এক দুর্নীতিবিহীন জগতের প্রতিজ্ঞা
সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির প্রবেশ ঘটেছে। সরকার, বিজ্ঞান, খেলাধূলা, ধর্ম অথবা ব্যবসা যে কোন ক্ষেত্রেই হোক না কেন, দুর্নীতি মনে হয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে।
একটির পর একটি দেশে, দুর্নীতিপূর্ণ কলঙ্কের হতাশাজনক খবরগুলি সংবাদপত্রের শিরোনামে দেখা যাচ্ছে। অনেক ব্যক্তিরা যারা লোকের মঙ্গলের জন্য সেবা করতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল, তারাই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টায় ঘুষ ও উৎকোচ নেওয়ার দোষে প্রকাশ হয়ে পড়ে। তথাকথিত ছদ্মবেশী অপরাধ আজ চারিদিকে প্রচলিত। ক্রমবর্দ্ধমান সংখ্যায় সামাজিক অথবা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত এবং অপরাধমূলক দোষে দোষী হয়ে পড়ছে।
একটি বিষয় যাকে কেন্দ্র করে বিশেষ উদ্বিগ্নতা গড়ে উঠছে যাকে একটি ইউরোপের পত্রিকা “মহান দুর্নীতি” বলে বর্ণনা করেছে—অর্থাৎ এটি এমন একটি অভ্যাস যার মাধ্যমে উচ্চপদস্থ অফিসারেরা, মন্ত্রীরা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিরা কোন কিছু বিশাল জিনিস কেনা বা গঠন করার আগে থেকেই অর্থ নিয়ে থাকে।” একটি দেশে “দুবছর ধরে পুলিশের অনুসন্ধান এবং প্রত্যেক দিন গ্রেপ্তারের ঘটনা সত্ত্বেও অদমনীয় দুর্নীতিকে নিবারণ করা যায়নি,” ব্রিটিশ পত্রিকা দি ইকনমিস্ট, এই মন্তব্য করে।
এই ব্যাপকপ্রসারী দুর্নীতির জন্য, আজকে অনেকে মনে করে যে এমন কেউ নেই যাকে তারা বিশ্বাস করতে পারে। তারা বাইবেল লেখক দায়ূদের মনোভাবের প্রতিধ্বনি করে যখন তিনি বলেছিলেন: “সকলে বিপথে গিয়াছে, সকলেই বিকারপ্রাপ্ত হইয়াছে; সৎকর্ম্ম করে, এমন কেহই নাই, এক জনও নাই।”—গীতসংহিতা ১৪:৩.
এই ব্যাপকপ্রসারী দুর্নীতির সাথে আপনি কিভাবে মোকাবিলা করেন? অধিকাংশ লোক আজ এটিকে উপেক্ষা করে। কিন্তু এমনকি আপনি যদি দুর্নীতিকে উপেক্ষা করেও থাকেন, তবুও দুর্নীতি আপনাকে আঘাত করবে। কিভাবে?
দুর্নীতি আপনাকে প্রভাবিত করে
উচ্চশ্রেণী ও ছোট পরিমাণে উভয় ক্ষেত্রে দুর্নীতির বৃদ্ধি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খরচের খাতকে বাড়িয়ে তুলছে, উৎপাদনের মানকে নষ্ট করে দিচ্ছে এবং চাকুরি পাওয়ার সম্ভাবনাকে হ্রাস করছে আর বেতনের পরিমাণকে কমিয়ে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, হিসাব করে দেখা হয়েছে যে, ধন আত্মসাৎ ও প্রতারণামূলক অপরাধের পিছনে যা খরচ করা হয় তা সিঁধ কেটে চৌর্যবৃত্তি, ডাকাতি ও সাধারণ চুরি করার ফলে মোট যা খরচ হয় তার চাইতে অন্তত দশগুণ বেশি। দ্যা নিউ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (১৯৯২) মন্তব্য করে যে: “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা সংক্রান্ত সংগঠিত অপরাধের পিছনে প্রতি বছর ২০,০০০,০০,০০,০০০ ডলার খরচ হয়—যা সংগঠিত অপরাধের চাইতে তিন গুণ বেশি।” এই সূত্রটি ব্যাখ্যা করে যে যদিও এর প্রভাব সরাসরি ধরা যায় না, “কিন্তু এইধরনের অপরাধের প্রভাব কর্মীদের, ক্রেতাদের এবং আবহাওয়ার যে সুরক্ষা তার উপর পড়ে।”
দুর্নীতির তিক্ত ফল আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাজা শলোমনের বাক্যগুলি: “আমি ফিরিয়া, সূর্য্যের নীচে যে সকল উপদ্রব হয় তাহা নিরীক্ষণ করিতে লাগিলাম। আর দেখ, উপদ্রুত লোকদের অশ্রুপাত হইতেছে, কিন্তু তাহাদের সান্ত্বনাকারী কেহ নাই; উপদ্রবী লোকদের হস্তে বল আছে, কিন্তু উপদ্রুত লোকদের সান্ত্বনাকারী কেহ নাই।”—উপদেশক ৪:১.
তাহলে, আমরা কি এই অবশ্যম্ভাবী দুর্নীতির সামনে নতি স্বীকার করব? দুর্নীতিবিহীন জগৎ সম্বন্ধে স্বপ্ন দেখা কি অসম্ভব? আনন্দের বিষয় হল যে, তা নয়! বাইবেল আমাদের শিক্ষা দেয় যে অন্যায় এবং অধর্মাচারণ খুব শীঘ্রই সরে যাবে।
বাইবেল আমাদের কী বলে
বাইবেল আমাদের জানায় যে দুর্নীতির সূত্রপাত তখনই হয় যখন শক্তিশালী এক দূত ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং প্রথম মানব দম্পতিকে প্ররোচিত করে তার সাথে যোগ দিতে। (আদিপুস্তক ৩:১-৬) তাদের এই পাপপূর্ণ কাজের থেকে কোন উত্তম ফল আসেনি। বরঞ্চ যে দিন থেকে আদম ও হবা যিহোবা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ করে, সেই দিন থেকে তারা দুর্নীতির মন্দ প্রভাবের দ্বারা জর্জরিত হয়েছে। তাদের দেহ ধীর গতিতে ক্ষয় হতে আরম্ভ করে, যা পরিশেষে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। (আদিপুস্তক ৩:১৬-১৯) সেই সময় থেকে আরম্ভ করে, ইতিহাসের পাতায় কেবল ঘুঁষ, প্রতারণা এবং চুরির উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। তবুও, যারা এগুলির মধ্যে জড়িত থাকে তারা কোন না কোনভাবে শাস্তি এড়িয়ে চলে।
সাধারণ অপরাধীদের বিপরীতে, দুর্নীতিতে ভরা উচ্চপদস্থ অফিসারেরা এবং রাজনীতিবিদেরা জেলেও যায় না অথবা তাদের এই অন্যায় উপার্জনের জন্য ক্ষতিপূরণও দেয় না। গোপনে ঘুঁষ, উৎকোচ ও বেআইনি ভাবে কিছু দেওয়ার ফলে উচ্চশ্রেণীর দুর্নীতিকে প্রকাশ করে দেওয়া প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দুর্নীতিবিহীন জগতের স্বপ্ন অবাস্তব।
দুর্নীতির থেকে মুক্তি আসবে মানুষের সৃষ্টিকর্তা, যিহোবা ঈশ্বরের হাত থেকে। ঐশিক হস্তক্ষেপই হচ্ছে একমাত্র সমাধান। কেন? কারণ মানবজাতির অদৃশ্য শত্রু, শয়তান দিয়াবল, এখনও মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করে চলেছে। আমরা যেমন ১ যোহন ৫:১৯ পদে পড়ি, “সমস্ত জগৎ সেই পাপাত্মার মধ্যে শুইয়া রহিয়াছে।” দুর্নীতি বৃদ্ধির পিছনে আর কী কারণ থাকতে পারে—বিশেষ করে এই মন্দ পরিণামমূলক ফলের পরিপ্রেক্ষিতে?
মানুষের শক্তি কখনই শয়তান ও তার দূতেদের দমন করতে পারবে না। একমাত্র ঐশিক হস্তক্ষেপই বাধ্য মানবজাতিকে “ঈশ্বরের সন্তানগণের প্রতাপের স্বাধীনতা”-র নিশ্চয়তা দিতে পারে। (রোমীয় ৮:২১) যিহোবা প্রতিজ্ঞা করেছেন যে অবিলম্বে শয়তানকে নিয়ন্ত্রিত করা হবে যাতে করে সে আর মানবজাতিকে প্রবঞ্চনা করতে না পারে। (প্রকাশিত বাক্য ২০:৩) কিন্তু, আমরা যদি ঈশ্বরের এই দুর্নীতি-মুক্ত নতুন জগতে থাকতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই জগতের দুর্নীতিপূর্ণ পথকে পরিত্যাগ করতে হবে।
লোকেরা পরিবর্তন হতে পারে
যীশু খ্রীষ্টের দিনে, এমন কিছু লোক ছিল যারা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করত এবং তাদের সহমানবদের উৎপীড়ন করত। উদাহরণস্বরূপ, করগ্রাহীরা তাদের অন্যায় অভ্যাসের জন্য পরিচিত ছিল। আর এই অন্যায় প্রচলিত ছিল ঈশ্বরে নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা সত্ত্বেও: “আর তুমি উৎকোচ গ্রহণ করিও না, কেননা উৎকোচ মুক্তচক্ষুদিগকে অন্ধ করে, এবং ধার্ম্মিকদের কথা সকল উল্টায়।” (যাত্রাপুস্তক ২৩:৮) এক প্রধান করগ্রাহী, সক্কেয়, স্বীকার করে যে মিথ্যা দোষারোপ করার দ্বারা সে কর আদায় করত। কিন্তু ব্যাপকভাবে সামাজিক সংস্কার না করে যীশু ব্যক্তিবিশেষদের ব্যক্তিগতভাবে অনুতপ্ত হতে এবং তাদের অন্যায় পথকে পরিত্যাগ করতে উৎসাহ দেন। (মথি ৪:১৭) এর ফলে, পরিচিত প্রতারণাকারী করগ্রাহী যেমন মথি ও সক্কেয় তাদের পূর্বেকার জীবনধারায় পরিবর্তন আনে।—মথি ৪:১৭; ৯:৯-১৩; লূক ১৯:১-১০.
আজকে যারা অন্যায় অভ্যাসের সাথে জড়িত তারাও ঠিক একই রকমভাবে “সেই নূতন মনুষ্যকে, . . . যাহা সত্যের ধার্ম্মিকতায় ও সাধুতায় ঈশ্বরের সাদৃশ্যে সৃষ্ট হইয়াছে” তা পরিধান করে দুর্নীতিকে পরিত্যাগ করতে পারে। (ইফিষীয় ৪:২৪) সততার সাথে কর দেওয়া অথবা সন্দেহজনক প্রকল্পের মধ্যে অংশ নিতে বন্ধ করে দেওয়া হয়ত সহজ কাজ হবে না। কিন্তু, এর উপকারিতার কথা চিন্তা করলে তা করা খুবই যুক্তিযুক্ত।
দুর্নীতিময় জগতের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, যারা অপরের মঙ্গল চিন্তা করে তারা অন্তরে শান্তি উপভোগ করে। অন্যায় কাজে ধরা পড়ে যাওয়ার আর ভয় থাকে না। বরঞ্চ, তারা উত্তম সংবেদ উপভোগ করে। তারা ভাববাদী দানিয়েলের উদাহরণ যা বাইবেলে দেওয়া আছে তা অনুকরণ করে। বাইবেলের বিবরণ জানায় যে অধ্যক্ষেরা সবসময় দানিয়েলের বিরুদ্ধে কিছু অজুহাত খোঁজার চেষ্টা করেছিল। “কিন্তু কোন দোষ বা অপরাধ পাইলেন না; কেননা তিনি বিশ্বস্ত ছিলেন, তাঁহার মধ্যে কোন ভ্রান্তি কিম্বা অপরাধ পাওয়া গেল না।”—দানিয়েল ৬:৪.
যিহোবার প্রতিজ্ঞা
যিহোবা প্রতিজ্ঞা করেছেন যে “পাপী যদ্যপি শতবার দুষ্কর্ম্ম করিয়া দীর্ঘকাল থাকে, তথাপি আমি নিশ্চয় জানি, ঈশ্বর-ভীত লোকদের, যাহারা ঈশ্বরের সাক্ষাতে ভীত হয়, তাহাদের মঙ্গল হইবে; কিন্তু দুষ্ট লোকের মঙ্গল হইবে না, ও সে দীর্ঘকাল থাকিবে না; তাহার আয়ু ছায়াস্বরূপ; কারণ সে ঈশ্বরের সাক্ষাতে ভীত হয় না।”—উপদেশক ৮:১২, ১৩.
কতই না স্বস্তির সময় আসবে যখন দুর্নীতি আর নিরানন্দের কারণ হবে না! দুর্নীতিবিহীন জগতে চিরকাল বেঁচে থাকা কতই না আশীর্বাদের বিষয়! এটা অসম্ভব নয়। বাইবেল “সেই অনন্ত জীবনের আশাযুক্ত, যাহা মিথ্যাকথনে অসমর্থ ঈশ্বর অতি পূর্ব্ব কালে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন” এই সম্বন্ধে বলে। (তীত ১:২) আপনি যদি দুর্নীতিকে ঘৃণা করেন এবং ধার্মিকতাকে প্রেম করেন, তাহলে আপনি হয়ত এক দুর্নীতিবিহীন জগৎ সম্বন্ধীয় ঈশ্বরের যে প্রতিজ্ঞা তার পরিপূর্ণতা দেখতে পাবেন।
[৪ পৃষ্ঠার চিত্র]
সরকার ও ব্যবসায়ী জগতে দুর্নীতি বিদ্যমান
[৫ পৃষ্ঠার চিত্র]
জনকর্তৃপক্ষদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রায়ই দুর্নীতির প্রভাব দেখা যায়