দেখুন! নিউয়েতে একটি কিংডম হল
নিউয়ে হল দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রবালদ্বীপ, নিউ জীল্যাণ্ডের ২,১৬০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। একটি ভ্রমণ ব্রোসার অনুসারে, নিউয়ে নামটি এসেছে দুটি শব্দ থেকে, নিউ, মানে “নারিকেল গাছ,” এবং য়ে, মানে “দর্শন,” বা “দেখা।” ব্রোসারটি বলে: “একটি কাহিনী আছে যে প্রথম পলিনিসীয় অধিবাসীরা দ্বীপটির উপর নারিকেল গাছ দেখতে পেয়ে এই শব্দগুলি উচ্চারণ করে ওঠে।”
আজকে, নিউয়েতে অবস্থিত যিহোবার সাক্ষীরা গৌরবের সাথে দর্শনার্থীদের বলে, “এ! ফালে হে কাউটু হা মাওটোলু!” এর অর্থ, “দেখুন! আমাদের কিংডম হল!” এই হলের প্রতি কেন তাদের এত গভীর উপলব্ধিবোধ রয়েছে? সর্বজায়গায় যিহোবার সাক্ষীরা তাদের কিংডম হলের জন্য গর্বিত আর বিশেষকরে তারাই যদি এর নির্মাণকর্তা হয়ে থাকে। কিন্তু একটি সুদূর দ্বীপে, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে একটি কিংডম হল বানানো একটা আলাদা ব্যাপার। বস্তুতপক্ষে, নিউয়ের আয়তন হল মাত্র ২৬০ বর্গ কিলোমিটার আর সমগ্র দ্বীপটিতে মাত্র ২,৩০০ লোক রয়েছে।
একটি প্রশ্ন উঠেছিল যে কারা এই কিংডম হল তৈরি করবে। নিউয়ের একটি মণ্ডলীতে মাত্র ৩২ জন সাক্ষী আছে। যে সমস্ত প্রধান জিনিসগুলির প্রয়োজন যেমন ট্রাক, বুলডোজার ও ক্রেইন এগুলি সরকারের সম্পত্তি। এছাড়াও সমস্ত প্রয়োজনীয় নির্মাণ সামগ্রী—স্টিল, ইটের ব্লক, ছাদ, বিদ্যুৎ ও জলের সামগ্রী, সাউণ্ডের জিনিসপত্র এবং চেয়ার—নিউ জীল্যাণ্ড থেকে জাহাজে করে আনতে হবে যা প্রতি পাঁচ সপ্তাহ অন্তর একবার মাত্র সেখানে আসে। পরিশেষে, দ্বীপটির পাথর মিশ্রিত মাটিতে নির্মাণ কাজ করা খুবই অসুবিধা আর হলটিকে এমন ভাবে তৈরি করতে হবে যাতে করে সামুদ্রিক ঝড়ের হাত থেকে এটিকে বাঁচান যেতে পারে। অবশ্যই, এটি প্রত্যেকের জন্য একটা অত্যন্ত কঠিন কাজ!
এছাড়াও এখানে আরেকটা বড় পার্থক্য আছে। যিহোবার সাক্ষীদের কাছে কিংডম হল স্থানীয়ভাবে সত্য উপাসনার এক কেন্দ্রস্থল আর তারা পরিচালনা ও সাহায্যের জন্য যিহোবার উপর নির্ভর করে। (গীতসংহিতা ৫৬:১১; ১২৭:১) নিউ জীল্যাণ্ডের খ্রীষ্টান ভাইয়েরা আর তার সাথে অকল্যাণ্ডের নিউয়েন মণ্ডলীর সদস্যেরা, নিউয়ে অবস্থিত সাক্ষীদের এই ছোট দলটিকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে এবং এই নির্মাণ প্রকল্পের প্রতি সমস্ত হৃদয় দিয়ে সমর্থন প্রকাশ করে।
এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত
জুন মাসের ১৯৯৪ সালে নিউ জীল্যাণ্ডের রোটোরুয়াতে কিংডম হল নির্মাণস্থলে তাদের কাছে আবেদন জানানো হয় যারা নিউয়েতে নির্মাণ কাজে অংশ নিতে চায়। আশ্চর্যের ব্যাপার যে, ২০০ জন খ্রীষ্টীয় ভাই ও বোনেরা স্বেচ্ছায় যোগদান করতে এগিয়ে আসে। এদের মধ্যে থেকে, ৮০ জন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হয়, যার অন্তর্ভুক্ত হল ছুঁতোর মিস্ত্রি, স্টিলের কর্মী, প্লাম্বার, ঢালাই কর্মী, প্লাসটারার, রঙের মিস্ত্রী, বিদ্যুতের মিস্ত্রী, সাউণ্ড টেকনিসিয়ান, কনক্রিট কর্মী, ইট বহনকারী ও মজদুর।
যিহোবার উপর নির্ভর করার দ্বারা ভাইয়েরা নকশা তৈরি করে এবং এগিয়ে যায়। নিউয়ের মণ্ডলীর দুই জন প্রাচীনের মধ্যে একজন, যিনি স্থানীয় ব্যবসায়ী ছিলেন, তিনি প্রয়োজনীয় সামগ্রী জাহাজে করে নিয়ে আসার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আরম্ভ করলেন। বিদেশ থেকে আসা কর্মীদের জন্য প্লেনে ভ্রমণ/থাকার খরচ সম্বন্ধে খসড়া করা হয় আর এরা নিজেদের খরচ বহন করার ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং নির্মাণের দিন ধার্য করা হয়। এই নির্মাণ প্রকল্পটি ২০ দিনে শেষ করতে হবে, ৪ঠা মার্চ থেকে ২৩শে মার্চ, ১৯৯৫ এর মধ্যে যখন কিংডম হল উৎসর্গ করা হবে।
“আমি প্রথমেই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম যখন আমি নির্মাণস্থলে গিয়ে পৌঁছাই,” নির্মাণ পরিচালক বলেন, যিনি নিউ জীল্যাণ্ড থেকে এক সপ্তাহ আগে সমস্ত কিছু ঠিকঠাক করতে আসেন। “মাটি পাথরে ভর্তি ছিল। গাঁথনির জন্য জায়গা তৈরি করতেই দুসপ্তাহ লেগে যাবে।” কিন্তু পরে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, স্থানীয় সাক্ষীদের ক্ষমতাকে তিনি অবজ্ঞাই করেছিলেন। “নিউয়েনের ভাইয়েরা পাথর চিনতে পারে,” তিনি বলেন। “তারা জানে যে পাথরের কোন্ অংশটিতে আঘাত করলে বিশাল টুকরোটি পড়ে যায়।” গাঁথনির জায়গা দুইদিনে প্রস্তুত করা হয়!
৪ঠা মার্চ নিউ জীল্যাণ্ড থেকে প্লেনে করে আসা প্রথম সাক্ষীদের দল উপস্থিত হয় এবং ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়। ধারাবাহিকভাবে যতই কর্মীদের দল আসতে শুরু করে, নির্মাণ প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের কাজ শেষ হতে থাকে। কাজের দিনগুলি ৭:০০ টার সময় সকালে দৈনিক বাইবেল পাঠ দিয়ে শুরু হত। কিছু ভাইয়েরা ৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার মধ্যেও প্রায় ১২ ঘন্টা সমানে কাজ করে যেত। পরিশেষে, ২৩শে মার্চ, জমির সৌন্দর্য্যবৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়। আম গাছ থেকে নেওয়া একটি চিত্তাকর্ষক চিহ্নের দ্বারা নির্মাণ কাজটিকে “যিহোবার সাক্ষীদের কিংডম হল” বলে চিত্রিত করা হয়।
সহযোগিতা ও আতিথেয়তার মনোভাব
এই নির্মাণ প্রকল্পের সফলতার পিছনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল নিউয়ের লোকেদের থেকে পাওয়া সহযোগিতা। স্থানীয় গ্রামবাসীরা, এই উপলক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, খাদ্য ও অর্থ দান করে। অনেকে হল নির্মাণের কাজটিকে নিজেদের কাজ বলে ধরে নেয়। সরকারী কর্তৃপক্ষেরা এবং ব্যবসায়ীরা কর্তব্য ব্যতিরেকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তাদের দেওয়া হয় যেমন উডওয়ার্ক ফ্যাকটারি। জাহাজ কোম্পানি তাদের জাহাজ যাওয়া আসার সূচী পরিবর্তন করে যাতে করে সঠিক সময় প্রয়োজনীয় মালপত্র সেখানে পৌঁছাতে পারে।
অতিথিরা প্রকৃতভাবে নিউয়েন সাক্ষীদের কঠোর পরিশ্রম ও আতিথেয়তাকে উপলব্ধি করে, যারা তাদের ঘর ও সামগ্রী দান করেছিল। “স্থানীয় বোনেরা অপূর্ব,” একজন নির্মাণ কর্মী বলে। দুপুরে গরম খাওয়া দেওয়া ছাড়াও, বোনেরা সকাল ৬:৩০ মিনিটে রান্না করা জলখাবার আমাদের দিত। কয়েকজন সকাল ৪:৩০ এর সময় উঠে খাবার তৈরি করত। একজন নির্মাণ কর্মী বলে: “আমার মনে হয় যে আমাদের বাড়ির চাইতে আমরা এই নিউয়েতে অনেক ভাল আছি।”
১০ই মার্চ নিউয়ে স্টার তাদের প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনামে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করে এই বলে, “নিউয়েতে প্রথম কিংডম হল” আর তার সাথে নির্মাণ কাজে কার্যরত নিউ জীল্যাণ্ড ও নিউয়েন কর্মীদের ছবি প্রকাশ করা হয়। এটি জানায় যে হলটির আয়তন হল ২৮০ বর্গ মিটার এবং সেখানে ৭০ থেকে ১০০ জন লোক বসতে পারে। প্রবন্ধটি আরও বলে: “এই কাজটি আসলে দুই [সপ্তাহে] শেষ করা যায়, কিন্তু এই ক্ষেত্রে তা আরেকটু বাড়াতে হবে। এই পর্যায়, কাজ শুরু হওয়ার মাত্র দুই দিনের মধ্যে, ভিত্তিস্থাপন, কাঠামো তৈরি, বিম ও ঢালাইয়ের কাজ, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই শেষ হয়ে যায়।”
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী এই ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে, নিউয়ে দ্বীপের সকল অধিবাসীরা যেন এই নির্মাণ প্রকল্পটিকে দেখে এবং এর থেকে কিছু শেখার চেষ্টা করে। তিনি বলেন যে, তিনি আশা করেন এটি সকলকে দেখাবে প্রেম ও সহযোগিতার দ্বারা কী করা সম্ভব।
উৎসর্গীকরণের অনুষ্ঠানে ২০৪ জন এসেছিল। যে বিষয়টি উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে এক অনুপ্রেরণাদায়ক অভিজ্ঞতা হিসাবে প্রমাণিত হয় তা হল যখন নিউয়ের ভাই, বোন এবং ছোটরা কিংডম হলকে কেন্দ্র করে গান ও নাচের মাধ্যমে এক বিশেষ অনুষ্ঠান উপস্থাপিত করে। নির্মাণ দলের প্রতি এবং যিহোবার প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়, যাঁর আত্মা সমস্ত মন, হৃদয় ও হস্তকে পরিচালিত করেছে এই কাজটিকে সম্পন্ন করতে।—যিশাইয় ৪০:২৮-৩১.