“সত্য কি?”
দুটি মানুষ মুখোমুখিভাবে বসেছিলেন, তাদের চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতমূখী। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন রাজনীতিবিদ্, যিনি বিশ্বনিন্দক, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, ধনবানও, যিনি নিজের কর্মজীবনে উন্নতিলাভার্থে যে কোন কাজই করতে প্রস্তুত। অপর ব্যক্তিটি ছিলেন একজন শিক্ষক, যিনি অবজ্ঞাভরে ধন এবং সম্মানকে পদদলিত করেছিলেন, এমনকি অপরের জীবনকে রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। বলা নিষ্প্রয়োজন, এই দুই ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কিন্তু ভিন্ন! বিশেষত, একটি বিষয়ের ক্ষেত্রে চরমভাবে বিপরীতমূখী—তা হল সত্য সম্বন্ধে।
এই ব্যক্তিরা ছিলেন পন্তীয় পীলাত এবং যীশু খ্রীষ্ট। যীশু পীলাতের সামনে অপরাধী হিসাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেন? যীশু এর কারণ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করেছিলেন—বাস্তবিকই, সেই বিশেষ কারণে তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন এবং পরিচর্যার কাজ গ্রহণ করেছিলেন—একটি মাত্র কারণের জন্য: সত্য। “আমি এই জন্যই জন্মগ্রহণ করিয়াছি ও এই জন্য জগতে আসিয়াছি,” তিনি বলেছিলেন, “যেন সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিই।”—যোহন ১৮:৩৭.
পীলাতের উত্তর ছিল এক উল্লেখযোগ্য প্রশ্ন: “সত্য কি?” (যোহন ১৮:৩৮) তিনি কি সত্যই এর উত্তর পেতে চেয়েছিলেন? খুব সম্ভবত, নয়। যীশু ছিলেন এমন এক প্রকৃতির মানুষ, যিনি আন্তরিকতার সাথে উত্থিত যে কোন প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি পীলাতকে উত্তর দেননি। আর বাইবেল আমাদের জানায় যে পীলাত এই প্রশ্ন করার পরেই তার শ্রোতাদের কক্ষ্য হতে সোজা বেরিয়ে যান। সম্ভবত রোমীয় রাজ্যপাল, যিনি অবিশ্বাসীর মত কোন ভালকেই স্বীকার করেন না, যেন বলেছিলেন, “সত্য? সে আবার কী? সত্য বলে কোন কিছু নেই!”a
পীলাতের মত সত্যের বিষয়ে সন্দেহপ্রবণ দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান দিনে অস্বাভাবিক কিছু নয়। বহু মানুষ বিশ্বাস করে যে সত্য হল অপেক্ষিক—আরেক কথায়, একজনের কাছে যা সত্য, তা হয়ত অন্যের কাছে সত্য নাও হতে পারে, অর্থাৎ দুজনের কথাই “ঠিক।” এইধরনের বিশ্বাস এতই ব্যাপক যে তার জন্য একটি শব্দও রয়েছে—“সম্পর্কবাদ।” সত্যের বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি এইরকম? যদি তাই হয়, তাহলে কি বলা যায় যে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অন্বেষন না করেই আপনি এই দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করেছেন? এমনকি যদি আপনি এই দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ না করে থাকেন, আপনি কি জানেন, এই দর্শনবাদ কতখানি আপনার জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে?
সত্যের প্রতি আক্রমণ
পন্তীয় পীলাতই প্রথম ব্যক্তি ছিলেন না, যিনি চরম সত্যের ধারনার উপরে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিছু প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকেরা এইধরনের সন্দেহজনক মতবাদগুলিকে তাদের জীবনের পেশা করে তুলেছিল! পীলাতের সময়ের প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে পারমেনিডস (যাকে ইউরোপীয় অধিবিদ্যা উদ্যোক্তা বলে মনে করা হয়) বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। ডিমোক্রিটাস, যাকে “প্রাচীন দার্শনিকদের মধ্যে সর্বমহান” বলে মনে করা হত, দৃঢ়রূপে ঘোষণা করেছিলেন: “সত্য গভীররূপে চাপা রয়েছে। . . . আমরা সঠিকভাবে কিছুই জানি না।” সম্ভবত তাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানীয়, সক্রেটিস বলেছিলেন যে প্রকৃতপক্ষে তিনি যা কিছু জানতেন, তা নগণ্য।
সত্য যে জানা যেতে পারে এই ধারণার উপর আক্রমণ আমাদের দিন পর্যন্ত চলে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু দার্শনিকেরা বলে থাকেন, যেহেতু জ্ঞান আমাদের জ্ঞানেন্দ্রীয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছায়, যা প্রতারিত হতে পারে, তাই কোন জ্ঞানই ধ্রুব সত্য নয়। ফরাসী দার্শনিক এবং গণিতজ্ঞ রেনে ডেসকার্টিস যে বিষয়গুলি তিনি নিশ্চিতরূপে জানতেন বলে মনে করতেন, সেগুলিকে পরীক্ষা করবেন বলে মনস্থির করেন। তিনি একটি সত্যকে ছাড়া আর সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করেন, যেটিকে তিনি বিতর্কমূলক নয় বলে মনে করতেন: “কোগিটো আরগো সাম” অথবা “যেহেতু আমি চিন্তা করি, তাই আমি অস্তিত্বে আছি।”
সম্পর্কবাদের সংস্কৃতি
সম্পর্কবাদ শুধুমাত্র দার্শনিকদের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় নেতারা এবিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকেন, স্কুলেতে এবিষয়ে শিখানো হয় এবং সংবাদ মাধ্যমগুলির দ্বারাও তা ছড়িয়ে থাকে। এপিস্কোপাল বিশপ জন. এস. স্পঙ্গ কয়েক বছর আগে বলেছিলেন: “আমাদের অবশ্যই . . . সত্য আমাদের কাছে আছে, এমন মনোভাব ত্যাগ করতে হবে এবং অন্যদেরও অবশ্যই আমাদের সঙ্গে একমত হওয়া ও উপলব্ধি করা উচিত যে চরম সত্য আমাদের সকলেরই নাগালের বাইরে। স্পঙ্গের সম্পর্কবাদ যা ঠিক বর্তমান দিনের অনেক যাজকশ্রেণীর মত, বাইবেলের নৈতিক শিক্ষাকে ছেড়ে দিয়ে একটি দর্শনের সপক্ষে কথা বলে, “প্রত্যেকে আপন সিদ্ধান্তে আসুক।” উদাহরণস্বরূপ, সমকামীদের আরও “গ্রহণযোগ্য” করে দেবার জন্য এপিস্কোপাল গির্জাতে স্পঙ্গ একটি বই লিখেছিলেন যাতে তিনি পৌলকে একজন সমকামী বলে দাবি করেছিলেন!
অনেক দেশের স্কুলে এই একই ধরনের চিন্তাধারাকে প্রবেশ করান হয়েছে। অ্যালান ব্লুম তার লিখিত দ্যা ক্লোসিং অফ দি আমেরিকান মাইন্ড বইটিতে লিখেছিলেন: “একটি বিষয় রয়েছে যেখানে একজন অধ্যাপক সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত: বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশকারী প্রত্যেক ছাত্রই বিশ্বাস করে অথবা বলে যে সে বিশ্বাস করে যে, সত্য হল আপেক্ষিক।” ব্লুম দেখেছিলেন যে তিনি যদি তার ছাত্রদের দৃঢ় বিশ্বাসের বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করেন, তাহলে তারা আশ্চর্য বোধ করবে, “যেন আমি প্রশ্ন তুলছি যে ২ + ২ = ৪ হয় না।”
এই একই চিন্তাধারা আরও অগণিত উপায়ে প্রচারিত হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, টিভি এবং সংবাদপত্রের সংবাদদাতারা প্রায়ই কোন ঘটনার সত্যতা প্রকাশ করার চাইতে তাদের দর্শকদের আপ্যায়ন করতেই বেশি আগ্রহ দেখায়। কিছু কিছু নতুন অনুষ্ঠানকে প্রয়োজন অনুসারে রদবদল করা হয়েছে অথবা মিথ্যা ফিল্মের রূপ দেওয়া হয়েছে, যাতে করে এটাকে আরও নাটকীয়ভাবে দেখান যেতে পারে। আর আমোদপ্রমোদের ক্ষেত্রে আরও জোরদার সত্যের উপর আক্রমণ চালানো হয়। আমাদের পিতামাতা এবং দাদুদিদিমারা যে ভাল গুণগুলি ও নৈতিক সত্য অনুসারে জীবনযাপন করতেন, তা অপ্রচলিত বলে মনে করা হয় এবং এখন প্রায়ই সরাসরি ঠাট্টা বিদ্রূপ করা হয়ে থাকে।
অবশ্যই, কয়েকজন হয়ত তর্ক করবে যে এই সম্পর্কবাদ সংস্কারমুক্ত করে যার ফলে মানব সমাজের উপর এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আর সত্যই কি তাই? আর এটা আপনার উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে? আপনি কি মনে করেন যে সত্য হল আপেক্ষিক অথবা অবিদ্যমান? যদি তাই হয়, তাহলে তার জন্য অন্বেষণ করা হল সময়ের অপচয়। এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি আপনার ভবিষ্যতের উপর প্রভাব বিস্তার করবে।
[পাদটীকাগুলো]
a বাইবেল পন্ডিত আর. সি. এইচ. লেনস্কির মতানুযায়ী, পীলাতের “বলার ভাব ছিল গতানুগতিক বিষয়ী লোকের মত যিনি তার প্রশ্নের দ্বারা বলতে চেয়েছিলেন যে, সত্য হল একটি অপ্রয়োজনীয় দূরকল্পনামূলক বিষয়।”