চমৎকার দ্বৈত গায়কগায়িকা
কেনিয়ার সচেতন থাক! সংবাদদাতা কর্তৃক
দুজন শিল্পী মুখোমুখি তাকিয়ে আছে, দুজনেই গান গাওয়ার জন্য তৈরি। প্রধান গায়ক সামান্য মাথা নুইয়ে মৃদু ও পরিষ্কার গলায় শিস দেয়, যা এতই স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ ছিল যে ভোরের হাওয়ায় তা বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর দ্বিতীয় জনও মাথা নুইয়ে একেবারে ঠিক ঠিক সময়ে একইরকম মধুর কণ্ঠে গলা ছেড়ে শিস দেয়। শিল্পীদের মধ্যে উদ্দীপনা ও আবেগ যতই বাড়তে থাকে, তাদের দুজনের সুর মিলে একাকার হয়ে যায়। আমি রুদ্ধশ্বাসে এবং অবাক হয়ে তাদের চমৎকার সৃজনশীলতা ও তাদের মধুর কণ্ঠ শুনেছিলাম।
এই চমৎকার গান কোন সুসজ্জিত ঐকতান সংগীত হলে গাওয়া হয়নি। এটা কেনিয়ায় আমার বাড়ির সামনে একটা গাছের ডালে দুটো পাখি গেয়েছিল। গান শেষ হয়ে যাওয়ার পর পালকে ঢাকা শিল্পীরা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাদের পাখা মেলে উড়ে চলে গিয়েছিল।
সাধারণত বলা হয় যে “একই জাতের পাখিরা একসঙ্গে থাকে।” কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল যে কিছু পাখিকে একসঙ্গে গান গাইতেও দেখা যায় আর একেবারে নির্ভুলভাবে! এই দ্বৈত সংগীতের সুর, তাল ও লয়ের মধ্যে এতটাই মিল রয়েছে যে কোন শ্রোতার পক্ষে না দেখে বলা মুশকিল যে দুটো আলাদা পাখি গান গাচ্ছে! এমনকি বিজ্ঞানীরাও বোকা বনে গিয়েছেন। মাত্র কিছুদিন হল দ্বৈত সংগীতকে পাখিদের একটা স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
বেল বার্ড
উদাহরণ হিসেবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বুবুর কথাই বলা যায়, যারা খুবই দক্ষ শিল্পী। এদের আফ্রিকা মহাদেশে দেখা যায় আর এরা বাঁশির মতো অপূর্ব সুরে গান গায়, যা অনেক সময় দুটো ধাতব খণ্ডকে একসঙ্গে আঘাত করলে যে শব্দ হয় তার মতো শোনায়। তাই এদেরকে সাধারণত বেল বার্ড বলা হয়। বুবুর মাথার ঝুঁটি, পিঠ এবং ডানা মসৃণ ও চকচকে কালো পালকে ঢাকা, যা তাকে সুদর্শন করে তোলে। তার বুকের ধবধবে সাদা পালক এবং ডানার সাদা ডোরা অপূর্ব রংয়ের বৈচিত্র্য তৈরি করে। বুবুদের সবসময় জোড়ায় জোড়ায় দেখা যায় আর পুরুষ ও স্ত্রী বুবুর পালকের নকশা ও রং একই।
গভীর জঙ্গল বা বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বুবুদের উপস্থিতি অনেক দূর থেকেই টের পাওয়া যাবে। পুরুষ বুবু সাধারণত তিনবার খুবই দ্রুত ঘন্টাধ্বনির মতো শিস দেবে। স্ত্রী বুবু সঙ্গে সঙ্গেই কর্কশ কুউউ ডাকে সাড়া দেয়। কখনও কখনও একটা পাখি একনাগাড়ে শিস দিয়ে চলে এবং তার সঙ্গী ওই সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে একবার করে শিস দেয় আর এর ফলে এক অপূর্ব মিষ্টি সুরের মূর্ছনা তৈরি হয়, যা একটানা চলতে থাকে।
ঠিক কীভাবে সুরের এই সমন্বয় সম্ভব হয় তা বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি ধরতে পারেননি। কোন কোন বিজ্ঞানী মনে করেন যে অন্তত কিছু ক্ষেত্রে “গাইতে গাইতে গায়েন, বাজাতে বাজাতে বায়েন” এই প্রবাদটা খাটে। যেহেতু পুরুষ ও স্ত্রী পাখি দিনের পর দিন একসঙ্গে গান গায়, তাই তারা এতটা নির্ভুলভাবে একসঙ্গে গাইতে পারে।
কিন্তু আগ্রহের বিষয় এই যে স্থান কাল ভেদে বুবুদের “স্বরভঙ্গি” আলাদা আলাদা হয়। এটা হয়ে থাকে কারণ তারা তাদের আশেপাশের শব্দ বা অন্য গায়ক পাখিদের ডাক নকল করে থাকে। এটাকে সুর নকল করা বলা হয়। এর ফলে, দক্ষিণ আফ্রিকার অরণ্যে বুবুদের যে গান শোনা যায় তা পূর্ব আফ্রিকার গ্রেট রিফ্ট ভ্যালিতে শোনা গানের চেয়ে কিছুটা আলাদা।
চিরদিনের সাথি
জীবনের পরীক্ষাগুলো (ইংরেজি) বইয়ে ডেভিড আ্যটেনবোরো বলেন: “এটা জানা সত্যিই মনকে ছুঁয়ে যায় যে দ্বৈত গায়কগায়িকারা সাধারণত বছরের পর বছর চিরদিনের সাথি হয়ে থাকে।” এই অটুট বন্ধনের পিছনে কারণগুলো কী? আ্যটেনবোরো বলে চলেন: “তারা একসঙ্গে গান গাইতে শেখে আর এই দ্বৈতসংগীত তাদের বন্ধনকে আরও অটুট করে। তারা যখন একটা ডালে পাশাপাশি বসে থাকে এমনকি তখনও তারা তাদের এই জটিল দ্বৈতসংগীত গায় আর কখনও কখনও যদি একজন সাথি না থাকে, তখনও নিঃসঙ্গ পাখি তার সাথির অভাব পূরণ করে অপূর্ব গানটার পুরোটাই একা একা গায়।”
এই গানগুলো হয়তো গহীন বনে পাখিদেরকে একে অন্যের অবস্থান জানতেও সাহায্য করে। পুরুষ পাখি যখন জানতে চায় যে তার সাথি কোথায় আছে, তখন সে মিষ্টি সুরে একের পর এক শিস দিয়ে চলে আর স্ত্রী পাখিও তার সঙ্গে যোগ দেয়, এমনকি সে যদি কিছুটা দূরেও থাকে। তাদের সময়জ্ঞান এতটাই যথাযথ যে মনে হয় যেন তারা আগে থেকে পরিকল্পনা করে গাইছে।
কাজের সময় গান গাওয়া
আপনি কি গান শুনতে শুনতে কাজ করতে ভালবাসেন? অনেক পাখিরাও তা করে থাকে। মাইকেল ব্রাইটের পাখিদের একান্ত জীবন (ইংরেজি) বইটা বলে যে পাখিদের গান অন্য পাখিদের শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে। বইটা আরও বলে যে পাখিদের গান শোনার পর “পুরুষ ও স্ত্রী পাখি উভয়েরই হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যায়।” এছাড়াও, কিছু স্ত্রী পাখি যখন পুরুষ পাখির গান শুনেছিল, তখন তারা “দ্রুত বাসা বানিয়েছিল” এবং “বেশি ডিমও পেড়েছিল।”
কোন সন্দেহ নেই যে বিজ্ঞানীরা গ্রীষ্মপ্রধান দেশের বুবুর মতো দ্বৈত গায়কগায়িকাদের সম্বন্ধে আকর্ষণীয় বিষয় আবিষ্কার করেই চলবেন। কিন্তু তাদের রোমাঞ্চকর গানগুলো যে উদ্দেশ্যেই গাওয়া হোক না কেন, আসুন আমরা যেন এগুলোর আরেকটা মহান উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা না করি। এগুলো সেইসব পুরুষ ও নারীদের আনন্দ দেয়, যাদের মধ্যে উপলব্ধি আছে! বাস্তবিকই, আমরা যখন এইরকম রোমাঞ্চকর সংগীত শুনি তখন তা আমাদেরকে ‘শূন্যের পক্ষিগণের’ সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করতে প্রেরণা দেয়।—গীতসংহিতা ৮:৮.