দীপ্তির ঝলকগুলি মুখ্য এবং গৌণ—প্রথম ভাগ
“ধার্ম্মিকদের পথ প্রভাতীয় জ্যোতির ন্যায়, যাহা মধ্যাহ্ন পর্য্যন্ত উত্তরোত্তর দেদীপ্যমান হয়।”—হিতোপদেশ ৪:১৮.
১. সত্যকে কেন ধীরে ধীরে প্রকাশ করা হয়েছে?
ঐশিক প্রজ্ঞা এটাই প্রমাণ দেয় যে হিতোপদেশ ৪:১৮ পদের সাথে মিল রেখে আধ্যাত্মিক সত্যগুলি দীপ্তির ঝলক পেয়ে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে। আগের প্রবন্ধে আমরা দেখেছি এই শাস্ত্রপদটি কিভাবে প্রেরিতদের সময়ে পরিপূর্ণতা লাভ করছিল। যদি একসাথে অনেক শাস্ত্রীয় সত্যের উন্মোচন ঘটে, তাহলে বিশৃঙ্খলা এবং বিভ্রান্তি, উভয়েরই সৃষ্টি হতে পারে—ঠিক যেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি গুহা থেকে বেরিয়ে উজ্জ্বল সূর্যালোকের সামনে আসা। এছাড়াও, ধীরে ধীরে প্রকাশিত সত্যগুলি খ্রীষ্টানদের বিশ্বাসকে ক্রমাগতভাবে দৃঢ় করে। এটা তাদের তাদের আশাকে প্রাণবন্ত করে এবং যাত্রাপথকে আরও পরিষ্কার করে।
“বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাস”
২. যীশু তাঁর অনুগামীদের আধ্যাত্মিক দীপ্তি দান করার জন্য কাদের ব্যবহার করবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এবং কাদের নিয়ে এই সংগঠনটি গঠিত?
২ প্রেরিতদের সময়ে, যীশু খ্রীষ্ট তাঁর অনুগামীদের প্রাথমিক দীপ্তির ঝলকগুলি প্রদান করতে অতিপ্রাকৃত উপায়গুলি ব্যবহার করাকে উপযুক্ত বলে মনে করেছিলেন। এর দুটি উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে: সা.শ. ৩৩ সালে পঞ্চাশত্তমী দিন এবং সা.শ. ৩৬ সালে কর্ণীলিয়ের ধর্মান্তকরণ। পরবর্তীকালে, খ্রীষ্ট একটি মানুষের মাধ্যমকে ব্যবহার করাকে উপযুক্ত বলে মনে করেছিলেন, এমনকি তিনি যেমন ভাববাণীও করেছিলেন: “এখন, সেই বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাস কে, যাহাকে তাহার প্রভু নিজ পরিজনের উপরে নিযুক্ত করিয়াছেন, যেন সে তাহাদিগকে উপযুক্ত সময়ে খাদ্য দেয়? ধন্য সেই দাস, যাহাকে তাহার প্রভু আসিয়া সেইরূপ করিতে দেখিবেন। আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, তিনি তাঁহাকে আপন সর্ব্বস্বের অধ্যক্ষ করিবেন।” (মথি ২৪:৪৫-৪৭) এই দাস শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিবিশেষ হতে পারে না, কারণ যখন থেকে খ্রীষ্টীয় মণ্ডলী স্থাপিত হয়েছে, তখন অর্থাৎ পঞ্চাশত্তমী থেকে শুরু করে যতক্ষণ না যীশু খ্রীষ্ট জবাবদিহি নেওয়ার জন্য আসেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে আধ্যাত্মিক খাদ্য দিয়ে যেতে হবে। ঘটনাবলী ইঙ্গিত দেয় যে এই বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাসশ্রেণী হল পৃথিবীতে যে কোন নির্দিষ্ট সময়ে সমস্ত অভিষিক্ত খ্রীষ্টানদের নিয়ে তৈরি দলবিশেষ।
৩. দাসশ্রেণীর প্রথম সদস্যদের মধ্যে কারা অন্তর্ভুক্ত ছিল?
৩ বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাসশ্রেণীর প্রথম সদস্য কারা ছিলেন? একজন ছিলেন প্রেরিত পিতর, যিনি যীশুর আদেশ মান্য করেছিলেন: “আমার মেষগণকে চরাও।” (যোহন ২১:১৭) দাসশ্রেণীর অন্যান্য প্রাথমিক সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মথি, যিনি তার নামের অনুকরণে সুসমাচারের পুস্তকটি লেখেন এবং পৌল, যাকোব এবং যিহূদা, যারা অনুপ্রাণিত পত্রগুলি লিখেছিলেন। প্রেরিত যোহন, যিনি প্রকাশিত বাক্য পুস্তকটি, তার সুসমাচারের পুস্তক এবং তার পত্রগুলি লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তিনিও বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাসশ্রেণীর একজন সদস্য ছিলেন। যীশুর নির্দেশ অনুসারে এইসব লোকেরা বাইবেলের পুস্তকগুলি লিখেছিলেন।
৪. “পরিজন” কারা?
৪ যদি সমস্ত অভিষিক্তেরা দলগতভাবে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই থাকুক না কেন, এই দাসশ্রেণীর অংশ হন, তাহলে ‘পরিজন’ কারা? তারা হলেন সেই একই অভিষিক্ত জনেরা, কিন্তু একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে—ব্যক্তিবিশেষ হিসাবে। হ্যাঁ, ব্যক্তিবিশেষ হিসাবে তারা “দাস” অথবা ‘পরিজন,’ তা নির্ভর করে তারা আধ্যাত্মিক খাদ্য দিচ্ছেন না গ্রহণ করছেন তার উপর। উদাহরণস্বরূপ বলতে গেলে: ২ পিতর ৩:১৫, ১৬ পদে যেমন লিপিবদ্ধ আছে, প্রেরিত পিতর পৌলের পত্রগুলির প্রতি দৃষ্টি আরোপ করান। সেগুলি পড়ার সময় পিতর হলেন পরিজনের একজন, আধ্যাত্মিক খাদ্য গ্রহণ করছেন যেটি পৌল দাস শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসাবে যোগান দিচ্ছেন।
৫. (ক) প্রেরিতদের পরের শতাব্দীগুলিতে দাসেদের কী ঘটেছিল? (খ) উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে কী কী ঘটনা ঘটেছিল?
৫ এই বিষয়ে সহস্র বছরব্যাপী ঈশ্বরের রাজ্য সন্নিকট (ইংরাজি) বইটি জানায়: “যীশু খ্রীষ্টের প্রেরিতদের মৃত্যুর পর থেকে ঠিক কিভাবে ‘বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাস’ দীর্ঘ শতাব্দী ধরে অস্তিত্বে থেকেছে এবং পরিচর্যা করে এসেছে, তার সঠিক কোন ঐতিহাসিক চিত্র আমাদের নেই। মনে হয়, ‘দাস’ শ্রেণী তাদের পরবর্তী বংশকে খাদ্য যুগিয়ে এসেছে। (২ তীমথিয় ২:২) কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ঈশ্বরভীরু লোকেরা ছিলেন যারা পবিত্র বাইবেলের আধ্যাত্মিক খাদ্যকে ভালবাসতেন এবং যারা এই আধ্যাত্মিক খাদ্যকে ক্রমাগতভাবে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। . . . বাইবেল অধ্যয়ন ক্লাসগুলির . . . আয়োজন করা হয় এবং পবিত্র শাস্ত্রের প্রাথমিক সত্যগুলি বুঝতে পারার দিকে অগ্রগতি লাভ করতে থাকে। এই বাইবেল ছাত্রদের মধ্যে যারা অকপট নিঃস্বার্থপর ছিলেন, তারা সেই আধ্যাত্মিক খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি অপরের সাথে ভাগ করে নিতে উৎসুক ছিলেন। উপযুক্ত সময়ে ‘পরিজনদের’ প্রয়োজনীয় ‘আত্মিক খাদ্যের যোগান দিতে’ নিযুক্ত ‘দাস’ এর বিশ্বস্ত আত্মা ছিল। তারা ‘বুদ্ধিমান্’ ছিলেন কারণ তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে এটাই হল সঠিক ও উপযুক্ত সময় ও কী উপায়ে পরিবেশন করা সর্বোৎকৃষ্ট হবে। তারা তা করতে প্রচেষ্টা করেছিলেন।—পৃষ্ঠা ৩৪৪-৫.a
বর্তমান সময়ে প্রাথমিক দীপ্তির ঝলকগুলি
৬. ধীরে ধীরে সত্যকে প্রকাশ করার পরিপ্রক্ষিতে কোন্ ঘটনা পরিষ্কার হয়ে ফুটে ওঠে?
৬ যিহোবা যাদের এই আধ্যাত্মিক জ্যোতি বৃদ্ধি করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তাদের বিষয়ে একটি জিনিস লক্ষনীয় ছিল যে তারা কখনও নিজেদের জন্য প্রশংসা আনার চেষ্টা করেনি। ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির প্রথম সভাপতি সি. টি. রাসেলের মনোভাব এটাই ছিল যে তারা তাদের কর্মদক্ষতাকে নম্রভাবে প্রভুর কাজে ব্যবহার করলে প্রভু তাতেই খুশি হন। তার শত্রুরা যে সব পদবি ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল, সেই বিষয়ে ভাই রাসেল পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি কখনও কোন “রাসেলাইট” এর সাক্ষাৎ পাননি, “রাসেলিজম” বলে কোন জিনিস নেই। সমস্ত প্রশংসা ঈশ্বরের কাছে গিয়েছিল।
৭. ভাই রাসেল এবং তার সহকর্মীরা কী প্রমাণ রেখেছিলেন যা দেখায় যে তারা অবশ্যই বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাসের সাথে জড়িত ছিল?
৭ ফল দেখে বিচার করার ক্ষেত্রে অবশ্যই দেখা যায় যিহোবার পবিত্র আত্মা রাসেল ও যারা তার সাথে মেলামেশা করছিল, তাদের সাহায্য করেছিল। তারা যে বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাসশ্রেণীর অংশ, তা তারা প্রমাণ করেছিলেন। যদিও সেই সময়ের অনেক পাদ্রী বিশ্বাস করত যে বাইবেল ছিল ঈশ্বরের অনুপ্রাণিত বাক্য এবং যীশু ছিলেন ঈশ্বরের পুত্র, তবুও তারা মিথ্যা বাবিলনীয় শিক্ষা, যেমন ত্রিত্ব, মানব প্রাণ অমর এবং অনন্ত যাতনার শিক্ষাগুলিকে গ্রহণ করেছিল। যীশুর প্রতিজ্ঞা অনুসারে, সত্যই পবিত্র আত্মার সহায়তায়, ভাই রাসেল এবং তার সঙ্গীদের একান্ত চেষ্টার ফলে সত্য স্পষ্টতর হতে শুরু করে, যা আগে কখনও হয়নি। (যোহন ১৬:১৩) এইসব অভিষিক্ত বাইবেল ছাত্ররা প্রমাণ করেছিলেন যে তারা সত্যই বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাসশ্রেণীর অংশ ছিলেন, যাদের কাজ হল প্রভুর পরিজনদের আধ্যাত্মিক খাদ্য যোগানো। অভিষিক্তদের একত্রীকরণের কাজে তাদের প্রচেষ্টা ছিল প্রচুর।
৮. যিহোবা ঈশ্বর, বাইবেল, যীশু খ্রীষ্ট এবং পবিত্র আত্মার বিষয়ে কোন্ প্রাথমিক সত্যগুলি বাইবেল ছাত্ররা বুঝতে পেরেছিলেন?
৮ এটা দেখা কতই না আনন্দের যে কী দারুণভাবে যিহোবা, পবিত্র আত্মার সহায়তায় এই প্রাথমিক বাইবেল ছাত্রদের দীপ্তির ঝলক দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। শুরুতেই তারা দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছিলেন যে সৃষ্টিকর্তা আছেন এবং তাঁর অদ্বিতীয় নাম হল যিহোবা। (গীতসংহিতা ৮৩:১৮; রোমীয় ১:২০) তারা উপলব্ধি করেছিলেন যে যিহোবার চারটি বিশেষ গুণ আছে—শক্তি, ন্যায়বিচার, প্রজ্ঞা এবং প্রেম। (আদিপুস্তক ১৭:১; দ্বিতীয় বিবরণ ৩২:৪; রোমীয় ১১:৩৩; ১ যোহন ৪:৮) এই অভিষিক্ত খ্রীষ্টানেরা পরিষ্কার করে দেখিয়ে দেন যে বাইবেল হল ঈশ্বরের অনুপ্রাণিত বাক্য এবং তা হল সত্য। (যোহন ১৭:১৭; ২ তীমথিয় ৩:১৬, ১৭) এছাড়া, তারা এও বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বরের পুত্র যীশু খ্রীষ্টকে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং তিনি তাঁর জীবন মুক্তির মূল্যরূপে সকল মানবজাতি জন্য দিয়েছিলেন। (মথি ২০:২৮; কলসীয় ১:১৫) পবিত্র আত্মা ত্রিত্বের তৃতীয় ব্যক্তি হওয়া ত দূরের কথা, কিন্তু তা হল ঈশ্বরের কার্যকারী শক্তি।—প্রেরিত ২:১৭.
৯. (ক) মানুষের প্রকৃতি এবং বাইবেলে যে গন্তব্যস্থলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে কোন্ সত্যগুলি বাইবেল ছাত্ররা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন? (খ) অন্যান্য কোন্ সত্যগুলি যিহোবার দাসেরা পরিষ্কারভাবে দেখতে পেয়েছিলেন?
৯ বাইবেল ছাত্ররা পরিষ্কারভাবে দেখেছিলেন যে মানুষের একটি অমর প্রাণ নেই, কিন্তু সে একজন মরণশীল প্রাণী। তারা উপলব্ধি করেছিলেন যে, “পাপের বেতন মৃত্যু,” অনন্তকালীন যাতনা নয়, কারণ জলন্ত নরকাগ্নি বলে কোন স্থান নেই। (রোমীয় ৫:১২; ৬:২৩; আদিপুস্তক ২:৭; যিহিষ্কেল ১৮:৪) এছাড়াও তারা পরিষ্কারভাবে দেখেছিলেন যে ক্রমবিবর্তনবাদ শুধুমাত্র অশাস্ত্রীয়ই নয়, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। (আদিপুস্তক ১ ও ২ অধ্যায়) তারা এটাও বুঝতে পারেন যে বাইবেল দুটি গন্তব্য পথের বিষয়ে উল্লেখ করে—একটি হল স্বর্গীয়, খ্রীষ্টের পদানুসরণকারীদের অভিষিক্ত ১,৪৪,০০০ জনের জন্য এবং আর একটি পরমদেশ পৃথিবীতে থাকার জন্য অগণিত “অপর মেষ” এর “বিস্তর লোক।” (প্রকাশিত বাক্য ৭:৯; ১৪:১; যোহন ১০:১৬) এইসব প্রাথমিক বাইবেল ছাত্ররা এও উপলব্ধি করেছিলেন যে পৃথিবী চিরকাল থাকবে এবং তা জ্বলে যাবে না, যেমন অনেক ধর্ম শিক্ষা দিয়ে থাকে। (উপদেশক ১:৪; লূক ২৩:৪৩) তারা এও শিখেছিলেন যে খ্রীষ্টের প্রত্যাবর্তন হবে অদৃশ্য, আর তখন তিনি জাতিগণের উপর বিচার করবেন এবং পার্থিব পরমদেশ নিয়ে আসবেন।—প্রেরিত ১০:৪২; রোমীয় ৮:১৯-২১; ১ পিতর ৩:১৮.
১০. বাপ্তিস্ম, যাজকীয় এবং অযাজকীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য এবং খ্রীষ্টের মৃত্যুর স্মরণার্থক সভার বিষয়ে কোন্ সত্যগুলি বাইবেল ছাত্ররা শিখেছিলেন?
১০ বাইবেল ছাত্ররা শিখেছিলেন যে শাস্ত্রীয় বাপ্তিস্ম শিশুদের মাথায় জল ছিটিয়ে হয় না, কিন্তু মথি ২৮:১৯, ২০ পদে যীশুর আদেশ অনুসারে হয়, যা হল যারা সত্য শিখেছে, তাদের অবগাহনের মাধ্যমে বাপ্তিস্ম দেওয়া। তারা দেখেছিলেন যে যাজকীয় এবং অযাজকীয় সাধারণ লোকেদের মধ্যে শাস্ত্রীয় কোন ভেদাভেদ নেই। (মথি ২৩:৮-১০) পরিবর্তে, সকল খ্রীষ্টানদেরই সুসমাচারের প্রচারক হওয়া উচিত। (প্রেরিত ১:৮) বাইবেল ছাত্ররা উপলব্ধি করেছিলেন যে যীশু খ্রীষ্টের মৃত্যুর স্মরণার্থক সভা, বছরে একবারই হওয়া উচিত, আর তা হল ১৪ই নিশান। তাছাড়াও, তারা দেখেছিলেন যে ইস্টার হল পৌত্তলিক উৎসব। এর সাথে তাদের কাজের পিছনে যে যিহোবা আছেন, সেই বিষয়ে অভিষিক্ত খ্রীষ্টানেরা এতই নিশ্চিত ছিলেন যে তারা কখনও দান চাননি। (মথি ১০:৮) প্রথম থেকেই, তারা বুঝেছিলেন যে খ্রীষ্টানেরা যেন বাইবেলের মান অনুসারে জীবন-যাপন করে, যার অন্তর্ভুক্ত হল ঈশ্বরের পবিত্র আত্মার ফল উৎপন্ন করা।—গালাতীয় ৫:২২, ২৩.
দীপ্তির ঝলকগুলি বেড়ে উঠে
১১. খ্রীষ্টীয় দায়িত্ব এবং যীশুর দেওয়া মেষ ও ছাগের দৃষ্টান্তের উপরে কোন্ আলোকপাত করা হয়েছে?
১১ বিশেষ করে ১৯১৯ সাল থেকে যিহোবার সাক্ষীরা ক্রমবর্ধমান দীপ্তির ঝলকগুলির দ্বারা আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৯২২ সালে সিডার পয়েন্ট সম্মেলনে কী প্রখর দীপ্তির ঝলকই না দেখা গিয়েছিল যখন ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির দ্বিতীয় সভাপতি জে. এফ. রাদারফোর্ড যিহোবার দাসেদের যে প্রধান দায়িত্ব, “রাজা এবং তাঁর রাজ্যকে ঘোষণা কর, ঘোষণা কর, ঘোষণা কর,” এই বিষয়ের উপর দৃঢ়ভাবে জোর দেন! তার ঠিক পরের বছরে এক প্রখর দীপ্তি প্রকাশ পায় মেষ ও ছাগের দৃষ্টান্তের উপর। এটা বুঝা যায় যে এই ভাববাণীটি বর্তমান সময়ে প্রভুর দিনে পরিপূর্ণ হওযার কথা, ভবিষ্যতে হাজার বছরের রাজত্বকালে নয়, যেমন আগে ভাবা হয়েছিল। হাজার বছরের রাজত্বকালে খ্রীষ্টের ভাইরা অসুস্থ হবে না বা জেলে বন্দীও থাকবে না। এছাড়াও, হাজার বছরের শেষে যীশু খ্রীষ্ট নয়, কিন্তু যিহোবা ঈশ্বরই বিচার সম্পাদন করবেন।—মথি ২৫:৩১-৪৬.
১২. হর্মাগিদোনের বিষয়ে কোন্ দীপ্তির ঝলক আসে?
১২ ১৯২৬ সালে আরেকটি উজ্জ্বল দীপ্তির ঝলক দেখা যায়, যখন বলা হয় যে হর্মাগিদোনের যুদ্ধ কোন সামাজিক বিপ্লব নয়, যা একসময়ে বাইবেল ছাত্ররা ভাবতেন। পরিবর্তে, এটা হবে এমন এক যুদ্ধ, যেখানে যিহোবা এমন পরিষ্কারভাবে তার শক্তি প্রদর্শন করবেন যাতে সকল লোকে নিশ্চিত হবে যে তিনি হলেন ঈশ্বর।—প্রকাশিত বাক্য ১৬:১৪-১৬; ১৯:১৭-২১.
বড়দিন—একটি পৌত্তলিকতামূলক ছুটি
১৩. (ক) বড়দিন উৎসবের উপরে কোন্ দীপ্তি প্রকাশ পায়? (খ) জন্মদিন আর কেন পালন করা হয় না? (পাদটীকা অন্তর্ভুক্ত)
১৩ এর অল্পকাল পরেই, দীপ্তির এক ঝলক বাইবেল ছাত্রদের বড়দিন পালন করা থেকে বিরত করে। কিন্তু এর আগে, পৃথিবীব্যাপী বাইবেল ছাত্ররা সর্বদা বড়দিন পালন করতেন এবং ব্রুকলিন প্রধান কার্যালয়ের উদ্যাপন হত খুব ধুমধাম করে। কিন্তু তখন বুঝা যায় যে ২৫শে ডিসেম্বরের উদ্যাপন ছিল আসলে পৌত্তলিক এবং ধর্মভ্রষ্ট খ্রীষ্টীয় জগৎ তা বেছে নিয়েছিল, যাতে করে পৌত্তলিক উপাসকদের সহজে ধর্মান্তকরণ করা যায়। এছাড়াও, এও জানা যায় যে যীশু শীতকালে জন্মাতে পারেন না, কারণ তাঁর জন্মের সময়ে মেষপালকেরা মাঠে তখনও মেষদের চড়াচ্ছিল—যা ডিসেম্বরের শেষে রাত্রিকালে করতে পারা সম্ভব নয়। (লূক ২:৮) বরং শাস্ত্র ইঙ্গিত দেয় যে যীশুর জন্ম ১লা অক্টোবর হয়েছিল। বাইবেল ছাত্ররা আরও বুঝতে পারে যে তথাকথিত যে জ্ঞানী ব্যক্তিরা যারা যীশুর জন্মের দুবছর পরে সাক্ষাৎ করতে এসেছিল, তারা হল পৌত্তলিক জ্ঞানী ব্যক্তিরা মেজাই।b
একটি নতুন নাম
১৪. যিহোবার লোকেদের কাছে বাইবেল ছাত্র নামটি কেন উপযুক্ত নয়?
১৪ ১৯৩১ সালে একটি উপযুক্ত শাস্ত্রীয় নামকে কেন্দ্র করে বাইবেল ছাত্ররা উজ্জ্বল সত্যের এক ঝলক পায়। যিহোবার সাক্ষীরা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের দেওয়া কোন উপাধিই তারা গ্রহণ করতে পারে না, যেমন রাসেলাইট, মিলেনিয়েল ডনিস্ট এবং নো হেলারস।c কিন্তু তারা এও বুঝতে শুরু করে, যে নাম তারা নিজেরা নিয়েছে—আন্তর্জাতিক বাইবেল ছাত্ররা—তাদের যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করেনি। এরা বাইবেল ছাত্রদের থেকেও আরও বেশি কিছু ছিল। এছাড়াও, সেখানে আরও অন্যান্য বাইবেল ছাত্ররাও ছিল, যারা বাইবেলের ছাত্র ছিল বটে, কিন্তু সকল বাইবেল ছাত্রদের সাথে এদের কোন মিল ছিল না।
১৫. বাইবেল ছাত্ররা ১৯৩১ সালে কোন্ নাম গ্রহণ করে এবং এই নাম কেন উপযুক্ত?
১৫ কী করে বাইবেল ছাত্ররা নতুন নাম পান? বছরের পর বছর ধরে প্রহরীদুর্গ পত্রিকা যিহোবার নামকে খুব স্পষ্ট করে তুলে ধরেছিল। সেইজন্য, এটাই ছিল সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত যে বাইবেল ছাত্ররা যিশাইয় ৪৩:১০, (NW) পদে উল্লেখিত নামটি গ্রহণ করবে: “যিহোবা বলেন, তোমরাই আমার সাক্ষী, এবং আমার মনোনীত দাস; যেন তোমরা জানতে ও আমাকে বিশ্বাস করতে পার, এবং বুঝতে পার যে, আমিই তিনি; আমার আগে কোন ঈশ্বর নির্ম্মিত হয়নি, এবং আমার পরেও হবে না।”
মহিমান্বিতকরণ এবং “বিস্তর লোক”
১৬. যে সব মাংসিক যিহূদীরা প্যালেষ্টাইনে ফিরে আসে, তাদের প্রতি প্রত্যাবর্তনের ভাববাণীগুলি কেন প্রযোজ্য নয়, কিন্তু কাদের প্রতি সেগুলি প্রযোজ্য?
১৬ ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির দ্বারা ১৯৩২ সালে প্রকাশিত ভিনডিকেশন পুস্তকটির দ্বিতীয় খণ্ডে দীপ্তির এক ঝলক প্রকাশ হয়ে পড়ে যে প্রত্যাবর্তনের ভাববাণীগুলি যা যিশাইয়, যিরমিয়, যিহিষ্কেল এবং অন্যান্য ভাববাদীরা করেছিলেন, তা মাংসিক যিহূদীদের প্রতি প্রযোজ্য নয় (যা একসময় ভাবা হয়েছিল), যারা অবিশ্বাসী এবং রাজনৈতিক চক্রান্ত নিয়ে প্যালেষ্টাইনে ফিরে আসছিল। বরং, এইসব প্রত্যাবর্তনের ভাববাণীগুলি যেগুলি সা.শ.পূ. ৫৩৭ সালে যিহূদীরা যখন বাবিলনের বন্দীত্ব থেকে ফিরছিল, তাদের প্রতি ক্ষুদ্র আকারে পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল, তার বৃহত্তর পরিপূর্ণতা ঘটে যখন আত্মিক ইস্রায়েল পরিত্রাণ পায় ও প্রত্যাবর্তন করে ১৯১৯ সালের পরে এবং যার ফলস্বরূপ আত্মিক পরমদেশের উন্নতি ঘটে যা যিহোবার সত্য উপাসকেরা বর্তমানে উপভোগ করে থাকে।
১৭, ১৮. (ক) উপযুক্ত সময়ে, দীপ্তির এক ঝলকের মাধ্যমে যিহোবার মুখ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে কী প্রকাশ করে দেয়? (খ) ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত বাক্য ৭:৯-১৭ পদের উপর কী দীপ্তির ঝলক ঘটে?
১৭ উপযুক্ত সময়ে, দীপ্তির ঝলক প্রকাশ করে দেয় যে যিহোবার মুখ্য উদ্দেশ্য পরিত্রাণ নয়, কিন্তু তাঁর সার্বভৌমত্বকে মহিমান্বিত করা। বাইবেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু মুক্তির মূল্য নয়, কিন্তু রাজ্যই হল মুখ্য বিষয়বস্তু, কারণ তা যিহোবার সার্বভৌমত্বকে মহিমান্বিত করে। কী দীপ্তির ঝলকই না তা ছিল! উৎসর্গীকৃত খ্রীষ্টানেরা আর শুধুমাত্র স্বর্গে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব নয়।
১৮ ১৯৩৫ সালে উজ্জ্বল এক সত্যের ঝলক প্রকাশ করে যে প্রকাশিত বাক্য ৭:৯-১৭ পদে যে বিরাট জনতার কথা বলা হয়েছিল, তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর স্বর্গীয় আশাযুক্ত ব্যক্তিরা নয়। এটা ভাবা হয়েছিল যে এই শাস্ত্রপদে উল্লেখিত ব্যক্তিদের মধ্যে কিছু অভিষিক্ত জনেরাও আছেন, যারা সম্পূর্ণরূপে বিশ্বস্ত নয় এবং সেইজন্য সিংহাসনে বসে যীশু খ্রীষ্টের সাথে রাজা এবং যাজকরূপে শাসন করার পরিবর্তে সিংহাসনের সামনে তারা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আংশিকভাবে বিশ্বস্ত থাকার কোন স্থান সেখানে নাই। একজন ব্যক্তি আংশিক বিশ্বস্ত এবং আংশিক অবিশ্বস্ত হতে পারে না। সেইজন্য দেখা যায় যে এই ভাববাণীটি অগণিত সংখ্যক বিস্তর লোকের প্রতি ইঙ্গিত করে, যারা বিভিন্ন জাতি থেকে এসে একত্রিত হয়েছে এবং যাদের আশা হল পার্থিব। এরা হল মথি ২৫:৩১-৪৬ পদের “মেষ” এবং যোহন ১০:১৬ পদের “অপর মেষ”।
ক্রুশ—একটি খ্রীষ্টীয় প্রতীক নয়
১৯, ২০. কেন ক্রুশ সত্য খ্রীষ্টতত্ত্বের একটি প্রতীক হতে পারে না?
১৯ বহু বছর যাবৎ বাইবেল ছাত্ররা ক্রুশকে খ্রীষ্টতত্ত্বের এক প্রতীকরূপে ব্যবহার করে এসেছে। এমনকি তারা জামায় লাগাবার “ক্রস-অ্যান্ড-ক্রাউন” পিনও ব্যবহার করেছে। কিং জেমস সংস্করণ অনুসারে, যীশু তাঁর অনুগামীদের বলেছিলেন “ক্রুশ” তুলে নিতে, আর তাই অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তিনি ক্রুশে নিহত হয়েছিলেন। (মথি ১৬:২৪; ২৭:৩২) বেশ কয়েক দশক ধরে প্রহরীদুর্গ পত্রিকার মলাটে এই প্রতীকটি ছাপানোও হয়েছিল।
২০ সমিতির দ্বারা ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত রিচেস বইটি পরিষ্কার করে দেয় যীশু খ্রীষ্ট ক্রুশে হত হননি, কিন্তু খাঁড়া করা একটি খুঁটি বা গাছের গুঁড়িতে হত হন। একজন কর্তৃপক্ষের কথা অনুযায়ী, “ক্রুশ” এর গ্রীক শব্দ যাকে (স্টেরস) বলা হয়েছে কিং জেমস সংস্করণে “প্রাথমিকভাবে খাঁড়া করা কোন খুঁটি বা গাছের গুঁড়িকে বুঝায়। এটিকে গির্জায় ব্যবহৃত আড়াআড়িভাবে দুটি কাঠকে রাখার পদ্ধতি থেকে স্বতন্ত্র করা উচিত। . . .পরবর্তীটির উদ্ভব হয় প্রাচীন কলদীয় এবং তামুজ দেবতার প্রতীকরূপে ব্যবহৃত হত।” যার উপরে যীশুকে বিদ্ধ করা হয়েছিল, তাকে উপাসনার বস্তু হিসাবে ব্যবহার করার পরিবর্তে সেই জিনিসটিকে ঘৃণা করা দরকার।
২১. পরের প্রবন্ধে কী আলোচনা করা হবে?
২১ উভয় প্রকার আরও দৃষ্টান্ত রয়েছে, যার কোনটি মুখ্য এবং কোনটি বা গৌণ দীপ্তির ঝলক বলে বিবেচিত হতে পারে। সেগুলি আলোচনার জন্য অনুগ্রহ করে পরবর্তী প্রবন্ধটি দেখুন।
[পাদটীকাগুলো]
a ওয়াচ টাওয়ার বাইবেল অ্যান্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটি অফ নিউ ইয়র্ক ইনক্ দ্বারা প্রকাশিত।
b যথাসময়ে, এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জন্মদিন যেটা কখনও ঘটেছিল তা যদি পালন না করা হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের কোন জন্মদিনই পালন করা উচিত নয়। এছাড়াও, ইস্রায়েলীয়রা বা প্রাথমিক খ্রীষ্টানেরা, কেউই জন্মদিন পালন করেনি। বাইবেলে শুধুমাত্র দুটি জন্মদিনের উল্লেখ আছে। একটি হল ফরৌণের এবং অপরটি হল হেরোদ আন্তিপার। প্রতিটি অনুষ্ঠানই হত্যামূলক ঘটনার দ্বারা ম্লান হয়ে গিয়েছিল। যিহোবার সাক্ষীরা জন্মদিন পালন করে না কারণ সেগুলির উৎপত্তি পৌত্তলিকতা থেকে, যা একজন ব্যক্তিকে উচ্চে তুলে ধরে।—আদিপুস্তক ৪০:২০-২২; মার্ক ৬:২১-২৮.
c খ্রীষ্টীয় জগতের বেশ কিছু সম্প্রদায় এই একই ভুল করেছিল। লুথারান হল সেই উপাধি যেটা মার্টিন লুথারের শত্রুরা তার অনুগামীদের দিয়েছিল, যেটি তারা গ্রহণ করেছিল। ব্যাপটিস্টরাও একটি উপাধি গ্রহণ করে, যেটি বাইরের লোকেরা তাদের দিয়েছিল, কারণ তারা অবগাহনের দ্বারা বাপ্তিস্মের শিক্ষার বিষয়ে প্রচার করত। এইভাবে, মেথডিস্টরা একটি নাম গ্রহণ করেছিল, যা বাইরের লোকেরা তাদের দিয়েছিল। কিভাবে সোসাইটি অফ ফ্রেন্ডস, কোয়েকার নামে পরিচিত হয়, সেই বিষয়ে দ্যা ওয়ার্ল্ড বুক এনসাইক্লোপিডিয়া জানায়: “কোয়েকার শব্দটির শুরুতে ফক্স অপমান করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল, যিনি ইংরাজ বিচারককে বলেছিলেন ‘প্রভুর ভয়ে কাঁপতে’। বিচারকটি ফক্সকে ‘কোয়েকার’ বলে ডেকেছিলেন।”
আপনি কি স্মরণ করতে পারবেন?
◻ “বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান্ দাস” কে, আর ‘পরিজনই’ বা কারা?
◻ আধুনিক যুগে কিছু কিছু প্রাথমিক দীপ্তির ঝলক কী?
◻ যিহোবার সাক্ষী নতুন নামটি কেন উপযুক্ত ছিল?
◻ উল্লেখযোগ্য কোন্ সত্যগুলি ১৯৩৫ সালে প্রকাশ পায়?
[১৭ পৃষ্ঠার চিত্র]
সি. টি. রাসেল ও তার সঙ্গীরা আধ্যাত্মিক আলো ছড়ান, কিন্তু সমস্ত মহিমা যিহোবার কাছে যায়