আনন্দহীন এক জগতে আনন্দিত
“এই শতাব্দীর চরম মন্দতার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, এটি হল এক শয়তানের শতাব্দী,” ১৯৯৫ সালের ২৬শে জানুয়ারির দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস এর একটি সম্পাদকীয় বিভাগ এই অভিব্যক্তিটি দিয়ে প্রবন্ধটি শুরু করে। “বিগত কোন যুগে লোকেরা সম্প্রদায়, ধর্ম অথবা শ্রেণীর জন্য কোটি কোটি মানুষকে হত্যা করার প্রতি এতটা প্রবণতা ও স্পৃহা প্রকাশ করেনি।”
নাজির মৃত্যুজনক ক্যাম্পগুলিতে কারাবদ্ধ নির্দোষ ব্যক্তিদের মুক্তির ৫০তম বার্ষিকীতে সম্পাদকীয় বিভাগগুলি এইধরনের মন্তব্যগুলি করতে প্রণোদিত হয়েছিল। কিন্তু, সেই একই ধরনের বর্বর হত্যাকাণ্ড এখনও আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে এবং পূর্ব ইউরোপে ঘটে থাকে।
সংঘবদ্ধভাবে হত্যা ও লুণ্ঠন, সম্প্রদায় বিলুপ্তিকরণ, উপজাতীয় হত্যাকাণ্ড—যে নামেই তারা ডাকুক না কেন —ফলাফল খুবই দুঃখজনক। তবুও, এইধরনের দাঙ্গাহাঙ্গামার মধ্যে আনন্দের প্রবল ধ্বনি শোনা যায়। উদাহরণস্বরূপ, আসুন ১৯৩০ দশকে জার্মানীর প্রতি দৃষ্টিপাত করে দেখা যাক।
১৯৩৫ সালের এপ্রিল মাসে হিটলার ও তার নাজি দলের দ্বারা সমস্ত সরকারি চাকুরি থেকে যিহোবার সাক্ষীদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া তাদের খ্রীষ্টীয় নিরপেক্ষতার দরুন সাক্ষীদের গ্রেফতার, কারারুদ্ধ করা হয় এবং কনসেনট্রেশন ক্যাম্পেও পাঠানো হয়। (যোহন ১৭:১৬) ১৯৩৬ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে, বিরাট সংখ্যক যিহোবার সাক্ষীদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে হাজার হাজার ব্যক্তিকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয় যেখানে তাদের অধিকাংশই যারা বাঁচতে পেরেছিল তারা ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ছিল। কিন্তু ক্যাম্পের মধ্যে তাদের প্রতি যে বর্বর আচরণ দেখানো হয়েছিল তার প্রতি সাক্ষীরা কিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল? যদিও এটি আশ্চর্য মনে হতে পারে, তাদের চতুষ্পার্শ্বে আনন্দহীন পরিস্থিতি দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকা সত্ত্বেও তারা আনন্দ বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছিল।
“কাদার মধ্যে পাথর”
বৃটিশ ইতিহাসবেত্তা ক্রীষ্টিন কিং, ক্যাম্পে ছিলেন এমন একজন ক্যাথলিক মহিলার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। “আমি কখনও ভুলিনি, এই অভিব্যক্তিটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন,” ডা: কিং বলেন। “যে নিদারুণ বিরক্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে তিনি ছিলেন তার আতঙ্কজনক জীবন সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা দেন। আর তিনি বলেছিলেন তিনি সাক্ষীদের জানতেন এবং সেই সাক্ষীদের যারা কাদার মধ্যে পাথরের মত ছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন যেন সেই কাদার মধ্যে শক্ত মাটির মত ছিল। তিনি বলেছিলেন যে তারাই ছিল একমাত্র ব্যক্তি যারা, গার্ডরা যখন সামনে দিয়ে হেঁটে যেত তখন থুতু ফেলত না। তারাই একমাত্র যারা ক্যাম্পে সব রকমের পরিস্থিতির মোকাবিলা করার সময় বিদ্বেষ প্রকাশ করত না, বরঞ্চ ভালবাসা ও আশা এবং এইধরনের অনুভূতি দেখাত যে এর পিছনে এক উদ্দেশ্য আছে।”
কোন্ বিষয়টি যিহোবার সাক্ষীদের ‘কাদার মধ্যে পাথর’ হতে সাহায্য করেছিল? যিহোবা ও তাঁর পুত্র, যীশু খ্রীষ্টের প্রতি অটল বিশ্বাস। তাই, খ্রীষ্টানদের ভালবাসা ও আনন্দকে শ্বাসরুদ্ধ করার ক্ষেত্রে হিটলারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল।
ক্যাম্প থেকে রক্ষাপ্রাপ্ত দুজন ব্যক্তি সফলতার সাথে এই পরীক্ষার মোকাবিলা করার পাঁচ দশক পরে যা স্মরণ করেন তা শুনুন। একজন বলেন: “অত্যন্ত কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্যেও এই জেনে আমি আনন্দে মেতে উঠেছিলাম যে যিহোবার প্রতি প্রেম ও কৃতজ্ঞতা প্রমাণ করার আমার এক অদ্বিতীয় সুযোগ ছিল। এটি করতে কেউ আমাকে জোর করেনি! বিপরীতে, যারা আমাদের উপর জোর করার চেষ্টা করেছিল তারা আমাদের শত্রু ছিল, যারা আমাদের ভয় দেখানোর দ্বারা ঈশ্বরের চাইতে হিটলারের বাধ্য করাতে চেষ্টা করেছিল—কিন্তু তাতে তারা ব্যর্থ হয়েছিল! কেবলমাত্র এখনই আমি সুখী নই কিন্তু, আমার শুদ্ধ বিবেক থাকার দরুন এমনকি জেলে থাকার সময়েও আমি সুখী ছিলাম।”—৯৪ বছর বয়স্কা মারিয়া হোমবাক্।
অপর সাক্ষীটি জানান: “আমি কৃতজ্ঞতা ও আনন্দের সাথে আমার কারাগারের দিনগুলির দিকে ফিরে তাকাই। হিটলারের নেতৃত্বাধীনে জেল ও কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে অতিবাহিত দিনগুলি ছিল কষ্টকর ও পরীক্ষায় পূর্ণ। আমি এগুলি থেকে অব্যাহতি পেতে চাইনি কারণ এগুলি আমাকে সম্পূর্ণরূপে যিহোবার উপর নির্ভর করতে শিখিয়েছিল।”—৯১ বছর বয়স্ক ইয়োহানস্ নিউবাকার।
“যিহোবার উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করা”—সেটিই ছিল যিহোবার সাক্ষীদের আনন্দ উপভোগের গোপন কথা। তাই, আনন্দহীন এক জগতের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকা সত্ত্বেও তারা আনন্দিত। সম্প্রতি মাসগুলিতে “আনন্দিত প্রশংসাকারীগণ” জেলা সম্মেলনগুলিতেই তাদের আনন্দ প্রতীয়মান হয়। আসুন সংক্ষেপে আমরা এই আনন্দজনক সমাবেশগুলি পুনরালোচনা করি।
[৪ পৃষ্ঠার চিত্র]
মারিয়া হোমবাক্