবিরত সেবা করতে পারেন। আপনি কি একজন যুবক? তাহলে, এই জগতের কুসংসর্গ এবং কলুষিত আচরণ প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে, অবিরত সেবা করার আদর্শ গড়ে তোলার জন্য এখনই কাজ করুন। যদিও আপনি কিছু সময় যাবৎ ঈশ্বরকে সেবা করে আসছেন, তবুও বিশ্বস্ততার সাথে ধৈর্য রাখার আদর্শ বজায় রাখুন। হাল ছেড়ে দেবেন না, কারণ আমরা যে প্রত্যেকটি পরীক্ষার সম্মুখীন হই, তা আমাদের এক সুযোগ দেয় যিহোবাকে দেখাতে যে তাঁকে অবিরত সেবা করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।—ফিলিপীয় ৪:১১-১৩
[পাদটীকাগুলো]
a “ক্ষিতিপাল” শব্দটি (আক্ষরিক অর্থ “রাজ্যের রক্ষাকর্তা”) পারসিক রাজার দ্বারা নিযুক্ত এক রাজ্যপালকে বোঝায়, যিনি একটি কর্তৃত্বভুক্ত জেলার প্রধান শাসক হিসাবে কাজ করেন। রাজার নথিভুক্ত প্রতিনিধি হিসাবে তিনি কর সংগ্রহ এবং রাজপ্রাসাদে রাজকর পাঠানোর কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।