সাহস রাখ!
“সাহস রাখ এবং বল: ‘যিহোবা আমার সহায়।’”—ইব্রীয় ১৩:৬, NW.
১. সা.শ. প্রথম শতাব্দীতে যারা ঈশ্বরের সত্য শিখেছিলেন তারা কী ধরনের সাহস দেখিয়েছিলেন?
আমাদের সাধারণ শতাব্দীর প্রথম শতক। বহু-প্রত্যাশিত মশীহ অবশেষে এসেছেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের ভালভাবে শিক্ষা দিয়েছেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচার কাজ শুরু করেছেন। ঈশ্বরের রাজ্য সম্বন্ধে সুসমাচার লোকেদের জানানোর সময় হয়েছিল। সুতরাং, যে পুরুষ এবং নারীরা সেই সত্য শিখেছিলেন তারা নির্ভয়ে সেই অপূর্ব বার্তা ঘোষণা করেছিলেন।—মথি ২৮:১৯, ২০.
২. বর্তমানে কেন যিহোবার সাক্ষীদের সাহসের প্রয়োজন?
২ সেই সময়ে রাজ্য স্থাপিত হয়নি। কিন্তু, নির্বাচিত রাজা, যীশু খ্রীষ্ট, ভবিষ্যতে রাজ্যের ক্ষমতা লাভের জন্য অদৃশ্যভাবে তাঁর উপস্থিতি সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। সেই উপস্থিতির চিহ্ন হবে অভূতপূর্ব যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, ভূমিকম্প এবং বিশ্বব্যাপী সুসমাচার প্রচার। (মথি ২৪:৩-১৪; লূক ২১:১০, ১১) যিহোবার সাক্ষী হিসাবে, এই পরিস্থিতি এবং আমরা যে নির্যাতনের সম্মুখীন হই তার মোকাবিলা করতে আমাদের সাহসের প্রয়োজন। সুতরাং, সা.শ. প্রথম শতকের সাহসী রাজ্য-ঘোষকদের ঘটনা বিবেচনা করলে আমরা উপকার পেতে পারি।
খ্রীষ্টকে অনুকরণ করার সাহস
৩. সাহস সম্পর্কে কে সবচেয়ে ভাল উদাহরণ দিয়েছেন এবং ইব্রীয় ১২:১-৩ পদে তাঁর সম্বন্ধে কী বলা হয়েছে?
৩ সাহস রাখা সম্বন্ধে যীশু খ্রীষ্ট সবচেয়ে ভাল উদাহরণ দিয়েছেন। যিহোবার খ্রীষ্টপূর্বকালের সাহসী সাক্ষীদের ‘বৃহৎ মেঘ’ সম্বন্ধে উল্লেখ করার পরে, প্রেরিত পৌল এই বলে যীশুর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন: “অতএব এমন বৃহৎ সাক্ষিমেঘে বেষ্টিত হওয়াতে আইস, আমরাও সমস্ত বোঝা ও সহজ বাধাজনক পাপ ফেলিয়া দিয়া ধৈর্য্যপূর্ব্বক আমাদের সম্মুখস্থ ধাবনক্ষেত্রে দৌড়ি; বিশ্বাসের আদিকর্ত্তা ও সিদ্ধিকর্ত্তা যীশুর প্রতি দৃষ্টি রাখি; তিনিই আপনার সম্মুখস্থ আনন্দের নিমিত্ত ক্রুশ সহ্য করিলেন, অপমান তুচ্ছ করিলেন, এবং ঈশ্বরের সিংহাসনের দক্ষিণে উপবিষ্ট হইয়াছেন। তাঁহাকেই আলোচনা কর, যিনি আপনার বিরুদ্ধে পাপিগণের এমন প্রতিবাদ সহ্য করিয়াছিলেন, যেন প্রাণের ক্লান্তিতে অবসন্ন না হও।”—ইব্রীয় ১২:১-৩.
৪. শয়তানের দ্বারা প্রলোভিত হওয়ার সময়ে যীশু কিভাবে সাহস দেখিয়েছিলেন?
৪ বাপ্তিস্ম নেওয়ার এবং ৪০ দিন ধরে গভীর চিন্তা, প্রার্থনা ও উপোস করার পরে, যীশু সাহসের সাথে শয়তানের মোকাবিলা করেছিলেন। দিয়াবল যখন পাথরকে রুটিতে পরিণত করতে প্রলোভন দেখিয়েছিল, তখন যীশু প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কারণ ব্যক্তিগত ইচ্ছা চরিতার্থ করার জন্য অলৌকিক ক্ষমতা ব্যবহার করা ভুল। “লেখা আছে,” যীশু বলেছিলেন: “মনুষ্য কেবল রুটীতে বাঁচিবে না, কিন্তু ঈশ্বরের মুখ হইতে যে প্রত্যেক বাক্য নির্গত হয়, তাহাতেই বাঁচিবে।” শয়তান যখন মন্দিরের প্রাচীর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল, তখনও যীশু প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কারণ সম্ভাব্য আত্মহত্যা থেকে তাঁকে বাঁচানোর জন্য ঈশ্বরকে পরীক্ষা করা পাপ হত। “আবার লেখা আছে,” খ্রীষ্ট বলেছিলেন, “তুমি আপন ঈশ্বর প্রভুর পরীক্ষা করিও না।” একবার “প্রণাম” করার বদলে জগতের সমস্ত রাজ্য দিতে এবারে শয়তান প্রস্তুত ছিল, কিন্তু যীশু ধর্মভ্রষ্ট হয়ে শয়তানের এই চ্যালেঞ্জকে সমর্থন করবেন না যে পরীক্ষায় পড়লে মানুষ ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে না। সুতরাং যীশু বলেছিলেন: “দূর হও, শয়তান; কেননা লেখা আছে, ‘তোমার ঈশ্বর যিহোবাকেই প্রণাম করবে, কেবল তাঁরই আরাধনা করবে।’” তখন, সেই প্রলোভনকারী ‘আরেকটি সুবিধাজনক সময়ের জন্য’ তার কাছ থেকে চলে গেল।—মথি ৪:১-১১, NW; লূক ৪:১৩.
৫. প্রলোভনের প্রতিরোধ করতে কী আমাদের সাহায্য করতে পারে?
৫ যীশু যিহোবার অধীনে ছিলেন এবং শয়তানের বিরোধিতা করেছিলেন। আমরাও যদি একইভাবে ‘ঈশ্বরের বশীভূত হই, কিন্তু দিয়াবলের প্রতিরোধ করি, তাহলে সে আমাদের কাছ থেকে পালিয়ে যাবে।’ (যাকোব ৪:৭) যীশুর মত, সাহসের সাথে আমরা প্রলোভন এড়িয়ে চলতে পারি যদি আমরা শাস্ত্র প্রয়োগ করি, হয়ত কোন পাপ করার জন্য প্রলোভনের সময়ে সেখান থেকে কিছু উদ্ধৃতিও করতে পারি। চুরি করার প্রলোভনে পড়লে, সেই সময় যদি আমরা ঈশ্বরের আজ্ঞা মনে মনে বলি: “চুরি করিও না,” তাহলে কি আমরা প্রলোভন কাটিয়ে উঠতে পারব না? দুইজন খ্রীষ্টান কি যৌন অনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়তে পারে যদি তাদের মধ্যে এমনকি একজনও সাহসের সাথে এই কথাগুলির উদ্ধৃতি করে: “ব্যভিচার করিও না”?—রোমীয় ১৩:৮-১০; যাত্রাপুস্তক ২০:১৪, ১৫.
৬. কিভাবে যীশু সাহসের সাথে জগৎ জয় করেছিলেন?
৬ এই জগতের দ্বারা ঘৃণিত খ্রীষ্টান হিসাবে আমরা জগতের মনোভাব ও পাপপ্রবণ আচরণ এড়িয়ে চলতে পারি। যীশু তাঁর অনুগামীদের বলেছিলেন: “জগতে তোমরা ক্লেশ পাইতেছ; কিন্তু সাহস কর, আমিই জগৎকে জয় করিয়াছি।” (যোহন ১৬:৩৩) তিনি জগতের মত না হয়ে জগতকে জয় করেছিলেন। বিজয়ী হিসাবে তাঁর উদাহরণ এবং তাঁর অনুগত জীবনধারা, জগতের থেকে পৃথক থেকে এবং জগতের দ্বারা কলুষিত না হয়ে তাঁর অনুকরণ করতে আমাদের সাহস দিতে পারে।—যোহন ১৭:১৬.
প্রচার করা বজায় রাখার সাহস
৭, ৮. নির্যাতন সত্ত্বেও প্রচার করে যেতে কী আমাদের সাহায্য করবে?
৭ নির্যাতন সত্ত্বেও, প্রচার কাজ বজায় রাখতে যীশু এবং তাঁর শিষ্যেরা সাহসের জন্য ঈশ্বরের উপরে নির্ভর করেছিলেন। নির্যাতন সত্ত্বেও খ্রীষ্ট নির্ভয়ে তাঁর পরিচর্যা সম্পূর্ণ করেছিলেন এবং সা.শ. ৩৩ সালের পঞ্চাশত্তমীর পরে, তাঁর নির্যাতিত অনুগামীরা সুসমাচার প্রচার করা বজায় রেখেছিলেন, যদিও যিহূদী ধর্মীয় নেতারা তাদের বাধা দিতে চেষ্টা করেছিল। (প্রেরিত ৪:১৮-২০; ৫:২৯) শিষ্যেরা প্রার্থনা করেছিলেন: “হে প্রভু, উহাদের ভয়প্রদর্শনের প্রতি দৃষ্টিপাত কর; এবং তোমার এই দাসদিগকে সম্পূর্ণ সাহসের সহিত তোমার বাক্য বলিবার ক্ষমতা দেও।” তখন কী হয়েছিল? “তাঁহারা প্রার্থনা করিলে, যে স্থানে তাঁহারা সমবেত হইয়াছিলেন, সেই স্থান কাঁপিয়া উঠিল,” সেই বিবরণে জানানো হয়েছে, “এবং তাঁহারা সকলেই পবিত্র আত্মায় পরিপূর্ণ হইলেন ও সাহসপূর্ব্বক ঈশ্বরের বাক্য বলিতে থাকিলেন।”—প্রেরিত ৪:২৪-৩১.
৮ বর্তমানে যেহেতু অধিকাংশ লোক সুসমাচারের প্রতি সাড়া দেয় না, তাদের কাছে প্রচার করা বজায় রাখতে প্রায়ই সাহসের প্রয়োজন হয়। বিশেষত যখন নির্যাতন করা হয়, তখন ভালভাবে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য যিহোবার সেবকদের ঈশ্বর-দত্ত সাহসের প্রয়োজন হয়। (প্রেরিত ২:৪০; ২০:২৪) সুতরাং রাজ্যের সাহসী প্রকাশক পৌল, একজন অল্পবয়স্ক, অল্প-অভিজ্ঞ সহকর্মীকে বলেছিলেন: “ঈশ্বর আমাদিগকে ভীরুতার আত্মা দেন নাই, কিন্তু শক্তির, প্রেমের ও সুবুদ্ধির আত্মা দিয়াছেন। অতএব আমাদের প্রভুর সাক্ষ্যের বিষয়ে, এবং তাঁহার বন্দি যে আমি, আমার বিষয়ে তুমি লজ্জিত হইও না, কিন্তু ঈশ্বরের শক্তি অনুসারে সুসমাচারের সহিত ক্লেশভোগ স্বীকার কর।” (২ তীমথিয় ১:৭, ৮) যদি আমরা সাহসের জন্য প্রার্থনা করি তাহলে প্রচার করা আমরা বজায় রাখতে পারব আর এমনকি নির্যাতনও রাজ্যের প্রকাশক হিসাবে আমাদের আনন্দ কেড়ে নিতে পারবে না।—মথি ৫:১০-১২.
যিহোবার পক্ষ নেওয়ার সাহস
৯, ১০. (ক) খ্রীষ্টের বাপ্তিস্মিত অনুগামী হওয়ার জন্য প্রথম শতাব্দীর যিহূদীরা এবং পরজাতীয়রা কী করেছিলেন? (খ) একজন খ্রীষ্টান হওয়ার জন্য কেন সাহসের প্রয়োজন ছিল?
৯ প্রথম শতাব্দীর বহু সাহসী যিহূদী এবং পরজাতীয়রা অশাস্ত্রীয় পরম্পরা ত্যাগ করে খ্রীষ্টের বাপ্তিস্মিত অনুগামী হয়েছিলেন। সা.শ. ৩৩ সালের পঞ্চাশত্তমীর কিছু পরেই, “যিরূশালেমে শিষ্যদের সংখ্যা অতিশয় বৃদ্ধি পাইতে লাগিল; আর যাজকদের মধ্যে বিস্তর লোক বিশ্বাসের বশবর্ত্তী হইল।” (প্রেরিত ৬:৭) ধর্মীয় বন্ধন ত্যাগ করে, মশীহ হিসাবে যীশুকে গ্রহণ করে নেওয়ার সাহস সেই যিহূদীদের ছিল।
১০ সা.শ. ৩৬ সাল থেকে শুরু করে, বহু পরজাতীয় ব্যক্তিরা বিশ্বাসী হতে শুরু করেছিলেন। যখন কর্ণীলিয়, তার পরিবারের লোকজন এবং অন্যান্য পরজাতীয় ব্যক্তিরা সুসমাচার শুনলেন, অবিলম্বে তারা তা গ্রহণ করলেন, পবিত্র আত্মা লাভ করলেন এবং “যীশু খ্রীষ্টের নামে” বাপ্তিস্মিত হয়েছিলেন। (প্রেরিত ১০:১-৪৮) ফিলিপীতে, একজন পরজাতীয় কারারক্ষক এবং তার পরিবার শীঘ্রই খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং “সে আপনি ও তাহার সকল লোক অবিলম্বে বাপ্তাইজিত হইল।” (প্রেরিত ১৬:২৫-৩৪) এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সাহসের প্রয়োজন ছিল কারণ খ্রীষ্টানেরা তখন নির্যাতিত, অপ্রিয় ছোট একটি দল ছিল। এখনও তারা তাই আছে। কিন্তু আপনি যদি ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গীকৃত হয়ে, যিহোবার একজন সাক্ষী হিসাবে বাপ্তিস্ম না নিয়ে থাকেন, তাহলে এই সাহসিকতার পদক্ষেপগুলি নেওয়ার জন্য এখনই কি সময় নয়?
বিভক্ত পরিবারে সাহস
১১. উনীকী এবং তীমথিয়, সাহস সম্পর্কে কোন্ ভাল উদাহরণ দিয়েছিলেন?
১১ ধর্মীয়রূপে বিভক্ত পরিবারে উনীকী এবং তার পুত্র তীমথিয়, সাহসের সাথে বিশ্বাসের অপূর্ব উদাহরণ দিয়েছেন। যদিও উনীকীর স্বামী একজন পৌত্তলিক ছিলেন, তবুও তিনি শিশুকাল থেকেই তার পুত্রকে “পবিত্র শাস্ত্রকলাপ” সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়েছিলেন। (২ তীমথিয় ৩:১৪-১৭) একজন খ্রীষ্টান হওয়ার পরে, তিনি ‘অকল্পিত বিশ্বাস’ দেখিয়েছিলেন। (২ তীমথিয় ১:৫) তার অবিশ্বাসী স্বামীর মস্তকপদের প্রতি সম্মান দেখিয়েও, তীমথিয়কে খ্রীষ্টীয় শিক্ষা দেওয়ার সাহসও তার ছিল। তার বিশ্বাস এবং সাহস অবশ্যই পুরস্কৃত হয়েছিল যখন তার সুশিক্ষিত পুত্রকে, মিশনারী যাত্রায় পৌলের সঙ্গে যাওয়ার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। যে খ্রীষ্টীয় পিতামাতারা নিজেদের একই পরিস্থিতিতে পান, এই ঘটনা তাদের কতই না উৎসাহ দিতে পারে!
১২. তীমথিয় কী ধরনের ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন এবং এখন কারা নিজেদের তার মত বলে প্রমাণিত করছেন?
১২ তীমথিয় যদিও একটি ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত পরিবারে বাস করতেন, তিনি সাহসের সাথে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং একজন আধ্যাত্মিক-মনা ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন, যার সম্বন্ধে পৌল বলতে পেরেছিলেন: “আমি প্রভু যীশুতে প্রত্যাশা করিতেছি যে, তীমথিয়কে শীঘ্রই তোমাদের [ফিলিপীয়দের] কাছে পাঠাইব, যেন তোমাদের অবস্থা জানিয়া আমারও প্রাণ জুড়ায়। কারণ আমার কাছে এমন সমপ্রাণ কেহই নাই যে, প্রকৃতরূপে তোমাদের বিষয় চিন্তা করিবে। . . . তোমরা ইঁহার পক্ষে এই প্রমাণ জ্ঞাত আছ যে, পিতার সহিত সন্তানের যেমন, আমার সহিত ইনি তেমনি সুসমাচারের নিমিত্ত দাস্যকর্ম্ম করিয়াছেন।” (ফিলিপীয় ২:১৯-২২) বর্তমানে, ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত পরিবারে, বহু ছেলেমেয়েরা সাহসের সাথে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করে। তীমথিয়ের মত তারাই নিজেদের প্রমাণ দিচ্ছে আর তারা যে যিহোবার সংগঠনের অংশ সেজন্য আমরা কত আনন্দিত!
‘মাথা পেতে বিপদ গ্রহণ করার’ সাহস
১৩. আক্কিলা এবং প্রিষ্কা কিভাবে সাহস প্রদর্শন করেছিলেন?
১৩ একজন সহবিশ্বাসীর জন্য সাহসপূর্বক ‘মাথা পেতে বিপদ গ্রহণ করে’ আক্কিলা এবং প্রিষ্কা (প্রিসিল্লা) একটি ভাল উদাহরণ দিয়েছিলেন। তারা পৌলকে নিজেদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছিলেন, তাঁবু বানাতে তার সাথে কাজ করেছিলেন এবং করিন্থের নতুন মণ্ডলী গড়ে তুলতে তাকে সাহায্য করেছিলেন। (প্রেরিত ১৮:১-৪) তাদের ১৫-বছর বন্ধুত্বের কোন এক সময়, তারা এমনকি পৌলের জন্য তাদের জীবন বিপন্ন করেছিলেন, কিভাবে তা আমাদের বলা হয়নি। যখন তারা রোমে বাস করছিলেন তখন তিনি সেখানকার খ্রীষ্টানদের বলেছিলেন: “খ্রীষ্ট যীশুতে আমার সহকারী প্রিষ্কা ও আক্কিলাকে মঙ্গলবাদ কর; তারা আমার প্রাণের নিমিত্তে নিজেরা মাথা পেতে বিপদ গ্রহণ করেছিলেন; কেবল আমিই যে ধন্যবাদ করি, এমন নয়, কিন্তু পরজাতীয়দের সমস্ত মণ্ডলীও করে।”—রোমীয় ১৬:৩, ৪, NW.
১৪. পৌলের জন্য নিজেদের জীবন বিপন্ন করে, আক্কিলা এবং প্রিষ্কা কোন আজ্ঞা অনুযায়ী কাজ করছিলেন?
১৪ পৌলের জন্য নিজেদের জীবন বিপন্ন করে, আক্কিলা এবং প্রিষ্কা যীশুর এই বাক্য অনুযায়ী কাজ করেছিলেন: “এক নূতন আজ্ঞা আমি তোমাদিগকে দিতেছি, তোমরা পরস্পর প্রেম কর; আমি যেমন তোমাদিগকে প্রেম করিয়াছি, তোমরাও তেমনি পরস্পর প্রেম কর।” (যোহন ১৩:৩৪) এই আজ্ঞা “নূতন” এই অর্থে ছিল যে মোশির নিয়মের চাহিদা, একজন ব্যক্তি তার প্রতিবাসীকে নিজের মত প্রেম করবে, এই আজ্ঞাটি তার থেকেও বেশি কিছু ছিল। (লেবীয়পুস্তক ১৯:১৮) এর জন্য প্রয়োজন ছিল আত্মত্যাগী প্রেম যার জন্য একে অপরের প্রয়োজনে জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত থাকে, যেমন যীশু দিয়েছিলেন। সা.শ. দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীর লেখক টার্টুলিয়ান, খ্রীষ্টানদের সম্বন্ধে জাগতিক লোকেদের কথা উদ্ধৃতি করে লিখেছিলেন: “‘দেখ,’ তারা বলে, ‘তারা কিভাবে একে অপরকে ভালবাসে . . . আর কিভাবে তারা একে অপরের জন্য মরতেও প্রস্তুত থাকে।’” (অ্যাপোলজি, অধ্যায় XXXIX, ৭) বিশেষত নির্যাতনের সময়ে, সহবিশ্বাসীরা যাতে শত্রুপক্ষের হাতে অত্যাচার অথবা মৃত্যু এড়িয়ে যেতে পারে, সেই জন্য আমাদের জীবন বিপন্ন করে সাহসের সাথে ভ্রাতৃস্নেহ দেখাতে আমরা যেন বাধ্য থাকি।—১ যোহন ৩:১৬.
সাহস আনন্দ নিয়ে আসে
১৫, ১৬. প্রেরিত ১৬ অধ্যায়ে যেমন দেখানো হয়েছে, সাহস এবং আনন্দের মধ্যে কী সম্পর্ক আছে?
১৫ পৌল এবং সীল প্রমাণ করেছেন যে পরীক্ষার মধ্যে সাহস প্রদর্শন করলে আনন্দ পাওয়া যায়। ফিলিপী শহরের পৌর বিচারকদের আদেশে, তাদের প্রকাশ্যে লাঠি দিয়ে মারা হয়েছিল এবং হাড়িকাঠ পরিয়ে কারাগারে রাখা হয়েছিল। তবুও, তারা হতাশায় ভীত হননি। তাদের প্রবল পরীক্ষা সত্ত্বেও, তারা ঈশ্বর-দত্ত সাহস এবং খ্রীষ্টানদের প্রতি সেই সাহস যে আনন্দ নিয়ে আসে তাও রেখেছিলেন।
১৬ প্রায় মধ্যরাত্রে, পৌল এবং সীল প্রার্থনা করছিলেন এবং গান গেয়ে ঈশ্বরের প্রশংসা করছিলেন। হঠাৎ, একটি ভূমিকম্প জেলখানাটিকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল, তাদের বন্ধন খসে পড়ল এবং দরজাগুলো খুলে গেল। ভীত কারারক্ষক এবং তার পরিবারকে ভালভাবে সাক্ষ্য দেওয়া হল এবং তার ফলে তারা যিহোবার সেবক হিসাবে বাপ্তিস্ম গ্রহণ করল। তিনি নিজে “সমস্ত পরিবারের সহিত ঈশ্বরে বিশ্বাস করাতে অতিশয় আহ্লাদিত” হলেন। (প্রেরিত ১৬:১৬-৩৪) এই ঘটনা পৌল এবং সীলকে কতই না আনন্দ দিয়েছিল! এইগুলি এবং শাস্ত্রে দেওয়া সাহসিকতার অন্যান্য উদাহরণ বিবেচনা করে, যিহোবার সেবক হিসাবে আমরা কিভাবে সাহস রাখতে পারি?
সাহস রাখুন!
১৭. গীতসংহিতা ২৭ অধ্যায়ে যেমন দেখানো হয়েছে, যিহোবার অপেক্ষায় থাকার সাথে সাহসের কী সম্পর্ক আছে?
১৭ যিহোবার অপেক্ষায় থাকলে আমরা সাহস বজায় রাখতে পারব। দায়ূদ গেয়েছিলেন: “সদাপ্রভুর অপেক্ষায় থাক; সাহস কর, তোমার অন্তঃকরণ সবল হউক; হাঁ, সদাপ্রভুরই অপেক্ষায় থাক।” (গীতসংহিতা ২৭:১৪) গীত ২৭ দেখায় যে দায়ূদ, তার “জীবন-দুর্গ” হিসাবে যিহোবার উপরে নির্ভর করতেন। (১ পদ) অতীতে, ঈশ্বর দায়ূদের শত্রুদের কী করেছিলেন, তা দেখে দায়ূদ সাহস পেয়েছিলেন। (২, ৩ পদ) যিহোবার উপাসনার কেন্দ্রের প্রতি উপলব্ধিবোধ আরেকটি কারণ ছিল। (৪ পদ) যিহোবার সাহায্য, সুরক্ষা এবং পরিত্রাণের উপরে নির্ভর করাও দায়ূদের সাহস গড়ে তুলেছিল। (৫-১০ পদ) যিহোবার ধার্মিক পথের নীতি সম্বন্ধে ক্রমাগত নির্দেশ পাওয়াও সাহায্য করেছিল। (১১ পদ) শত্রুদের থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিশ্চয়তার সাথে প্রার্থনা এবং তার সাথে বিশ্বাস ও আশা, দায়ূদকে সাহসী হতে সাহায্য করেছিল। (১২-১৪ পদ) আমরাও একইভাবে আমাদের সাহস গড়ে তুলতে পারি ও দেখাতে পারি যে আমরা সত্যিই “সদাপ্রভুর অপেক্ষা” করি।
১৮. (ক) কী দেখায় যে যিহোবার সহ-উপাসকেদের সাথে নিয়মিত মেলামেশা করতে সাহসী থাকতে আমরা সাহায্য পেতে পারি? (খ) সাহস গড়ে তুলতে খ্রীষ্টীয় সভাগুলির কোন্ ভূমিকা আছে?
১৮ যিহোবার সহ-উপাসকদের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা করলেও আমরা সাহস রাখতে সাহায্য পেতে পারি। পৌল যখন কৈসরের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন এবং রোমে যাচ্ছিলেন, তখন সহবিশ্বাসীরা তার সাথে অপ্পিয়ের হাট এবং তিন সরাইতে দেখা করতে আসতেন। “তাঁহাদিগকে দেখিয়া,” সেই বিবরণ জানায়, “পৌল ঈশ্বরকে ধন্যবাদ করিয়া সাহস প্রাপ্ত হইলেন।” (প্রেরিত ২৮:১৫) খ্রীষ্টীয় সভায় নিয়মিত উপস্থিত থাকলে, আমরা পৌলের এই উপদেশ মেনে চলি: “আইস, আমরা পরস্পর মনোযোগ করি, যেন প্রেম ও সৎক্রিয়ার সম্বন্ধে পরস্পরকে উদ্দীপিত করিয়া তুলিতে পারি; এবং আপনারা সমাজে সভাস্থ হওয়া পরিত্যাগ না করি—যেমন কাহারও কাহারও অভ্যাস—বরং পরস্পরকে চেতনা দিই; আর তোমরা সেই দিন যত অধিক সন্নিকট হইতে দেখিতেছ, ততই যেন অধিক এ বিষয়ে তৎপর হই।” (ইব্রীয় ১০:২৪, ২৫) পরস্পরকে উদ্দীপিত করার অর্থ কী? উদ্দীপিত করার অর্থ হল “সাহস, উদ্যম অথবা আশা যুগিয়ে অনুপ্রেরণা দেওয়া।” (ওয়েব্স্টারস্ নাইন্থ নিউ কলেজিয়েট ডিক্শনারী) অন্য খ্রীষ্টানদের মধ্যে সাহস গড়ে তুলতে আমরা অনেক কিছু করতে পারি এবং তাদের উৎসাহ আমাদের মধ্যেও একইভাবে সাহস গড়ে তুলতে পারে।
১৯. আমাদের সাহস বজায় রাখার সঙ্গে শাস্ত্র এবং খ্রীষ্টীয় প্রকাশনাগুলির কী সম্পর্ক আছে?
১৯ সাহস বজায় রাখতে, আমাদের অবশ্যই নিয়মিতরূপে ঈশ্বরের বাক্য অধ্যয়ন করতে হবে এবং সেখানে দেওয়া উপদেশ আমাদের জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। (দ্বিতীয় বিবরণ ৩১:৯-১২; যিহোশূয় ১:৮) নিয়মিত অধ্যয়নের মধ্যে শাস্ত্রের উপরে ভিত্তি করে খ্রীষ্টীয় প্রকাশনাগুলি থাকা উচিত, কারণ সেখানে দেওয়া মূল্যবান উপদেশ, ঈশ্বর-দত্ত সাহসের সাথে বিশ্বাসের পরীক্ষার মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। বাইবেলের বিবরণ থেকে, আমরা দেখেছি যে যিহোবার সেবকেরা কিভাবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। সেই জ্ঞান কিভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারে তা এখনই না জানলেও, ঈশ্বরের বাক্যে শক্তি আছে এবং আমরা যা শিখছি তা থেকে আমরা সবসময়ে উপকৃত হতে পারি। (ইব্রীয় ৪:১২) উদাহরণস্বরূপ, মানুষের ভয় যদি আমাদের পরিচর্যাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তাহলে আমরা মনে করতে পারি হনোক কিভাবে ঈশ্বরহীন লোকেদের কাছে ঈশ্বরের বার্তা ঘোষণা করতে সাহস দেখিয়েছিলেন।—যিহূদা ১৪, ১৫.
২০. যিহোবার সেবক হিসাবে আমরা যদি সাহস রাখতে চাই, তাহলে কেন বলা যেতে পারে যে প্রার্থনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ?
২০ যিহোবার সেবক হিসাবে সাহস রাখতে হলে, আমাদের অবশ্যই প্রার্থনায় নিবিষ্ট থাকতে হবে। (রোমীয় ১২:১২) যীশু তাঁর পরীক্ষাগুলি সাহসের সাথে সহ্য করেছিলেন কারণ তিনি “প্রবল আর্ত্তনাদ ও অশ্রুপাত সহকারে তাঁহারই নিকটে প্রার্থনা ও বিনতি উৎসর্গ করিয়াছিলেন, যিনি মৃত্যু হইতে তাঁহাকে রক্ষা করিতে সমর্থ, এবং আপন ভক্তি প্রযুক্ত উত্তর পাইলেন।” (ইব্রীয় ৫:৭) প্রার্থনার মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্যে থেকে, আমরা ভীরু জাগতিক ব্যক্তিদের মত হব না, যাদের পরিণাম “দ্বিতীয় মৃত্যু,” যেখান থেকে কোন পুনরুত্থান নেই। (প্রকাশিত বাক্য ২১:৮) ঈশ্বরের সাহসী সেবকদের জন্য থাকবে ঐশ্বরিক সুরক্ষা এবং তাঁর নতুন জগতে জীবন।
২১. যিহোবার বিশ্বস্ত সাক্ষীরা কেন সাহস রাখতে পারেন?
২১ যিহোবার বিশ্বস্ত সাক্ষী হিসাবে, মানুষ অথবা মন্দ আত্মা, কোন শত্রুকেই আমাদের ভয় করা উচিত নয়, কারণ ঈশ্বর আমাদের সমর্থন করেন এবং জগৎ-জয়ী যীশুর সাহসী উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। যিহোবার লোকেদের সাথে আধ্যাত্মিকভাবে গঠনমূলক মেলামেশাও আমাদের সাহস রাখতে সাহায্য করে। শাস্ত্র এবং খ্রীষ্টীয় প্রকাশনার নির্দেশ এবং উপদেশের মাধ্যমেও আমাদের সাহস গড়ে ওঠে। আর ঈশ্বরের অতীতকালের সেবকদের বিবরণ, যা বাইবেলে পাওয়া যায়, তাও সাহসপূর্বক চলতে আমাদের সাহায্য করে। এই সঙ্কটপূর্ণ শেষকালে, তাই আসুন আমরা পবিত্র পরিচর্যায় সাহসের সাথে এগিয়ে যাই। হ্যাঁ, যিহোবার সমস্ত সেবকেরা যেন সাহস রাখে! (w93 11/15)
▫ যীশুর উদাহরণ কিভাবে আমাদের সাহসী করে তুলতে পারে?
▫ প্রচার কাজ চালিয়ে যেতে, যীশু এবং তাঁর শিষ্যরা কোথা থেকে সাহস পেয়েছিলেন?
▫ যিহোবার পক্ষ নিতে যিহূদীদের এবং পরজাতীয়দের কেন সাহসের প্রয়োজন ছিল?
▫ সাহস সম্পর্কে, উনীকী এবং তীমথিয় কী উদাহরণ দিয়েছিলেন?
▫ নির্যাতনের মধ্যেও, সাহস যে আনন্দ দিতে পারে তার কী প্রমাণ আছে?
[অধ্যয়ন প্রশ্নাবলি]
[২৮ পৃষ্ঠার বাক্স]
আমরা যদি শাস্ত্র প্রয়োগ করি এবং সেখান থেকে উদ্ধৃতি করি, তাহলে যীশুর মত আমরাও প্রলোভনের প্রতিরোধ করতে পারব