জীবনকাহিনি
যিহোবার সেবায় আমি অনেক আনন্দ খুঁজে পেয়েছি
১৯৫৮ সালে আমি কানাডার বেথেলে আসি আর সেইসময় আমার বয়স ছিল ১৮ বছর। বেথেলে আমার প্রথম কাজ ছিল পরিষ্কার করা, যেখানে ছাপানোর কাজ হত। কিছুদিন পর, আমাকে এমন একটা মেশিন চালাতে বলা হয়, যেটা দিয়ে বইয়ের চারপাশের অতিরিক্ত কাগজ কাটা হত। আমার জীবনে সব কিছু ভালোই চলছিল আর আমি বেথেলে কাজ করে খুব খুশি ছিলাম।
পরের বছর, বেথেলে এই ঘোষণা করা হয় যে, দক্ষিণ আফ্রিকার শাখা অফিসে একটা রোটারি প্রিন্টিং প্রেস সেট করা হবে আর এরজন্য সেখানে ভাইদের প্রয়োজন রয়েছে। আমি আমার নাম দিই আর আমাকে যখন ডাকা হয়, তখন আমি খুব খুশি হই। আমার সঙ্গে আরও তিন জন ভাইকে ডাকা হয়। তারা হল ডেনিস লিচ, বিল মেকলেলান ও কেন্ নর্ডিন। আমাদের বলা হয় যে, সেখানে আমাদের দীর্ঘসময়ের জন্য থাকতে হবে। আমরা তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে পারব না।
আমি মাকে ফোন করি আর বলি: “মা, আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই। আমি দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছি!” মা বেশি কিছু বলেননি। কিন্তু, আমি জানতাম, তিনি আমার এই সিদ্ধান্তে খুশি ছিলেন। যিহোবার উপর মায়ের বিশ্বাস ছিল আর তাঁর সঙ্গে এক উত্তম সম্পর্ক ছিল। যদিও বাবা-মায়ের দুঃখ ছিল যে, আমি তাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছি, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা আমাকে বাধা দেননি।
দক্ষিণ আফ্রিকায়
১৯৫৯ সালে কেপ টাউন থেকে জোহান্সবার্গে ট্রেনে যাওয়ার সময়, ডেনিস লিচ, বিল মেকলেলান ও কেন্ নর্ডিনের সঙ্গে
২০১৯ সালে আমরা চার জন ৬০ বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকার শাখা অফিসে আবারও একসঙ্গে
আমাদের ব্রুকলিন বেথেলে পাঠানো হয়। সেখানে আমাদের তিন মাসের জন্য ছাপানোর একটা বিশেষ ট্রেনিং দেওয়া হয়। তারপর, আমরা জাহাজে করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনের উদ্দেশে রওনা দিই। সেইসময় আমার বয়স ছিল ২০ বছর। আমরা যখন কেপ টাউনে পৌঁছাই, তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। তারপর, আমরা জোহান্সবার্গের উদ্দেশে ট্রেন ধরি। আমাদের ট্রেন খুব সকাল সকাল ছোটো একটা শহরে এসে দাঁড়ায়। সেই শহর করু নামের একটা মরুভূমিতে ছিল। সেখানে খুব গরম আর ধুলোবালি ছিল। আমরা চার জনই ট্রেনের বাইরে তাকাই আর চিন্তা করি, “এ আমরা কোথায় এসে পড়েছি! আমরা কি এখানে সেবা করতে পারব?” কিন্তু, কিছু বছর পর আবার যখন আমরা এই এলাকায় আসি, তখন এখানকার ছোটো ছোটো শহর আমাদের খুব ভালো লাগে। এখানকার লোকেরা শান্তিতে জীবন উপভোগ করছিল।
আমি অনেক বছর ধরে লাইনোটাইপ মেশিনে কাজ করেছি। এটা সত্যিই এক অসাধারণ মেশিন ছিল, যার মধ্যে আমি প্রহরীদুর্গ ও সজাগ হোন! পত্রিকার মুদ্রাক্ষর টাইপ করতাম আর সেগুলো ছাপানোর জন্য প্রস্তুত করতাম। দক্ষিণ আফ্রিকার শাখা অফিস শুধুমাত্র নিজের দেশের জন্য নয়, কিন্তু আশেপাশের দেশের জন্যও পত্রিকা ছাপাত। আমরা এটা দেখে অনেক আনন্দিত হয়েছিলাম যে, সাত সমুদ্র পার করে যে-নতুন রোটারি প্রিন্টিং প্রেসের জন্য এসেছি, সেটা কত ভালোভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে!
তারপর, আমি ফ্যাক্টরি অফিসে কাজ করি, যেখানে সাহিত্যাদি অনুবাদের, ছাপানোর ও পাঠানোর কাজ দেখাশোনা করা হত। আমি অনেক ব্যস্ত থাকতাম, কিন্তু তার মধ্যেও খুব আনন্দে ছিলাম।
বিয়ে এবং এক নতুন কার্যভার
১৯৬৮ সালে, যখন আমাকে ও লোরাকে বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়
১৯৬৮ সালে আমি লোরা বোয়ান নামে একজন অগ্রগামী বোনকে বিয়ে করি। ও বেথেলের পাশেই থাকত আর অগ্রগামী হিসেবে সেবা করত। এ ছাড়া, ও অনুবাদ বিভাগে টাইপিং-এর কাজ করত। সেই সময় বিবাহিত দম্পতিদের বেথেলে থাকার অনুমতি দেওয়া হত না। তাই, আমাদের বিশেষ অগ্রগামী হিসেবে সেবা করতে বলা হয়। আমি দশ বছর ধরে বেথেলে কাজ করছিলাম। তাই, থাকা-খাওয়ার জন্য কোনো চিন্তা করতে হয়নি। কিন্তু, এখন আমি চিন্তা করতে থাকি, বিশেষ অগ্রগামীদের যে-ভাতা দেওয়া হয়, তাতে কি আমাদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পূরণ হবে? সেই সময়ে একজন বিশেষ অগ্রগামীকে মাসে ২৫ রেন্ড (সেই সময় অনুযায়ী প্রায় ২৬২ টাকা) দেওয়া হত। সেই টাকা দিয়ে তাদের খাওয়া-দাওয়া, আসা-যাওয়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ পূরণ করতে হত। বিশেষ অগ্রগামীদের এই টাকা তখনই দেওয়া হত, যখন তারা নিজেদের ঘণ্টা পূরণ করত, অনেক পুনর্সাক্ষাৎ করত ও বইপত্র অর্পণ করত।
আমাদের ডার্বান শহরের কাছাকাছি একটা এলাকায় অগ্রগামী হিসেবে সেবা করার কার্যভার দেওয়া হয়। এই শহর ভারত মহাসাগরের উপকূলে ছিল। সেখানে বসবাসকারী অনেক লোক ভারতীয় ছিল। তাদের পূর্বপুরুষেরা ১৮৭৫ সালে চিনি তৈরি করার কারখানায় কাজ করার জন্য ভারত থেকে এসেছিল। কিন্তু, তারা তাদের পূর্বপুরুষদের থেকে আলাদা অন্য একটা কাজ করতে শুরু করে। যদিও সেই লোকেরা দীর্ঘসময় ধরে সেখানে বসবাস করছিল, কিন্তু তারা তাদের সংস্কৃতিকে খুব ভালোবাসত। এ ছাড়া, তাদের খাওয়া-দাওয়া ভারতীয়দের মতো ছিল। তাদের খাবার খেতে আমার খুব ভালো লাগত। আর একটা ভালো বিষয় ছিল, তারা ইংরেজি ভাষা জানত। তাই, তাদের কাছে প্রচার করার জন্য আমাদের কোনো নতুন ভাষা শিখতে হয়নি।
বিশেষ অগ্রগামীদের প্রতি মাসে ১৫০ ঘণ্টা প্রচার করতে হত। লোরা ও আমি চিন্তা করি, আমরা প্রথম দিন ছয় ঘণ্টা করব। আমাদের কাছে কোনো পুনর্সাক্ষাৎ ও বাইবেল অধ্যয়ন ছিল না। তাই, আমাদের ছয় ঘণ্টা শুধু ঘরে ঘরে প্রচার করতে হত। সেই দিন খুব গরম ও আর্দ্রতা ছিল। কিছু সময় পর আমি ঘড়ি দেখি, মাত্র ৪০ মিনিট হয়েছে। আমি চিন্তা করি, আমরা কীভাবে অগ্রগামীর সেবা করতে পারব?
খুব তাড়াতাড়ি আমরা একটা ভালো তালিকা তৈরি করি। আর আমরা ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে বের হই। আমরা সঙ্গে করে টুকিটাকি খাবার নিয়ে যেতাম। আর প্রচারের মাঝে মাঝে আমরা আমাদের ছোটো গাড়ি কোনো গাছের নীচে দাঁড় করিয়ে কিছু খেয়ে নিতাম। কখনো কখনো কিছু ভারতীয় ছোটো ছেলে-মেয়ে আমাদের ঘিরে ধরত আর আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকত। কারণ আমরা ওদের থেকে অনেক আলাদা দেখতে ছিলাম। কিছুদিন পর থেকে এমনটা হয় যে, দু-তিন ঘণ্টা পর আমরা বুঝতেই পারতাম না, দিনের বাকি সময় কীভাবে কেটে গিয়েছে।
যে-সমস্ত ভারতীয় লোকের কাছে আমরা প্রচার করতাম, তারা আমাদের প্রতি আতিথেয়তা দেখাত, সম্মান করত আর ঈশ্বরকে ভালোবাসত। বেশিরভাগ লোক হিন্দু ছিল। কিন্তু, তারা যিহোবা, যিশু, বাইবেল, নতুন জগৎ ও মৃত ব্যক্তিদের আবারও জীবন ফিরে পাওয়ার আশা সম্বন্ধে জানতে ভালোবাসত। এই লোকদের সত্য সম্বন্ধে জানাতে পেরে আমরা খুব খুশি হই। এক বছর পর, আমরা ২০টা বাইবেল অধ্যয়ন পরিচালনা করি। আমরা প্রতিদিন আমাদের একজন ছাত্রের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করতাম। আমরা আমাদের অগ্রগামীর সেবায় আনন্দ লাভ করছিলাম।
কিছু সময় পর, আমাকে সীমা অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত করা হয় এবং আমাদের ভারত মহাসাগরের উপকূলে থাকা মণ্ডলীগুলোতে পরিদর্শন করতে হত। প্রতি সপ্তাহে, আমরা একটা পরিবারের সঙ্গে থাকতাম এবং মণ্ডলীর ভাই-বোনদের সঙ্গে প্রচার করতাম আর তাদের উৎসাহিত করতাম। যারা তাদের বাড়িতে থাকতে দিত, তারা আমাদের নিজের পরিবারের মতো মনে করত। তাদের সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাতে আর তাদের পোষা জীবজন্তুর সঙ্গে খেলতে আমাদের খুব ভালো লাগত। আমরা আমাদের এই সেবায় আনন্দ লাভ করছিলাম। দেখতে দেখতে দু-বছর কেটে যায়। এরপর একদিন, বেথেল থেকে ফোন আসে। একজন ভাই বলেন, “আপনি কি আবারও বেথেলে আসতে চান?” আমি বলি, “সত্যি বলতে কী, আমরা এখন যেখানে আছি, খুব খুশিতে আছি।” যদিও আমি এটা বলি, তা সত্ত্বেও আমি বেথেল ফিরে যাই।
বেথেলে ফিরে আসা
বেথেলে আমি পরিচর্যা বিভাগ-এ কাজ করতে শুরু করি। সেখানে আমি অভিজ্ঞ ভাইদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাই। সেই সময়, সীমা অধ্যক্ষের পরিদর্শনের পর মণ্ডলীর রিপোর্ট শাখা অফিসে পাঠানো হত আর পরে শাখা অফিস মণ্ডলীকে উৎসাহিত করার জন্য কিংবা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠাত। এরজন্য, পরিচর্যা বিভাগ-এর ভাইদের অনেক পরিশ্রম করতে হত কারণ তাদের সীমা অধ্যক্ষের চিঠি হোসা, জুলু ও অন্যান্য ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হত। আর মণ্ডলীর জন্য শাখা অফিসের চিঠি পুনরায় সেই ভাষাগুলোতে অনুবাদ করতে হত। সেই ভাইদের কাছ থেকে আমি এটাও জেনেছি যে, আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ভাই-বোনেরা কত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে যিহোবার সেবা করে যাচ্ছে।
সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবিদ্বেষ চলছিল। ভিন্ন ভিন্ন জাতির লোকেরা নিজ নিজ এলাকায় থাকত আর অন্য বর্ণের লোকদের সঙ্গে মেলামেশা করত না। এই কারণে, আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ ভাই-বোনেরা শুধু নিজেদের ভাষায় কথা বলত এবং নিজেদের ভাষায় কথা বলে এমন লোকদের কাছে প্রচার করত আর নিজেদের ভাষার মণ্ডলীতে যোগ দিত।
আমি শুরু থেকেই ইংরেজি ভাষার মণ্ডলীতে যেতাম, তাই কৃষ্ণাঙ্গ লোকদের সম্বন্ধে বেশি কিছু জানতাম না। কিন্তু, এখন আমি তাদের সংস্কৃতি ও রীতিনীতির বিষয়ে জানার সুযোগ পাই। আমি জানতে পারি, গ্রামের লোকেরা খুব দরিদ্র। তারা বেশি পড়াশোনা জানে না, তা সত্ত্বেও বাইবেলের প্রতি তাদের সম্মান রয়েছে। আমি এও জানতে পারি, আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ ভাই-বোনদের কোন কোন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। জাদুমন্ত্র জড়িত রয়েছে এমন কাজ ও মিথ্যা রীতিনীতি পালন করার জন্য তাদের উপর চাপ দেওয়া হয়। আর তারা যখন তা করতে অস্বীকার করে, তখন তাদের পরিবার ও গ্রামের সবাই তাদের বিরোধিতা করে। তা সত্ত্বেও, তারা সাহসের সঙ্গে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করে।
সেই সময় উপাসনা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে আমরা অনেক মামলা করি। আমি তাতে সাহায্য করার সুযোগ পাই। আসলে, সাক্ষি ছেলে-মেয়েদের স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছিল কারণ তারা অন্য ছেলে-মেয়েদের মতো প্রার্থনা ও ঈশ্বরভক্তি গান করে না। সেই ছেলে-মেয়েদের সাহস ও বিশ্বাস দেখে আমার বিশ্বাস মজবুত হয়।
আফ্রিকার একটা ছোটো দেশে (যেটা সোয়াজিল্যান্ড বলা হত) ভাইদের আর একটা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সেখানকার রাজা সোবুজা ২য় মারা গিয়েছিলেন আর এরজন্য সমস্ত নাগরিককে বলা হয়েছিল যে, রাজার মৃত্যুর জন্য তাদের শোক পালন করতে হবে। তাই, পুরুষদের ন্যাড়া হতে হত আর মহিলাদের চুল ছোটো করতে হত। অনেক ভাই-বোন এই রীতি পালন করতে অস্বীকার করে কারণ এতে পূর্বপুরুষদের উপাসনা করা জড়িত ছিল। এইজন্য, তাদের উপর খুবই খারাপভাবে অত্যাচার করা হয়। তা সত্ত্বেও, তারা বিশ্বস্ত থাকে আর ধৈর্য ধরে সেই কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করে। এটা দেখে আমাদের বিশ্বাস অনেক মজবুত হয়।
আবারও ছাপাখানায়
১৯৮১ সালে আমি আবারও ছাপাখানায় কার্যভার পাই। সেই সময় কম্পিউটারের সাহায্যে ছাপানোর কাজ শুরু হচ্ছিল। সেটা খুবই রোমাঞ্চকর এক সময় ছিল! কারণ ছাপানোর পদ্ধতি পরিবর্তিত হচ্ছিল। একজন সেলস্ম্যান আমাদের ফটোটাইপসেটার নামে একটা মেশিন দেন, যাতে আমরা সেটা চালিয়ে দেখতে পারি। এরজন্য, আমাদের কোনো টাকা দিতে হয়নি। এই মেশিন কম্পিউটারের মাধ্যমে ছাপানোর আগে সমস্ত কিছু প্রস্তুত করে ফেলত। আমাদের কাছে ন-টা লাইনোটাইপ মেশিন ছিল, সেগুলো পালটে আমরা পাঁচটা ফটোটাইপসেটার মেশিন কিনে ফেলি। এর সঙ্গে সঙ্গে, আমরা একটা নতুন রোটারি অফসেট প্রেসও কিনি। ছাপানোর কাজ দ্রুতগতিতে চলতে থাকে!
কম্পিউটারের সাহায্যে একটা নতুন প্রোগ্রাম তৈরি করা হয়, যেটাকে মাল্টিল্যাঙ্গুয়েজ ইলেকট্রনিক পাবলিশিং সিস্টেম (MEPS) বলা হয়ে থাকে। এর সাহায্যে বাক্যগুলো কম্পিউটারে সঠিকভাবে ফেলা হয়, যাতে তা ছাপানো যেতে পারে। আমরা চার জন যখন প্রথম বার দক্ষিণ আফ্রিকায় আসি, সেই সময় থেকে আজকে টেকনোলজি আরও উন্নত হয়ে গিয়েছে। (যিশা. ৬০:১৭) আমাদের চার জনেরই জীবন পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। আমাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আমরা এমন বোনদের বিয়ে করেছি, যারা অগ্রগামী ছিল আর যিহোবাকে খুব ভালোবাসত। আমি ও বিল বেথেলে সেবা করতে থাকি। কিন্তু, কেন্ ও ডেনিসের সন্তান হয়। তাই, তারা বেথেলের পাশেই থাকতে শুরু করে।
শাখা অফিসে বিভিন্ন কাজ করা হচ্ছিল। আমাদের বইপত্র বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছিল, সেগুলো ছাপানো হচ্ছিল আর আলাদা আলাদা শাখায় সেগুলো পাঠানো হচ্ছিল। শীঘ্রই, আমাদের একটা বড়ো বেথেলের প্রয়োজন দেখা দেয়। ভাইয়েরা জোহান্সবার্গের পশ্চিম দিকে একটা সুন্দর জায়গা দেখেন আর তারা সেখানে একটা নতুন বেথেল তৈরি করেন। ১৯৮৭ সালে সেই জায়গাটা যিহোবার উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়। আমি খুশি যে, এই অপূর্ব কাজে আমি অংশ নিতে পেরেছিলাম। আর আমি অনেক বছর ধরে শাখা কমিটি-তে সেবা করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
নতুন দেশ, নতুন কার্যভার
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটা নতুন শাখা কমিটি তৈরি হয়েছিল। আমাকে যখন সেই কমিটিতে সেবা করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, তখন আমি খুব অবাক হই। একদিকে, আমরা যেমন দক্ষিণ আফ্রিকায় আমাদের সেবা ও বন্ধুদের ছেড়ে আসার জন্য দুঃখ পাচ্ছিলাম, আবার অপর দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বেথেল পরিবারের সদস্য হিসেবে সেবা করার জন্য উৎসুক ছিলাম।
কিন্তু, আমাদের লোরার মায়ের জন্য চিন্তা হচ্ছিল কারণ উনি বয়স্ক হয়ে গিয়েছিলেন আর নিউ ইয়র্ক থেকে ওনাকে বেশি সাহায্য করতে পারছিলাম না। তবে, লোরার তিন বোন বলেন যে, তারা ওনার যত্ন নেবেন। তারা বলেন: “আমরা তো পূর্ণসময়ের সেবা করতে পারছি না। কিন্তু আমরা চাই, তোমার এই সেবা চালিয়ে যাও। তাই, মায়ের জন্য চিন্তা কোরো না। আমরা মায়ের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করব।” আমি ও লোরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ ছিলাম।
লোরার বোনদের মতো কানাডার টরোন্টে শহরে আমার দাদা-বৌদি আমার মায়ের দেখাশোনা করছিলেন। আমার মা একজন বিধবা ছিলেন। তারা ২০ বছর ধরে মায়ের যত্ন নিয়েছিলেন। কিন্তু, আমাদের নিউ ইয়র্কে আসার কিছু সময় পর, আমার মা মারা যান। আমরা আমার দাদা-বৌদির কাছে খুবই কৃতজ্ঞ যে, তারা মায়ের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়েছিলেন আর খুব ভালোভাবে যত্ন নিয়েছিলেন। আমরা খুব খুশি যে, আমরা এমন পরিবার পেয়েছি, যারা বয়স্ক বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। যদিও তাদের জন্য তা করা সহজ ছিল না, কিন্তু তারা আনন্দ সহকারে এই সমস্ত কিছু করেছিলেন, যাতে আমরা পূর্ণসময়ের সেবা চালিয়ে যেতে পারি।
আমি কিছু বছর যুক্তরাষ্ট্রের ছাপাখানায় কাজ করি। সেই বছরগুলোতে ছাপানোর কাজে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় আর ছাপানোর কাজ আরও সহজ হয়ে ওঠে। কিছু সময় ধরে আমি কেনাকাটা বিভাগ অর্থাৎ পার্চেসিং ডিপার্টমেন্ট-এ কাজ করি। আমি যুক্তরাষ্ট্রের বেথেলে ২০ বছর ধরে সেবা করছি। এখানকার বেথেল অনেক বড়ো, প্রায় ৫,০০০ জন ভাই-বোন এখানে থেকে কাজ করে আর ২,০০০ জন ভাই-বোন ঘর থেকে আসা-যাওয়া করে।
৬০ বছর আগে আমি চিন্তাও করতে পারতাম না, যিহোবার সেবায় আমার জীবন এতটা রোমাঞ্চকর হয়ে উঠবে! এই বছরগুলোতে আমার স্ত্রী লোরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। আমরা বিভিন্ন উপায়ে যিহোবার সেবা করেছি, বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কাজ করেছি আর আমাদের আলাদা আলাদা শাখা অফিসে পাঠানো হয়েছে। এই সমস্ত কিছু করার মাধ্যমে আমরা অনেক আনন্দ খুঁজে পেয়েছি। আজ আমার বয়স ৮০ বছরেরও বেশি। তাই, আমাকে এখন বেশি কাজ দেওয়া হয় না। বেশিরভাগ কাজ যুবক ভাইয়েরা করে কারণ এরজন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
গীতরচক লিখেছিলেন: “ধন্য” বা সুখী “সেই জাতি, যাহার ঈশ্বর সদাপ্রভু।” (গীত. ৩৩:১২) এটা কতই-না সত্য! আমি নিজে এটা অনুভব করেছি যে, যিহোবার লোকদের সঙ্গে মিলে তাঁর সেবা করার ফলেই প্রকৃত আনন্দ পাওয়া যায়।