পরিবারের জন্য সাহায্য | সন্তান লালনপালন
সন্তান ও স্মার্টফোন—ভাগ ১: আমার সন্তানকে কি একটা স্মার্টফোন দেওয়া উচিত?
আজকাল বেশিরভাগ বাচ্চার হাতেই স্মার্টফোনa দেওয়া হয় আর তাদের মধ্যে অনেকেই নিজের রুমে একা থাকার সময় ইন্টারনেট চালিয়ে ফোন ব্যবহার করে। বাচ্চার হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার কোন কোন উপকারিতা রয়েছে আর কোন কোন বিপদ রয়েছে? সারা দিনে তাকে কতক্ষণ সেটা ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত?
আপনার যা জানা উচিত
উপকারিতা
সন্তানদের সুরক্ষা এবং বাবা-মায়ের মনের শান্তি। বেথেনি নামে এক মা, যার দু-জন কিশোরবয়সি ছেলে রয়েছে, বলেন, “আমরা এক বিপদজনক জগতে বাস করছি। তাই এটা খুবই জরুরি, যেন সন্তানরা তাদের বাবা-মায়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।”
ক্যাথরিন নামে আরেকজন মা আরও একটা কারণ দেখান। তিনি বলেন, “আপনার সন্তানের স্মার্টফোনে থাকা কিছু অ্যাপের মাধ্যমে আপনি দেখতে পান, সে কোথায় আছে। আপনি এমনকী এটাও দেখতে পাবেন, সে কত স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে।”
হোমওয়ার্কে সাহায্যকারী। মেরি নামে একজন মা বলেন, “ই-মেল অথবা টেক্সট ম্যাসেজে ছেলে-মেয়েদের হোমওয়ার্ক দেওয়া হয় আর তারা ফোনের মাধ্যমে তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।”
বিপদ
ফোনের পিছনে প্রচুর সময় ব্যয়। অল্পবয়সিরা সাধারণত ফোনের পিছনে ঘন্টার-পর-ঘণ্টা সময় ব্যয় করে। আসলে বাবা-মায়েরাও একই কাজ করে থাকে। তারাও তাদের সন্তানদের সঙ্গে সময় না কাটিয়ে বরং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত থাকে। একজন পরামর্শদাতা এটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন, “একই ছাদের তলায় থেকেও তারা অপরিচিত, যে যার ডিভাইস নিয়েই ব্যস্ত।”b
পর্নোগ্রাফি। একটা পরিসংখ্যান দেখায়, কিশোরবয়সিদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছেলে-মেয়ে প্রতি মাসে পর্নোগ্রাফি দেখার জন্য সার্চ করে। এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই কারণ স্মার্টফোনের মতো ডিভাইসে খুব সহজেই পর্নোগ্রাফি খোঁজা যায়। দুই কিশোরবয়সি সন্তানের বাবা উইলিয়াম বলেন, “সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন দিয়ে বাবা-মায়েরা অনিচ্ছাকৃতভাবেই তাদের সামনে একটা পর্নোগ্রাফির দোকান খুলে দেয়, যেখানে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো চলাফেরা করতে পারে।”
আসক্তি। অনেক লোকই ফোন ছাড়া থাকতে পারে না। যদি কোনো কারণে তারা তাদের ফোন খুঁজে না পায়, তারা খুবই চিন্তায় পড়ে যায়, তারা বুঝতে পারে না, কী করবে আর এমনকী অসুস্থও হয়ে পড়ে। কিছু বাবা-মা লক্ষ করেছে, ফোন দেখার সময় তাদের সন্তানেরা অভদ্র আচরণ করে। কারমেন নামে একজন মা বলেন, “আমি যদি সেইসময় আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চাই, তা হলে সে আমাকে চোখ রাঙায় অথবা খুব অসম্মানের সঙ্গে কথা বলে। সে চায় না, কেউ তাকে বিরক্ত করে।”
অতিরিক্ত বিপদ। স্মার্টফোন ব্যবহার করার অনেক ঝুঁকি রয়েছে যেমন, সাইবারবুলিং অর্থাৎ ইন্টারনেটে একে অন্যের প্রতি অসভ্য আচরণ করা এবং সেক্সটিং করা। এ ছাড়া, ঝুঁকে পড়ে ফোন দেখার এবং পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু অল্পবয়সি ছেলে-মেয়ে তাদের ফোনে “ঘোষ্ট অ্যাপ” ডাউনলোড করে রাখে। এই অ্যাপ দেখতে আর পাঁচটা সাধারণ অ্যাপের মতো, যেমন ক্যালকুলেটার। কিন্তু এই অ্যাপ বাবা-মায়েদের কাছ থেকে কোনো তথ্য লুকানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।
একজন কিশোরবয়সি মেয়ের বাবা ড্যানিয়েল বিষয়টাকে এক কথায় এভাবে বলেন, “স্মার্টফোন আপনার সন্তানের সামনে ইন্টারনেটের একটা জানালা খুলে দেয় আর সে সেখান দিয়ে সমস্ত কিছু দেখতে পায়, হোক তা ভালো কিংবা মন্দ।”
আপনার যা জিজ্ঞেস করা উচিত
‘আমার সন্তানের কি স্মার্টফোন দরকার?’
বাইবেল বলে: “সতর্ক ব্যক্তি প্রতিটা পদক্ষেপের আগে চিন্তা করে।” (হিতোপদেশ ১৪:১৫) এই কথাটা মাথায় রেখে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন:
‘সন্তানের সুরক্ষার জন্য অথবা অন্য কোনো কারণে কি তাকে স্মার্টফোন দেওয়া ঠিক হবে? আমি কি ভালো-মন্দ উভয় দিক বিচার করে দেখেছি? স্মার্টফোন না দিয়ে অন্য কোনো উপায় কি ব্যবহার করা যেতে পারে?’
টড নামে একজন বাবা বলেন, “এখনও বাজারে সাধারণ ফোন পাওয়া যায় আর সেটার মাধ্যমেও আপনার সন্তান আপনাকে ফোন করতে পারে এবং ম্যাসেজ পাঠাতে পারে। এতে আপনার অনেক টাকাও বেঁচে যায়।”
‘আমার সন্তান কি দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত?’
বাইবেল বলে: “বিজ্ঞ ব্যক্তির হৃদয় তাকে সঠিক পথে নিয়ে যায়।” (উপদেশক ১০:২) এই কথাটা মাথায় রেখে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন:
‘কীভাবে আমি নিশ্চিত হব যে, আমার সন্তান বিশ্বাসযোগ্য? সে কি আমার সঙ্গে মন খুলে কথা বলে? আমার সন্তান কি ইতিমধ্যেই সত্যি কথা বলে, না কি কিছু গোপন করে, যেমন কারা তার বন্ধুবান্ধব? সে কি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে টিভি, ট্যাবলেট অথবা ল্যাপটপ ব্যবহার করে?’ শিরিন নামে একজন মা বলেন, “স্মার্টফোন একদিকে যেমন উপকার করে, আবার অন্য দিকে ক্ষতিও করে। চিন্তা করুন তো, আপনি আপনার সন্তানকে এত কম বয়সে কত ভারি দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিতে চলেছেন!”
‘আমি কি দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত?’
বাইবেল বলে: “শিশুকে সেই পথে চলতে শেখাও, যে পথে তার চলা উচিত।” (হিতোপদেশ ২২:৬) এই কথাটা মাথায় রেখে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন:
‘আমি কি নিজে ফোন সম্বন্ধে যথেষ্ট জানি আর আমি কি আমার সন্তানকে বোঝাতে পারব যে, এটা ব্যবহার করলে কোন কোন বিপদ আসতে পারে আর কীভাবে তা এড়ানো যায়? আমি কি জানি কীভাবে পেরেন্টাল কনট্রোল অ্যাপ (এমন একটা অ্যাপ, যেটার সাহায্যে বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানের ডিভাইসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে) সেট করতে হয়? কীভাবে আমি আমার সন্তানকে সাহায্য করব, যাতে সে বুঝে-শুনে ফোন ব্যবহার করতে পারে?’ ড্যানিয়েল, যার বিষয়ে আগে উল্লেখ করা হয়েছে, বলেন, “আমি অনেক বাবা-মাকে দেখেছি, যারা তাদের শিশুদের হাতে ফোন দিয়ে চলে যায় আর দেখেও না, সে কী করছে।”
আমরা যা শিখি: সন্তানেরা যাতে বুঝে-শুনে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারে, সেইজন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। ইনডিসট্রেকেবেল নামক একটা বই বলে, “আমাদের শিশুরা অতিরিক্ত সময় ধরে ফোন ব্যবহার করার প্রলোভন আটকাতে পারে না, বিশেষ করে তাদের বাবা-মায়েরা যখন তাদের দিকে নজর দেয় না।”
a এই প্রবন্ধে “স্মার্টফোন” বলতে সেই মোবাইল ফোনকে বোঝায়, যেটা ইন্টারনেট চালিয়ে ব্যবহার করা হয়।
b থমাস কার্সটিং-এর লেখা ডিসকানেকটেড বই থেকে।