এশিয়ার বৃহত্তম
পশুমেলায় এক দিন
মহারাজারা সুসজ্জিত হাতির পিঠে চড়ে যাচ্ছেন বা সাধারণ কৃষক বড় শিংওয়ালা দুটো বলদকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—এইরূপ দৃশ্যের ছবি প্রায়ই ভারতে তোলা হয়ে থাকে। কিন্তু এই ধরনের বড় ও মূল্যবান পশু কোথায় পাওয়া যায়?
জানতে হলে আমাদের সাথে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিহার রাজ্যের সোনপুর-এ আসুন। সেখানে এমন একটি মেলা দেখতে যেতে পারি যা আপনি হয়ত আগে কখনও দেখেননি। বলা হয় যে এটি হল এশিয়ার বৃহত্তম পশুমেলা, সম্ভবত বিশ্বেরও। অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যে দুই সপ্তাহের জন্য এই মেলা বসে।
একটি মনোরম ঘটনা
কত ভিড়! স্ত্রীলোকেরা রঙবেরঙের শাড়ি পরে প্রচুর গয়নাগাটি পরেছে। বিবাহিতা স্ত্রীলোকদের বিশেষ করে সিঁথিতে সিঁদুর। বেশিরভাগের কোলে বাচ্চা রয়েছে, আর যখন স্ত্রীয়েরা তাদের স্বামীর সাথে তাল রেখে তাড়াতাড়ি হাঁটছে তখন আরও একটা কি দুটো বাচ্চা তাদের শাড়ি ধরে চলেছে।
এত ভিড়ের মাঝে আমরা অবাক হচ্ছি যে কিভাবে ছেলেমেয়েরা হারিয়ে না গিয়ে থাকতে পারে। আসলে, অনেকেই হারিয়ে যায়। আমরা শুনলাম যে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ৫০টি ছেলেমেয়ে হারিয়ে গেছে আর তাদের মধ্যে মাত্র ১৭ জনকে খুঁজে পাওয়া গেছে। যারা হারিয়ে গেছে তাদের কথা চিন্তা করে আমরা শিহরিত হই, কারণ আমরা শুনেছি যে অন্যায়কারী ব্যক্তিরা তাদের প্রায়ই ধরে নিয়ে গিয়ে জোর করে ভিক্ষা এবং অনৈতিক কাজ করায়।
রাস্তার ধারের দোকানগুলি ভিড় আরও বাড়ায় কিন্তু সেগুলি দেখতে খুব আগ্রহ লাগে। একটি দোকানে এক টাকা দিলে ছোট একটা পাখি খাঁচা থেকে বার হয়ে এসে একটা কার্ড তোলে। এর মালিক কার্ড থেকে তখন কোন ব্যক্তির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করে। তাড়াতাড়ি দাড়ি কামাতে চান? তাহলে নাপিতের সামনে পিঁড়িতে বসে পড়ুন এবং তার লম্বা, ধারাল ক্ষুর আপনার সাবান লাগানো মুখমণ্ডলের দাড়ি কাটতে থাকবে। যে কোন আধুনিক সরঞ্জাম আপনাকে যে রকম দাড়ি কামিয়ে দেবে মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে তার থেকেও ভালভাবে আপনার দাড়ি কামানো হয়ে যাবে।
দোকানে থাকে হরেক রকমের সুন্দর চুড়ি, যা ভারতীয় নারীরা শাড়ির সাথে মিলিয়ে হাতে পরতে ভালবাসে। অভিজ্ঞ বিক্রেতা ক্রেতার হাতে চুড়ি পরাতে ও খুলাতে থাকে যতক্ষণ না সঠিক মাপের ও নক্সার চুড়ি পাওয়া যায়। কাঁচ, ধাতু বা প্লাস্টিকের তৈরি চুড়ি প্রত্যেকটি হাতে ভারতীয় নারীরা অন্তত এক ডজন পরে থাকে।
দোকানে পশুদের পরাবার জন্য গয়নাও পাওয়া যায়। কারণ, এটি হল এক পশু মেলা। এখানে অনেক রকমের জিনিস খুব তাড়াতাড়ি বিক্রি হয়ে যায় কারণ গ্রামবাসীরা তাদের পশুদের সাজাতে ভালবাসে। সাজাবার বস্তুর মধ্যে রয়েছে পশুর গলায় পরাবার জন্য পুঁথির মালা ও তার সাথে বিভিন্ন মাপের নানা রঙের ঘন্টা।
কে চিৎকার করছে? কেন, এক ভিক্ষুক! বিবর্ণ ধুলো মেখে সে রাস্তার উপরে হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছে তার সাথে তার থালাটাও ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। এত ভিড় থাকলেও আশ্চর্যের বিষয় যে সে লোকেদের পায়ের তলায় পড়ছে না! মেলায় এলে লোকেরা উদার হয়, তাই এই ভিখারীর থালাটি ইতিমধ্যেই অর্দ্ধেক ভরে গেছে। মন্দিরের কাছে শত শত ভিখারীরা ভিক্ষা চাইছে—খঞ্জ, অন্ধ ও কুষ্টরোগী। কেউ তাদের ভাগ্যকে দোষারোপ করছে, অন্যেরা দেবতাদের নাম নিচ্ছে, আবার কিছু জন যারা দান করছে তাদের আশীর্বাদ করছে।
বিভিন্ন রকমের পশুও মেলায় আসছে। হাতিদের গায়ে রং করা হয়েছে ও চকমকে বস্তু দিয়ে সাজান হয়েছে। প্রত্যেকের পিঠে মাহুত রয়েছে যারা মাঝে মাঝে একটি লাঠি দিয়ে হাতির কানে খোঁচা মেরে চলার জন্য বা থামার জন্য আদেশ দিচ্ছে। মোষেরা তাদের মাথা উঁচু করে আস্তে আস্তে আসছে, তাদের পিছনে জড়ো হওয়া ভিড়ের কথা যেন তাদের মনেই নেই।
পথে আমরা অনেক গরু ও কিছু উটকেও দেখি। প্রচুর বাঁদর, বেশির ভাগ লেঙ্গুর জাতীয়। এদের থাকে ঘন ভ্রূ ও দাড়িওয়ালা থুতনি। পালকওয়ালা পাখিও প্রচুর আছে, বহুবর্ণ ময়ূর ও তোতা পাখি থেকে ছোট টিয়া পাখি ও পায়রাও আছে। সকলেই মেলাতে কাছে-দূরে সর্বত্র থেকে এসেছে।
কিছু বিশেষ আকর্ষণগুলি
যে বিশিষ্ট গরুগুলি পাঞ্জাব থেকে এসেছে তারাই হল আকর্ষণের বিষয়। এদের মধ্যে কিছু গরু দিনে দুবার ২৫ লিটার দুধ দেয়। সত্যই, তারা সুন্দর পশু! অনেকে আসে শুধুমাত্র তাদের দেখার জন্য, আবার অনেকে আসে প্রকৃতপক্ষে কিনতে। যখনই বিক্রি করা হয়ে যায়, মালিক বলে ওঠে, “বোলো হরিহরনাথ কি,” এইভাবে স্থানীয় দেবতার প্রশংসা করে, আর জনতা সম্মতির সাথে চেঁচিয়ে বলে “জয়।” একটি ভারতীয় গরুর মূল্য হল সাধারণত ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা কিন্তু এই বিদেশী বিশিষ্ট জাতের গরু বিক্রি হয় ২০,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকাতে।a
a এক হাজার টাকা ৬০, ইউ. এস. ডলারের সমান।
এই বছর মাত্র ১৫টি উট এসেছে বাজারে বিক্রি হওয়ার জন্য। এই “মরুভূমির জাহাজ”-দের প্রত্যেকটির দাম হল ৫,০০০ টাকা। তারা অনেকক্ষণ ধরে কাজ করতে পারে ও গরম, ঠাণ্ডা, তৃষ্ণা ও ক্ষুধা সহজেই সহ্য করতে পারে। উটদের গাড়ি টানতে ও লাঙ্গল চালাতে এবং জলের চাকা ঘুরাতে ব্যবহার করা যেতে পারে যা সাধারণত বলদ বা ষাঁড় করে থাকে।
সবথেকে জনপ্রিয় পশু হল বলদ। ভারতের রাস্তায় যাত্রা করার সময়, সদা নির্ভরযোগ্য বলদের গাড়িকে চাষার বস্তু সামগ্রী ও পরিবারকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য না দেখা অসম্ভব। একজন উদ্যমী বিক্রেতা একটি বোর্ড লাগিয়েছে যাতে লেখা আছে “সুপারস্টার বলদ।” আর তারা সত্যি দেখতে সুপারস্টারের মত! যদি কেউ বিক্রেতাকে ঠকাতে বা চুরি করতে যায়, তাই দুটি রাইফেলকে সাজিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। একটি সুপারস্টার ৩৫,০০০ টাকায় বিক্রি হয়।
পরে, ঘোড়াগুলির চিৎকার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এইগুলিও কী সুন্দর পশু! এদের মধ্যে রয়েছে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর জন্য কিছু ঘোড়া আবার অন্যগুলি ঘোড়দৌড়ের ঘোড়া। চড়ার জন্য ও গাড়ি টানার জন্য টাট্টু ঘোড়াও আছে। একটি দোকানে ব্রাস্ ব্যাণ্ড বাজানো হচ্ছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়াদের জন্য, যেগুলি সঙ্গীতের সুরের সাথে তালে তালে নাচছে।
আমরা বৃংহণের আওয়াজ পেয়ে সেই দিকে গেলাম। সেখানে আম্রকুঞ্জের মাঝে রয়েছে হাতিরা, ২৫০টি হাতি। কী বিশাল প্রাণী! এরা ভারত ও নেপালের সর্বত্র থেকে এসেছে। দেখে মনে হচ্ছে এরা অশান্ত, হয়ত বিশাল সমাবেশ ও তার সাথে অন্যান্য হাতিদের উপস্থিতির জন্যও তা হতে পারে।
এখানে আমাদের হরিহর প্রসাদের সাথে দেখা হয়, ২৫ বছরের একটি মদ্দা হাতি যেটি প্রচণ্ড চিৎকার করছে। ওর মালিক গঙ্গাবু সিং সবেমাত্র ৭০,০০০ টাকায় তাকে বিক্রি করেছে। ভাল বড় হাতির বর্তমান বাজার দর ১,৩০,০০ টাকার সাথে তুলনা করলে এর দাম হল বেশ কম। কিন্তু হরিহরকে সামলানো একটু কষ্টকর।
হরিহর মেলায় আসার জন্য ২২ দিন ধরে হেঁটেছে আর এখন ওর মালিক তাকে ছেড়ে যেতে কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু ব্যবসা হল ব্যবসা, আবেগজনিত বন্ধনকে ছিঁড়ে ফেলতেই হবে। আমরাও ভাবছি যে হরিহর তার পুরনো মাহুতকে (প্রশিক্ষককে) ছেড়ে যেতে কষ্ট বোধ করছে কি না। যখন তার নতুন মাহুত তাকে চালনা করতে যায়, হরিহর তার দড়ি ছিঁড়ে ফেলে তাই সে এখন শিকলে বাঁধা।
তাকে শান্ত করার জন্য ও অন্য জায়গায় ভালভাবে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য আগের মাহুত তার সাথে ওর নতুন ঘরে যাবে। সেখানে দুই মাহুতই এক সঙ্গে কাজ করবে যতক্ষণ না নতুন মাহুত হরিহর ও তার মেজাজের সাথে পরিচিত হয়। আমরা জানতে পারলাম যে নতুন মাহুত হরিহরকে বেশি দিন রাখতে চায় না। তাই, তাকে হয়ত সোনপুরে আগামী বছরে এনে আবার বিক্রি করা হবে।
হতে পারে যে হরিহরকে রাজস্থানের লোকেরা কিনে নেবে যারা হয়ত তাকে কোন দূরবর্তী অঞ্চলের মন্দিরের হাতি হিসাবে রাখবে। তখন তাকে সম্পূর্ণ সাজিয়ে মন্দিরের রথ টানার জন্য ব্যবহার করা হবে। অথবা বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জের সুদূর জঙ্গলে তাকে হয়ত গাছের গুঁড়ি টানার জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।
দীর্ঘ ইতিহাসসহ একটি মেলা
যদিও বা কেউ নিশ্চিতরূপে জানে না যে কখন ও কিভাবে সোনপুরে এই পশুমেলা শুরু হয়, মনে হয় এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে মুঘল সম্রাট আলমগীরের (১৬৫৮-১৭০৭) রাজত্বকালে। রাজেশ্বর প্রসাদ সিং, জমির এক স্থানীয় মালিক বলেন, যে তার পরিবার ঘোড়া বিক্রির জন্য মেলাতে জমি ভাড়া দিচ্ছেন ১৮৮৭ সাল থেকে। উনিশশো শতাব্দী থেকে ইংরেজ রাজত্বের নীল ব্যবসায়ীরা এই মেলার সময় পোলো খেলতে, ঘোড় দৌড়ের জন্য ও নাচের জন্য এখানে জড়ো হত।
আগেকার দিনে মহারাজারা অনেক লোকজন নিয়ে মেলাতে আসতেন এবং তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করতেন তা মেলাতে জাঁকজমক আনত। তবুও, যতদিন পশুর চাহিদা থাকবে, সোনপুর মেলাও চলবে। আমরা এই সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকারের এক মেলাতে কিছু সময় ব্যয় করে আনন্দিত হলাম যেখানে সর্ব প্রকারের পশু হল আকর্ষণের বস্তু। (g92 10/22)
সুসজ্জিত তেজী ঘোড়া দর্শকদের দেখান হচ্ছে
বিক্রি হওয়ার পর হরিহর প্রসাদ