কুষ্ঠরোগী হয়েও আমার জীবন—আনন্দপূর্ণ ও আধ্যাত্মিকভাবে আশীর্বাদপ্রাপ্ত
আইজা আদাগ্বোনা দ্বারা কথিত
আমি নাইজেরিয়ার আকুরেতে বড় হয়েছি। আমার পরিবার মিষ্টি আলু, কলা, কাসাভা ও কোকোর চাষ করত। আমার বাবা আমাকে বিদ্যালয়ে যেতে দিতে চাননি। তিনি আমাকে বলেছিলেন: “তুমি একজন কৃষক। তোমাকে কেউ কখনও মিষ্টি আলু চাষ করার জন্য পড়াশোনা করতে বলবে না।”
তথাপি, আমি পড়াশোনা শিখতে চেয়েছিলাম। আমি সন্ধ্যাবেলায় একটি ঘরের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতাম যেখানে এক গৃহশিক্ষক কিছু ছেলেমেয়েদের পড়াতেন আর আমি তা শুনতাম। সেটি ছিল ১৯৪০ সাল যখন আমার বয়স প্রায় ১২ বছর ছিল। যখন সেই ছেলেমেয়েদের বাবা আমাকে দেখতেন তখন তিনি চিৎকার করতেন ও আমাকে তাড়িয়ে দিতেন। তবুও আমি আবারও ফিরে আসতাম। কখনও কখনও শিক্ষক আসতেন না, আমি চোরের মত লুকিয়ে ঢুকতাম ও সেই ছেলেমেয়েদের সাথে তাদের বইগুলি দেখতাম। মাঝে মাঝে তারা আমাকে তাদের বইগুলি ধার দিত। আর এভাবে আমি পড়তে শিখেছিলাম।
আমি ঈশ্বরের লোকেদের সাথে যোগ দিই
একসময় আমি একটি বাইবেল পেয়েছিলাম আর শুতে যাওয়ার আগে নিয়মিতভাবে আমি সেটি পড়তাম। এক সন্ধ্যায় আমি মথি ১০ অধ্যায়টি পড়েছিলাম, যেটি দেখায় যে যীশুর শিষ্যেরা লোকেদের দ্বারা ঘৃণিত ও তাড়িত হবেন।
আমার স্মরণে ছিল যে যিহোবার সাক্ষীরা আমাদের ঘরে এসেছিলেন এবং তাদের সাথে খুব খারাপ আচরণ করা হয়েছিল। এটি আমার মনে দাগ কেটেছিল যে এরাই হয়ত সেই লোক যাদের সম্বন্ধে যীশু বলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই সাক্ষীরা সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন আর আমি তাদের কাছ থেকে একটি পত্রিকা পেয়েছিলাম। আমি যখন থেকে তাদের সাথে মেলামেশা করতে শুরু করি, আমি এক বিদ্রূপের পাত্র হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু লোকেরা যতই আমাকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করতেন, আমি ততই দৃঢ়প্রত্যয়ী ও আনন্দিত হয়ে উঠেছিলাম কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমি সত্য ধর্ম খুঁজে পেয়েছি।
যিহোবার সাক্ষীদের সম্বন্ধে যে বিষয়টি আমাকে প্রকৃতপক্ষে প্রভাবিত করেছিল তা হল আমার এলাকায় অন্যান্য ধর্মীয় দলগুলির বৈসাদৃশ্যে তারা স্থানীয় পৌত্তলিক ধর্মের প্রথা ও পরম্পরাগত রীতিনীতির সাথে তাদের উপাসনাকে সংযুক্ত করেননি। উদাহরণস্বরূপ, আমার পরিবার যদিও এংলিকান গির্জায় যেত, তবুও আমার বাবা ইয়োরুবা দেবতা ওগুনের উদ্দেশে একটি মন্দির রেখেছিলেন।
আমার বাবার মৃত্যুর পর, উত্তরাধিকারসূত্রে মন্দিরটি আমার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমি এটি চাইনি, যেহেতু আমি জানতাম যে বাইবেল প্রতিমাপূজাকে নিন্দা করে। যিহোবার সহায়তায় আমি আধ্যাত্মিকভাবে উন্নতি করেছিলাম আর ১৯৫৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি বাপ্তাইজিত হয়েছিলাম।
কুষ্ঠরোগ আঘাত করে
সেই বছরের প্রথমদিকে, আমি আমার পায়ে স্ফীতি ও অনুভূতিহীনতা লক্ষ্য করেছিলাম। উত্তপ্ত কয়লার উপরে পা রাখলেও আমি যন্ত্রণা বোধ করতাম না। কিছুদিন পর আমার কপাল ও ঠোঁটের উপরে রক্তাভ ক্ষত দেখা দিয়েছিল। আমি কিংবা আমার পরিবারও জানতেন না যে সমস্যাটি কী ছিল; আমরা ভেবেছিলাম এটি কোন চর্মরোগ। আমি সুস্থ হওয়ার জন্য ১২ জন ভেষজ চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলাম। পরিশেষে তাদের মধ্যে একজন আমাদের বলেছিলেন যে তা কুষ্ঠরোগ ছিল।
কী এক আকস্মিক আঘাতই না সেটি ছিল! আমি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলাম আর ভালভাবে ঘুমাতে পারতাম না। আমি দুঃস্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু বাইবেলের সত্য সম্বন্ধে আমার জ্ঞান ও যিহোবাতে নির্ভরতা আমাকে প্রত্যয়ের সাথে ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রাখতে সাহায্য করেছিল।
লোকেরা আমার মাকে বলতেন যে আমি যদি দৈববাণীজ্ঞাপকের কাছে গিয়ে বলি উৎসর্গ করি, তাহলে আমি সুস্থ হয়ে যাব। আমি যাইনি কারণ আমি জানি যে এইধরনের কাজ যিহোবাকে অসন্তুষ্ট করবে। এই বিষয়ে আমার মনের দৃঢ়তা বুঝতে পেরে আমার মায়ের বান্ধবীরা তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে একটি কোলা নাট নিয়ে সেটি আমার কপালে স্পর্শ করতে। তারপর তিনি সেই কোলা নাটটি আমার জন্য উৎসর্গ করতে ব্যবহার করার জন্য দৈববাণীজ্ঞাপকের কাছে প্রদান করতে পারেন। আমি তাকে বলেছিলাম যে আমি এতে কোন অংশ নিতে চাই না। পরিশেষে তিনি আমাকে পৌত্তলিক ধর্মে জড়িত করার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে, হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন।
আমি পরে যখন হাসপাতালে গিয়েছিলাম, কুষ্ঠরোগ তখন ইতিমধ্যেই গুরুতর অবস্থায় পৌঁছেছিল। আমার সমস্ত দেহে ক্ষত ছেয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে, তারা আমাকে ওষুধ দিয়েছিলেন আর ধীরে ধীরে আমার ত্বক স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছিল।
তারা ভেবেছিলেন আমি মৃত
আমার সমস্যা কিন্তু সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। আমার ডান পা গুরুতরভাবে সংক্রামিত হয়েছিল ফলে ১৯৬২ সালে সেটি কেটে ফেলতে হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর, চিকিৎসাগত জটিলতাগুলি দেখা দিয়েছিল। চিকিৎসকেরা আশা করেননি যে আমি বাঁচব। একজন শ্বেতবর্ণ মিশনারি যাজক শেষ আচারানুষ্ঠানসূচি পরিচালনা করার জন্য এসেছিলেন। আমি এতই দুর্বল ছিলাম যে কথা বলতে পারছিলাম না কিন্তু একজন সেবিকা তাকে বলেছিলেন যে আমি একজন যিহোবার সাক্ষী।
সেই যাজক আমাকে বলেছিলেন: “তুমি কি পরিবর্তিত হতে ও একজন ক্যাথলিক হতে চাও যাতে তুমি স্বর্গে যেতে পার?” সেটি আমাকে মনে মনে হাসতে বাধ্য করেছিল। উত্তর দেওয়ার জন্য শক্তি চেয়ে আমি যিহোবার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম। অনেক প্রচেষ্টার পর আমি বলতে পেরেছিলাম, “না!” যাজক পিছন ফিরে চলে গিয়েছিলেন।
আমার অবস্থা ততক্ষণে এতই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে হাসপাতালের কর্মচারীরা ভেবেছিলেন আমি মৃত। তারা আমার মুখ চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। যেহেতু একজন চিকিৎসক কিংবা সেবিকাকে প্রথমে নিশ্চিত করতে হত যে আমি মৃত তাই তারা আমাকে শবাগারে নিয়ে যাননি। সেই সময় সেখানকার দায়িত্বে কোন চিকিৎসক ছিলেন না আর সেবিকারা সবাই এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। তাই তারা আমাকে হাসপাতালের ওয়ার্ডে সারা রাত ফেলে রেখে গিয়েছিলেন। পরের দিন সকালে, চিকিৎসক যখন রোগীদের দেখতে আসেন সেই সময়েও আমার বিছানার কাছে কেউ আসেননি কারণ তখনও আমি ঢাকা অবস্থায় ছিলাম আর আমাকে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। পরিশেষে, কোন এক ব্যক্তি লক্ষ্য করেছিলেন যে চাদরের নিচে “শবদেহটি” নড়াচড়া করছিল!
যাইহোক, আমি আমার স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করেছিলাম আর ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে, তারা আমাকে দক্ষিণপশ্চিম নাইজেরিয়ার এবোকুটা কুষ্ঠ হাসপাতালের সেবালয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর আমি সেখানেই থেকে গিয়েছিলাম।
আমার প্রচারের ক্ষেত্রে বিরোধিতা
আমি যখন সেই সেবালয়ে গিয়েছিলাম সেখানে প্রায় ৪০০ জন কুষ্ঠরোগী ছিলেন আর আমিই ছিলাম একমাত্র সাক্ষী। আমি সোসাইটির কাছে লিখেছিলাম আর আকোমোজা মণ্ডলীকে আমার সাথে যোগাযোগ করার নির্দেশ দিয়ে তারা আমাকে অবিলম্বে উত্তর দিয়েছিলেন। তাই আমি কখনও ভাইদের সংস্পর্শ হারাইনি।
সেবালয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আমি প্রচার করতে শুরু করেছিলাম। স্থানীয় পুরোহিত সেই সম্বন্ধে খুশি ছিলেন না তাই তিনি আমার সম্বন্ধে শিবিরের ভারপ্রাপ্ত কল্যাণ কর্মকর্তার কাছে নালিশ করেছিলেন। জার্মানি থেকে আগত সেই কর্মকর্তা একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে আমার বাইবেল শিক্ষা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই কারণ আমার বিদ্যালয়ের শিক্ষা কিংবা তা করার কোন প্রশংসাপত্র ছিল না; যেহেতু আমি অশিক্ষিত ছিলাম তাই লোকেদের আমি ত্রুটিপূর্ণভাবে শিক্ষা দেব। আমি যদি দৃঢ়তার সাথে চালিয়ে যেতাম তাহলে তারা আমাকে সেই সেবালয় থেকে বের করে দিতে ও চিকিৎসাদানে অস্বীকার করতে পারতেন। তিনি আমাকে উত্তরে কোন কিছু বলার সুযোগ দেননি।
পরে তিনি একটি নির্দেশপত্র জারি করেছিলেন যে কোন ব্যক্তি আমার সাথে বাইবেল অধ্যয়ন করতে পারবেন না। ফলস্বরূপ, যারা আগ্রহ দেখিয়েছিলেন তারা আমার কাছে আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
প্রজ্ঞা ও পরিচালনা লাভের জন্য আমি এই বিষয়টি প্রার্থনায় যিহোবার কাছে উপস্থাপন করেছিলাম। পরের রবিবার, আমি সেই সেবালয়ের ব্যাপ্টিস্ট গির্জায় গিয়েছিলাম, যদিও আমি সেখানকার ধর্মীয় কার্যাবলিতে অংশগ্রহণ করিনি। সেই কার্যাবলিতে একটি নির্দিষ্ট সময় ছিল যখন উপস্থিত ব্যক্তিরা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারতেন। আমি আমার হাত উঠিয়েছিলাম ও জিজ্ঞাসা করেছিলাম: “যদি সকল ভাল লোকেরা স্বর্গে আর খারাপ লোকেরা অন্য কোন স্থানে যান তাহলে কেন যিশাইয় ৪৫:১৮ পদ বলে যে ঈশ্বর পৃথিবীকে বাসস্থানার্থে নির্মাণ করেছেন?”
তখন সেই মণ্ডলীর মধ্যে বেশ বিড়বিড় শব্দ শোনা গিয়েছিল। পরিশেষে, সেই মিশনারি পুরোহিত বলেছিলেন যে আমরা ঈশ্বরের পথসমূহ বুঝতে পারি না। ফলে, আমি নিজে শাস্ত্রাবলি পড়ার দ্বারা আমার নিজের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলাম যেখানে দেখায় যে ১,৪৪,০০০ জন স্বর্গে যাবেন, দুষ্টদের বিনষ্ট করা হবে আর ধার্মিক লোকেরা পৃথিবীতে চিরকাল বাস করবেন।—গীতসংহিতা ৩৭:১০, ১১; প্রকাশিত বাক্য ১৪:১, ৪.
সকলে সেই উত্তরে উপলব্ধি জানিয়ে হাততালি দিয়েছিলেন। এরপর সেই পুরোহিত বলেছিলেন: “আরেকবার হাততালি দিন কারণ এই ব্যক্তি প্রকৃতই বাইবেল জানেন।” সেই কার্যাবলির পর, কেউ কেউ আমার কাছে এসেছিলেন এবং বলেছিলেন: “আপনি পুরোহিতের চেয়ে অনেক বেশি জানেন!”
আমাকে বের করে দেওয়ার চাপ চলতে থাকে
এটি তাড়নার তীব্রতাকে কমিয়ে দিয়েছিল আর লোকেরা পুনরায় আমার সাথে বাইবেল অধ্যয়নে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে কিছু বিরোধীরা ছিলেন যারা আমাকে তাড়ানোর জন্য সেই কল্যাণ কর্মকর্তাকে চাপ দিয়েছিলেন। গির্জার কার্যাবলির প্রায় এক মাস পর, তিনি আমাকে ডেকেছিলেন এবং বলেছিলেন: “তুমি কেন প্রচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছ? আমার দেশে, লোকেরা যিহোবার সাক্ষীদের পছন্দ করেন না আর এখানেও একইরকম। কেন তুমি আমাকে সমস্যায় ফেলছ? তুমি কি জান না যে আমি তোমাকে বের করে দিতে পারি?”
আমি উত্তর দিয়েছিলাম: “মহোদয়, আমি আপনাকে তিনটি কারণে শ্রদ্ধা করি। প্রথমত, আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড় আর বাইবেল বলে যে আমাদের পক্বকেশদের শ্রদ্ধা করা উচিত। দ্বিতীয় যে কারণটির জন্য আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি তা হল আপনি এখানে আমাদের সাহায্য করার জন্য আপনার দেশ ত্যাগ করে এসেছেন। তৃতীয়ত, আপনি দয়ালু, উদার ও যারা চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছে তাদের সহায়তা করেন। কিন্তু কোন্ অধিকারে আপনি মনে করেন যে আপনি আমাকে বের করে দিতে পারেন? দেশের রাষ্ট্রপতি যিহোবার সাক্ষীদের বের করে দেন না। এই অঞ্চলের ঐতিহ্যগত শাসক আমাদের বের করে দেন না। আর যদিও আপনি আমাকে এই শিবির থেকে তাড়িয়ে দেন, যিহোবা আমার প্রতি যত্ন নেবেন।”
আমি এর আগে কখনও তার সাথে এভাবে সরাসরি কথা বলিনি আর আমি দেখতে পেয়েছিলাম যে এটি তাকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি কোন কথা না বলে চলে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে, কোন ব্যক্তি যখন তার কাছে আমার সম্বন্ধে অভিযোগ করতেন, তিনি হতাশ হয়ে উত্তর দিতেন: “আমি এইধরনের ব্যাপারে আর নিজেকে জড়াতে চাই না। আপনার যদি তার প্রচার নিয়ে কোন সমস্যা থাকে তাহলে এটি তার সাথে আলোচনা করুন!”
সাক্ষরতা দানের ক্লাস
যারা শিবিরের ব্যাপ্টিস্ট গির্জায় যোগ দিতেন তাদের কাছ থেকে ক্রমাগত আমার প্রচারে বিরোধিতা এসেছিল। সেই সময় আমার মাথায় একটি পরিকল্পনা এসেছিল। আমি কল্যাণ কর্মকর্তার কাছে গিয়েছিলাম এবং অনুরোধ করেছিলাম যে আমি একটি সাক্ষরতা ক্লাস স্থাপন করতে পারি কি না। আর তিনি যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে এইজন্য আমাকে কত অর্থ দিতে হবে, আমি তখন বলেছিলাম যে আমি বিনা বেতনে শিক্ষা দিতে চাই।
তারা একটি শ্রেণীকক্ষ, ব্ল্যাকবোর্ড ও চক্ দিয়েছিলেন আর এভাবে আমি কিছু সহসাথীদের পড়াশোনা শেখাতে শুরু করেছিলাম। প্রতি দিন আমাদের ক্লাস চলত। প্রথম ৩০ মিনিট, আমি পড়তে শেখাতাম, পরে আমি বাইবেল থেকে একটি গল্প বলতাম ও ব্যাখ্যা করতাম। তারপর আমরা বাইবেল থেকে কোন বিবরণ পড়তাম।
নিমোটা নামে একজন ছাত্রী ছিলেন। আধ্যাত্মিক বিষয়ে তার গভীর উৎসাহ ছিল আর তিনি মসজিদ ও গির্জা উভয় স্থানে ধর্মীয় প্রশ্নাবলি জিজ্ঞাসা করতেন। তিনি সেখানে তার প্রশ্নের উত্তর পাননি তাই তিনি আমার কাছে তা জিজ্ঞাসা করতে আসতেন। পরিশেষে, তিনি তার জীবন যিহোবার উদ্দেশে উৎসর্গ করেছিলেন ও বাপ্তাইজিত হয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালে আমরা বিয়ে করেছিলাম।
বর্তমানে আমাদের মণ্ডলীর অধিকাংশেরাই ওই সাক্ষরতার ক্লাস থেকে পড়তে ও লিখতে শিখেছিলেন। ওই ক্লাসের পরামর্শ প্রদানের প্রজ্ঞা আমার ছিল না। অবশ্যই যিহোবার আশীর্বাদ স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছিল। এরপর কেউই প্রচার করা থেকে আমাকে বিরত করার চেষ্টা করেননি।
শিবিরের ভিতর একটি কিংডম হল
নিমোটা ও আমার বিয়ের পর, আমরা চারজন প্রহরীদুর্গ অধ্যয়নের জন্য একত্রে মিলিত হতাম। প্রায় এক বছর ধরে আমরা একত্রে একটি কক্ষে মিলিত হতাম যেখানে কুষ্ঠরোগীদের ক্ষতগুলি ধুয়ে দেওয়া হত। পরে সেই কল্যাণ কর্মকর্তা যিনি তখন আমার বন্ধু হয়েছিলেন, আমাকে বলেছিলেন: “একটি চিকিৎসা কক্ষের ভিতরে তুমি ঈশ্বরের উপাসনা কর, এটা ঠিক নয়।”
তিনি বলেন যে আমরা একটি খালি কাঠমিস্ত্রীর ছাউনিতে একত্রিত হতে পারি। একসময় সেই ছাউনি একটি কিংডম হলে পরিণত হয়েছিল। ১৯৯২ সালে, শহরের ভাইদের সাহায্যে আমরা এটি সমাপ্ত করেছিলাম। ২৪ পৃষ্ঠার চিত্রটিতে যেমন আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, আমাদের হলটি প্লাস্টার ও রং করা হয়েছিল আর কংক্রীট মেঝে ও পাকাপোক্ত ছাদ, সব মিলে—একটি মজবুত ঘর।
কুষ্ঠরোগীদের কাছে প্রচার করা
৩৩ বছর ধরে কুষ্ঠরোগীর সেবালয়টিই আমার ক্ষেত্র হয়ে এসেছিল। কুষ্ঠরোগীদের কাছে প্রচার করতে কেমন লাগে? আফ্রিকার অধিকাংশ লোকেরা বিশ্বাস করেন যে সমস্তকিছু ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে। সুতরাং তারা যখন কুষ্ঠরোগের শিকার হতেন, তারা বিশ্বাস করতেন যে এর জন্য ঈশ্বরই কোন না কোনভাবে দায়ী। কেউ কেউ তাদের অবস্থার কারণে গভীরভাবে হতাশাগ্রস্ত ছিলেন। অন্যেরা ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন: “প্রেমময় ও করুণাময় ঈশ্বর সম্বন্ধে আমাদের কাছে বলবেন না। তাই-ই যদি সত্যি হত তাহলে এই অসুস্থতা থাকত না!” তখন আমরা যাকোব ১:১৩ পদটি পড়ি ও এর উপর যুক্তি দেখাই, যেখানে বলে: ‘মন্দ বিষয়ের দ্বারা ঈশ্বর . . . কাহারও পরীক্ষা করেন না।’ পরে আমরা ব্যাখ্যা করি যে যিহোবা কেন লোকেদের রোগভোগের জন্য অনুমোদন করেন এবং পরমদেশ পৃথিবীর জন্য তাঁর প্রতিজ্ঞা যেখানে কোন ব্যক্তি অসুস্থ হবেন না সেটি আমরা তুলে ধরি।—যিশাইয় ৩৩:২৪.
অনেকে সুসমাচারের প্রতি অনুকূলভাবে সাড়া প্রদান করেছেন। যখন থেকে আমি এই শিবিরে এসেছিলাম, যিহোবা আমাকে ৩০ জনের বেশি লোকেদের উৎসর্গ ও বাপ্তিস্মের জন্য সাহায্য করতে ব্যবহার করেছেন যারা সকলে কুষ্ঠরোগী। অনেকে সুস্থ হওয়ার পর তাদের ঘরে ফিরে গিয়েছেন আর কয়েকজন মারা গিয়েছেন। বর্তমানে আমাদের ১৮ জন রাজ্যের ঘোষণাকারী রয়েছেন এবং প্রায় ২৫ জন লোক নিয়মিতভাবে সভাগুলিতে যোগ দেন। আমাদের দুইজন প্রাচীন হিসাবে সেবা করেন আর আমাদের একজন পরিচারক দাস ও একজন নিয়মিত অগ্রগামী রয়েছেন। এই শিবিরে এখন অনেকে বিশ্বস্তভাবে যিহোবার সেবা করছেন তা দেখে আমি কতই না আনন্দিত! আমি যখন এখানে এসেছিলাম, আমি হয়ত একা থাকব বলে ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু যিহোবা আমাকে এক অপূর্বভাবে আশীর্বাদ করেছেন।
আমার ভাইদের সেবা করার আনন্দ
আমি ১৯৬০ সাল থেকে প্রায় গত পাঁচ বছর পর্যন্ত কুষ্ঠরোগের জন্য ওষুধ গ্রহণ করেছিলাম। মণ্ডলীর অন্যান্যদের মত, বর্তমানে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু কুষ্ঠরোগটি এর চিহ্ন রেখে গিয়েছে—আমি আমার পায়ের নিচের অংশ হারিয়েছি এবং আমি আমার হাতগুলি সোজা করতে পারি না—তবে রোগমুক্ত হয়েছি।
আমি যখন সুস্থ হয়েছিলাম তখন কেউ কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমি কেন শিবিরটি ছেড়ে ঘরে ফিরে যাইনি। আমার থেকে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু কারণ ছিল, তবে প্রধান কারণটি ছিল যে আমি আমার এখানকার ভাইদের ক্রমাগত সাহায্য করে চলতে চেয়েছিলাম। পরিবারের কাছে ফিরে গেলে তারা হয়ত আমাকে যা দিতে পারত, যিহোবার মেষেদের যত্ন নেওয়ার আনন্দ তাকে ছাপিয়ে গিয়েছে।
আমি এক কুষ্ঠরোগী এটি জানতে পারার আগে আমি যিহোবাকে জেনেছি বলে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। অন্যথায় আমি হয়ত নিজেকে শেষ করে দিতাম। সেই বছরগুলিতে অনেক বাধা ও সমস্যা হয়েছে কিন্তু ওষুধ আমাকে সেগুলি থেকে রক্ষা করেছে তা নয়—তিনি ছিলেন যিহোবা। আমি যখন অতীতের দিকে ফিরে তাকাই, আমি আনন্দিত; আর আমি যখন ঈশ্বরের রাজ্যের অধীনে ভবিষ্যতের বিষয় চিন্তা করি তখন আমি আরও বেশি আনন্দিত।
[২৫ পৃষ্ঠার বাক্স]
কুষ্ঠরোগের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি
এটি কী?
আধুনিক দিনের কুষ্ঠরোগের কারণ এমন একটি জীবাণু যেটি আরমাওয়ের হ্যানসেন কর্তৃক ১৮৭৩ সালে চিহ্নিত হয়েছিল। তার প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ, চিকিৎসকেরা কুষ্ঠরোগকে হ্যানসেনের রোগ বলেও উল্লেখ করেন।
জীবাণুগুলি মাংসপেশী, হাড়, চোখ ও নির্দিষ্ট অঙ্গগুলিকে ক্ষয় করে। প্রায়ই হাত ও পায়ের সংবেদনশক্তি লোপ পায়। প্রতিকার করা না হলে, রোগটি মুখমণ্ডল ও হাত বা পায়ের চরম অঙ্গহানির কারণ হতে পারে। কদাচিৎ এটি মৃত্যুর কারণও হয়।
কোন প্রতিকার আছে কি?
সামান্য কুষ্ঠগ্রস্ত লোকেরা কোন প্রকার চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হতে পারেন। অধিক গুরুতর ক্ষেত্রগুলি ওষুধের সাহায্যে প্রতিকার করা যায়।
সর্বপ্রথম ১৯৫০ দশকে কুষ্ঠরোগ প্রতিকারের ওষুধ তৈরি করা হয়েছিল যেটি খুব মন্থরগতিতে কাজ করত আর সেটি ক্রমান্বয়ে অকার্যকর হয়ে পড়ে কারণ কুষ্ঠরোগের জীবাণু এটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কার করা হয়েছিল এবং ১৯৮০ দশক থেকে মালটি-ড্রাগ থেরাপি (এমডিটি) বিশ্বব্যাপী আদর্শ চিকিৎসাপ্রণালীতে পরিণত হয়েছিল। এই চিকিৎসাটি তিনটি ওষুধের ব্যবহারকে যুক্ত করে—ডেপসোন, রিফেমপিসিন এবং ক্লোফাজাইমিন। এমডিটি জীবাণুগুলিকে ধ্বংস করলেও ইতিমধ্যে যা ক্ষয় হয়ে গিয়েছে এটি তা পূরণ করতে পারে না।
রোগ প্রতিকারের ক্ষেত্রে এমডিটি অত্যন্ত কার্যকারী। ফলস্বরূপ, কুষ্ঠরোগীদের সংখ্যা দ্রুতগতিতে ১৯৮৫ সালে ১.২ কোটি থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে ১৩ লাখে এসে নেমেছে।
এটি কতটা সংক্রামক?
কুষ্ঠরোগ অত্যন্ত সংক্রামক নয়; অধিকাংশ লোকেদের এই রোগকে প্রতিরোধ করার মত যথেষ্ট প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। যখন রোগসংক্রমণ ঘটে এটি সাধারণত সেই লোকেদের মধ্যে ছড়ায় যারা সংক্রামিত লোকেদের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে থাকেন।
মানব দেহে জীবাণুটি কিভাবে প্রবেশ করে সেই সম্বন্ধে চিকিৎসকেরা নিশ্চিতভাবে জানেন না কিন্তু তারা ধারণা করেন যে এটি ত্বক অথবা নাকের মাধ্যমে প্রবেশ করে।
ভবিষ্যৎ প্রত্যাশাগুলি
“সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে” ২০০০ সালের মধ্যে কুষ্ঠরোগকে নির্মূল করার লক্ষ্য স্থাপন করা হয়েছে। এর অর্থ হল যে কোন সম্প্রদায়ে কুষ্ঠরোগীদের সংখ্যা ১০,০০০ জনের মধ্যে ১ জনের বেশি অতিক্রম করবে না। ঈশ্বরের রাজ্যের অধীনে এটি সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হবে।—যিশাইয় ৩৩:২৪.
উৎসগুলি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা; কুষ্ঠ-প্রতিরোধী আন্তর্জাতিক যুগ্ম সংস্থাগুলি; আর ম্যানসন্স ট্রপিক্যাল ডিজিসেস, ১৯৯৬ সংস্করণ।
[২৭ পৃষ্ঠার বাক্স]
আজকেও কি কুষ্ঠরোগ বাইবেলের সময়ের মতই?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকগুলি আজকে কুষ্ঠরোগকে নির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে; রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুটির বৈজ্ঞানিক নাম হল মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি। অবশ্যই বাইবেল চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোন পাঠ্যপুস্তক নয়। বাইবেলের অনেক অনুবাদে “কুষ্ঠরোগ” হিসাবে অনুবাদিত ইব্রীয় ও গ্রীক শব্দগুলির আরও ব্যাপক অর্থ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাইবেলের সময়ের কুষ্ঠরোগে প্রত্যক্ষ করার মত লক্ষণের সৃষ্টি হত, কেবল মানুষের দেহেই নয় কিন্তু সেই সাথে বস্ত্র এবং গৃহেও, যা একটি জীবাণুর মাধ্যমে হয় না।—লেবীয় পুস্তক ১৩:২, ৪৭; ১৪:৩৪.
এছাড়াও আজকে মানুষের মধ্যে যে লক্ষণগুলিকে কুষ্ঠরোগের লক্ষণ বলে শনাক্ত করা হয়, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাইবেলের সময়ের কুষ্ঠরোগের বর্ণনার সাথে মেলে না। কেউ কেউ ধারণা করেন যে ব্যাখ্যাটি হয়ত এটি হতে পারে যে সময়ের প্রবাহে রোগের প্রকৃতিও পরিবর্তিত হয়। অন্যেরা মনে করেন যে বাইবেলে উল্লেখিত কুষ্ঠরোগ রোগের সীমাকে বর্ণনা করে, যেটি হয়ত এম লেপ্রি এর কারণে উৎপন্ন রোগকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে অথবা নাও করতে পারে।
নতুন নিয়মের ঈশ্বরতত্ত্বগত অভিধান (ইংরাজি) উল্লেখ করে যে কুষ্ঠরোগ হিসাবে অনুবাদিত ইব্রীয় ও গ্রীক উভয় শব্দই “একই রোগ অথবা একই গোত্রের রোগগুলিকে উল্লেখ করে . . . সেটি এখন আমরা যাকে কুষ্ঠরোগ বলি তাই-ই কি না সেই বিষয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু রোগটি সম্বন্ধে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট শনাক্তিকরণ আমাদের [যীশু ও তাঁর শিষ্যগণ কর্তৃক কুষ্ঠরোগীদের] আরোগ্যকরণের বিবরণ সম্বন্ধে আমাদের মূল্যায়নকে প্রভাবিত করে না।”
[২৪ পৃষ্ঠার চিত্র]
কুষ্ঠরোগীদের শিবিরে কিংডম হলের বাইরে মণ্ডলীটি
[২৬ পৃষ্ঠার চিত্র]
আইজা আদাগ্বোনা এবং তার স্ত্রী নিমোটা