তারা যিহোবার ইচ্ছা পালন করেছিলেন
মোশি এবং হারোণ—ঈশ্বরের বাক্যের নির্ভীক ঘোষণাকারী
দৃশ্যটি কল্পনা করুন: আশি বছরের বৃদ্ধ মোশি ও তার ভাই হারোণ, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি—মিশরের ফরৌণের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মিশরীয়দের কাছে এই ব্যক্তি একজন ঈশ্বরের প্রতিনিধির চেয়েও বড়। তারা বিশ্বাস করে যে তিনি স্বয়ং একজন ঈশ্বর। তাকে দেখা হত পুনরায় দেহধারনকারী হোরাসরূপে, যে ছিল বাজপাখির মস্তক বিশিষ্ট এক দেবতা। মিশরের দেব দেবীদের মধ্যে আইসিস ও ওসিরিসকে নিয়ে হোরাস আদর্শ ত্রিত্ব গঠন করেছিল।
যে কোন ব্যক্তি ফরৌণের সাক্ষাতে গেলে অবশ্যই লক্ষ্য করত যে এক অশুভ লক্ষণপূর্ণ গোখরো সাপের মাথা তার মুকুটের মাঝখান থেকে অভিক্ষিপ্ত হচ্ছে। অনুমান করা হয় যে, এই সাপটি আগুন নিক্ষেপ করত ও ফরৌণের যে কোন শত্রুর উপর ধ্বংস নিয়ে আসতে পারত। এখন মোশি ও হারোণ এই ঈশ্বররূপ রাজার সামনে অপ্রত্যাশিত অনুরোধ নিয়ে উপস্থিত—যে যেন সে ইস্রায়েলীয় দাসদের ছেড়ে দেয় যাতে তারা তাদের ঈশ্বর যিহোবার উদ্দেশ্যে উৎসব পালন করতে পারে।—যাত্রাপুস্তক ৫:১.
যিহোবা আগেই ভাববাণী করেছিলেন যে ফরৌণের হৃদয় কঠিন করা হবে। সুতরাং, মোশি ও হারোণ তার অবজ্ঞাপূর্ণ উত্তরে আশ্চর্য হননি: “সদাপ্রভু কে, যে আমি তাহার কথা শুনিয়া ইস্রায়েলকে ছাড়িয়া দিব? আমি সদাপ্রভুকে জানি না, ইস্রায়েলকেও ছাড়িয়া দিব না।” (যাত্রাপুস্তক ৪:২১; ৫:২) তাই নাটকীয় সংঘর্ষের ক্ষেত্র তৈরি হয়। পরের সাক্ষাতে মোশি ও হারোণ ফরৌণের সামনে বিস্ময়কর প্রমাণ উপস্থিত করেছিলেন দেখাতে যে তারা সত্য ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে
যিহোবার দ্বারা নির্দেশিত হয়ে হারোণ এক অলৌকিক কাজ সম্পাদন করেন যা মিশরের দেবতাদের উপর যিহোবার সর্বোচ্চতাকে প্রমাণ করে। তিনি তার যষ্টি ফরৌণের সামনে ফেলেছিলেন আর তখনই সেটা একটি বড় সাপে পরিণত হয়েছিল! এই অলৌকিক কাজ দেখে বিভ্রান্ত হয়ে ফরৌণ তার মন্ত্র-বেত্তাদের ডাকে।a মন্দ শক্তির সাহায্যে এই লোকেরা তাদের যষ্টি দিয়ে অনুরূপ কিছু করতে পেরেছিল।
যদিও ফরৌণ ও তার পুরোহিতরা উল্লাসিত হয়েছিল কিন্তু তা ছিল মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য। তাদের অবস্থার কথা চিন্তা করুন যখন হারোণের সাপ তাদের সাপগুলিকে একটার পর একটা গিলে ফেলে! সমস্ত বিষয় দেখিয়েছিল মিশরীয় দেবতারা কোনভাবেই সত্য ঈশ্বর যিহোবার সমতুল্য নয়।—যাত্রাপুস্তক ৭:৮-১৩.
কিন্তু, এই ঘটনার পরেও ফরৌণের মন কঠিন ছিল। কেবলমাত্র ঈশ্বর মিশরের উপর দশটি বিধ্বংসী দুর্দশা বা আঘাত আনার পরই পরিশেষে ফরৌণ মোশি ও হারোণকে বলেছিল: “তোমরা উঠ, ইস্রায়েল-সন্তানদিগকে লইয়া আমার প্রজাদের মধ্য হইতে বাহির হও, তোমরা যাও, তোমাদের কথানুসারে সদাপ্রভুর সেবা কর গিয়া।”—যাত্রাপুস্তক ১২:৩১.
আমাদের জন্য শিক্ষা
কী মোশি ও হারোণকে মিশরের শক্তিশালী ফরৌণের সামনে উপস্থিত হতে সাহায্য করেছিল? প্রথমে “জড়মুখ ও জড়জিহ্ব” হওয়ার দাবি জানিয়ে মোশি তার ক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসের অভাব প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি যিহোবার সাহায্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েও তিনি বিনয়পূর্বক বলেছিলেন: “যাহার হাতে পাঠাইতে চাও, পাঠাও।” আরেক কথায়, মোশি ওজর দেখিয়েছিলেন যেন ঈশ্বর অন্য কাউকে পাঠান। (যাত্রাপুস্তক ৪:১০, ১৩) তবুও তাঁর কার্যভার সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞা ও শক্তি যুগিয়ে যিহোবা নম্র মোশিকে ব্যবহার করেছিলেন।—গণনাপুস্তক ১২:৩.
আজকেও, যিহোবা ও যীশু খ্রীষ্টের দাসেরা “সমুদয় জাতিকে শিষ্য কর” এই আদেশ পালন করছেন। (মথি ২৮:১৯, ২০) এই কাজের পরিপূর্ণতায় আমাদের অংশ সম্পন্ন করতে, শাস্ত্রীয় জ্ঞান ও যে কোন ক্ষমতা আমাদের থাকে তার উত্তম ব্যবহার আমাদের করা উচিত। (১ তীমথিয় ৪:১৩-১৬) আমাদের অযোগ্যতাকে বড় করে দেখার পরিবর্তে আসুন যিহোবার দেওয়া যে কোন কার্যভারকে বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করতে আমরা যেন প্রস্তুত থাকি। তাঁর ইচ্ছা পালন করার জন্য তিনি আমাদের যোগ্য ও শক্তিশালী করতে পারেন।—২ করিন্থীয় ৩:৫, ৬; ফিলিপীয় ৪:১৩.
মোশি যেহেতু মনুষ্য ও মন্দ শক্তির বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তার নিশ্চয়ই অতিমানবীয় সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছিল। ফলস্বরূপ, যিহোবা তাকে নিশ্চিত করেছিলেন: “দেখ, আমি ফরৌণের কাছে তোমাকে ঈশ্বরস্বরূপ করিয়া নিযুক্ত করিলাম।” (যাত্রাপুস্তক ৭:১) হ্যাঁ, মোশির ঐশিক কর্তৃত্ব ও সমর্থন ছিল। যিহোবার আত্মা তার উপর থাকায় মোশির ফরৌণ ও ওই গর্বিত শাসক বাহিনীকে ভয় করার কোন কারণ ছিল না।
আমাদেরও অবশ্যই আমাদের পরিচর্যা সম্পন্ন করার জন্য যিহোবার পবিত্র আত্মা বা কার্যকারী শক্তির উপর নির্ভর করা উচিত। (যোহন ১৪:২৬; ১৫:২৬, ২৭) ঐশিক সমর্থনে আমরা দায়ূদের কথাগুলির প্রতিধ্বনি করতে পারি, যিনি গেয়েছিলেন: “আমি ঈশ্বরে নির্ভর করিয়াছি, ভয় করিব না; মনুষ্য আমার কি করিতে পারে?”—গীতসংহিতা ৫৬:১১.
তাঁর করুণার জন্য যিহোবা মোশিকে তার কার্যভার সম্পন্ন করার জন্য একা ছেড়ে দেননি। বরং ঈশ্বর বলেছিলেন: “তোমার ভ্রাতা হারোণ তোমার ভাববাদী হইবে। আমি তোমাকে যাহা যাহা আদেশ করি, সে সকলই তুমি বলিবে; এবং তোমার ভ্রাতা হারোণ ফরৌণকে তাহা বলিবে।” (যাত্রাপুস্তক ৭:১, ২) মোশি যুক্তিসঙ্গতভাবে যা করতে পারতেন সেই সীমিত কার্যভার তাকে দেওয়া, যিহোবার এক প্রেমের পরিচায়ক।
ঈশ্বর আমাদের সঙ্গ হিসাবে সহখ্রীষ্টানদের যুগিয়েছেন যারা সর্বোচ্চ ঈশ্বর যিহোবার সাক্ষী হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা গ্রহণ করেছে। (১ পিতর ৫:৯) বাধা সত্ত্বেও আমরা তার সম্মুখীন হতে পারি, সুতরাং আসুন আমরা মোশি ও হারোণের মত হই—যারা ঈশ্বরের বাক্যের নির্ভীক ঘোষণাকারী ছিলেন।
[পাদটীকাগুলো]
a ইব্রীয় শব্দ “মন্ত্রবেত্তা” কে বর্ণনা করে জাদুকরদের একটি দল হিসাবে যারা দাবি করে মন্দ আত্মিক প্রাণীদের ছাড়াই তারা অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী। এটা বিশ্বাস করা হত যে এই লোকেরা মন্দ আত্মাদের বাধ্য করার জন্য মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারত এবং এই জাদুকরদের উপর মন্দ আত্মাদের কোন ক্ষমতা ছিল না।
[২৫ পৃষ্ঠার চিত্র]
মোশি ও হারোণ ফরৌণের সামনে সাহসের সাথে যিহোবাকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন