জুয়াখেলা—৯০ দশকের এক আসক্তি
রঙিন ফিল্মে ভরা ক্যামেরা দৃশ্যটিকে তুলে ধরে। রবিবারের এক সংবাদপত্রে দুটি বড় পৃষ্ঠা জুড়ে এই ছবিটি স্থান পায়—আর যতদূর দৃষ্টি যায় তার মধ্যে এটাই বোধগম্য হয় যে, একটি বিশাল গুদাম ঘর, জুয়াখেলার আস্তানায় পরিণত হয়েছে, যেটি সহস্রাধিক বর্গমিটার দীর্ঘ আর খেলায় মগ্ন সমস্ত বয়স ও বর্ণের পৃষ্ঠপোষকদের ভিড়ে রম রম করছে। লক্ষ্য করে দেখুন তাদের চিন্তিত মুখ ও রক্তবর্ণ চোখগুলি, অবিরাম গতিতে খেলে যাওয়ার কোন ছাপ কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন? অধীর আগ্রহে তারা পরবর্তী সংখ্যা ঘোষণার অপেক্ষায় থাকে যা হয়ত হেরে যাওয়া এই রাতের মাঝে অবশেষে তাদের জয়ী করে তুলবে।
সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাগুলি উলটান। হাত ভরতি তাস আর হেরে যাওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্ন লোকগুলির মুখ লক্ষ্য করেছেন? বহু ক্ষেত্রে পরবর্তী তাসটি তোলার আগেই হাজার হাজার ডলার কেউ জিতে নেয় বা হেরে যায়। চিত্রটির আরও গভীরে প্রবেশ করুন। কম্পিত হাতের ঘর্মাক্ত করতলগুলি কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন? দ্রুত হৃদকম্পন ও পরবর্তী বাজি জেতা আর বিপক্ষ খেলোয়াড়ের হার সম্বন্ধীয় নিঃশব্দ প্রার্থনাটি কি আপনি শুনতে পাচ্ছেন?
বিখ্যাত হোটেল ও নৌকার মধ্যে অবস্থিত বিলাসবহুল ক্যাসিনোতে প্রবেশ করুন। রংবেরঙের বিভ্রান্তিকর স্লট মেশিনের মধ্যে কি আপনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন? মেশিনগুলির হাতলের শব্দ ও চাকার আওয়াজ কি আপনাকে বধির করে তুলেছে? জেতা অথবা হারা এটাই হল খেলোয়াড়দের কানে আসা একমাত্র সুরধ্বনি। “স্লট মেশিনের হাতল টানার সাথে সাথে কী ঘটবে সেটা দেখাই হল তাদের এক উত্তেজনার বিষয়,” ক্যাসিনোর একজন প্রধান ব্যক্তি জানান।
লোকেদের ভিড় ঠেলে জনাকীর্ণ রুলে টেবিলগুলির দিকে এগিয়ে যান। আপনার চোখের সামনে লাল ও কালো রঙের বিভাগে বিভক্ত চলন্ত চাকাগুলির বিভিন্ন অংশ দেখে আপনি হয়ত বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারেন। আন্দোলিত বলের শব্দ আপনার উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। ঘুরতে ঘুরতে এটা এগিয়ে চলে আর যেখানে গিয়ে এটা থামে সেটাই নির্ধারণ করে দেয় হার জিতের পার্থক্যকে। চাকার একটি ঘূর্ণনের দ্বারাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাজার হাজার ডলারের অপচয় ঘটে।
এই চিত্র ও দৃশ্যগুলির কথা হাজার হাজার গুণ অধিক সংখ্যায় চিন্তা করুন, লক্ষ লক্ষ অগণিত খেলোয়াড়দের কথা ভাবুন, জগদ্ব্যাপী সহস্রাধিক স্থানগুলির কথা মনে করুন। জুয়াখেলার প্রতি তাদের লালসাকে চরিতার্থ করতে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ থেকে এই সব লোকেরা প্লেন, ট্রেন, বাস, জাহাজ ও গাড়ি করে এখানে এসে উপস্থিত হয়। এটাকে বলা হয়ে থাকে “এক গুপ্ত রোগ, ৯০ দশকের এক আসক্তি: বাধ্যতামূলক জুয়াখেলা।” “আমি মনে করি যে ১৯৯০ দশক হবে জগদ্ব্যাপী জুয়াখেলাকে আইনতভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার এক ঐতিহাসিক বছর,” জাতীয় স্তরে জুয়াখেলার কার্যনীতির উপর এক অভিজ্ঞ গবেষক ডিউরান্ট জেকবস্ এই মন্তব্য করেন।
উদাহরণস্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ১৯৯৩ সালে প্রধান-লিগ বেস্বল পার্কগুলিতে যাওয়ার তুলনায় অধিক সংখ্যার আমেরিকানরা ক্যাসিনোতে গিয়েছিল—৯.২ কোটি লোকের উপস্থিতি সেখানে ছিল। নতুন জুয়াখেলার প্রতিষ্ঠান তৈরি করার কাজ অবিরাম গতিতে এগিয়ে চলেছে। পূর্ব উপকূলের হোটেল ব্যবসায়ীরা খুবই আশাবাদী। “আনুমানিক প্রতিদিন ৫০,০০০ ক্যাসিনো দর্শনার্থীদের থাকার জন্য যথেষ্ট ঘর তাদের নেই।”
১৯৯৪ সালে দক্ষিণ রাষ্ট্রগুলি, যেখানে কিছুদিন আগেও জুয়াখেলাকে পাপপূর্ণ কাজ বলে বিবেচনা করা হত সেখানে এটিকে এখন মুক্ত হস্তে আহ্বান করা হয় ও রক্ষাকর্তা হিসাবে গণ্য করা হয়। “আজকে বাইবেল বেল্টকে, ব্ল্যাকজ্যাক বেল্ট বলে নতুন নামকরণ করা যেতে পারে, যেখানে সমগ্র মিসিসিপি ও লুসিয়ানাতে ভাসমান ও ভূমিবিশিষ্ট ক্যাসিনোগুলি রয়েছে এবং ফ্লোরিডা, টেক্সাস, আলবামা ও আরকানসাসেও আরও অধিক সংখ্যায় এগুলি স্থাপিত করার পরিকল্পনা আছে,” ইউ. এস. নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট মন্তব্য করে। জুয়াখেলা যে অন্যায় এই চিন্তাধারার ক্ষেত্রে কিছু ধর্মীয় নেতারা সম্পূর্ণরূপে তাদের ধারণাকে পরিবর্তন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৪ সালে মিসিসিপি নদীর উপর, নিউ অর্লিন্স লুসিয়ানাতে যখন শহরের কর্তৃপক্ষেরা তাদের প্রথম ভাসমান ক্যাসিনোর উদ্বোধন করেন, তখন একজন পাদ্রি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রার্থনা করে এই বিষয় যে “খেলতে পারার ক্ষমতা দিয়ে: অর্থাৎ উৎকর্ষতার সাথে,” তিনি বলেন “তুমি এইভাবে শহরটিকে আশীর্বাদযুক্ত করেছো।”
এটা আশা করা হচ্ছে যে, ২০০০ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ লোক জুয়াখেলার ক্যাসিনো যেখানে অবস্থিত সেখান থেকে গাড়ি করে যাওয়া তিন থেকে চার ঘন্টার দূরত্বের মধ্যে বসবাস করবে। আমেরিকান ইন্ডিয়ানরাও জুয়াখেলার ব্যবসায় এক বিশাল অংশের অংশীদার হতে পেরেছে। তাই মার্কিন সরকার রাষ্ট্রব্যাপী ২২৫টি ক্যাসিনো আর বিশাল ব্যয় সাপেক্ষ বিংগো হলগুলিকে স্বীকৃতি দিয়েছে, ইউ. এস. নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট জানায়।
যখন তাস খেলা, ক্রীড়া সংক্রান্ত জুয়াখেলা, ঘোড়া ও কুকুরের দৌড়, গির্জার বিংগো ইত্যাদি একসাথে সংমিশ্রিত হয়, তখন এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে কিভাবে আমেরিকানরা ১৯৯৩ সালে আইনত ৩৯,৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা ছিল গত বছরের তুলনায় ১৭.১ শতাংশ বৃদ্ধি। যারা জুয়াখেলার বিরোধী তারা হতবাক হয়ে যায়। বাধ্যতামূলক জুয়াখেলার একটি কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর বলেন যে “গির্জা, মন্দির ও সরকারের সাথে যুক্ত লোকেদের আমাদের সবচাইতে বেশি সাহায্য করতে হবে।” “আর এরা এখন সকলেই জুয়াখেলার ব্যবসার সাথে জড়িত।” একটি আমেরিকান সংবাদপত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে “জুয়াখেলার দেশ” হিসাবে বর্ণনা করেছে, আর বলেছে যে জুয়াখেলাই হল “আমেরিকার প্রকৃত জাতীয় অবসর বিনোদন।”
১৮২৬ সালে ইংল্যান্ড তার প্রথম লটারি চালু করে আর জানা যায় যে এর বিক্রিও বেড়েই চলেছে। এছাড়াও এই দেশটিতে বিংগো খেলাও বেড়েই চলেছে, নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা রিপোর্ট করে। “মস্কো এখন ব্যস্ত ক্যাসিনোগুলির দ্বারা পরিপূর্ণ। আর লেবাননের জুয়াড়িরা, পশ্চিম বেরুটের খেলার ঘরগুলিতে যাওয়ার জন্য রীতিমত তাদের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে আর যেগুলি সামরিক লোক ও ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসীরা আক্রমণ করে থাকে,” টাইমস জানায়। “প্রচুর পরিমাণে অর্থ যারা জিতে নেয়, তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বন্দুকধারী ক্যাসিনোর দ্বাররক্ষীরা সাহায্য করে।”
“ক্যানেডিয়ানরা উপলব্ধি করে না যে তারা হল এক জুয়াড়ি জাতি,” কানাডার এক ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক এই কথা বলেন। তিনি আরও বলেন “সম্ভবত এক ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কানাডাতে এক উচ্চমানের জুয়াখেলার অস্তিত্ব রয়েছে।” “কানাডা, এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ গত বছর বৈধ বাজিগরদের এবং জুয়াখেলার উপর ব্যয় করে—ছায়াছবিতে যাওয়ার উপর যা খরচ করে থাকে তার চাইতে প্রায় ৩০ গুণ বেশি,” দ্যা গ্লোব অ্যান্ড মেইল সংবাদপত্রটি জানায়। “কানাডার বিংগো ব্যবসাগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে অথবা যা কখনও ছিল তার তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। কানাডার লটারির ব্যবসা অনেক বেশি আধুনিক। আর ঘোড়দৌড়ের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য,” সংবাদপত্রটি জানায়।
“কেউ জানে না যে দক্ষিণ আফ্রিকায় কতজন জুয়াখেলায় আসক্ত ব্যক্তি আছে,” দক্ষিণ আফ্রিকার একটি সংবাদপত্র লেখে, “কিন্তু অন্ততপক্ষে সেখানে ‘সহস্রাধিক’ ব্যক্তি রয়েছে।” কিন্তু স্পেনের সরকার, এই সমস্যা এবং ক্রমবর্ধমান জুয়াড়িদের সংখ্যা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল রয়েছে। আধিকারিক পরিসংখ্যান দেখায় যে ৩.৮ কোটি বাসিন্দাদের মধ্যে অধিকাংশই ২,৫০০ কোটি ডলার প্রতি বছর খরচ করে, যার ফলে পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে বেশি হারে স্পেন জুয়ার মুনাফা পেয়ে থাকে। “স্পেনীয়রা হল দক্ষ জুয়াড়ি,” এক ব্যক্তি এই মন্তব্য করেন যিনি জুয়াড়িদের সাহায্য করার জন্য একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করেছেন। “তারা বরাবরই এইরকম ছিল। . . তারা ঘোড়া, সকার, লটারি এবং অবশ্যই রুলে, পোকার, বিংগো আর স্লট মেশিনের উপর জুয়া খেলে থাকে।” কেবলমাত্র সাম্প্রতিক বছরগুলিতেই স্পেনে, জুয়াখেলাকে এক মানসিক উৎপীড়নের কারণ হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে।
প্রাপ্ত প্রমাণগুলি ইঙ্গিত করে যে ইতালীও এই জুয়াখেলার প্রভাবের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। কোটি কোটি টাকা লটারি ও খেলার মধ্যে ডুবে গেছে আর এছাড়াও তারা সংবাদপত্রের প্রতিযোগিতা ও জুয়ার টেবিলের উপরেও ঝুঁকেছে। সরকারী অর্থ দ্বারা অনুমোদিত একটি গবেষণার দল জানায় যে “জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জুয়াখেলার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।” আজকে “জুয়াখেলার এই স্তরটি এমন এক শিখরে এসে পৌঁছেছে যা ছিল এক সময় অচিন্তনীয়,” দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস, লেখে “এবং সরকারী কর্তৃপক্ষদের থেকে শুরু করে গির্জার যাজকেরা পর্যন্ত টাকা রোজগার করার দৌড়ে সামিল হয়েছে।”
কতই না সত্য! অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে জুয়াখেলা লোকেদের জীবনের প্রতিটি দিককে প্রভাবিত করেছে, যা পরবর্তী প্রবন্ধটি দেখাবে।
[৪ পৃষ্ঠার ব্লার্ব]
এক সময়কার পাপপূর্ণ কাজ—এখন এক “রক্ষাকর্তা”
[৫ পৃষ্ঠার ব্লার্ব]
জুয়াখেলার নেশা জগদ্ব্যাপী ছেয়ে যাচ্ছে