জীবন কাহিনী
আমি এক বিশেষ উত্তরাধিকার পেয়েছি
বলেছেন ক্যারল আ্যলেন
সুন্দর নতুন বইটা হাতে নিয়ে আমি একা দাঁড়িয়েছিলাম। ভয়ে আমার বুক কাঁপছিল ও আমার দুগাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। কারণ আমি এক অপরিচিত শহরে হারিয়ে গিয়েছিলাম আর আমার চারপাশে হাজার হাজার লোক ছিল! সেই সময় আমার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর।
কিছুদিন আগে, আমার স্বামী পলের সঙ্গে আমি নিউ ইয়র্কের প্যাটারসনে ওয়াচ টাওয়ার শিক্ষা কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। সেখানে যিহোবার সাক্ষিদের ভ্রমণ অধ্যক্ষদের স্কুলের দ্বিতীয় ক্লাসে যোগ দেওয়ার জন্য পলকে ডাকা হয়েছিল। আর সেখানে গিয়েই প্রায় ৬০ বছর আগের ছেলেবেলার কথা আমার মনে পড়ে যায়।
আমরা যখন সূর্যের আলোয় ঝলমল করা লবির চারপাশটা ঘুরে দেখছিলাম তখন বড় বড় করে লেখা “সম্মেলন” শিরোনামটা আমার চোখে পড়ে। এর ঠিক মাঝখানে একটা সাদাকালো ছবি ছিল যেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আনন্দের সঙ্গে আমার ছেলেবেলার সেই বইটা দেখাচ্ছে! ছবিটা দেখেই এর নিচে লেখা কথাগুলো আমি এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম, যেখানে লেখা ছিল: “১৯৪১—মিশৌরির সেন্ট লুইস সম্মেলনের সকালের পর্বে ৫ থেকে ১৮ বছরের ১৫,০০০ ছেলেমেয়ে মঞ্চের সামনে জড়ো হয়েছে। . . . ভাই রাদারফোর্ড সন্তান (ইংরেজি) নামের নতুন বইয়ের কথা ঘোষণা করছেন।”
প্রত্যেক ছেলেমেয়েকে একটা করে বই দেওয়া হয়েছিল। এরপর সবাই যার যার বাবামার কাছে ফিরে যায় শুধু আমি ছাড়া। কারণ আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম! তখন একজন দারোয়ান আমাকে কাঁদতে দেখে একটা উঁচু দান-বাক্সের ওপর আমাকে দাঁড় করিয়ে দেয় এবং পরিচিত কাউকে খুঁজে বের করতে বলে। আমি সিড়ি ভেঙে নেমে আসা মানুষের ঢলের মধ্যে অস্থিরভাবে একটা পরিচিত মুখ খুঁজতে থাকি। হঠাৎ পরিচিত একজনকে আমি দেখতে পাই! “বব আংকেল! বব আংকেল!” বলে আমি তাকে চিৎকার করে ডাকতে থাকি। সেখান থেকে বব রেইনার আমাকে আমার বাবামার কাছে নিয়ে যান, যারা আমার জন্য চিন্তায় অস্থির হয়ে বসেছিল।
প্রথম দিকের যে ঘটনাগুলো আজকে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে
সেই ছবির দিকে তাকিয়ে আমার আরও অনেক কথা মনে পড়ে যায়, যা আমাকে আজকে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে এবং এখানে এই প্যাটারসনে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। আমার মন প্রায় একশ বছর আগের ঘটনাগুলোতে ফিরে যায়, যা বিশেষ করে আমি আমার দাদুঠাকুমা এবং বাবামার কাছ থেকে শুনেছি।
১৮৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে একজন পূর্ণ-সময়ের বাইবেল ছাত্র (যিহোবার সাক্ষিদের তখন এই নামেই ডাকা হতো) আমার ঠাকুরদাদা ক্লেটন জে. উডওয়র্থের কাছে আসেন। দাদু তখন যুক্তরাষ্ট্রে পেনসিলভানিয়ার স্ক্রেটনে থাকত আর সবেমাত্র বিয়ে করেছিল। ওয়াচ টাওয়ার বাইবেল আ্যন্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটির প্রেসিডেন্ট, চার্লস টেজ রাসেলের কাছে সে একটা চিঠি লিখেছিল যেটা ১৮৯৫ সালের ১৫ই জুন প্রহরীদুর্গ-এ ছাপা হয়েছিল। সে লিখেছিল:
“আমরা কম বয়সী এক দম্পতি এবং প্রায় দশ বছর ধরে একটা প্রটেস্টান্ট গির্জার সদস্য; কিন্তু এখন আমরা বিশ্বাস করি যে ঈশ্বরের পবিত্র সন্তানদের জন্য অন্ধকার থেকে নতুন দিনের আলোয় বেরিয়ে আসার সময় এগিয়ে আসছে। আমাদের দুজনের দেখা হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমাদের ইচ্ছা ছিল, সম্ভব হলে আমরা মিশনারি হয়ে বিদেশে গিয়ে কাজ করব।”
১৯০৩ সালে, আমার মার দাদু সেবাস্টিন এবং দিদিমা ক্যাথরিন ক্রেজির কাছে ওয়াচ টাওয়ার থেকে দুজন প্রতিনিধি আসেন। মার দাদু-দিদিমা তখন পেনসিলভানিয়ার পোকোনো পাহাড়ে তাদের বিরাট ফার্মে থাকত আর তারা খুশি মনে বাইবেলের বার্তা শুনেছিল। তাদের মেয়ে কোরা ও মেরি এবং মেয়ে জামাই ওয়াশিংটন ও এডমান্ড হাউয়েলও তাদের সঙ্গে থাকত। ওয়াচটাওয়ার প্রতিনিধি কার্ল হেমারলি এবং রে রেটক্লিফ তাদের সঙ্গে পুরো এক সপ্তা থাকেন এবং তাদেরকে বাইবেলের অনেক বিষয় শেখান। এই পরিবারের ছয়জন সদস্যই তাদের কথা মন দিয়ে শোনে, অধ্যয়ন করে এবং খুব তাড়াতাড়ি বাইবেলের উদ্যোগী ছাত্র হয়।
সেই বছরই অর্থাৎ ১৯০৩ সালে কোরা এবং ওয়াশিংটন হাউয়েলের একটা মেয়ে হয় আর তার নাম রাখা হয় ক্যাথরিন। পরে কীভাবে সে আমার বাবা ক্লেটন জে. উডওয়র্থ জুনিয়রকে বিয়ে করে, তা সত্যিই একটা মজার ঘটনা আর আমি বিশ্বাস করি সেটা অর্থপূর্ণও বটে। কারণ এর থেকে আমার দাদু ক্লেটন জে. উডওয়র্থ সিনিয়রের বিচক্ষণতা এবং তার ছেলের জন্য সে যে কতটা চিন্তা করত তা বোঝা যায়।
বাবা প্রেমময় সাহায্য পায়
বাবা, ১৯০৬ সালে স্ক্রেনটনে জন্মগ্রহণ করে, যা হাউয়েল ফার্ম থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে ছিল। সেই সময় হাউয়েল পরিবারের সঙ্গে দাদুর ঘনিষ্ঠতা হয় এবং সে প্রায়ই তাদের বাড়িতে যেত ও তারা দাদুকে অনেক আদর-যত্ন করত। সেই এলাকার বাইবেল ছাত্রদের মণ্ডলীকে সে অনেক সাহায্য করত। পরে দাদুকে হাউয়েল পরিবারের তিন ছেলের বিয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং দাদু তার নিজের ছেলের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে প্রত্যেকটা বিয়েতে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল।
বাইবেল ছাত্রদের সঙ্গে তখন বাবা প্রচারে যেত না। সে দাদুকে গাড়িতে করে প্রচারের এলাকায় নামিয়ে দিত ঠিকই কিন্তু দাদু তাকে প্রচার করার কথা বললেও বাবা প্রচার করত না। সেই সময় গানবাজনার দিকেই বাবার বেশি ঝোঁক ছিল আর গানবাজনাকেই পেশা হিসেবে নেওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছিল।
কোরা এবং ওয়াশিংটন হাউয়েলের মেয়ে ক্যাথরিন অর্থাৎ আমার মা-ও খুব ভাল পিয়ানো বাজাতে পারত এবং অন্যদেরও বাজাতে শেখাত। যদিও সেই কাজকে মা তার জীবনের লক্ষ্য হিসেবে নিতে পারত কিন্তু তা না করে সে পূর্ণ-সময়ের প্রচার কাজ শুরু করে। দাদু সবসময় চাইত তার ছেলে যেন একটা উপযুক্ত সাথি পায় আর আমার মনে হয় দাদুর চোখে মা-ই ছিল বাবার জন্য একেবারে উপযুক্ত পাত্রী। পরে বাবা বাপ্তিস্ম নেয় এবং এর ছয় মাস পর ১৯৩১ সালে মাকে বিয়ে করে।
গানবাজনায় বাবা খুব ভাল ছিল বলে দাদু সবসময়ই গর্ব করত। ১৯৪৬ সালে, ওহাইওর ক্লীভল্যান্ডের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বাদকদলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বাবাকে যখন ডাকা হয় তখন দাদু অনেক খুশি হয়েছিল। পরের বছরগুলোতেও বাবা, যিহোবার সাক্ষিদের অন্যান্য সম্মেলনের বাদকদলকে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
দাদুর বিচার ও জেল
প্যাটারসনের লবিতে আমি এবং পল বিভিন্ন ছবি দেখতে দেখতে পরের পৃষ্ঠায় দেওয়া ছবিটার কাছে আসি। ছবিটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমি চিনতে পারি কারণ প্রায় ৫০ বছর আগে দাদু আমাকে এর একটা কপি পাঠিয়েছিল। ছবিটার একেবারে ডান দিকে দাদু দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন স্বদেশপ্রেম তুঙ্গে তখন ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির প্রেসিডেন্ট জোসেফ এফ. রাদারফোর্ড (মাঝখানে বসা) সহ এই আটজন বাইবেল ছাত্রকে অন্যায়ভাবে জেলে ভরা হয়েছিল এবং জামিনে ছাড়া চাইলেও তাদেরকে ছাড়া হয়নি। শাস্ত্র অধ্যয়ন (ইংরেজি) বইয়ের সপ্তম খণ্ডের নাম দেওয়া হয়েছিল রহস্য সমাপ্ত হল আর এই বইয়ের কিছু কথার ওপর ভিত্তি করেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। এই বইয়ের কথাগুলোকে আমেরিকার সরকার ভুল বুঝেছিল, তারা মনে করেছিল যে এই বইয়ের প্রকাশকরা আমেরিকাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে না করছে।
অনেক বছর বসে চার্লস টেজ রাসেল শাস্ত্র অধ্যয়ন বইয়ের প্রথম ছয়টা খণ্ড লিখেছিলেন কিন্তু সপ্তম খণ্ড লেখার আগেই তিনি মারা যান। তাই, ভাই রাসেলের গবেষণা করা বিষয়গুলো দাদু এবং আরেকজন বাইবেল ছাত্রকে দেওয়া হয় আর তারা সেই সপ্তম খণ্ডটা লেখেন। ১৯১৭ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে এটা বের করা হয়। আদালতে দাদু ও সেইসঙ্গে বাকি প্রায় সবার বিরুদ্ধে চারটে অভিযোগ আনা হয় আর এর জন্য তাদেরকে ২০ বছরের সাজা দেওয়া হয়।
প্যাটারসনের লবিতে রাখা সেই ছবির নিচে লেখা আছে: “রাদারফোর্ড এবং তার সঙ্গীদের সাজা দেওয়ার নয় মাস পর যুদ্ধ শেষে ১৯১৯ সালের ২১শে মার্চ, আপীল আদালত জামিনে ছেড়ে দেওয়ার রায় দেয়। আর ২৬শে মার্চ, প্রত্যেকের জন্য ১০,০০০ ডলার জামিনে ব্রুকলিনে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর ১৯২০ সালের ৫ই মে, জে. এফ. রাদারফোর্ড এবং অন্যদের ওপর থেকে সব অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়।”
সাজা দেওয়ার পর কিন্তু আটলান্টার জর্জিয়ার জেলে পাঠানোর আগে, সেই আটজনকে কিছুদিন নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে রেমন্ড স্ট্রিট জেলে রাখা হয়। তারা যে কামরায় থাকত তার বর্ণনা দিয়ে দাদু লিখেছিল যে সেটা ৬ মিটার লম্বা এবং ৮ মিটার চওড়া ছিল আর “এত বেশি নোংরা ছিল যে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।” সে আরও লিখেছিল: “এক গাদা খবরের কাগজ দেখে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেও কিছুক্ষণ বাদেই তুমি বুঝতে পারবে যে এই খবরের কাগজগুলো আর এর সঙ্গে এক টুকরো সাবান ও একটা টাওয়ালই হল তোমার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার এবং মানসম্মান বাঁচানোর একমাত্র উপায়।”
এত কষ্টের মধ্যেও দাদুর কৌতুকবোধ কমেনি। কৌতুক করে সেই জেলকে দাদু “হোটেল ডি রেমন্ডি” নাম দিয়েছিল ও বলেছিল “আমার মেয়াদ শেষ হলেই আমি এই হোটেল ছেড়ে চলে আসব।” দাদু এর সামনের জায়গা সম্বন্ধেও লিখেছিল। একবার চুল আঁচড়ানোর জন্য সে একটু থামলে একজন পকেটমার তার পকেট থেকে ঘড়িটা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এ বিষয়ে দাদু লিখেছিল “ঘড়ির চেনটা ছিঁড়ে গিয়েছিল কিন্তু ঘড়িটাকে আমি পকেটমারের হাত থেকে উদ্ধার করেছিলাম।” ১৯৫৮ সালে আমি যখন ব্রুকলিন বেথেলে যাই তখন গ্র্যান্ট সুইটার, যিনি তখন ওয়াচ টাওয়ার সোসাইটির কোষাধ্যক্ষের সচিব ছিলেন, আমাকে তার অফিসে ডেকে পাঠান এবং সেই ঘড়িটা দেন। আমি এখনও সেটা যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
বাবার ওপর ছাপ ফেলে
১৯১৮ সালে দাদুকে যখন অন্যায়ভাবে জেলে দেওয়া হয় তখন বাবার বয়স ছিল মাত্র বার বছর। ঠাকুমা তখন বাড়িঘর তালা মেরে বাবাকে নিয়ে তার মা এবং তিন বোনের কাছে গিয়ে থাকতে শুরু করে। বিয়ের আগে ঠাকুমার পদবি ছিল আর্থার। আর্থার পরিবার খুব গর্ব করে বলত যে তাদেরই একজন আত্মীয় চেস্টার আ্যলেন আর্থার আমেরিকার ২১তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
দেশের বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে দাদুকে যখন লম্বা সাজা দেওয়া হয় তখন আর্থার পরিবার মনে করেছিল যে দাদু তাদের পরিবারের মানসম্মান ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। এই বিষয়টা আমার বাবার ওপর বড়রকমের ছাপ ফেলেছিল এবং সে মানসিক কষ্টের মধ্যে ছিল। আর এই কারণেই বাবা হয়তো ঘরে-ঘরে প্রচারে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিল।
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর, ঠাকুমা ও বাবাকে নিয়ে দাদু স্ক্রেনটনের কুইনসি স্ট্রিটের একটা বড় পাকা বাড়িতে গিয়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকেই ওই বাড়িটা এবং ঠাকুমার চিনামাটির বাসনকোসনের কথা আমি খুব ভাল করেই জানতাম। আমরা সেগুলোর নাম দিয়েছিলাম পবিত্র বাসনকোসন কারণ ঠাকুমা সেগুলো অন্য কাউকে ধুতে দিত না। ১৯৪৩ সালে ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর, পারিবারিক অনুষ্ঠানে মা মাঝে মাঝে সেগুলো ব্যবহার করত।
আরও বেশি করে রাজ্যের কাজ করা
আরেক দিন আমি প্যাটারসনের লবিতে রাখা ছবিগুলো দেখি। ছবি দেখতে দেখতে আমি সেই ছবিটার কাছে আসি, যেখানে ১৯১৯ সালে ওহাইওর সিডার পয়েন্টের সম্মেলনে ভাই রাদারফোর্ড বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। সেখানে তিনি সবাইকে আরও উদ্যোগ নিয়ে ঈশ্বরের রাজ্যের বিষয়ে প্রচার করতে ও সেই সম্মেলনে প্রকাশিত নতুন পত্রিকা স্বর্ণযুগ (ইংরেজি) লোকেদেরকে দিতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। দাদুকে এই পত্রিকার সম্পাদক করা হয়েছিল আর সেই কাজ সে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত করেছিল। ১৯৩৭ সালে, এই পত্রিকার নাম বদলে রাখা হয় সান্ত্বনা এবং ১৯৪৬ সালে আবার নাম পালটে রাখা হয় সচেতন থাক!
দাদু স্ক্রেনটনে নিজের বাড়িতে এবং প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দূরে ব্রুকলিনে ওয়াচ টাওয়ারের প্রধান অফিসে বসেই লেখার কাজ করত। সে দুসপ্তা নিজের বাড়িতে ও দুসপ্তা অফিসে কাজ করত। বাবা বলেছিল যে দাদু যখন ঘরে থাকত তখন প্রায়ই সে ভোর পাঁচটা থেকে দাদুর টাইপরাইটারের শব্দ শুনতে পেত। এত কাজের পরও দাদু নিয়মিত প্রচারে যেত। ছেলেদের জন্য সে একটা বড় ওয়েস্টকোট বানিয়েছিল যেটার ভেতরে বাইবেল ভিত্তিক বইপত্রিকা রাখার জন্য দুটো বড় পকেট ছিল। আমার মাসি নাওমি হাউয়েলের কাছে এখনও এইরকম একটা ওয়েস্টকোট আছে আর তার বয়স এখন ৯৪ বছর। এছাড়া, মেয়েদের জন্যও দাদু একটা বইয়ের ব্যাগ বানিয়েছিল।
একবার প্রচারে গিয়ে দাদু একজন গৃহকর্তার সঙ্গে বাইবেলের বিষয় নিয়ে খুব ভাল আলোচনা করে। আলোচনার পর দাদুর প্রচারের সঙ্গী দাদুকে বলেছিলেন: “সি. জে., তুমি একটা ভুল করেছ।”
দাদু জিজ্ঞেস করে “কী ভুল?” দাদু তার ওয়েস্ট কোটের পকেটগুলো চেক করে কিন্তু তার দুটো পকেটই খালি ছিল।
তিনি বলেন “তুমি তাকে স্বর্ণযুগ পত্রিকার গ্রাহক হওয়ার প্রস্তাব দিতে ভুলে গেছ।” সম্পাদক তার নিজের পত্রিকার কথাই ভুলে গেছে বলে তারা দুজনে অনেক হেসেছিল।
বড় হওয়ার স্মৃতিগুলো
আমার মনে আছে যে ছোটবেলায় দাদু আমাকে কোলে নিয়ে আমার ছোট্ট হাতটা তার হাতে নিয়ে “আঙুলের গল্প” বলত। সে “বুড়ো আঙুল” দিয়ে শুরু করে প্রত্যেকটা আঙুলের বিশেষ বিশেষ কাজের কথা বলত। এরপর সে খুব সাবধানে সবকটা আঙুল ভাঁজ করে মুঠো করত আর বলত: “একতাই বল।”
বিয়ের পর বাবামা ওহাইওর ক্লীভল্যান্ডে চলে যায় এবং সেখানে এড ও মেরি হপারের সঙ্গে তাদের খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই তাদের পরিবার বাইবেলের ছাত্র ছিলেন। এড আংকেল ও মেরি আন্টি বাবামার খুব কাছের বন্ধু ছিলেন। তারা তাদের একমাত্র মেয়েকে হারিয়েছিলেন তাই ১৯৩৪ সালে যখন আমি সেখানে আসি তখন আমিই তাদের আদরের “মেয়ে” হয়ে উঠি। এইরকম আধ্যাত্মিক পরিবেশে বড় হয়ে আমি আমার অষ্টম জন্মদিনের আগেই ঈশ্বরের কাছে নিজেকে উৎসর্গ করি এবং বাপ্তিস্ম নিই।
ছেলেবেলা থেকেই আমি রোজ বাইবেল পড়ি। যিশাইয় ১১:৬-৯ পদ ছিল আমার প্রিয় পদগুলোর মধ্যে একটা কারণ এখানে ঈশ্বরের নতুন জগৎ সম্বন্ধে বলা আছে। ১৯৪৪ সালে যখন আমেরিকার নিউ ইয়র্কে বাফেলো কনভেনশনে প্রথম আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড ভারসন বের হয় তখন আমি প্রথম পুরো বাইবেল পড়ার উদ্যোগ নিই। এই বাইবেল খুলে যখন আমি দেখেছিলাম যে “পুরাতন নিয়ম”-এ ৭,০০০ বার যিহোবার নাম দেওয়া হয়েছে তখন আমি কী যে খুশি হয়েছিলাম, তা বলে বোঝাতে পারব না!
ছুটির দিনগুলো আমরা খুব মজা করে কাটাতাম। বাবামা, এড আংকেল ও মেরি আন্টি আমাকে সঙ্গে নিয়ে দূরের গ্রামে প্রচার করতে যেতেন। আমরা দুপুরের খাবার সঙ্গে নিতাম এবং নদীর পাশে বসে খেতাম। এরপর আমরা ওই গ্রামের কারও খামারে যেতাম এবং আশেপাশের সমস্ত লোকেদের ডেকে এনে বাইবেলের বিষয় নিয়ে কথা বলতাম। যদিও আমাদের জীবন খুবই সাদাসিধে ছিল কিন্তু আমাদের পরিবারে অনেক সুখ ছিল। আমাদের পরিবারের বন্ধুদের মধ্যে অনেকে পরে ভ্রমণ অধ্যক্ষ হয়েছেন। এদের মধ্যে এড হপার, বব রেইনার এবং তার সঙ্গে তার দুই ছেলেও রয়েছে। রিচার্ড রেইনার, তার স্ত্রী লিন্ডার সঙ্গে এখনও সেই কাজ করে চলেছেন।
গরমের সময়টা সত্যিই খুব আনন্দে কাটত। সেই সময় আমি হাউয়েল ফার্মে আমার মাসতুতো বোনদের সঙ্গে থাকতাম। আমার এক মাসতুতো বোন গ্রেস, ১৯৪৯ সালে ম্যালকম আ্যলেনকে বিয়ে করে। তখন আমি ঘুণাক্ষরেও জানতাম না যে কয়েক বছর পর ম্যালকমের ছোট ভাইয়ের সঙ্গেই আমার বিয়ে হবে। আমার আরেক মামাতো বোন মেরিয়ান উরুগুয়েতে মিশনারি হিসেবে কাজ করত। ১৯৬৬ সালে সে হাউয়ার্ড হিলবর্নকে বিয়ে করে। অনেক বছর ধরে আমার এই দুই মামাতো-মাসতুতো বোন তাদের স্বামীদের সঙ্গে ব্রুকলিনের প্রধান কার্যালয়ে কাজ করছে।
আমার গ্র্যাজুয়েশন এবং দাদু
আমি যখন হাইস্কুলে পড়তাম তখন দাদু আমাকে সবসময় চিঠি লিখত। চিঠির সঙ্গে সে পরিবারের অনেক পুরনো ছবি পাঠাতো আর এর পেছনে পরিবারের ইতিহাস টাইপ করে লেখা থাকত। এভাবেই আমি তার কাছ থেকে আটজনের সেই ছবিটা পাই, যাদেরকে অন্যায়ভাবে জেলে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৫১ সালের শেষের দিকে, ক্যান্সারের কারণে দাদু কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। তখনও তার স্মৃতি শক্তি ভাল ছিল কিন্তু তার কথাগুলো বোঝানোর জন্য সে সেগুলো একটা ছোট্ট নোট বুকে লিখত যেটা সবসময় তার কাছে থাকত। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে হাইস্কুল থেকে আমার ডিপ্লোমা পাওয়ার কথা ছিল। ডিপ্লোমা দেওয়ার দিন ছাত্রছাত্রীদের পক্ষ থেকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমাকে বাছাই করা হয় আর তাই ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আমি আমার বক্তৃতার একটা খসড়া দাদুর কাছে পাঠিয়ে দিই। সেটাতে দাদু কিছু সংশোধন করে এবং শেষের পাতায় “দাদু খুবই খুশি” কথাগুলো লিখে আমাকে পাঠায়। এই কথাগুলো আমার মনকে ছুঁয়ে দিয়েছিল। ১৯৫১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর, ৮১ বছর বয়সে দাদু মারা যায়।a মলিন হয়ে যাওয়া সেই বক্তৃতাটা আমি এখনও যত্ন করে রেখে দিয়েছি, যার শেষের পাতায় দাদুর লেখা কথাগুলো আছে।
আমার গ্র্যাজুয়েশনের পর পরই আমি অগ্রগামীর কাজ শুরু করি, যিহোবার সাক্ষিরা এটাকে পূর্ণ-সময়ের প্রচার কাজ বলেন। ১৯৫৮ সালে, আমি নিউ ইয়র্কের সেই বড় সম্মেলনে যোগ দিই যেখানে ১২৩টা দেশ থেকে মোট ২,৫৩,৯২২ জন ব্যক্তি এসেছিলেন। ওই সম্মেলনে পুরো ইয়াংকি স্টেডিয়াম আর পোলো খেলার মাঠ কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল। সেখানে আফ্রিকা থেকে আসা একজন ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় যার লেপেল কার্ডে “উডওয়র্থ মিলস” নাম লেখা ছিল। প্রায় ৩০ বছর আগে দাদুর নামে ওই ভাইয়ের নাম রাখা হয়!
আমার উত্তরাধিকার পেয়ে আমি খুশি
আমার বয়স যখন ১৪ বছর তখন মা আবারও অগ্রগামীর কাজ শুরু করে। প্রায় ৪০ বছর মা অগ্রগামীর কাজ করে এবং ১৯৮৮ সালে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত সে অগ্রগামীর কাজ করছিল। আমার বাবাও যখনই সময় পেত অগ্রগামীর কাজ করত। মা মারা যাওয়ার নয় মাস আগে বাবা মারা যায়। যাদের আমরা স্টাডি করাতাম তারা আমাদের খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। তাদের ছেলেদের মধ্যে কেউ কেউ ব্রুকলিনের প্রধান কার্যালয়ে কাজ করছে এবং অন্যরা অগ্রগামীর কাজ করছে।
আমার কাছে ১৯৫৯ সাল ছিল এক বিশেষ বছর কারণ সেই বছরই পল আ্যলেনের সঙ্গে আমার দেখা হয়। গিলিয়েড স্কুল অর্থাৎ যিহোবার সাক্ষি মিশনারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ৭ম ক্লাশ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর, ১৯৪৬ সালে তাকে ভ্রমণ অধ্যক্ষ করা হয়। আমাদের যখন দেখা হয় তখন আমরা কেউই জানতাম না যে ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসেবে পলকে ওহাইওর ক্লীভল্যান্ডে পাঠানো হবে, যেখানে আমি অগ্রগামীর কাজ করতাম। বাবামা তাকে খুব পছন্দ করত। ১৯৬৩ সালে হাউয়েল ফার্মে আমাদের বিয়ে হয়। এড হপার আমাদের বিয়ের বক্তৃতা দেন আর ওই দিন আমাদের স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল।
পলের নিজের কোন গাড়ি ছিল না। তাই পলকে যখন ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসেবে ক্লীভল্যান্ড থেকে আরেক জায়গায় পাঠানো হয় তখন আমাদের সমস্ত মালপত্র আমার ছোট্ট গাড়িতে ভরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সোমবারগুলোতে যখন আমরা এক মণ্ডলী থেকে অন্য মণ্ডলীতে যেতাম তখন প্রায়ই ভাইবোনেরা আমাদের অবস্থা দেখার জন্য আমাদের কাছে আসত। সেই ছোট্ট গাড়িতে সুটকেস, ব্রিফকেস, ফাইল বাক্স, টাইপরাইটার এবং আরও অন্যান্য জিনিসপত্র বেঁধে নিয়ে যাওয়ার সময় এটাকে সারকাস বলে মনে হতো।
আমি ও পল জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছি এবং চলার পথে অনেক সুখের মুহূর্ত ছিল আবার অনেক সমস্যাও এসেছিল। কিন্তু, যিহোবার দেওয়া শক্তিতে আমরা সমস্ত বাধা কাটিয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছি। যিহোবাকে, পুরনো ও নতুন বন্ধুদের এবং দুজন দুজনকে ভালবেসে আমাদের দিনগুলো আনন্দে কেটেছে। পলের ট্রেনিংয়ের জন্য আমরা দুই মাস প্যাটারসনে কাটিয়েছিলাম আর এটাই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে বিশেষ সময়। যিহোবার পার্থিব সংগঠনকে খুব কাছ থেকে দেখে এটাকে সত্যিই ঈশ্বরের সংগঠন বলে মনে হয়েছিল। এই বিরাট সংগঠনের এক ক্ষুদ্র অংশ হতে পারা কতই না আনন্দের!
[পাদটীকা]
a ১৯৫২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি প্রহরীদুর্গ (ইংরেজি) এর ১২৮ পৃষ্ঠা দেখুন।
[২৫ পৃষ্ঠার চিত্র]
১৯৪১ সালে এড হপারের সঙ্গে সেন্ট লুইস কনভেনশনে, যেখানে আমি “সন্তান” বইয়ের একটা কপি পেয়েছিলাম
[২৬ পৃষ্ঠার চিত্র]
১৯৪৮ সালে দাদু
[২৬ পৃষ্ঠার চিত্র]
হাউয়েল ফার্মে বাবামার (মাঝখানে) বিয়ের সময়
[২৭ পৃষ্ঠার চিত্র]
আটজন বাইবেল ছাত্র, যাদেরকে মিথ্যা অভিযোগে ১৯১৮ সালে জেলে দেওয়া হয়েছিল (ডানদিকে দাদু দূরে দাঁড়িয়ে)
[২৯ পৃষ্ঠার চিত্র]
আমাদের সমস্ত জিনিসপত্র আমাদের ছোট্ট গাড়িতে ঢোকানো হয়
[২৯ পৃষ্ঠার চিত্র]
আমার স্বামী পলের সঙ্গে