পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত সাক্ষীরা
ইটা
থূলি
গডহাভ্ন
গডথাব
জুলিয়ানহাব
অ্যাংমাসালিক
থূলি হল একটি নামের অংশবিশেষ যা প্রাচীনকাল থেকে কোন ভৌগলিক বা অন্যকিছুর ক্ষেত্রে এক চরম লক্ষ্যকে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। আজ থূলি হল একটি গ্রামের নাম যা পৃথিবীর সবচাইতে বড় দ্বীপ, গ্রীণল্যান্ডের সুদূর উত্তরে অবস্থিত। ১৯১০ সালে গ্রামটিকে এইভাবে নামকরণ করা হয়েছিল যখন একজন ডেন জাতীয় আবিষ্কারক, নূট্ রাসমুসেন, মেরুসংক্রান্ত অভিযানে এটিকে এক কেন্দ্রস্থান হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। এমনকি আজও, থূলিতে যাওয়া কোন বিলাসভ্রমণ নয়, বরঞ্চ এটি এক অভিযানের তুল্য।
তবুও, থূলির অভিমুখে অভিযান করার এক জরুরী প্রয়োজন আছে। “পৃথিবীর প্রান্ত পর্য্যন্ত আমার সাক্ষী হইবে,” যীশুর এই আদেশে সাড়া দিতে যিহোবার সাক্ষীরা, পৃথিবীর সবচাইতে উত্তরে অবস্থিত এই স্থানে, স্থায়ী মনুষ্য বসতির এই গ্রামগুলিতে ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার নিয়ে আসতে আগ্রহী।—প্রেরিত ১:৮; মথি ২৪:১৪.
‘কখন আমরা থূলিতে যেতে পারি?’
১৯৫৫ সালে ডেন জাতীয় দুজন সাক্ষী যারা “পৃথিবীর প্রান্ত পর্য্যন্ত” প্রচারে অংশ নিতে চেয়েছিল তারা গ্রীণল্যাণ্ডে এসে পৌঁছায়। এরপর আরও কিছু ব্যক্তি সেখানে আসে এবং ক্রমশ তাদের প্রচার কাজ মেলভিল উপসাগরের দক্ষিণ ও পশ্চিম কূল পর্যন্ত এবং অংশত পূর্ব উপকূলে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু থূলির মত আরও সুদূর প্রান্তে কেবলমাত্র চিঠি অথবা দূরভাষের মাধ্যমেই পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল।
একদিন ১৯৯১ সালে, বো ও তার স্ত্রী হেলেন, দুজন পূর্ণ-সময়ের পরিচারক, মেলভিল উপসাগরের সামনে অবস্থিত একটি প্রস্তরখণ্ডের উপরে দাঁড়িয়েছিল। উত্তর প্রান্তে তাকিয়ে তারা চিন্তা করতে থাকে, ‘কবে আমরা রাজ্যের সুসমাচার নিয়ে থূলির লোকেদের কাছে পৌঁছাতে পারবো?’
১৯৯৩ সালে, ওয়ারনার, আরেকজন পূর্ণ-সময়ের পরিচারক, তার ৫.৫-মিটারের স্পিডবোট কামানেক এর (আলো) সাহায্যে মেলভিল উপসাগর অতিক্রম করার চেষ্টা করে। সে ইতিমধ্যেই গডথাব থেকে শুরু করে উপারনাভিক অঞ্চল পর্যন্ত ১,২০০ কিলোমিটার জলপথ অতিক্রম করে ফেলে। তবুও, মেলভিল উপসাগর—৪০০ কিলোমিটার ব্যাপী উন্মুক্ত সুমেরুর জল—অতিক্রম করা একেবারেই আলাদা ব্যাপার। বছরের অধিকাংশ সময়ে, উপসাগরটি বরফের দ্বারা পূর্ণ থাকে। ওয়ারনার এই উপসাগরটিকে অতিক্রম করতে সফল হয়, যদিও বরফের দরুন তার একটি ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। আর ফিরে আসার আগে সে কিছুটা প্রচার কাজ করতে পেরেছিল।
থূলির উদ্দেশ্যে যাত্রা
সেই অভিযানটির পর, ওয়ারনার নতুন এক পরিকল্পনা করতে শুরু করে। সে আর্নি ও ক্যারিন—যাদের কাছেও চারটি শয়নস্থান সমেত সাত মিটার দীর্ঘ, একটি নৌকা ছিল, আর সবচাইতে বড় বিষয় হল যে এর মধ্যে আধুনিক দিক্নিরীক্ষণ যন্ত্র ছিল—তাদের সঙ্গে এক সাথে থূলি যাওয়ার অভিযান সম্পর্কে কথা বলে। নৌকাগুলির মধ্যে থাকার ব্যবস্থা থাকবে এবং দুটি নৌকা একসাথে চলার ফলে মেলভিল উপসাগর পার হওয়ার ঝুঁকি অনেকটা হ্রাস পাবে। ৬০০ জন অধিবাসীসহ প্রধান শহরটি এবং সেই এলাকার ছয়টি গ্রামে পৌঁছানোর জন্য তাদের আরও বেশি সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। অতএব তারা তাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য বো এবং হেলেন আর জরগেন ও ইন্গেকে আমন্ত্রণ জানায়—যারা সকলেই অভিজ্ঞ পরিচারক ছিল এবং এই দেশগুলিতে ভ্রমণ করার সাথে পরিচিত ছিল। এই দলের মধ্যে পাঁচজন গ্রীণল্যাণ্ডের ভাষা বলতে পারত।
তারা আগে থেকে বাইবেল সাহিত্যাদি পাঠিয়ে দিয়েছিল। এছাড়াও নৌকার মধ্যে ছিল সাহিত্য, সেইসাথে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও জল, জ্বালানি, বারতি একটি ইঞ্জিন এবং রবারের একটি ডিঙ্গি। এরপর, অনেক মাস ধরে প্রস্তুতিকরণের পর, আগস্ট ৫, ১৯৯৪ সালে, দলটি একত্রিত হয় এবং দুটি নৌকাই যাত্রা করার জন্য তৈরি থাকে এবং লুলিসাটের বন্দরে এগুলির উপর মাল বোঝাই করা হয়। উত্তরমুখী যাত্রা শুরু হয়। ওয়ারনার, বো আর হেলেন দুটি ছোট নৌকার মধ্যে করে যাত্রা শুরু করে। “আপনি কেবলমাত্র কিছু ধরে ঐ শয়নস্থানটিতে বসে অথবা শুয়ে থাকতে পারেন,” বো লেখেন। আসুন আমরা সেই যাত্রাপথের নৌকাটিকে অনুসরণ করি।
“বিস্তৃত পথ জুড়ে শান্ত সমুদ্র। আমাদের চোখের সামনে এক মনোরম দৃশ্য প্রকাশ পায়—দেদীপ্যমান সমুদ্র, ঘন কুয়াশা, উজ্জ্বল সূর্য ও নীল আকাশ, বিভিন্ন রঙ ও আকারের তূষারস্তূপ, বাদামি রঙের সিন্ধুঘোটক ভাসমান তুষারস্তুপের উপর বসে রৌদ্র পোহাচ্ছে, উপকূলের উপর রয়েছে ঘন পাহাড়ের ঢাল ও সমতলভূমি—বিরামহীন দৃশ্যের পরিবর্তন।
“অবশ্য, সবচাইতে আগ্রহের বিষয় ছিল যাত্রা পথে গ্রামগুলিকে পরিদর্শন করা। চারদিকে লোক, সাধারণত শিশুরা, উঁকি মেরে দর্শনার্থীদের দেখছিল এবং তাদের সম্ভাষণ জানানোর জন্য প্রস্তুত ছিল। আমরা বাইবেল সাহিত্যাদি তাদের বন্টন করি এবং আমাদের সংগঠন সম্বন্ধে লোকেদের কাছে ভিডিও প্রদর্শন করি। আমরা সেই স্থানটি ত্যাগ করার আগে অধিকাংশের পক্ষে এটি দেখা সম্ভব হয়েছিল। দক্ষিণ উপারনাভিকে, কিছু লোক, আমরা ফিরে আসার আগেই আমাদের নৌকার কাছে এসে উপস্থিত হয়েছিল। অতএব সারা বিকেলে, আমাদের নৌকায় অনেক অতিথিরা আসে এবং আমরা বহু বাইবেল প্রশ্নের উত্তর দিই।”
এবার, প্রথম ৭০০ কিলোমিটার যাত্রা করার পর, দুটি নৌকা মেলভিল উপসাগর অতিক্রম করার জন্য প্রস্তুত হয়।
এক কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা
“এটিকে অভিযানের সবচাইতে কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসাবে গণ্য করা হয়েছিল। আমাদের একনাগাড়ে জলপথ অতিক্রম করতে হয়েছিল কারণ সাভিসিভিক গ্রামটি (যেখান থেকে এলাকা শুরু এবং যেখানে হয়ত আমরা আশ্রয় পেতে পারতাম) তখনও বরফের দ্বারা পূর্ণ ছিল।
“সুতরাং আমরা যাত্রা শুরু করি। যেহেতু অনেক বরফ ছিল, তাই আমরা উন্মুক্ত সমুদ্রের উপর ভেসে চলি। সৌভাগ্যবশত, জল ছিল শান্ত। প্রথম বেশ কিছু ঘন্টা ধরে কোন ঘটনা ঘটেনি—সমুদ্রের উপর মাইলের পর মাইল আমরা এগিয়ে চলি। বিকেলের দিকে কেইপ ইয়র্ক আমাদের দৃষ্টির নাগালে আসে এবং আমরা ধীর গতিতে উত্তর অভিমুখে, স্থলের কাছাকাছি ফিরি। আবার সেখানে বরফ দেখা যায়—যতদূর আমাদের দৃষ্টি পৌঁছায় আমরা পুরনো, ঘন এবং গলিত বরফের চাঁই দেখতে পাই। অনেকক্ষণ ধরে এক নাগাড়ে আমরা বরফের ধার দিয়ে দূরের দিকে চলতে থাকি, এক একসময় ছোট ছোট সরু জলপথগুলিকে অতিক্রম করতে হয়। এছাড়াও সেখানে ছিল কুয়াশা, ঘন ছাই রঙের ঘোলাটে ধোঁয়া এবং হালকা সূর্যের আলোয় এটিকে অপূর্ব লাগছিল। আর ছিল ঢেউ! কুয়াশা, ঢেউ ও বরফ তিনটেই এক সাথে—এর মধ্যে যে কোন একটি সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য যথেষ্ট।”
আমাদের প্রতি অভ্যর্থনা
“পিটুফিকের কাছাকাছি আসার সময় আমরা শান্ত জলের মধ্যে প্রবেশ করি। সৃষ্টি আমাদের এক অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা জানায়: সূর্য নীল আকাশের অতি উচ্চে অবস্থিত ছিল; ঠিক আমাদের সামনে, প্রশস্ত, উজ্জ্বল নালী, ভাসমান তুষার পর্বতের দ্বারা খচিত; এবং বেশকিছু দূরে ডানডাস—অর্থাৎ প্রাচীন থূলিতে অবস্থিত একটি প্রস্তরখণ্ডের বৈশিষ্ট্যময় অংশবিশেষ। উত্তরের প্রায় আরও ১০০ কিলোমিটার দূরে ভ্রমণার্থীরা পরিশেষে তাদের গন্তব্য স্থানে এসে পৌঁছায়।
এখন তারা ঘরে ঘরে প্রচার করার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এদের মধ্যে দুজন তাদের প্রথম ঘরে রূঢ় ব্যবহার পায়। “আমাদের এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয় যেন আমরা ডেনমার্কে রয়েছি,” তারা বলে। “কিন্তু অধিকাংশ আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানায়। সেখানকার লোকেরা চিন্তাশীল ও তথ্যাভিজ্ঞ ছিল। কয়েকজন উল্লেখ করে যে তারা আমাদের সম্বন্ধে শুনেছিল এবং আমরা যে অবশেষে আসতে পেরেছি এর জন্য তারা খুব খুশি হয়েছিল। আমাদের কয়েকজন উত্তম লোকেদের সাথে দেখা হয়, যেমন সিলার্সরা, যারা উত্তর মেরুতে অভিযান চালিয়েছিল এবং আদিম অধিবাসীরা যারা তৃপ্ত ও মিতব্যয়ী, যদিও আধুনিক সভ্যতার প্রতি খানিকটা সন্দিগ্ধ।”
পরবর্তী কয়েকটি দিন আমাদের সকলের জন্য কিছু উত্তম অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে। সর্ব জায়গায় বাইবেল সাহিত্যাদি উপলব্ধিসহকারে গৃহীত হয়। বেশ কিছু গৃহে সাক্ষীরা সরাসরি বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করতে সমর্থ হয়। ইন্গে একটি গৃহের কথা বলে যেখানে সে আগ্রহ দেখতে পায়: “সেটি ছিল একটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এক কামরার ঘর। তিন দিন ধরে এক নাগাড়ে আমরা একজন নম্র ব্যক্তির কাছে যাই এবং সে আমাদের কাছে খুব প্রিয় হয়ে ওঠে। সে ছিল একজন প্রকৃত সিলার্স এবং তার ঘরের বাইরে কাইয়াক থাকতো। সে অনেক সুমেরু ভাল্লুক, সিন্ধুঘোটক আর অবশ্যই শীলমাছ হত্যা করেছে। আমাদের শেষ সাক্ষাতে আমরা তার সাথে প্রার্থনা করি আর তার চোখ জলে ভরে যায়। এখন আমাদের উচিত সমস্ত কিছু যিহোবার হাতে ছেড়ে দেওয়া এবং সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকা।”
থূলিতে প্রায়ই কানাডার এস্কিমোরা আসে। ইন্গে জানায়: “হেলেন আর আমি কানাডার থেকে আসা কিছু এস্কিমোদের সাথে পরিচিত হই। এটা খুব আগ্রহের বিষয় যে তারা গ্রীণল্যাণ্ডবাসীদের সাথে কথোপকথন করতে পারে; মেরু অঞ্চলের লোকেরাও মনে হয় একই ধরনের ভাষা বলে থাকে। যদিও কানাডার এস্কিমোদের নিজস্ব লিখিত ভাষা আছে, কিন্তু তারা গ্রীণল্যান্ডিক ভাষায় লিখিত আমাদের সাহিত্যগুলি পড়তে পারে। এটা হয়ত তাদের জন্য এক উৎসাহজনক সুযোগ খুলে দিতে পারে।”
নৌকাতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গ্রামগুলিতেও পরিদর্শন করা হয়। “কোয়েকারটাট গ্রামে যাওয়ার পথে আমরা উপকূলস্থ অঞ্চলের খুব পাশ দিয়ে হেঁটে যাই এই আশা করে যে যদি আমাদের সাথে বিশাল তিমিমাছ শিকাররত লোকেদের সাথে দেখা হয়। ঠিক যেমন আমরা আশা করেছিলাম একটি প্রস্তরখণ্ডের পাশে আমরা একটি তাঁবু দেখতে পাই, যার মধ্যে ছিল পশম পরিহিত তিনটি অথবা চারটি পরিবার আর তাদের সাথে ছিল নিজস্ব তাঁবু ও কায়য়াক। হাতে হারপুন নিয়ে, পুরুষেরা সেই প্রস্তরের উপর বসে ছিল অত্যন্ত লোভনীয় তিমিমাছগুলি দেখার জন্য। ইতিমধ্যেই অনেকদিন নিরর্থক অপেক্ষা করার পর, তারা আমাদের দেখে খুশি হল না কারণ আমাদের উপস্থিতিতে হয়ত তিমিমাছগুলি ভয় পেয়ে সরে যাবে! তারা সম্পূর্ণরূপে নিজেদের নিয়েই মগ্ন ছিল। স্ত্রীলোকেরা কয়েকটি সাহিত্য গ্রহণ করে, কিন্তু আরও কথা বলার জন্য সেটা উপযুক্ত সময় ছিল না। অবশেষে আমরা কোয়েকারটাটে রাত ১১টায় এসে পৌঁছাই এবং পরের দিন সকালে ২টার মধ্যে শেষ গ্রামটির পরিদর্শন সমাপ্ত করে ফেলি!”
“পরিশেষে আমরা সিয়োরাপালুক গ্রামে এসে পৌঁছাই, যা গ্রীণল্যান্ডের সবচাইতে উত্তরের বসতি। এটি সবুজ ঘাস দ্বারা বেষ্টিত প্রস্তরগুলির নিচে একটি বালুকাময় সমুদ্র সৈকতের উপর অবস্থিত, যেখানে সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়া থাকে।” সাক্ষীরা বলতে গেলে তাদের প্রচারের ক্ষেত্রে প্রায় আক্ষরিকভাবে পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে, অন্ততপক্ষে উত্তরাঞ্চলে।
যাত্রার সমাপ্তি
সাক্ষীরা তাদের কাজ সম্পাদন করেছে। তারা গৃহ থেকে গৃহে, এক তাঁবু থেকে আরেক তাঁবুতে প্রচার করেছে, সাহিত্যাদি অর্পণ করেছে, গ্রাহকভুক্তি অর্জন করেছে, ভিডিও প্রদর্শন করেছে, বহু গ্রীণল্যাণ্ডবাসীদের সাথে কথা বলেছে এবং বাইবেল অধ্যয়ন পরিচালনা করেছে। এখন বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় আসে। “সেইদিন বিকালে আমরা যখন মরিউসাক গ্রাম ছেড়ে আমাদের ডিঙ্গিতে উঠি, অনেক লোক আমাদের বিদায় জানাবার জন্য সৈকতে এসেছিল এবং বই ও ব্রোশার, যেগুলি তারা কিনেছিল সেগুলি দিয়ে তারা আমাদের অভিনন্দন জানিয়েছিল।”
এরপর, উপকূলের একটি নির্জন স্থানে, একটি প্রস্তরখণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে একজন ব্যক্তিকে অভিনন্দন করতে দেখে সাক্ষীরা অবাক হয়ে যায়—এমন একটি নির্জন স্থান যেখানে কেউ নেই! “অবশ্যই, তার সাথে কথা বলার জন্য আমরা তীরের কাছে এগিয়ে যাই। সে ছিল জার্মানির বার্লিন থেকে আসা এক যুবক ব্যক্তি, যে তার কাইয়াকের সাহায্যে উপকূলে প্রায় একমাস যাবৎ ভ্রমণ করছিল। জার্মানিতে যিহোবার সাক্ষীরা তার কাছে নিয়মিত আসত এবং তার কাছে তাদের অনেক বই রয়েছে। আমরা কয়েক ঘন্টা তার সাথে কাটাই এবং এইধরনের জায়গায় যিহোবার সাক্ষীদের দেখে সে খুবই অভিভূত হয়েছিল।”
সাভিসভিক গ্রাম, যেখানে যাওয়া সম্ভবপর হয়নি, সেখানে একজন ভ্রমণ পরিচালক অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা পান। সেখানে কয়েকজন গত বছরে কয়েকটি সাহিত্য পায় ও পড়ে এবং আরও আধ্যাত্মিক খাদ্যের জন্য তারা ক্ষুধার্ত ছিল।
ফিরে আসার সময় মেলভিল উপসাগর অতিক্রম করতে ১৪ ঘন্টা লাগে। “আমরা সূর্যাস্ত দেখতে পাই, যে অভিজ্ঞতার আবেশ এখানে বহু ঘন্টা ধরে চলতে থাকে, এক অন্তহীন রঙের বৈচিত্র্য। এরপরেই যে সূর্যোদয় ঘটে, সেটাও অনেক সময় লাগে। একধারে যেখানে সূর্যাস্ত লাল ও ঘন লালের রঙ দিয়ে উত্তর পশ্চিম আকাশকে ঢেকে রাখে অন্যদিকে দক্ষিণ প্রান্তে সূর্য একটুখানি উদয় হতে থাকে। এটি এমন একটি দৃশ্য যা বর্ণনা করা অসম্ভব—অথবা এর ছবি নেওয়া—উপযুক্তরূপে সম্ভব নয়।” দলটি সারারাত জেগে থাকে।
“কুলোরসাকে পৌঁছানোর পর, আমরা খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু আমরা আনন্দিত ও তৃপ্ত ছিলাম। আমরা সফলতার সাথে যাত্রা সম্পাদন করি! যাত্রার বাদবাকি অংশে, আমরা উপকূলবর্তী বিভিন্ন শহর ও গ্রামের মধ্যে বেশি আগ্রহ দেখতে পাই। একটি প্রশ্ন প্রায়ই করা হয়েছিল, ‘আপনাদের মধ্যে কয়েকজন আমাদের সাথে থেকে যান না কেন? আপনারা এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন দেখে আমাদের দুঃখ হচ্ছে!’”
কারসাটে একটি বন্ধুত্বসুলভ পরিবার অতিথিদের মধ্যে পাঁচ জনকে তাদের সাথে ভোজন করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। “পরিবারটি চায় যে আমরা যেন তাদের সাথে রাত কাটাই। কিন্তু যেহেতু ৪০ কিলোমিটার দূরে নৌকা রাখার এক উত্তম ব্যবস্থা আছে তাই আমরা প্রত্যাখ্যান করি এবং নৌকা নিয়ে এগিয়ে যাই। পরে আমরা জানতে পারি যে এক বিরাট তুষারস্তূপ পরের দিন সকালে যেখানে আমরা ছিলাম সেখানে এসে পড়ে এবং ১৪টি ছোট নৌকাকে আটকে ফেলে!”
পরিশেষে, দলটি লুলিসাটে এসে পৌঁছায় এবং তাদের থূলির অভিযান সমাপ্ত করে। প্রায় একই সময়, আরও দুজন প্রকাশক গ্রীণল্যাণ্ডের পূর্ব তীরের এক নির্জন স্থানে প্রস্থান করে। সেই দুটি যাত্রায়, প্রকাশকেরা মোট প্রায় ১,২০০টি বই, ২,১৯৯টি ব্রোশার এবং ৪,২২৪টি পত্রিকা বন্টন করে এবং ১৫২টি গ্রাহকভুক্তি অর্জন করে। বহু নব আগ্রহী ব্যক্তিদের সাথে এখন টেলিফোন ও চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখা হয়েছে।
সময়, শক্তি ও অর্থ অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও, যিহোবার সাক্ষীরা তাদের প্রভুর আদেশ “পৃথিবীর প্রান্ত পর্য্যন্ত আমার সাক্ষী হইবে,” তা পালন করার মাধ্যমে অত্যন্ত আনন্দ খুঁজে পায়।—প্রেরিত ১:৮.
[২৮ পৃষ্ঠার বাক্স]
গ্রীণল্যাণ্ডের পূর্ব তীরে
প্রায় একই সময় যখন প্রকাশকদের একটি দল থূলিতে পৌঁছায় একটি সাক্ষী দম্পতি, ভিগো ও সোন্জা, আরেকটি অঞ্চলে অভিযান চালায় যেখানে কাজ হয়নি—ইট্টোকোরটুরমিট (স্কোর্সবাইসুন্ড) গ্রীণল্যাণ্ডের পূর্ব তীরবর্তী এলাকা। সেখানে পৌঁছানোর জন্য তাদের আইসল্যান্ডের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে, একটি উড়োজাহাজে কন্সটাবেল পয়েন্টে ফিরতে হবে যা গ্রীণল্যান্ডের তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এবং তার পর হেলিকপ্টারে করে সেখানে পৌঁছাতে হবে।
“এটা ছিল প্রথমবার যখন যিহোবার সাক্ষীরা এখানে এসেছিল,” এই দুজন অগ্রগামী বর্ণনা করে যাদের মাতৃভাষা হল গ্রীণল্যাণ্ডিক। “নির্জনে থাকা সত্ত্বেও, এটা আশ্চর্যের বিষয় যে লোকেরা খুবই তথ্যাভিজ্ঞ। তবুও, তারা নতুন কিছু শিখতে পেরে খুশি। গল্প বলার প্রতিভা থাকার দরুন, তারা আগ্রহের সাথে কিভাবে তারা তিমিমাছ ধরে এবং তাদের প্রকৃতি সম্বন্ধীয় অন্যান্য অভিজ্ঞতাগুলি আমাদের জানায়।” প্রচার কাজের প্রতি তারা কিভাবে সাড়া দিয়েছিল?
“গৃহ থেকে গৃহে প্রচার করার সময় আমাদের সাথে দেখা হয় জে——, যে হল একজন ক্যাটিকিস্ট। ‘আপনাদের পরিদর্শনের তালিকাতে আমার নামকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই,’ সে বলে। আমরা তাকে আমাদের সাহিত্য দেখাই এবং বুঝিয়ে দিই যে কিভাবে এগুলিকে ব্যবহার করতে হয়। পরের দিন সে আমাদের কাছে আসে এবং যিহোবার নাম সম্বন্ধে জানতে চায়। তার গ্রীণল্যাণ্ডিক বাইবেল থেকে আমরা তাকে পাদটীকা দেখাই যেখানে এই বিষয় সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করা আছে। যখন আমরা চলে আসি তখন সে নূকে আমাদের বন্ধুদের টেলিফোন করে আমাদের পরিদর্শনের জন্য ধন্যবাদ জানায়। আমাদের অবশ্যই ক্রমাগতভাবে এই ব্যক্তিটিকে সাহায্য করে যাওয়া উচিত।
“এছাড়াও আমাদের ও——, সাথে দেখা হয়, একজন শিক্ষক যিনি যিহোবার সাক্ষীদের সাথে পরিচিত। তিনি আমাদের দুই ঘন্টা সময় দেন তার ক্লাসের ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়স্কদের সাথে কথা বলতে। অতএব আমরা তাদের আমাদের ভিডিও দেখাই ও তাদের প্রশ্নগুলির উত্তর দিই। যুবক যুবতীদের জিজ্ঞাস্য—যে উত্তরগুলি কাজ করেa ও অন্যান্য বইগুলি আগ্রহের সাথে গৃহীত হয়। পরে আমরা এদের মধ্যে তিনটি মেয়ের সাথে দেখা করি। তাদের নানাধরনের প্রশ্ন ছিল আর এদের মধ্যে একজন বিশেষভাবে আগ্রহী ছিল। মেয়েটি জিজ্ঞাসা করে, ‘কী করে একজন সাক্ষী হতে পারে? আপনাদের মতো হওয়া নিশ্চয়ই খুব উত্তম হবে। আমার বাবাও আপনাদের সমর্থন করে।’ আমরা প্রতিশ্রুতি দিই যে আমরা তাকে চিঠি লিখব।
“এই গ্রামগুলির মধ্যে আমাদের সাথে আরেকটি ক্যাটেকিস্টের দেখা হয়, এম——, এবং তার সাথে আমাদের এক আগ্রহজনক আলোচনা হয়। সে নিশ্চিতভাবে জানায় যে লোকেরা যারা শিকার করতে গেছে তারা যাতে ফিরে এসে আমাদের সাহিত্যাদি পেতে পারে। এখন সেই সুদূর প্রান্তে সে আমাদের একজন ‘প্রকাশক।’”
যদিও এটি এক পরিবেষ্টিত ও ক্লান্তিকর যাত্রা ছিল, দুজন অগ্রগামী উপলব্ধি করে যে তাদের এই যাত্রা খুবই পুরস্কারদায়ক হয়েছিল।
[পাদটীকাগুলো]
a ওয়াচটাওয়ার বাইবেল অ্যান্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটির দ্বারা প্রকাশিত।