যিহোবার সাক্ষীরা কেন সতর্ক থাকেন
“সতর্ক থাক, কেননা তোমাদের প্রভু কোন্ দিন আসিবেন, তা তোমরা জান না।”—মথি ২৪:৪২, NW.
১. “সতর্ক থাক” আদেশটি কাদের প্রতি প্রযোজ্য?
ঈশ্বরের সকল সেবক—অল্পবয়স্ক অথবা বয়স্ক, সম্প্রতি উৎসর্গীকৃত অথবা বহু বছর ধরে পরিচর্যার রত, যাই হোক না কেন—সকলের প্রতি বাইবেলের এই উপদেশ প্রযোজ্য: “সতর্ক থাক”! (মথি ২৪:৪২) সতর্ক থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
২, ৩. (ক) যীশু স্পষ্টভাবে কোন্ চিহ্নের বর্ণনা করেন এবং ভবিষ্যদ্বাণীর পরিপূর্ণতা কী দেখায়? (খ) মথি ২৪:৪২ পদে আমাদের বিশ্বাসের যথার্থতা পরীক্ষার কোন্ পরিস্থিতির উল্লেখ করা হয়েছে এবং কিভাবে?
২ পৃথিবীতে তাঁর পরিচর্যা-কালের শেষের দিকে, রাজ্যের ক্ষমতায় তাঁর অদৃশ্য উপস্থিতির চিহ্ন সম্বন্ধে যীশু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। (মথি ২৪ ও ২৫ অধ্যায়) তিনি সেই সময় তাঁর রাজকীয় উপস্থিতি সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছিলেন—আর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ঘটনাবলী দেখিয়েছে যে তিনি ১৯১৪ সালে স্বর্গে রাজা হিসাবে আসীন হয়েছিলেন। তিনি একটি পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেছিলেন যার দ্বারা আমাদের বিশ্বাসের যথার্থতা পরীক্ষিত হবে। সেটি হল সেই সময় সম্বন্ধে, যখন মহাক্লেশে যীশু ঘাতক হিসাবে বর্তমান মন্দ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে আসবেন, এই সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন: “কিন্তু সেই দিনের ও সেই দণ্ডের তত্ত্ব কেহই জানে না, স্বর্গে দূতগণও জানেন না, পুত্ত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন। অতএব জাগিয়া থাক, কেননা তোমাদের প্রভু কোন্ দিন আসিবেন, তাহা তোমরা জান না।”—মথি ২৪:৩৬, ৪২.
৩ মহাক্লেশের সময় এবং দিন জানা না থাকলে, আমরা যদি নিজেদের সত্য খ্রীষ্টান বলে দাবি করি, তাহলে প্রত্যেকদিন আমাদের খ্রীষ্টান হিসাবে জীবনযাপন করতে হবে। আপনি যেভাবে জীবনযাপন করছেন, যখন মহাক্লেশ আসবে, তখন কি আপনি প্রভুর অনুমোদন পাবেন? অথবা মৃত্যু যদি প্রথমে আসে, তাহলে, আপনার বর্তমান জীবনের শেষ পর্যন্ত যিহোবার একজন বিশ্বস্ত সেবক হিসাবে কি তিনি আপনাকে মনে রাখবেন?—মথি ২৪:১৩; প্রকাশিত বাক্য ২:১০.
প্রাথমিক শিষ্যেরা সতর্ক হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন
৪. যীশুর আধ্যাত্মিক সতর্ক থাকার উদাহরণ থেকে আমরা কী শিখতে পারি?
৪ আধ্যাত্মিক সতর্কতা সম্বন্ধে যীশু খ্রীষ্ট নিজে উত্তম উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। তিনি বারংবার ও আন্তরিকভাবে তাঁর পিতার কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। (লূক ৬:১২; ২২:৪২-৪৪) পরীক্ষার সম্মুখীন হলে, তিনি শাস্ত্রের উপদেশের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রাখতেন। (মতি ৪:৩-১০; ২৬:৫২-৫৪) যিহোবা তাঁকে যে কাজ দিয়েছিলেন তা থেকে তিনি বিচ্যুত হয়ে পড়েননি। (লূক ৪:৪০-৪৪; যোহন ৬:১৫) যারা নিজেদের যীশুর অনুগামী মনে করতেন, তাদেরও কি একই রকম সতর্ক হওয়া উচিত ছিল?
৫. (ক) আধ্যাত্মিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে যীশুর প্রেরিতদের কেন সমস্যা ছিল? (খ) তাঁর পুনরুত্থানের পর যীশু তাঁর প্রেরিতদের কী সাহায্য দেন?
৫ অনেকসময়ে, এমনকি যীশুর প্রেরিতেরাও ভুল করেছিলেন। অতি আগ্রহ এবং ভুল ধারণার জন্য তাদের হতাশ হতে হয়েছিল। (লূক ১৯:১১; প্রেরিত ১:৬) যিহোবার প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে শেখার আগে, আকস্মিক পরীক্ষা তাদের হতবুদ্ধি করে দেয়। সুতরাং, যীশুকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তখন তাঁর প্রেরিতেরা পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে সেই রাত্রে, ভয় পেয়ে পিতর খ্রীষ্টকে জানা সত্ত্বেও বার বার অস্বীকার করেছিলেন। প্রেরিতেরা তখনও যীশুর এই উপদেশ হৃদয়ে গ্রহণ করেননি: “সতর্ক থাক, ও প্রার্থনা কর।” (মথি ২৬:৪১, NW, ৫৫, ৫৬, ৬৯-৭৫) পুনরুত্থিত হওয়ার পরে, শাস্ত্র ব্যবহার করে যীশু তাদের বিশ্বাস দৃঢ় করে তুলেছিলেন। (লূক ২৪:৪৪-৪৮) আর যখন মনে হয়েছিল যে তাদের যে কাজ দেওয়া হয়েছিল সেটিকে তারা দ্বিতীয় স্থান দিতে যাচ্ছে, তখন যীশু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে তাদের প্রেরণা দিয়েছিলেন।—যোহন ২১:১৫-১৭.
৬. যীশু তাঁর শিষ্যদের কোন্ দুটি ফাঁদ সম্বন্ধে প্রথমেই সাবধান করে দেন?
৬ পূর্বে, যীশু তাঁর শিষ্যদের সাবধান করে দিয়েছিলেন যে তারা যেন জগতের কোন অংশ না হয়। (যোহন ১৫:১৯) একে অপরের উপরে প্রভুত্ব না করে ভাইয়ের মত একসঙ্গে পরিচর্যা করতে তিনি তাদের উপদেশ দিয়েছিলেন। (মথি ২০:২৫-২৭; ২৩:৮-১২) তারা কি তাঁর উপদেশ শুনেছিলেন? তিনি তাদের যে কাজ দিয়েছিলেন তারা কি সেটিকে প্রথম স্থান দিয়েছিল?
৭, ৮. (ক) প্রথম শতাব্দীর খ্রীষ্টানদের সৃষ্ট ইতিহাস কিভাবে প্রদর্শন করে যে তারা যীশুর আদেশ হৃদয়ে গ্রহণ করেছিলেন? (খ) কেন প্রতিনিয়ত আধ্যাত্মিক সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ?
৭ যতদিন প্রেরিতেরা ছিলেন, তারা মণ্ডলীকে রক্ষা করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে প্রাথমিক খ্রীষ্টানেরা রোমীয় সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ব্যাপারে জড়িত ছিলেন না এবং তাদের মধ্যে কোন উচ্চপদস্থ যাজক শ্রেণী ছিল না। বরং তারা ঈশ্বরের রাজ্যের ঐকান্তিক ঘোষক ছিলেন। প্রথম শতাব্দীর শেষ অবধি তারা রোমীয় সাম্রাজ্যের সর্বত্র সাক্ষ্য দিয়ে, এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকায় শিষ্য তৈরি করেন।—কলসীয় ১:২৩.
৮ কিন্তু, প্রচারকাজে সাফল্যের অর্থ এই নয় যে তাদের আর আধ্যাত্মিকভাবে সতর্ক থাকতে হবে না। যীশুর পূর্বঘোষিত আগমন তখনও অনেক দূরে ছিল। আর যখন মণ্ডলী সা.শ. দ্বিতীয় শতকে পদক্ষেপ করে তখন এমন কিছু পরিস্থিতি দেখা যায়, যা খ্রীষ্টানদের আধ্যাত্মিকতাকে বিপদাপন্ন করে। কিভাবে?
যারা সতর্ক থাকতে ক্ষান্ত হয়
৯, ১০. (ক) প্রেরিতদের মৃত্যুর পর, কোন্ ঘটনাবলী দেখায় যে অনেক নামধারী খ্রীষ্টানেরা সতর্ক ছিল না? (খ) এই অনুচ্ছেদে উল্লিখিত কোন্ শাস্ত্রপদগুলি নামধারী খ্রীষ্টানদের আধ্যাত্মিকভাবে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করতে পারত?
৯ মণ্ডলীতে কয়েকজন, যারা আসে তারা মনে করে যে তাদের বিশ্বাস গ্রীক দর্শনবাদের উপযোগী করে প্রকাশ করার প্রয়োজন, যাতে তারা যা প্রচার করছে তা জগতের লোকেদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হয়। ক্রমে, ত্রিত্ব এবং আত্মার অমরত্ব, এই সব পৌত্তলিক মতবাদগুলি একটি কলুষিত খ্রীষ্টতত্ত্বের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে সহস্র বছর রাজত্বের আশা ত্যাগ করা হয়। কেন? যারা আত্মার অমরত্বের বিশ্বাস করতে শুরু করে তারা ধরে নেয় যে মানবদেহের আত্মা একটি আত্মিক জগতে খ্রীষ্টের রাজত্বের সমস্ত আশীর্বাদ পাবে। সুতরাং, রাজ্য ক্ষমতায় খ্রীষ্টের উপস্থিতি সম্বন্ধে সতর্ক থাকার কোন প্রয়োজন তারা বোধ করেননি।—তুলনা করুন গালাতীয় ৫:৭-৯; কলসীয় ২:৮; ১ থিষলনীকীয় ৫:২১.
১০ অন্যান্য ঘটনার জন্য এই পরিস্থিতি আরও বৃদ্ধি পায়। খ্রীষ্টীয় অধ্যক্ষ বলে যারা দাবি করত, তাদের মধ্যে কয়েকজন নিজেদের প্রসিদ্ধ করে তুলবার জন্য মণ্ডলীগুলিকে ব্যবহার করত। খুব চতুরতার সাথে তারা নিজেদের মতামত এবং শিক্ষাকে শাস্ত্রের সমতুল্য অথবা এমনকি তার থেকেও বেশি মূল্যবান করে তোলে। যখন সুযোগ আসে, এই ধর্মভ্রষ্ট গির্জা এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতাগুলিরও সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকে।—প্রেরিত ২০:৩০; ২ পিতর ২:১, ৩.
আরও বেশি সতর্কতার ফল
১১, ১২. কেন প্রটেস্টান্ট সংস্কার সত্য উপাসনায় ফিরে আসাকে চিহ্নিত করেনি?
১১ বহু শতাব্দী ধরে রোমান ক্যাথলিক গির্জা ক্ষমতার অপব্যবহার করার পর, ষোলশ শতাব্দীতে কিছু সংস্কারসাধক, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু এর ফলে সত্য উপাসনা ফিরে আসেনি। কেন আসেনি?
১২ যদিও বিভিন্ন প্রোটেস্টান্ট দল রোমের ক্ষমতার বাইরে চলে আসে, কিন্তু তারা ধর্মভ্রষ্টতার মূল শিক্ষা এবং প্রথাগুলি—যাজক-সাধারণ মানুষের ব্যবধানের ধারণায়, এছাড়া ত্রিত্বে, আত্মার অমরত্বে এবং মৃত্যুর পরে অনন্ত যন্ত্রণায় বিশ্বাস রজায় রাখে। আর রোমান ক্যাথলিক গির্জার মত তারা এখনও রাজনৈতিক ক্ষমতাগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে জগতের অংশ হয়ে থাকে। সুতরাং, রাজা হিসাবে খ্রীষ্টের আগমন সম্বন্ধে সব প্রত্যাশাকে তারা উপেক্ষা করতে থাকে।
১৩. (ক) কী দেখায় যে কিছু লোক সত্যই ঈশ্বরের বাক্যকে মূল্য দিয়েছিল? (খ) উনিশশো শতাব্দীতে, কোন্ ঘটনা কিছু নামধারী খ্রীষ্টানের কাছে বিশেষ আগ্রহের বস্তু হয়? (গ) কেন অনেকে হতাশ হন?
১৩ কিন্তু, যীশু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে প্রেরিতদের মৃত্যুর পরে, শস্যছেদনের সময় পর্যন্ত, নকল খ্রীষ্টানদের (যাদের তিনি শ্যামাঘাসের সাথে তুলনা করেছিলেন) সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকারীরাও (অথবা গম) বৃদ্ধি পেতে থাকবে। (মথি ১৩: ২৯, ৩০) প্রভু যাদের গম হিসাবে দেখেছিলেন, আজ তাদের সকলকে আমরা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে পারি না। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হল যে চোদ্দশো, পনেরশো ও ষোলশো শতাব্দীতে এমন লোকেরা ছিলেন যারা বাইবেলকে সাধারণ মানুষের ভাষায় প্রকাশ করতে নিজেদের জীবন ও স্বাধীনতা বিপন্ন করে। অন্যেরা শুধুমাত্র বাইবেলকে ঈশ্বরের বাক্য হিসাবে মেনে নেননি, কিন্তু ত্রিত্ব মতবাদকে অশাস্ত্রীয় বলে প্রত্যাখ্যানও করেছিলেন। কিছু ব্যক্তি আত্মার অমরত্ব এবং নরকাগ্নিতে যন্ত্রণা পাওয়ার মতবাদের সঙ্গে ঈশ্বরের বাক্যের কোন মিল নেই বলে, সেগুলি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এছাড়াও, উনিশশো শতাব্দীতে বাইবেল আরও ভালভাবে অধ্যয়ন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ইংল্যান্ড, এবং রাশিয়ার বিভিন্ন দল, খ্রীষ্টের পুনরাগমনের সময় হয়েছে বলে তাদের দৃঢ় বিশ্বাসটি প্রকাশ করে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ আশাই ব্যর্থ হয়। কেন? বেশ কিছু ক্ষেত্রে, তারা শাস্ত্রের বদলে মানুষের উপরে অতিরিক্ত নির্ভর করেছিল।
কিভাবে এরা সতর্ক প্রমাণিত হয়
১৪. সি. টি. রাসেল এবং তার সহযোগীদের বাইবেল অধ্যয়ন করার রীতির বর্ণনা দিন।
১৪ তারপর, ১৮৭০ সালে, পেন্সিল্ভানিয়ার অ্যালেঘেনিতে চার্লস্ টেজ্ রাসেল এবং তার কয়েকজন সহযোগী বাইবেল অধ্যয়ন করার জন্য একটি দল গড়েছিলেন। বাইবেল থেকে যে সত্যগুলি তারা গ্রহণ করে নিয়েছিলেন, তার অনেকগুলিই আবিষ্কার করতে তারাই প্রথম ছিলেন না, কিন্তু অধ্যয়নের সময়ে যে কোন প্রশ্ন সম্পর্কে ভালভাবে সমস্ত শাস্ত্র পরীক্ষা করে দেখার তারা অভ্যাস করেন।a কোন পূর্বকল্পিত ধারণা সম্বন্ধে প্রমাণস্বরূপ শাস্ত্র খুঁজে বার করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না, কিন্তু তারা নিশ্চিত হতে চাইছিলেন যে সেই বিষয়ে বাইবেল যা বলছে তার সাথে তাদের সিদ্ধান্তের যেন সমতা থাকে।
১৫. (ক) ভাই রাসেল ছাড়া অন্যেরাও কী বুঝতে পেরেছিলেন? (খ) এদের থেকে বাইবেল ছাত্রদের কী পৃথক করেছিল?
১৫ তাদের আগে আরও কয়েকজন বুঝেছিলেন যে খ্রীষ্ট অদৃশ্যভাবে, আত্মিকরূপে ফিরে আসবেন। কেউ কেউ লক্ষ্য করেছিলেন যে খ্রীষ্টের পুনরাগমনের উদ্দেশ্য পৃথিবীকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মানবজীবন নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া নয়, কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত পরিবারকে আশীর্বাদ করা। এমনকি কয়েকজন এও বুঝেছিলেন যে ১৯১৪ সাল জাতিগণের সময়ের শেষকে চিহ্নিত করবে। কিন্তু ভাই রাসেলের সঙ্গে জড়িত বাইবেলের ছাত্রদের কাছে এই সমস্ত বিষয়গুলি ঈশ্বরতত্ত্ব সম্বন্ধে আলোচনার বিষয় ছাড়া আরও কিছু ছিল। এই সত্যগুলিকে কেন্দ্র করে তারা তাদের জীবন গড়ে তুলেছিলেন এবং সেগুলিকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এমনভাবে প্রচার করেছিলেন যার বিস্তৃতি সেই যুগে অভূতপূর্ব ছিল।
১৬. ভাই রাসেল কেন ১৯১৪ সালে লিখেছিলেন: “আমরা এক পরীক্ষার সময়ে বাস করছি”?
১৬ তবুও, তাদের সতর্ক থাকার প্রয়োজন ছিল। কেন? যেমন উদাহরণস্বরূপ, যদিও তারা জানতেন না যে বাইবেলে ভবিষ্যদ্বাণী দ্বারা ১৯১৪ সালকে চিহ্নিত করা হয়েছে, কিন্তু তারা নিশ্চিতভাবে জানতেন না সেই বছরে কী ঘটতে চলেছে। এইজন্য তাদের সামনে একটি পরীক্ষা উপস্থিত হয়। নভেম্বর ১, ১৯১৪ সালের প্রহরীদুর্গ-এ ভাই রাসেল লিখেছিলেন: “আমাদের মনে রাখা উচিত যে আমরা একটি পরীক্ষার সময়ে বাস করছি। . . . কোন কারণের জন্য আমাদের মধ্যে কেউ যদি প্রভু এবং তাঁর সত্যে বিশ্বাস করা ত্যাগ করে, তাহলে সে যে ঈশ্বরের প্রতি প্রেমের জন্য প্রভুর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল তা নয়, কিন্তু অন্য কিছুর জন্য হয়েছিল; হয়ত সে ভেবেছিল যে খুব অল্প সময় বাকি আছে; একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাকে উৎসর্গীকৃত থাকতে হবে।”
১৭. এ. এইচ্. ম্যাক্মিলান এবং তার মত অন্যান্য ব্যক্তিরা কিভাবে আধ্যাত্মিক ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন?
১৭ কিছু ব্যক্তি তখনই যিহোবার সেবা করা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু এ. এইচ্. ম্যাক্মিলান দেননি। বহু বছর পরে তিনি অকপটে স্বীকার করেছিলেন: “কখনও কখনও কোন তারিখ সম্বন্ধে আমাদের আশা শাস্ত্রের উপর ভিত্তি করা আশার থেকে আরও বেশি ছিল।” আধ্যাত্মিক ভারসাম্য বজায় রাখতে তাকে কী সাহায্য করেছিল? তিনি যেমন বলেছিলেন যে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন “এইরকম আশা পূর্ণ না হলেও, ঈশ্বরের উদ্দেশ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি।” তিনি আরও বলেছিলেন: “আমি শিখেছিলাম যে আমাদের ভুল স্বীকার করা উচিত এবং আরও জ্ঞানালোক প্রাপ্তির জন্য ঈশ্বরের বাক্য অন্বেষণ করা চালিয়ে যাওয়া উচিত।”b নম্রতার সাথে, সেই প্রাথমিক বাইবেল ছাত্রেরা তাদের দৃষ্টিকোণের রদবদল করতে ঈশ্বরের বাক্যকে সুযোগ দেয়।—২ তীমথিয় ৩:১৬, ১৭.
১৮. জগতের কোন অংশ না হওয়ার বিষয়ে খ্রীষ্টীয় সতর্কতা ধীরে ধীরে বেশি উপকার নিয়ে এসেছিল?
১৮ বছরগুলি অতিবাহিত করার সাথে সাথে, তাদের সতর্ক থাকার প্রয়োজন কমে যায়নি। তারা অবশ্যই জানতেন যে, খ্রীষ্টানেরা জগতের অংশ হবে না। (যোহন ১৭:১৪; যাকোব ৪:৪) এর সঙ্গে সমতা রেখে, জাতিপুঞ্জকে ঈশ্বরের রাজ্যের রাজনৈতিক অভিব্যক্তি হিসাবে সমর্থন করতে তারা খ্রীষ্টজগতের সাথে যোগ দেননি। কিন্তু ১৯৩৯ সালের আগে পর্যন্ত তারা খ্রীষ্টীয় নিরপেক্ষতার বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানতেন না।—প্রহরীদুর্গ, নভেম্বর ১, ১৯৩৯, দেখুন।
১৯. সংগঠনের সতর্ক থাকার ফলে মণ্ডলী দেখাশোনার ক্ষেত্রে কী উপকার পাওয়া গেছে?
১৯ তাদের মধ্যে কোন যাজকবর্গ ছিল না, কিন্তু কিছু নির্বাচিত প্রাচীন মনে করেন যে মণ্ডলীতে প্রচার করাই হল তাদের একমাত্র কাজ। কিন্তু শাস্ত্র অনুযায়ী চলার একান্ত ইচ্ছা নিয়ে, শাস্ত্রের আলোকে প্রাচীনদের ভূমিকা সম্বন্ধে বার বার প্রহরীদুর্গের পাতার মাধ্যমে সংগঠন বার বার পুনরালোচনা করে। শাস্ত্রীয় নির্দেশের সাথে মিল রেখে সাংগঠনিক পরিবর্তনগুলি করা হয়েছিল।
২০-২২. সমস্ত পৃথিবীতে পূর্বঘোষিত রাজ্য প্রচার কাজ সম্পন্ন করার জন্য সম্পূর্ণ সংগঠনকে কিভাবে ক্রমাগত প্রস্তুত করা হয়েছে?
২০ ঈশ্বরের বাক্যে আমাদের দিনের জন্য যে কাজ দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ করতে সংগঠনকে পুরো দমে প্রস্তুত করা হচ্ছিল। (যিশাইয় ৬১:১, ২) আমাদের দিনে সুসমাচার কত ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে? যীশু বলেছিলেন: “অগ্রে সর্ব্বজাতির কাছে সুসমাচার প্রচারিত হওয়া আবশ্যক।” (মার্ক ১৩:২০) মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই কাজ প্রায়ই অসম্ভব বলে মনে হয়েছে।
২১ তবুও, মণ্ডলীর মস্তক হিসাবে খ্রীষ্টের উপরে আস্থা রেখে বিশ্বস্ত এবং বুদ্ধিমান দাসশ্রেণী এগিয়ে গেছে। (মথি ২৪:৪৫) যে কাজ করতে হবে, বিশ্বস্তভাবে এবং দৃঢ়ভাবে তারা সেই সম্বন্ধে যিহোবার লোকেদের জানিয়েছেন। উনিশশো উনিশ সাল থেকে ক্ষেত্রের পরিচর্যার উপরে আরও বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ঘরে ঘরে গিয়ে অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা অনেকের কাছে সহজ ছিল না। (প্রেরিত ২০:২০) কিন্তু “ধন্য যারা নির্ভীক” (১৯১৯) এবং “সৎসাহস রাখ” (১৯২১ সালে), এই অধ্যয়ন প্রবন্ধগুলি অনেককে যিহোবার উপরে নির্ভর করে কাজ শুরু কবেত সাহায্য করেছিল।
২২ উনিশশো বাইশ সালে, “রাজা এবং তাঁর রাজ্যকে ঘোষণা কর, ঘোষণা কর, ঘোষণা কর” আবেদন এই কাজকে উপযুক্ত প্রসিদ্ধি দান করতে প্রয়োজনীয় উৎসাহ দেয়। উনিশশো সাতাশ সাল থেকে যে প্রাচীনেরা এই শাস্ত্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেনি তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় সেই সময়েই সমিতির ভ্রমণকারী প্রতিনিধিদের, পরিভ্রমণকারীদের স্থানীয় পরিচর্যা পরিচালক হিসাবে নিযুক্ত করা হয় যারা ক্ষেত্রের পরিচর্যায় প্রকাশকদের ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশ দিতেন। সকলে অগ্রগামী হতে পারেননি, কিন্তু সপ্তাহের শেষে অনেকে সারা দিন প্রচার করে কাটাতেন, ভোরবেলা শুরু করে, মাঝখানে শুধু হালকা কিছু খেয়ে নিয়ে আবার বিকালবেলা পর্যন্ত তারা পরিচর্যায় রত থাকতেন। ঐশিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তখনকার দিনগুলি খুবই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছিল, আর যিহোবা কিভাবে তাঁর লোকেদের পরিচালনা করছিলেন তা পুনরালোচনা করে আমরা অনেকভাবে উপকৃত হতে পারি। আজও তিনি পরিচালনা করেন। তাঁর আশীর্বাদের সাথে স্থাপিত রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করার কাজ সফলভাবে শেষ করা হবে।
আপনি কি সতর্ক আছেন?
২৩. খ্রীষ্টীয় প্রেম ও জগৎ থেকে পৃথক থাকা সম্পর্কে, আমরা ব্যক্তিগতভাবে কিভাবে দেখাতে পারি যে আমরা সতর্ক আছি?
২৩ যিহোবার নির্দেশের প্রতি সাড়া দিয়ে তাঁর সংগঠন ক্রমাগত আমাদের সেই সব অভ্যাস এবং মনোভাবের প্রতি সতর্ক করে দেয় যা আমাদের জগতের অংশ বলে চিহ্নিত করবে এবং তার ফলে আমাদের বয়ে যাওয়ার বিপদ থাকবে। (১ যোহন ২:১৭) অপরপক্ষে, যিহোবার নির্দেশের প্রতি সাড়া দিয়ে আমাদের প্রত্যেকের সতর্ক থাকা উচিত। একসঙ্গে থাকতে এবং কাজ করতে যিহোবা আমদের নির্দেশও দেন। তাঁর সংগঠন আমাদের প্রকৃত খ্রীষ্টীয় প্রেমের অর্থ কী তার প্রতি উপলব্ধি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করেছে। (১ পিতর ৪:৭, ৮) আমাদের সতর্ক থাকা দাবি করে যে মানব অসিদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা যেন আন্তরিকভাবে এই উপদেশ প্রয়োগ করতে চেষ্টা করি।
২৪, ২৫. কোন্ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সম্বন্ধে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত, কোন্ আশার প্রতি দৃষ্টি রেখে?
২৪ বারংবার বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান দাস আমাদের মনে করিয়ে দেন: “তুমি সমস্ত চিত্তে যিহোবাতে বিশ্বাস কর; তোমার নিজ বিবেচনায় নির্ভর করিও না।” (হিতোপদেশ ৩:৫, NW) “অবিরত প্রার্থনা কর।” (১ থিষলনীকীয় ৫:১৭) ঈশ্বরের বাক্যের উপরে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে শিখতে, এই বাক্যকে ‘আমাদের চরণের প্রদীপ এবং আমাদের পথের আলোক করতে,’ আমাদের উপদেশ দেওয়া হয়েছে। (গীতসংহিতা ১১৯:১০৫) প্রেমের সাথে আমাদের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার প্রচারকে প্রথম স্থান দিতে, যে কাজ সম্বন্ধে যীশু আমাদের দিনের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।—মথি ২৪:১৪.
২৫ হ্যাঁ, বিশ্বস্ত এবং বুদ্ধিমান দাসশ্রেণী অবশ্যই সতর্ক আছে। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের ‘সতর্ক থাকতে’ হবে। তা করার দ্বারা, আমরা হয়ত তাদের মধ্যে থাকতে পারি যারা মনুষ্যপুত্রের অনুমোদন পাবে যখন তিনি বিচার নিষ্পন্ন করার জন্য আসবেন।—মথি ২৪:৩০; লূক ২১:৩৪-৩৬.
[পাদটীকাগুলো]
a বিশ্বাস এগিয়ে চলেছে এ. এইচ ম্যাক্মিলান্ কর্তৃক প্রিনটাইস্-হল, আইএনসি, ১৯৫৭, পৃষ্ঠা ১৯-২২.
b প্রহরীদুর্গ, আগস্ট ১৫, ১৯৬৬, পৃষ্ঠা ৫০৪-১০ দেখুন।
পুনরালোচনায়
▫ মথি ২৪:৪২ পদে যেমন দেখানো হয়েছে, আমাদের কেন সতর্ক থাকতে হবে?
▫ যীশু ও তাঁর প্রথম শতাব্দীর অনুগামীরা কিভাবে আধ্যাত্মিক সতর্কতা বজায় রাখতেন?
▫ যিহোবার সেবকেরা সতর্ক থাকার জন্য ১৮৭০ সাল থেকে কী কী বিষয় প্রকাশ পেয়েছে?
▫ কী প্রমাণ দেবে যে আমরা ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক আছি?
[Pictures on page 29]
যীশু তাঁর পিতার দেওয়া কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি ঐকান্তিকভাবে প্রার্থনাও করতেন
[Pictures on page 30]
চালর্স টেজ রাসেল, তার শেষ বয়সে
[Pictures on page 31]
সারা পৃথিবীতে ৪৭,০০,০০০-এরও বেশি রাজ্যের ঘোষকেরা সক্রিয় রয়েছেন