যেহেতু মুক্তি সন্নিকট সাহস করুন
“তোমার উদ্ধারার্থে আমি তোমার সঙ্গে সঙ্গে আছি, ইহা সদাপ্রভু কহেন।”—যিরমিয় ১:১৯.
১, ২. কেন মানব পরিবারের মুক্তির প্রয়োজন আছে?
মুক্তি! কতই না সান্ত্বনাদায়ক এক শব্দ! মুক্তি পাওয়ার অর্থ হচ্ছে এক মন্দ, অসুখী পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়া, স্বাধীন হওয়া। এটি এক অধিকতর উত্তম, সুখী অবস্থায় নিয়ে আসার ধারণাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
২ এই সময়ে মানব পরিবারের এইরূপ মুক্তি কতই না ভীষণভাবে প্রয়োজন! সর্বত্রই লোকেরা ভারগ্রস্ত এবং কঠিন সমস্যাগুলির দ্বারা নিরুৎসাহিত—যেমন অর্থনৈতিক, সামাজিক, শারীরিক, মানসিক এবং আবেগগত। এক বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক, যেভাবে জগৎ চলছে তাতে অসন্তুষ্ট ও হতাশাগ্রস্ত এবং তারা অধিকতর উত্তম পরিস্থিতির জন্য একটি পরিবর্তন চায়।—যিশাইয় ৬০:২; মথি ৯:৩৬.
“বিষম সময় উপস্থিত হইবে”
৩, ৪. বর্তমানে কেন বৃহত্তর মুক্তির প্রয়োজন রয়েছে?
৩ যেহেতু এই বিংশ শতাব্দী যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট ভোগ করেছে, তাই পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন মুক্তির আরও অনেক বেশি প্রয়োজন আছে। আজকে, শত কোটি লোকেরা চরম দারিদ্রের মধ্যে বসবাস করে এবং এই সংখ্যা বছরে প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ করে বৃদ্ধি পায়। প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ শিশু অপুষ্টি অথবা অন্যান্য দরিদ্রতাজনিত কারণগুলির জন্য মারা যায়—দিনে ৩৫,০০০ এরও অধিক! আর লক্ষ লক্ষ বয়স্ক লোকেরা বিভিন্ন রোগের কারণে অকালে মারা যায়।—লূক ২১:১১; প্রকাশিত বাক্য ৬:৮.
৪ যুদ্ধ এবং সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলাগুলি অবর্ণনীয় কষ্টভোগের কারণ হয়েছে। সরকার দ্বারা মৃত্যু (ইংরাজি) নামক বইটি বলে যে যুদ্ধ, উপজাতিগত ও ধর্মীয় বিবাদ এবং তাদের নিজস্ব নাগরিকদের সরকারগুলির দ্বারা গণহত্যা, “এই শতাব্দীতে ২০ কোটি ৩০ লক্ষেরও অধিক লোকেদের হত্যা করেছে।” এটি আরও বলে: “প্রকৃতপক্ষে মৃতদের সংখ্যা প্রায় ৩৬ কোটি হতে পারে। এটি যেন এমন যে, আমাদের প্রজাতি এক আধুনিক প্লেগ-মহামারী দ্বারা বিধ্বস্ত হয়েছে। আর বাস্তবিকপক্ষে তা হয়েছে, তবে জীবাণু দ্বারা নয়, কিন্তু ক্ষমতার প্লেগ দ্বারা।” লেখক রিচার্ড হারউড লক্ষ্য করেছিলেন: “কিছু শতাব্দী পূর্বের বর্বর যুদ্ধগুলি তুলনামূলকভাবে খুবই তুচ্ছ লড়াই ছিল।”—মথি ২৪:৬, ৭; প্রকাশিত বাক্য ৬:৪.
৫, ৬. কী আমাদের সময়কে অত্যন্ত হতাশাজনক করে?
৫ এছাড়া সম্প্রতি বছরগুলির চরম দুর্দশাপূর্ণ অবস্থার সাথে দৌরাত্ম্যমূলক অপরাধ, অনৈতিকতা এবং পরিবারে ভাঙনও অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন শিক্ষা সচিব উইলিয়াম বিনেট মন্তব্য করেছিলেন যে ৩০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যা শতকরা ৪১ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু দৌরাত্ম্যমূলক অপরাধ শতকরা ৫৬০ ভাগ, অবৈধ জন্ম শতকরা ৪০০ ভাগ, বিবাহবিচ্ছেদ শতকরা ৩০০ ভাগ এবং কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যার হার শতকরা ২০০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রিনস্টেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ডিউলিয় জুনিয়র, কিশোর বয়সী “চতুর-লুণ্ঠনকারীদের” বৃদ্ধিরত হার সম্বন্ধে সতর্ক করেছিলেন যারা “হত্যা, আক্রমণ, ধর্ষণ, ডাকাতি, চুরি এবং গুরুতর সামাজিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। তারা গ্রেপ্তারের কলঙ্ক, বন্দীত্বের ব্যথা এবং বিবেকের যন্ত্রণাকে ভয় পায় না।” ঐ দেশে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়স্কদের মধ্যে পরস্পরকে হত্যা করা হল এখন মৃত্যুর দ্বিতীয়-মুখ্য কারণ। আর চার বছর বয়সের নিচে অধিক শিশুরা রোগের চেয়ে অপব্যবহারের কারণে মারা যায়।
৬ এইরূপ অপরাধ এবং দৌরাত্ম্য একটি দেশে সীমাবদ্ধ নয়। অধিকাংশ দেশগুলি অনুরূপ প্রবণতাগুলি সম্বন্ধে বিবৃতি দেয়। অবৈধ নেশাকর ওষুধের ব্যবহারের বৃদ্ধি এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে যা লক্ষ লক্ষ লোকেদের কলুষিত করে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড বলেছিল: “আন্তর্জাতিক নেশাকর ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় অস্ত্র ব্যবসার পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাপেক্ষা লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।” আরেকটি বিষয় হল দৌরাত্ম্য এবং অনৈতিকতা, যা এখন দূরদর্শনে পরিব্যাপ্ত। অনেক দেশে, একটি শিশু যখন ১৮ বছর বয়সে পৌঁছায়, সেই সময়ের মধ্যে সে দূরদর্শনে হাজার হাজার দৌরাত্ম্য এবং অগণিত অনৈতিক কাজগুলি দেখে থাকে। এটি হল এক তাৎপর্যপূর্ণ কলুষিত প্রভাব যেহেতু আমরা আমাদের মনকে নিয়মিত যা সরবরাহ করি, তার মাধ্যমে আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠিত হয়।—রোমীয় ১২:২; ইফিষীয় ৫:৩, ৪.
৭. বর্তমানের মন্দ অবস্থা সম্বন্ধে বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী কিভাবে ভাববাণী করেছিল?
৭ বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী যথার্থভাবেই আমাদের শতাব্দীর ঘটনাগুলির এই ভয়ঙ্কর প্রবণতা সম্বন্ধে ভাববাণী করেছিল। এটি বলেছিল যে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ, রোগের মহামারী, খাদ্যাভাব এবং অধর্মের বৃদ্ধি হবে। (মথি ২৪:৭-১২; লূক ২১:১০, ১১) আর যখন আমরা ২ তীমথিয় ৩:১-৫ পদে লিপিবদ্ধ ভবিষ্যদ্বাণীটি বিবেচনা করি, তখন এটি রাত্রিকালীন সংবাদ বিবৃতি শোনার মত। এটি আমাদের যুগকে ‘শেষ কাল’ হিসাবে শনাক্ত করে এবং লোকেদের ‘আত্মপ্রিয়, অর্থপ্রিয়, পিতামাতার অবাধ্য, অসাধু, স্নেহরহিত, অজিতেন্দ্রিয়, প্রচণ্ড, গর্ব্বান্ধ, ঈশ্বরপ্রিয় নয় বরং বিলাসপ্রিয়’ হিসাবে বর্ণনা করে। এটি প্রকৃতই আজকের জগৎ যেমন, সেইরকম। উইলিয়াম বিনেট যেমন স্বীকার করেছিলেন: “সভ্যতা ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার . . . অনেক চিহ্ন রয়েছে।” এমনকি এও বলা হয়ে থাকে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে সভ্যতা শেষ হয়ে গিয়েছে।
৮. নোহের দিনে কেন ঈশ্বর জলপ্লাবন এনেছিলেন এবং আমাদের দিনের সাথে এটি কিভাবে সম্পর্কযুক্ত?
৮ নোহের দিনের জলপ্লাবনের পূর্বে যখন “পৃথিবী দৌরাত্ম্যে পরিপূর্ণ ছিল,” তার চেয়ে পরিস্থিতি এখন এমনকি আরও মন্দ। তখন সাধারণভাবে লোকেরা তাদের মন্দ কাজের জন্য অনুতপ্ত হওয়াকে প্রত্যাখান করেছিল। তাই, ঈশ্বর বলেছিলেন: “তাহাদের দ্বারা পৃথিবী দৌরাত্ম্যে পরিপূর্ণ হইয়াছে; আর দেখ আমি . . . তাহাদিগকে বিনষ্ট করিব।” মহাপ্লাবন সেই দৌরাত্ম্যপূর্ণ জগৎকে শেষ করেছিল।—আদিপুস্তক ৬:১১, ১৩; ৭:১৭-২৪.
মনুষ্য দ্বারা মুক্তি নয়
৯, ১০. মুক্তি সরবরাহের জন্য কেন আমাদের মনুষ্যের প্রতি তাকান উচিত নয়?
৯ মনুষ্য প্রচেষ্টা কি এই মন্দ পরিস্থিতি থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে? ঈশ্বরের বাক্য উত্তর দেয়: “তোমরা নির্ভর করিও না রাজন্যগণে, বা মনুষ্য-সন্তানে, যাহার নিকটে ত্রাণ নাই।” “মনুষ্য চলিতে চলিতে আপন পাদবিক্ষেপ স্থির করিতে পারে না।” (গীতসংহিতা ১৪৬:৩; যিরমিয় ১০:২৩) সহস্রাধিক বছরগুলির ইতিহাস এই সত্যগুলিকে প্রমাণ করেছে। মনুষ্যেরা কল্পনাযোগ্য সর্বপ্রকারের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ব্যবস্থার চেষ্টা করেছে, কিন্তু অবস্থা মন্দতর হয়েছে। মানুষের দ্বারা যদি কোন সমাধান থাকত, তবে ইতিমধ্যে তা প্রমাণিত হত। পরিবর্তে, বাস্তব বিষয় হল যে “এক জন অন্যের উপরে তাহার অমঙ্গলার্থে কর্ত্তৃত্ব করে।”—উপদেশক ৮:৯; হিতোপদেশ ২৯:২; যিরমিয় ১৭:৫, ৬.
১০ কয়েক বছর পূর্বে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রেজিন্স্ক বলেছিলেন: “বিশ্ব প্রবণতাগুলির যে কোন নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের অপরিহার্য উপসংহারটি হল যে সামাজিক অশান্তি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর্থিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক সংঘর্ষ সম্ভবত আরও বিস্তৃত হবে।” তিনি আরও বলেছিলেন: “মানবতা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে তা [হল] বিশ্বব্যাপী অরাজকতা।” জগতের অবস্থার এই বিশ্লেষণ এমনকি আজকের দিনে অনেক বেশি বৈধ। এই যুগের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত দৌরাত্ম্যের উপর মন্তব্য করে, নিউ হেভেন, কানেটিকাট, রেজিস্টার এর একটি সম্পাদকীয় প্রবন্ধ ঘোষণা করেছিল: “নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এটি মনে হয় অনেক দূরে, এটিকে রোধ করার সামর্থের বাইরে চলে গেছে।” না, জগতের এই অবক্ষয় নিবৃত্ত হবে না, কারণ এই ‘শেষ কাল’ সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণীটি আরও বলেছিল: “দুষ্ট লোকেরা ও বঞ্চকেরা, পরের ভ্রান্তি জন্মাইয়া ও আপনারা ভ্রান্ত হইয়া, উত্তর উত্তর কুপথে অগ্রসর হইবে।”—২ তীমথিয় ৩:১৩.
১১. মানুষের চেষ্টার দ্বারা কেন মন্দতর অবস্থার পরিবর্তন হবে না?
১১ মনুষ্যেরা এই প্রবণতাগুলিকে পরিবর্তন করতে পারে না কারণ শয়তান হল “এই যুগের দেব।” (২ করিন্থীয় ৪:৪) হ্যাঁ, “সমস্ত জগৎ সেই পাপাত্মার মধ্যে শুইয়া রহিয়াছে।” (১ যোহন ৫:১৯; এছাড়াও দেখুন যোহন ১৪:৩০ পদ।) আমাদের দিন সম্পর্কে তাই বাইবেল যথাযথভাবে বলে: “পৃথিবী ও সমুদ্রের সন্তাপ হইবে; কেননা দিয়াবল তোমাদের নিকটে নামিয়া গিয়াছে; সে অতিশয় রাগাপন্ন, সে জানে, তাহার কাল সংক্ষিপ্ত।” (প্রকাশিত বাক্য ১২:১২) শয়তান জানে যে তার শাসন এবং তার জগৎ প্রায় শেষ হয়ে আসছে, তাই সে “গর্জ্জনকারী সিংহের” মত “কাহাকে গ্রাস করিবে, তাহার অন্বেষণ করিয়া বেড়াইতেছে।”—১ পিতর ৫:৮.
মুক্তি সন্নিকট—কাদের জন্য?
১২. কাদের জন্য মুক্তি সন্নিকট?
১২ পৃথিবীতে বৃদ্ধিরত কঠিন পরিস্থিতিগুলি হল লক্ষণীয় প্রমাণ যে এক বিরাট পরিবর্তন—বাস্তবিকপক্ষে, এক মহান মুক্তি—সন্নিকট! কাদের জন্য? মুক্তি তাদের জন্য নিকটে যারা সতর্ক সঙ্কেতগুলির প্রতি মনোনিবেশ করে এবং যারা যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অবশ্যই কী করতে হবে সে সম্বন্ধে প্রথম যোহন ২:১৭ পদ দেখায়: “জগৎ [শয়তানের বিধিব্যবস্থা] ও তাহার অভিলাষ বহিয়া যাইতেছে; কিন্তু যে ব্যক্তি ঈশ্বরের ইচ্ছা পালন করে, সে অনন্তকালস্থায়ী।” (বাঁকা অক্ষরে মুদ্রণ আমাদের।)—এছাড়াও ২ পিতর ৩:১০-১৩ পদ দেখুন।
১৩, ১৪. জেগে থাকার প্রয়োজনীয়তার উপর যীশু কিভাবে জোর দিয়েছিলেন?
১৩ যীশু ভাববাণী করেছিলেন যে আজকের কলুষিত সমাজ ক্লেশের সময়ে শীঘ্রই ধ্বংস হয়ে যাবে “যেরূপ জগতের আরম্ভ অবধি এ পর্য্যন্ত কখনও হয় নাই, কখনও হইবেও না।” (মথি ২৪:২১) সেইজন্য তিনি সতর্ক করেছিলেন: “আপনাদের বিষয়ে সাবধান থাকিও, পাছে ভোগপীড়ায় ও মত্ততায় এবং জীবিকার চিন্তায় তোমাদের হৃদয় ভারগ্রস্ত হয়, আর সেই দিন হঠাৎ ফাঁদের ন্যায় তোমাদের উপরে আসিয়া পড়ে; কেননা সেই দিন সমস্ত ভূতল-নিবাসী সকলের উপরে উপস্থিত হইবে। কিন্তু তোমরা সর্ব্বসময়ে জাগিয়া থাকিও এবং প্রার্থনা করিও, যেন এই যে সকল ঘটনা হইবে, তাহা এড়াইতে, . . . শক্তিমান্ হও।”—লূক ২১:৩৪-৩৬.
১৪ যারা ‘সাবধান থাকে’ এবং ‘জাগিয়া থাকে,’ তারা ঈশ্বরের ইচ্ছা কী তা অনুসন্ধান ও পালন করবে। (হিতোপদেশ ২:১-৫; রোমীয় ১২:২) এরাই হল সেই ব্যক্তি যারা শয়তানের ব্যবস্থার উপর যে ধ্বংস শীঘ্র আসতে যাচ্ছে তা ‘এড়াইতে শক্তিমান্’ হবে। আর তারা সম্পূর্ণ আস্থাশীল থাকতে পারে যে তারা মুক্তি পাবে।—গীতসংহিতা ৩৪:১৫; হিতোপদেশ ১০:২৮-৩০.
প্রধান মুক্তিদাতা
১৫, ১৬. প্রধান মুক্তিদাতা কে এবং কেন আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে তাঁর বিচার সকল ধার্মিক হবে?
১৫ ঈশ্বরের দাসেদের মুক্তি পেতে হলে, শয়তান ও তার বিশ্বব্যাপী সমগ্র বিধিব্যবস্থার অপসারণ করা প্রয়োজন। এইজন্য মুক্তির এমন এক উৎসের প্রয়োজন যা মনুষ্যের চেয়ে আরও অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন। সেই উৎস হলেন যিহোবা ঈশ্বর, সর্বোচ্চ সার্বভৌম, বিস্ময়কর নিখিলবিশ্বের সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা। তিনিই হলেন প্রধান মুক্তিদাতা: “আমি, আমিই সদাপ্রভু; আমি ভিন্ন আর ত্রাণকর্ত্তা নাই।”—যিশাইয় ৪৩:১১; হিতোপদেশ ১৮:১০.
১৬ যিহোবাতে চূড়ান্ত মাত্রায় শক্তি, প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার এবং প্রেম রয়েছে। (গীতসংহিতা ১৪৭:৫; হিতোপদেশ ২:৬; যিশাইয় ৬১:৮; ১ যোহন ৪:৮) সুতরাং যখন তিনি তাঁর বিচার সম্পাদন করবেন, আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে তাঁর কার্যধারা ধার্মিক হবে। অব্রাহাম জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “সমস্ত পৃথিবীর বিচারকর্ত্তা কি ন্যায়বিচার করিবেন না?” (আদিপুস্তক ১৮:২৪-৩৩) পৌল বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন: “ঈশ্বরে কি অন্যায় আছে? তাহা দূরে থাকুক।” (রোমীয় ৯:১৪) যোহন লিখেছিলেন: “হাঁ, হে প্রভু [“যিহোবা,” NW] ঈশ্বর, সর্ব্বশক্তিমান্, তোমার বিচারাজ্ঞা সকল সত্য ও ন্যায্য।”—প্রকাশিত বাক্য ১৬:৭.
১৭. কিভাবে যিহোবার অতীতকালের দাসেরা তাঁর প্রতিজ্ঞার উপর আস্থা প্রকাশ করেছিল?
১৭ যিহোবা যখন মুক্তির প্রতিজ্ঞা করেন, তখন তিনি তা বিনা ব্যর্থতায় সম্পন্ন করবেন। যিহোশূয় বলেছিলেন: “সদাপ্রভু . . . যে সকল মঙ্গলবাক্য বলিয়াছিলেন, তাহার মধ্যে একটী বাক্যও নিষ্ফল হইল না।” (যিহোশূয় ২১:৪৫) শলোমন বলেছিলেন: “তিনি . . . যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, সেই উত্তম প্রতিজ্ঞার একটী কথাও পতিত হয় নাই।” (১ রাজাবলি ৮:৫৬) প্রেরিত পৌল উল্লেখ করেছিলেন যে অব্রাহাম “অবিশ্বাস বশতঃ সন্দেহ করিলেন না; . . . নিশ্চয় জানিলেন, ঈশ্বর যাহা প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, তাহা সফল করিতে সমর্থও আছেন।” অনুরূপভাবে সারা “প্রতিজ্ঞাকারীকে [ঈশ্বরকে] বিশ্বাস্য জ্ঞান করিয়াছিলেন।”—রোমীয় ৪:২০, ২১; ইব্রীয় ১১:১১.
১৮. আজকের দিনে যিহোবার দাসেরা কেন আস্থাশীল হতে পারে যে তারা মুক্তি পাবে?
১৮ মনুষ্যদের বৈসাদৃশ্যে, যিহোবা সম্পূর্ণভাবে আস্থাবান, তাঁর বাক্যের প্রতি বিশ্বস্ত। “বাহিনীগণের সদাপ্রভু শপথ করিয়া বলিয়াছেন, অবশ্যই, আমি যেরূপ সঙ্কল্প করিয়াছি, তদ্রূপ ঘটিবে; আমি যে মন্ত্রণা করিয়াছি, তাহা স্থির থাকিবে।” (যিশাইয় ১৪:২৪) সুতরাং যখন বাইবেল বলে যে “ইহাতে জানি, প্রভু [“যিহোবা,” NW] ভক্তদিগকে পরীক্ষা হইতে উদ্ধার করিতে, এবং অধার্ম্মিকদিগকে দণ্ডাধীনে বিচারদিনের জন্য রাখিতে জানেন,” তখন আমরা পূর্ণ আস্থা রাখতে পারি যে এটি ঘটবে। (২ পিতর ২:৯) এমনকি যখন ক্ষমতাশালী শত্রুদের দ্বারা ধ্বংসের ভীতি প্রদর্শিত হয়, তখন তাঁর মনোভাবের জন্য যিহোবার দাসেরা সাহস রাখতে পারে, যা তাঁর ভাববাদীদের মধ্যে একজনের কাছে তাঁর প্রতিজ্ঞায় প্রতিফলিত হয়েছিল: “তাহারা তোমার সহিত যুদ্ধ করিবে, কিন্তু তোমাকে পরাজয় করিতে পারিবে না, কারণ তোমার উদ্ধারার্থে আমি তোমার সঙ্গে সঙ্গে আছি, ইহা সদাপ্রভু কহেন।”—যিরমিয় ১:১৯; গীতসংহিতা ৩৩:১৮, ১৯; তীত ১:২.
অতীতে মুক্তি প্রদান
১৯. যিহোবা কিভাবে লোটকে মুক্ত করেছিলেন এবং আমাদের সময়ে তার কী সাদৃশ্য থাকবে?
১৯ যিহোবার পূর্বের কিছু উদ্ধারকার্য পুনরালোচনা করার দ্বারা আমরা প্রচুর পরিমাণে উৎসাহিত হতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, লোট সদোম ও ঘমোরার দুষ্টতার দ্বারা “ক্লিষ্ট” হয়েছিলেন। কিন্তু যিহোবা ঐ নগরগুলির বিরুদ্ধে “ক্রন্দন” এর প্রতি মনোনিবেশ করেছিলেন। উপযুক্ত সময়ে, তিনি লোট ও তার পরিবারকে অবিলম্বে সেই এলাকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিতে বার্তাবাহকদের পাঠিয়েছিলেন। ফল কী হয়? যিহোবা “ধার্ম্মিক লোটকে উদ্ধার করিলেন,” “সদোম ও ঘমোরা নগর ভস্মীভূত” করলেন। (২ পিতর ২:৬-৮; আদিপুস্তক ১৮:২০, ২১) আজকের দিনেও, যিহোবা এই জগতের চরম দুষ্টতার বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্রন্দন লক্ষ্য করেন। যখন তাঁর আধুনিক-দিনের বার্তাবাহকেরা তিনি যতটা চান সেই পর্যন্ত তাদের জরুরী সাক্ষ্যের কাজ শেষ করবে, তখন তিনি এই জগতের বিরুদ্ধে কাজ করবেন এবং যেভাবে লোটের ক্ষেত্রে করেছিলেন সেভাবে তাঁর দাসেদের মুক্ত করবেন।—মথি ২৪:১৪.
২০. মিশর থেকে প্রাচীন ইস্রায়েলকে যিহোবার মুক্ত করা সম্বন্ধে বর্ণনা করুন।
২০ প্রাচীন মিশরে লক্ষ লক্ষ ঈশ্বরের লোকেরা বন্দীত্বে ছিল। যিহোবা তাদের সম্বন্ধে বলেছিলেন: “আমি . . . তাহাদের ক্রন্দনও শুনিয়াছি; . . . আমি তাহাদের দুঃখ জানি। আর . . . তাহাদিগকে উদ্ধার করিবার জন্য . . . নামিয়া আসিয়াছি।” (যাত্রাপুস্তক ৩:৭, ৮) কিন্তু, ঈশ্বরের লোকেদের যেতে দিয়ে, ফরৌণ তার মন পরিবর্তন করেছিলেন এবং তার শক্তিশালী সৈন্যদল নিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছিলেন। ইস্রায়েলীয়রা লোহিত সাগরে ফাঁদে পড়েছে বলে মনে হয়েছিল। তথাপি মোশি বলেছিলেন: “ভয় করিও না, সকলে স্থির হইয়া দাঁড়াও। সদাপ্রভু অদ্য তোমাদের যে নিস্তার করেন, তাহা দেখ।” (যাত্রাপুস্তক ১৪:৮-১৪) যিহোবা লোহিত সাগরকে বিভক্ত করেছিলেন এবং ইস্রায়েলীয়রা নিষ্কৃতি পেয়েছিল। ফরৌণের সৈন্যেরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছিল, কিন্তু যিহোবা তাঁর ক্ষমতাকে ব্যবহার করেছিলেন যার ফলে: “সমুদ্র তাহাদিগকে আচ্ছাদন করিল; তাহারা প্রবল জলে সীসাবৎ তলাইয়া গেল।” পরে, মোশি যিহোবার উদ্দেশ্যে এই বিজয় সংগীতটি গেয়েছিলেন: “কে তোমার ন্যায় পবিত্রতায় আদরণীয়, প্রশংসায় ভয়ার্হ, আশ্চর্য্য ক্রিয়াকারী?”—যাত্রাপুস্তক ১৫:৪-১২, ১৯.
২১. কিভাবে যিহোবার লোকেরা অম্মোন, মোয়াব এবং সেয়ীর থেকে রক্ষা পেয়েছিল?
২১ অন্য একটি ঘটনায়, শত্রু জাতি অম্মোন, মোয়াব ও সেয়ীর (ইদোম) যিহোবার লোকেদের ধ্বংসের দ্বারা ভীতি প্রদর্শন করেছিল। যিহোবা বলেছিলেন: “তোমরা ঐ বৃহৎ লোকসমারোহ [শত্রু] হইতে ভীত কি নিরাশ হইও না, কেননা এই যুদ্ধ তোমাদের নয়, কিন্তু ঈশ্বরের। . . . তোমাদিগকে যুদ্ধ করিতে হইবে না; . . . দাঁড়াইয়া থাক, আর তোমাদের সহবর্ত্তী সদাপ্রভু যে নিস্তার করিবেন, তাহা দেখ।” যিহোবা শত্রুদের সৈন্যসারিতে বিভ্রান্তি প্রদানের দ্বারা আঘাত করেন যাতে করে তারা একে অপরকে বধ করে, আর এইরূপে তাঁর লোকেদের তিনি মুক্ত করেন।—২ বংশাবলি ২০:১৫-২৩.
২২. অশূরীয়দের থেকে কোন্ অলৌকিক মুক্তি যিহোবা ইস্রায়েলীয়দের জন্য যুগিয়েছিলেন?
২২ যখন অশূরীয় বিশ্বশক্তি যিরূশালেমের বিরুদ্ধে এসেছিল, রাজা সন্হেরীব প্রাচীরের উপরের লোকেদের এই বলার দ্বারা যিহোবাকে বিদ্রূপ করেছিলেন: “ভিন্ন ভিন্ন দেশের সমস্ত দেবতার মধ্যে কোন্ দেবগণ আমার হস্ত হইতে আপনাদের দেশ উদ্ধার করিয়াছে? তবে সদাপ্রভু আমার হস্ত হইতে যিরূশালেমকে উদ্ধার করিবেন, ইহা কি সম্ভব?” ঈশ্বরের দাসেদের তিনি বলেছিলেন: “হিষ্কিয় এই কথা বলিয়া সদাপ্রভুতে তোমাদের বিশ্বাস না জন্মাউক যে, সদাপ্রভু আমাদিগকে নিশ্চয়ই উদ্ধার করিবেন।” তখন হিষ্কিয় মুক্তির জন্য ঐকান্তিকভাবে প্রার্থনা করেছিলেন, “তাহাতে পৃথিবীর সমস্ত রাজ্য জানিতে পারিবে যে, তুমি, কেবল মাত্র তুমিই সদাপ্রভু।” যিহোবা ১,৮৫,০০০ জন অশূরীয় সৈন্যকে বধ করেছিলেন এবং ঈশ্বরের দাসেরা মুক্ত হয়েছিল। পরবর্তীকালে, সন্হেরীব তার মিথ্যা দেবতাকে উপাসনা করার সময়ে, তার ছেলেরা তাকে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্বক হত্যা করেছিল।—যিশাইয় ৩৬ ও ৩৭ অধ্যায়।
২৩. আজকের দিনের মুক্তি সম্বন্ধে কোন্ প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন আছে?
২৩ আমরা নিশ্চিতভাবে সাহস রাখতে পারি যখন আমরা দেখি যে অতীতে যিহোবা কত আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর লোকেদের মুক্ত করেছিলেন। আজকের দিন সম্বন্ধে কী? শীঘ্রই কোন্ বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তাঁর বিশ্বস্ত দাসেরা আসবে যার জন্য তাঁর অলৌকিক মুক্তির প্রয়োজন হবে? তাদের মুক্তি নিয়ে আসতে কেন তিনি এখনও পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন? যীশুর বাক্যের কোন্ পরিপূর্ণতা হবে: “এ সকল ঘটনা আরম্ভ হইলে তোমরা ঊর্দ্ধ্বদৃষ্টি করিও, মাথা তুলিও, কেননা তোমাদের মুক্তি সন্নিকট”? (লূক ২১:২৮) ঈশ্বরের যে দাসেরা ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে তাদের জন্য কিভাবে মুক্তি আসবে? পরবর্তী প্রবন্ধটি এই প্রশ্নগুলিকে পরীক্ষা করবে।
পুনরালোচনার প্রশ্নগুলি
◻ কেন মুক্তির বিশেষ প্রয়োজন আছে?
◻ মুক্তির জন্য কেন আমাদের মনুষ্যের প্রতি তাকান উচিত নয়?
◻ কাদের জন্য মুক্তি সন্নিকট?
◻ যিহোবার মুক্তির প্রতি কেন আমরা আস্থাশীল হতে পারি?
◻ অতীতকালের মুক্তির কোন্ উদাহরণগুলি উৎসাহজনক?
[১০ পৃষ্ঠার চিত্র]
অব্রাহাম তাদের মধ্যে একজন ছিলেন যাদের যিহোবাতে পূর্ণ আস্থা ছিল