যুদ্ধবিহীন এক জগৎ—কখন?
অক্টোবর ২৪, ১৯৪৫ সালে রাষ্ট্রসংঘের চার্টার কার্যকারী হয়। মানুষের দ্বারা তৈরি জগতে শান্তির জন্য এটি হল সবচেয়ে ব্যাপক প্রণালী। মূল ৫১টি দেশ সহ রাষ্ট্রসংঘ জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংগঠন হয়ে ওঠে। এছাড়াও, এই প্রথমবার একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সামরিক বাহিনীর সুবিধা থাকবে যা শান্তি এবং সুরক্ষা বলবৎ করে যুদ্ধবিহীন এক জগৎ নিয়ে আসবে।
আজকে, ১৮৫ জন সদস্য দেশ সহ রাষ্ট্রসংঘ আগের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। তাহলে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংগঠন কেন তার উত্তম উদ্দেশ্যগুলি সম্পূর্ণরূপে সম্পাদন করতে ব্যর্থ হয়েছে?
ধর্ম—এক বড় বাধাস্বরূপ
একটি মুখ্য জটিলতা হল জগতের বিষয়গুলিতে ধর্ম যে ভূমিকা পালন করে। এটা সত্য যে, রাষ্ট্রসংঘের শুরু থেকে, জগতের মুখ্য ধর্মগুলি সেই সংগঠনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ৫০ তম বার্ষিকীর প্রতি ইঙ্গিত করতে গিয়ে, পোপ জন পল ২য় রাষ্ট্রসংঘের বিষয় বলেন, “শান্তি এবং সুরক্ষার আনার ক্ষেত্রে এই উপাদানটি হল সর্বোৎকৃষ্ট।” তার এই মনোভাবের সাথে জগদ্ব্যাপী ধর্মীয় নেতারাও একমত। কিন্তু ধর্ম এবং সরকারের মধ্যে এই কৌশলী সম্পর্ক, এই বিষয়টিকে লুকিয়ে রাখতে পারে না যে, ধর্ম রাষ্ট্রসংঘের কাছে এক বাধাস্বরূপ এবং সমস্যাস্বরূপ।
শতাব্দী ধরে ধর্ম ঘৃণা, যুদ্ধ এবং সাম্প্রদায়িক বিলোপ সাধনে এবং তা সমর্থন করাতে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি কিছু বছরে, ধর্মীয় উত্তাপের আড়ালে প্রতিবেশীরা একে অপরকে হত্যা করেছে। এই কথাটি অর্থাৎ “সাম্প্রদায়িক বিলোপসাধন” বলকানের যুদ্ধের সাথে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু, দৌরাত্ম্যপূর্ণ ঘৃণা যা অনেকে একে অপরের প্রতি দেখিয়েছে তা ধর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত, জাতিগত নয়, কারণ বেশির ভাগ লোকেরাই একই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। হ্যাঁ, যুগোস্লাভিয়াতে রক্তের বন্যার জন্য ধর্মকে তার দায়িত্ব স্বীকার করতেই হবে এবং রাষ্ট্রসংঘ তা বন্ধ করতে পারেনি।
তাই সঠিকভাবে, এক কলেজের ধর্মের প্রফেসর সম্প্রতি বলেন যে, “প্রাক্তন ঠান্ডা-লড়াইয়ের জগতে যেখানে ধর্মীয় সংগ্রামগুলি বেড়ে চলেছে, ধর্ম এবং সম্প্রদায় বিলোপসাধন হয়ত আমাদের পরীক্ষার মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত, যদিও তা অস্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে আসতে পারে।” একটি নতুন সচেতনতা যা দেখায় যে কিভাবে ধর্ম আজকে জগতের শান্তি আনার প্রচেষ্টাগুলিকে বাধা দিচ্ছে।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রসংঘের ঘোষণা জানায়: “অসিহষ্ণুতা প্রকাশের দ্বারা চিন্তিত হয়ে এবং জগতের কিছু অংশে ধর্ম এবং বিশ্বাসের ফলে পক্ষপাতিত্ব বিদ্যমান তার প্রমাণের ফলে, সেইসব উপায়গুলি গ্রহণ করতে যা এই অসহিষ্ণুতার সবরকম রূপ এবং ধারাকে তৎপরতার সাথে মিটিয়ে দেবে এবং ধর্ম এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতে পক্ষপাতিত্ব এড়াতে এবং লড়াই করতে বদ্ধপরিকর।”
এই ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রসংঘ ১৯৯৫ সাল সহিষ্ণুতার বৎসর বলে ঘোষণা করেছে। বাস্তবভাবে বলতে গেলে, বিভক্ত ধর্মীয় জগতে শান্তি এবং সুরক্ষা কি পাওয়া কখনও সম্ভব হবে?
ধর্মের ভবিষ্যৎ
বাইবেলের পুস্তক প্রকাশিত বাক্যের ভবিষ্যদ্বাণী এর উত্তর দেয়। এটি এক রূপক “মহাবেশ্যা”-র কথা বলছে যা “রাণীর” মত “পৃথিবীর রাজগণের উপরে রাজত্ব করিতেছে।” সেই বেশ্যা “বিলাস”-এ বাস করে এবং জগতের সরকারদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। এই সরকারগুলিকে ‘সিন্দূরবর্ণ পশু’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে যার উপর এই বেশ্যা আরামে চড়ে বেড়ায়। (প্রকাশিত বাক্য ১৭:১-৫, ১৮; ১৮:৭) যাকে “মহতী বাবিল” বলে জানা যায়, এই শক্তিশালী এবং অনৈতিক নারীর নাম প্রাচীন বাবিলনের নাম অনুসারে নামকরণ করা হয়েছে, যা মূর্তিপূজার কেন্দ্রস্থল ছিল। তাই সঠিকরূপে এই বেশ্যা বর্তমান দিনের জগতের ধর্মগুলিকে প্রতিনিধিত্ব করে যা জগতের বিষয়গুলির সাথে সংমিশ্রিত।
এই বিবরণটি আরও বলে চলে যে, সঠিক সময়ে ঈশ্বর বন্য পশুর সামরিক উপাদানগুলির হৃদয়ের মধ্যে কার্য করার জন্য অনুপ্রেরণা যোগাবেন। এটি “সেই বেশ্যাকে ঘৃণা করিবে, এবং তাহাকে অনাথা ও নগ্না করিবে, তাহার মাংস ভক্ষণ করিবে, এবং তাহাকে আগুনে পোড়াইয়া দিবে।” (প্রকাশিত বাক্য ১৭:১৬)a এইভাবে শক্তিশালী দেশগুলি মিথ্যা ধর্মের বিরুদ্ধে অভিযান এবং তা সরানোর জন্য যিহোবা ঈশ্বর দক্ষতার সাথে পরিচালনা করার উদ্দেশ্যে নিজের থেকে পদক্ষেপ নেবেন। জগদ্ব্যাপী ধর্মীয় ব্যবস্থা তার প্রাচুর্যপূর্ণ মন্দির এবং স্মারক বেদীগুলি সমেত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। শান্তি এবং সুরক্ষার পথে ধর্মীয় বাধা তখন সরে যাবে। কিন্তু তখনও কি প্রকৃত শান্তি এবং সুরক্ষা পৃথিবীতে আসবে?
অসিদ্ধ মানবিক প্রবণতা
এই বিষয়ে কী কোন নিশ্চয়তা আছে যে ধর্ম সরিয়ে দিলে সত্যই যুদ্ধবিহীন এক জগৎ আসবে? না। রাষ্ট্রসংঘ তখনও এক পরিহাসমূলক পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। অপরপক্ষে, একদিকে লোকেরা শান্তি এবং সুরক্ষা চায়। তবুও, অন্যদিকে শান্তি এবং সুরক্ষার বিরুদ্ধে লোকেরা হল সবচেয়ে বড় ভয়। ঘৃণা, গর্ব, আমিত্ব, স্বার্থপরতা এবং অজ্ঞানতা হল মানুষের বৈশিষ্ট্য যা সবরকমের সংগ্রাম এবং যুদ্ধের কারণ।—যাকোব ৪:১-৪.
বাইবেল ভাববাণী করেছিল যে আমাদের দিনে লোকেরা হবে “আত্মপ্রিয়, অর্থপ্রিয়, আত্মশ্লাঘী, অভিমানী, ধর্ম্মনিন্দক, পিতামাতার অবাধ্য, অকৃতজ্ঞ, অসাধু, স্নেহরহিত, ক্ষমাহীন, অপবাদক, অজিতেন্দ্রিয়, প্রচণ্ড, সদ্বিদ্বেষী, বিশ্বাসঘাতক, দুঃসাহসী, গর্ব্বান্ধ।”—২ তীমথিয় ৩:১-৪.
সেক্রেটারি-জেনেরাল বুতরস বুতরস-ঘালি স্বীকার করেন যে “জগৎ সামাজিক এবং নৈতিক সংকটে ভুগছে এবং অনেক সমাজে তা বড় আকার ধারণ করেছে।” যতই কূটনীতিক দক্ষ পরিচালনা চালানো হোক না কেন তা অসিদ্ধ মানবের মন্দ বৈশিষ্ট্যগুলিকে সরাতে পারবে না।—তুলনা করুন আদিপুস্তক ৮:২১; যিরমিয় ১৭:৯.
যীশু খ্রীষ্ট—শান্তিরাজ
স্পষ্টতই, রাষ্ট্রসংঘের জগতে শান্তি নিয়ে আসার ক্ষমতা নেই। তাদের উচ্চ আকাঙ্ক্ষাগুলি থাকা সত্ত্বেও এর সদস্য এবং সমর্থনকারীরা সকলে অসিদ্ধ। বাইবেল বলে যে, “মনুষ্যের পথ তাহার বশে নয়, মনুষ্য চলিতে চলিতে আপন পাদবিক্ষেপ স্থির করিতে পারে না।” (যিরমিয় ১০:২৩) এছাড়াও, ঈশ্বর সতর্ক করে দেন: “তোমরা নির্ভর করিও না রাজন্যগণে, বা মনুষ্য-সন্তানে, যাহার নিকটে ত্রাণ নাই।”—গীতসংহিতা ১৪৬:৩.
যিহোবা তাঁর পুত্র, “শান্তিরাজ” এর মাধ্যমে যা সম্পাদন করবেন তা বাইবেল ভাববাণী করে। যিশাইয় ৯:৬, ৭ পদ বলে: “একটী বালক আমাদের জন্য জন্মিয়াছেন, একটী পুত্ত্র আমাদিগকে দত্ত হইয়াছে; আর তাঁহারই স্কন্ধের উপরে কর্ত্তৃত্বভার থাকিবে, তাঁহার নাম হইবে—‘আশ্চর্য্য মন্ত্রী, বিক্রমশালী ঈশ্বর, সনাতন পিতা, শান্তিরাজ’। . . . কর্ত্তৃত্ববৃদ্ধির ও শান্তির সীমা থাকিবে না।”
৫০ বছর ধরে হতাশাজনক প্রচেষ্টাগুলির জন্য জগতের জাতিগুলি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। শীঘ্রই তারা বেশ্যাতুল্য ধর্মীয় সংগঠনগুলিকে ধ্বংস করবে। তারপর যীশু খ্রীষ্ট যিনি হলেন “রাজাদের রাজা ও প্রভুদের প্রভু,” এবং তাঁর স্বর্গীয় যোদ্ধাদের সহ মানুষের সমস্ত সরকারগুলিকে ধ্বংস করবেন এবং যারা ঈশ্বরের সার্বভৌমতাকে প্রত্যাখ্যান করবে তাদের হত্যা করবেন। (প্রকাশিত বাক্য ১৯:১১-২১; তুলনা করুন দানিয়েল ২:৪৪.) এরই মাধ্যমে যিহোবা ঈশ্বর যুদ্ধবিহীন এক জগৎ নিয়ে আসবেন।
[পাদটীকাগুলো]
a মহতী বাবিল সম্বন্ধে প্রকাশিত বাক্যের ভবিষ্যদ্বাণীর গভীর অধ্যয়নের জন্য ওয়াচটাওয়ার বাইবেল অ্যান্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত প্রকাশিত বাক্য—তার মহান পরিপূর্ণতা সন্নিকট বইয়ের ৩৩ থেকে ৩৭ অধ্যায়গুলি পড়ুন।
[৭ পৃষ্ঠার বাক্স]
রাষ্ট্রসংঘের প্রতি খ্রীষ্টীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি
বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীতে, মানব সরকারগুলিকে প্রায়ই বন্য পশু দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। (দানিয়েল ৭:৬, ১২, ২৩; ৮:২০-২২) তাই, অনেক দশক ধরে প্রহরীদুর্গ পত্রিকা প্রকাশিত বাক্য ১৩ এবং ১৭ অধ্যায়ের বন্য পশুগুলিকে আজকের জাগতিক সরকারগুলির সাথে শনাক্তিকরণ করেছে। এর অন্তর্ভুক্ত হল রাষ্ট্রসংঘ, যাকে সপ্তমস্তক ও দশ শৃঙ্গ-বিশিষ্ট সিন্দূর-বর্ণ পশু হিসাবে প্রকাশিত বাক্যে ১৭ অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
কিন্তু, এই শাস্ত্রীয় মনোভাব কোন দিক দিয়েই সরকারগুলি অথবা তাদের আধিকারিকদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করছে না। বাইবেল পরিষ্কারভাবে বলে: “প্রত্যেক প্রাণী প্রাধান্যপ্রাপ্ত কর্ত্তৃপক্ষদের বশীভূত হউক; কেননা ঈশ্বরের নিরূপণ ব্যতিরেকে কর্ত্তৃত্ব হয় না; এবং যে সকল কর্ত্তৃপক্ষ আছেন, তাঁহারা ঈশ্বর-নিযুক্ত। অতএব যে কেহ কর্ত্তৃত্বের প্রতিরোধী হয়, সে ঈশ্বরের নিয়োগের প্রতিরোধ করে; আর যাহারা প্রতিরোধ করে, তাহারা আপনাদের উপরে বিচারাজ্ঞা প্রাপ্ত হইবে।”—রোমীয় ১৩:১, ২.
সেই অনুসারে যিহোবার সাক্ষীরা যারা দৃঢ় রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে, মানব সরকারের বিষয়গুলিতে হস্তক্ষেপ করে না। তারা কখনও সংগ্রাম শুরু করে না অথবা আইন অমান্যকরণ কাজগুলিতে যোগদান করে না। পরিবর্তে, তারা মনে করে যে নিয়ম ও কানুন বজায় রাখতে কোন এক ধরনের সরকারের দরকার।—রোমীয় ১৩:১-৭; তীত ৩:১.
যিহোবার সাক্ষীরা রাষ্ট্রসংঘকে জগতের অন্য যে কোন সরকারী সংগঠনের মত মনে করে। তারা স্বীকার করে যে রাষ্ট্রসংঘ ঈশ্বরের অনুমতিতে অস্তিত্বে রয়েছে। বাইবেলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যিহোবার সাক্ষীরা সকল সরকারগুলিকে সম্মান করে এবং বাধ্য হয় যতক্ষণ তাদের সেই বাধ্যতা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ করতে প্ররোচিত না করে।—প্রেরিত ৫:২৯.