ঈশ্বরের প্রাচীন দাসেদের মধ্যে নারীদের মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা
“সদাপ্রভু ঈশ্বর কহিলেন, মনুষ্যের একাকী থাকা ভাল নয়, আমি তাহার জন্য তাহার অনুরূপ [পরিপূরক, NW] সহকারিণী নির্ম্মাণ করি।”—আদিপুস্তক ২:১৮.
১. একটি বাইবেল অভিধান কিভাবে প্রাচীন কালের নারীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে বর্ণনা দেয়?
“প্রাচীন ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলের দেশগুলিতে অথবা প্রাচ্যের নিকটবর্তী অঞ্চলগুলিতে কোথাও নারীদের স্বাধীনতা ছিল না, যা তারা আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজে পেয়ে থাকে। তখনকার সাধারণ পরিস্থিতি ছিল যে নারীরা পুবুষের অধীনে থাকবে, ঠিক যেমন ক্রীতদাসেরা স্বাধীন ব্যক্তিদের এবং যুবকেরা বৃদ্ধদের অধীনস্থ ছিল। . . . ছেলে শিশুদের মেয়ে শিশুদের থেকে বেশি সম্মান দেখান হত এবং শিশু বালিকাদের কখনও কখনও কোন যত্ন ছাড়াই মরবার জন্য ছেড়ে দেওয়া হত।” একটি বাইবেল অভিধান প্রাচীনকালের নারীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে এটিই ব্যক্ত করে।
২, ৩. (ক) একটি রিপোর্ট অনুসারে আজকের বহু নারীদের পরিস্থিতি কেমন? (খ) কী কী প্রশ্ন ওঠে?
২ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আজ পরিস্থিতি এর থেকে ভাল নয়। এই প্রথমবার ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্য দপ্তর নারীদের প্রতি আচরণের উপর মনোনিবেশ করে মানব অধিকারের বার্ষিক রিপোর্টটি পেশ করে। নিউ ইয়র্ক টাইমস্ পত্রিকার শিরোনামে এই রিপোর্ট সম্পর্কে জানায় যে, “১৯৩টি দেশের তথ্য সকলের বিশ্লেষণ দেখায় যে দৈনন্দিন জীবনে পক্ষপাতিত্ব হল বাস্তব ঘটনা।”
৩ যেহেতু বিভিন্ন পটভূমিকা থেকে আগত বহু নারী আজ পৃথিবীব্যাপী যিহোবার লোকেদের মণ্ডলীতে মেলামেশা করে, তাই কিছু প্রশ্ন থেকে যায়: এখানে যে ধরনের আচরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, নারীদের জন্য কি ঈশ্বরের এমন আদি পরিকল্পনা ছিল? বাইবেলের সময়ে যিহোবার উপাসকদের মধ্যে নারীদের প্রতি কিরূপ ব্যবহার করা হত? আর বর্তমানে নারীদের প্রতি কিরূপ ব্যবহার করা উচিত?
একজন “সহকারিণী” এবং “পরিপূরক”
৪. প্রথম পুরুষকে এদন উদ্যানে একাকী কিছু সময় থাকতে দেওয়ার পর যিহোবা কী লক্ষ্য করেন এবং তারপর ঈশ্বর কী করেন?
৪ এদন উদ্যানে বেশ কিছু দিন আদমের অতিবাহিত হওয়ার পরে যিহোবা লক্ষ্য করেন: “মনুষ্যের একাকী থাকা ভাল নয়, আমি তাহার জন্য তাহার পরিপূরক সহকারিণী নির্ম্মাণ করি।” (আদিপুস্তক ২:১৮) এমনকি যদিও আদম একজন সিদ্ধ মানুষ ছিলেন, তবুও সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য সম্পাদন করার জন্য আরও কিছুর প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজনকে পরিপূর্ণ করার জন্য যিহোবা নারীকে সৃষ্টি করে প্রথম বিবাহটি সম্পন্ন করেছিলেন।—আদিপুস্তক ২:২১-২৪.
৫. (ক) ইব্রীয় বিশেষ্য পদ “সহকারিণী”-কে বাইবেল লেখকেরা প্রায়ই কিভাবে ব্যবহার করেছিলেন? (খ) যিহোবা প্রথম নারীটিকে “পরিপূরক” বলার দ্বারা কী বোঝাতে চেয়েছিলেন?
৫ “সহকারিণী” এবং “পরিপূরক” শব্দ দুটি কি ইঙ্গিত দেয় যে ঈশ্বর-নিযুক্ত নারীর ভূমিকা খুব হীন ছিল? ঠিক তার বিপরীত। বাইবেল লেখকেরা “সহকারিণী” বুঝাতে প্রায়ই ঈশ্বরের প্রতি ইব্রীয় বিশেষ্যপদ (ইজার) ব্যবহার করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, যিহোবা প্রমাণ দিয়েছেন যে তিনি “আমাদের সহায় [“সহকারী,” NW] ও আমাদের ঢাল।” (গীতসংহিতা ৩৩:২০; যাত্রাপুস্তক ১৮:৪; দ্বিতীয় বিবরণ ৩৩:৭) হোশেয় ১৩:৯ পদে যিহোবা এমনকি নিজেকে ইস্রায়েলের “সহায়” [“সহকারী,” NW] বলেছেন। আর ইব্রীয় শব্দ (নেগেধ) যাকে “পরিপূরক” বলা হয়েছে, সে বিষয়ে একজন বাইবেল পণ্ডিত ব্যাখ্যা দেন: “যে সাহায্যের জন্য বলা হচ্ছে তা শুধুমাত্র দৈনন্দিন কাজের সহায়তার কথা অথবা সন্তান উৎপাদন করা নয় . . . কিন্তু সঙ্গীরূপে একে অপরকে যে সাহায্য করা, তাকে বুঝায়।”
৬. নারীকে সৃষ্টি করার পর কী বলা হয়েছিল এবং কেন?
৬ সুতরাং যিহোবা যখন নারীকে “সহকারিণী” এবং “পরিপূরক” বলে বর্ণনা করেছিলেন, তখন তিনি তাদের কোনভাবেই হীন করে দেখেননি। সেই নারীর নিজস্ব স্বতন্ত্র মানসিক, অনুভূতিসূচক এবং শারীরিক গঠনপ্রণালী ছিল। সে ছিল একজন সমকক্ষ প্রতিরূপ, একজন মানুষের উপযুক্ত পরিপূরক। প্রত্যেকেই ছিল ভিন্ন প্রকৃতির, অথচ সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য অনুসারে পৃথিবীকে “পরিপূর্ণ” করার জন্য তাদের প্রত্যেকেরই প্রয়োজন ছিল। এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান ছিল যে পুরুষ এবং নারী, উভয়কে সৃষ্টি করার পরেই “ঈশ্বর আপনার নির্ম্মিত বস্তু সকলের প্রতি দৃষ্টি করিলেন, আর দেখ, সে সকলই অতি উত্তম।”—আদিপুস্তক ১:২৮, ৩১.
৭, ৮. (ক)এদনে পাপ প্রবর্তিত হওয়ার পরে, কিভাবে নারীদের ভূমিকা প্রভাবিত হয়েছিল? (খ) আদিপুস্তক ৩:১৬ পদের পরিপূর্ণতা সম্বন্ধে যিহোবার উপাসকদের মধ্যে কী কী প্রশ্ন তোলে?
৭ পাপ করার পরেই, পুরুষ এবং নারী, উভয়ের ক্ষেত্রেই ঘটনা সকল বদলাতে থাকে। যিহোবা তাদের উভয়কেই পাপী বলে সাব্যস্ত করেছিলেন। যিহোবা হবাকে বলেছিলেন, “আমি তোমার গর্ব্ভবেদনা অতিশয় বৃদ্ধি করিব,” অর্থাৎ তার কৃত পাপের ফল তাকে ভোগ করতে হবে, এটাই বোঝাতে চাইছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন: “তুমি বেদনাতে সন্তান প্রসব করিবে; এবং স্বামীর প্রতি তোমার বাসনা থাকিবে; ও সে তোমার উপরে কর্ত্তৃত্ব করিবে।” (আদিপুস্তক ৩:১৬) সেই সময় থেকেই তাদের স্বামীদের দ্বারা প্রায়ই অত্যন্ত রূঢ়ভাবে বহু স্ত্রীদের উপরে প্রভুত্ব করা শুরু হয়েছে। তাদের সহকারিণী এবং পরিপূরকরূপে মূল্য দেওয়ার পরিবর্তে তাদের প্রতি প্রায়ই পরিচারিকা অথবা কৃতদাসীর মত আচরণ করা হয়েছে।
৮ তাহলে, আদিপুস্তক ৩:১৬ পদের পরিপূর্ণতা যিহোবার নারী উপাসকদের জন্য কী অর্থ রাখে? তাদের কি অবজ্ঞা এবং অপমান করে নিম্ন শ্রেণীতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে? অবশ্যই না! কিন্তু বাইবেলের সেই সব প্রথা এবং অভ্যাসগুলি যা নারীদের সাথে সম্পর্কযুক্ত, সেই সব বিবরণ সম্পর্কে কী বলা যায়, যা হয়ত বর্তমান দিনে বিশেষ কিছু সমাজে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে হয়?
বাইবেলের প্রথাগুলিকে বুঝতে পারা
৯. যখন আমরা বাইবেলের সময়ের নারীদের সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রথাগুলির কথা বিবেচনা করি, তখন কোন্ তিনটি জিনিস আমাদের মনে রাখা উচিত?
৯ বাইবেলের সময়ে ঈশ্বরের দাসেদের মধ্যে নারীদের প্রতি উত্তম আচরণ দেখান হত। অবশ্যই, তখনকার দিনে নারীদের কেন্দ্র করে প্রথাগুলির বিষয়ে বিবেচনা করার সময়ে আমাদের বেশ কিছু বিষয় স্মরণে রাখা সাহায্যকারী। প্রথমত, বাইবেল যখন বলে যে দুষ্ট লোকেদের পৈশাচিক কর্তৃত্বের ফলে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল, তখন তার অর্থ এটা ছিল না যে ঈশ্বর নারীদের প্রতি সেই আচরণকে অনুমোদন করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, যদিও যিহোবা কিছু প্রথাকে স্বল্পকালের জন্য তার দাসেদের মধ্যে চলতে দিয়েছিলেন, তবুও তিনি নারীদের রক্ষা করার জন্য সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। তৃতীয়ত, আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে আমরা যেন আধুনিক মানগুলির দ্বারা প্রাচীন প্রথাগুলির বিচার না করি। কিছু প্রথা হয়ত আজকের দিনের লোকেদের কাছে খারাপ লাগতে পারে যা তখনকার দিনে নারীদের কাছে সেগুলি হীন বলে দেখা হত না। আসুন আমরা এবিষয়ে কিছু দৃষ্টান্ত বিবেচনা করে দেখি।
১০. বহুগামিতার অভ্যাসকে যিহোবা কিভাবে দেখেছিলেন এবং কী ইঙ্গিত দেয় যে তিনি কখনও এক বিবাহের আদি মানকে পরিত্যাগ করেননি?
১০ বহুগামিতা:a যিহোবার আদি উদ্দেশ্য অনুসারে একজন স্ত্রীর তার স্বামীকে অন্য নারীর সাথে সম্পর্ক রাখতে দেওয়া উচিত নয়। ঈশ্বর আদমের জন্য শুধুমাত্র একটিই স্ত্রী সৃষ্টি করেছিলেন। (আদিপুস্তক ২:২১, ২২) এদনে বিদ্রোহের পর বহুগামিতার প্রচলন প্রথম শুরু হয় কয়িনের বংশে। কালক্রমে তা একটি প্রথায় পরিণত হয় এবং কিছু যিহোবার উপাসকদের দ্বারা তা গৃহীত হয়। (আদিপুস্তক ৪:১৯; ১৬:১-৩; ২৯:২১-২৮) যদিও যিহোবা বহুগামিতাকে থাকতে দিয়েছিলেন এবং তা ইস্রায়েলের জনসংখ্যা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করেছিল, কিন্তু তিনি সেই প্রথাকে নিয়ন্ত্রণ করে নারীদের প্রতি বিবেচনা দেখিয়েছিলেন যাতে স্ত্রীরা এবং তাদের শিশুরা রক্ষা পায়। (যাত্রাপুস্তক ২১:১০, ১১; দ্বিতীয় বিবরণ ২১:১৫-১৭) এছাড়াও, যিহোবা কখনও তাঁর এক বিবাহের আদি মানকে পরিত্যাগ করেননি। নোহ এবং তার ছেলেরা যাদের ‘বহুবংশ এবং পৃথিবী পরিপূর্ণ করতে’ পুনর্বার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা সকলেই একগামী ছিলেন। (আদিপুস্তক ৭:৭; ৯:১; ২ পিতর ২:৫) ঈশ্বর নিজেকে একজন একগামী স্বামীরূপে বর্ণনা করেছিলেন যখন তিনি ইস্রায়েল জাতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে চিত্রিত করছিলেন। (যিশাইয় ৫৪:১, ৫) তারপর, এক বিবাহ সম্পর্কে ঈশ্বরের আদি মান যীশু খ্রীষ্টের দ্বারাও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রাথমিক খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীতে তা অভ্যাস করা হত।—মথি ১৯:৪-৮; ১ তীমথিয় ৩:২, ১২.
১১. বাইবেলের সময়ে কনের মূল্য কেন দেওয়া হত এবং তা কি নারীদের হীন চোখে দেখত?
১১ কনের মূল্যদান করা: পুস্তক প্রাচীন ইস্রায়েল—তার জীবন এবং প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-কানন (ইংরাজি) জানায়: “কনের পরিবারকে টাকা অথবা তার সমতুল্য কিছু দেওয়ার প্রথা ইস্রায়েলীয়দের বিবাহকে বাহ্যিকভাবে কেনাবেচার পর্যায়ে ফেলেছিল। কিন্তু এই [কনের মূল্যদান] মনে হয় না যে ততটা পরিমাণ টাকা কনের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে দেওয়া হত। (বাঁকা অক্ষরে মুদ্রন আমাদের) সুতরাং এই কনের মূল্যদান কনের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে দেওয়া হত, তার কাজের ক্ষয়ক্ষতি এবং তার পরিবার তত্ত্বাবধানের জন্য যা ব্যয় করেছে তার জন্য। তার পরিবারের কাছে তাকে হীন করার পরিবর্তে এই মূল্যদান তার পরিবারকে কনের মূল্য দেয়।—আদিপুস্তক ৩৪:১১, ১২; যাত্রাপুস্তক ২২:১৬; প্রহরীদুর্গ (ইংরাজি), জানুয়ারি ১৫, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ২১-৪ দেখুন।
১২. (ক) শাস্ত্রের সময়ে কিভাবে বিবাহিত নারী ও পুরুষদের উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই অভিব্যক্তিগুলি কি নারীদের প্রতি হীন ছিল? (খ) এদনে যিহোবা যে আখ্যাগুলি ব্যবহার করেছিলেন তা উল্লেখযোগ্য কেন? (পাদটীকা দেখুন।)
১২ “অধিকারী” হিসাবে স্বামীরা: প্রায় সা.শ.পূ. ১৯১৮ সালে অব্রাহাম এবং সারার জীবনের একটি ঘটনা ইঙ্গিত করে যে তাদের সময়ে স্পষ্টত একজন বিবাহিত পুরুষকে “অধিকারী” (ইব্রীয়, বাল) এবং একজন বিবাহিতা নারীকে ‘অধিকার’ (ইব্রীয় বিউলা) রূপে দেখা প্রথা হয়ে গিয়েছিল। (দ্বিতীয় বিবরণ ২২:২২) এই উক্তিগুলিই তার পরবর্তী সময়কাল হতে শাস্ত্রে ব্যবহৃত হতে থাকে এবং এমন কোন ইঙ্গিত পাওয়া যায় না যে প্রাক-খ্রীষ্টীয় সময়ে নারীরা এগুলিকে অপমানকর বলে মনে করত না।b (দ্বিতীয় বিবরণ ২২:২২) যদিও স্ত্রীদের একখণ্ড সম্পত্তি মনে করে আচরণ করা উচিত নয়। সম্পত্তি অথবা সম্পদ কেনা, বেচা এবং উত্তরাধিকার হওয়া যেতে পারত, কিন্তু স্ত্রীর ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য ছিল না। “বাটী ও ধন পৈত্রিক অধিকার,” একটি বাইবেলের প্রবাদ বলে, “কিন্তু বুদ্ধিমতী স্ত্রী সদাপ্রভু হইতে পাওয়া যায়।”—হিতোপদেশ ১৯:১৪; দ্বিতীয় বিবরণ ২১:১৪.
একটি মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা
১৩. যখন ঈশ্বরভীরু লোকেরা যিহোবার উদাহরণ অনুসরণ করে এবং তাঁর আজ্ঞা মেনে চলে, তখন নারীদের প্রতি কী পরিণাম হয়?
১৩ প্রাক্-খ্রীষ্টীয় সময়ে ঈশ্বরের দাসেদের মাঝে নারীদের কী ভূমিকা ছিল? তাদের কী চোখে দেখা হত এবং তাদের প্রতি কেমন ব্যবহার করা হত? সরল ভাষায় বলতে গেলে, যখন ঈশ্বরভীরু পুরুষেরা যিহোবার উদাহরণকে অনুসরণ করত এবং তার আইন মেনে চলত, তখন নারীরা তাদের মর্যাদা পেত এবং বহু অধিকার ও সুযোগ সুবিধা উপভোগ করত।
১৪, ১৫. কোন্ জিনিস থেকে বোঝা যায় যে ইস্রায়েলে নারীদের সম্মান দেওয়া হত এবং কেন যিহোবা সঠিকরূপে তাঁর পুরুষ উপাসকদের কাছ থেকে সম্মান আশয়য়া করতে পারতেন?
১৪ নারীদের সম্মান করা কর্তব্য। ইস্রায়েল জাতির প্রতি ঈশ্বরের আইন আদেশ দিয়েছিল যে পিতা ও মাতা উভয়কেই সম্মান জানান উচিত। (যাত্রাপুস্তক ২০:১২; ২১:১৫, ১৭) “তোমরা প্রত্যেকে মাতাকে ও আপন আপন পিতাকে ভয় করিও,” লেবীয়পুস্তক ১৯:৩ পদ বলে। একবার যখন বৎশেবা তার সন্তান শলোমনের দিকে এগিয়ে যায়, তৎক্ষণাৎ সম্মানের খাতিরে “রাজা তাঁহার সম্মুখে উঠিয়া তাঁহার কাছে প্রণিপাত করিলেন।” (১ রাজাবলি ২:১৯) এনসাইক্লোপিডিয়া জুডাইকা জানায়: “ইস্রায়েলের প্রতি ঈশ্বরের প্রেম ভাববাণীমূলকভাবে স্ত্রীদের প্রতি স্বামীদের প্রেম তুলনা করলে দেখা যায় যে তা শুধুমাত্র সেই সমাজেই করা সম্ভব, যে সমাজে নারীদের প্রতি সম্মান দেখান হয়।”
১৫ যিহোবা আশা করেন যে তাঁর পুরুষ উপাসকেরা যেন নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন কারণ তিনি তাদের সম্মান করেন। শাস্ত্রে এই সব বিষয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেখানে যিহোবা উদাহরণ হিসাবে নারীদের অভিজ্ঞতার কথা এবং নারীদের প্রতি তাঁর অনুভূতি কেমন তা বর্ণনা করেছেন। (যিশাইয় ৪২:১৪; ৪৯:১৫; ৬৬:১৩) এটি পাঠকদের বুঝতে সাহায্য করে যে যিহোবা কেমন অনুভব করেন। আগ্রহের বিষয় যে “দয়া” এবং “করুণা”-র ইব্রীয় শব্দ, যা যিহোবা নিজের প্রতি ব্যবহার করেন, তা “গর্ভাশয়” শব্দটির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং তাকে “মাতৃ অনুভূতি”-র সাথে তুলনা করা যেতে পারে।—যাত্রাপুস্তক ৩৩:১৯; যিশাইয় ৫৪:৭.
১৬. কোন্ উদাহরণগুলি দেখায় যে ঈশ্বরীয় নারীদের উপদেশ মূল্যবান বলে গ্রহণ করা হত?
১৬ ঈশ্বরীয় নারীদের উপদেশকে মূল্য দেওয়া হত। যখন একবার ঈশ্বরভীরু অব্রাহাম তার ঈশ্বরীয় স্ত্রী সারার কথা শুনতে দ্বিধাবোধ করছিলেন, তখন যিহোবা তাকে বলেছিলেন: “তাহার সেই কথা শুন।” (আদিপুস্তক ২১:১০-১২) এষৌর হিত্তীয় স্ত্রীরা “ইস্হাকের ও রিবিকার মনের দুঃখদায়িকা হইল।” কালক্রমে, রিবিকা জানান যে যদি তার ছেলে যাকোব কোন হিত্তীয়কে বিবাহ করে, তাহলে তিনি কষ্ট পাবেন। তাতে ইস্হাকের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? “তখন” বিবরণ বলে, “ইস্হাক যাকোবকে ডাকিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন এবং এই আজ্ঞা দিয়া তাঁহাকে কহিলেন, তুমি কনান দেশীয় কোন কন্যাকে বিবাহ করিও না।” হ্যাঁ, যদিও রিবিকা সরাসরি কোন উপদেশ দেননি, তথাপি রিবিকার অনুভূতিকে স্মরণে রেখে তার স্বামী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। (আদিপুস্তক ২৬:৩৪, ৩৫; ২৭:৪৬; ২৮:১) রাজা দায়ূদ পরবর্তীকালে রক্তের দায়কে এড়িয়েছিলেন কারণ তিনি অবীগলের অনুরোধ শুনেছিলেন।—১ শমূয়েল ২৫:৩২-৩৫.
১৭. কী দেখায় যে পরিবারের মধ্যে নারীদের কিছুটা পরিমাণে কর্তৃত্ব ছিল?
১৭ নারীদের কিছু পরিমাণে পরিবারের উপর কর্তৃত্ব ছিল। শিশুদের উপদেশ দেওয়া হয়েছিল: “বৎস, তুমি তোমার পিতার উপদেশ শুন, তোমার মাতার ব্যবস্থা ছাড়িও না।” (হিতোপদেশ ১:৮) হিতোপদেশ ৩১ অধ্যায়ে “গুণবতী ভার্য্যা”-র বর্ণনা প্রকাশ করে যে একজন পরিশ্রমী বিবাহিতা নারী শুধুমাত্র ঘরেরই দেখাশুনা করে না, কিন্তু সেইসঙ্গে হয়ত স্থাবর-সম্পত্তি কেনাবেচা করতে, ফলদায়ক ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে, ছোটখাট ব্যবসা পরিচালনা করতে, এবং তার বিজ্ঞ কথাবার্তার জন্য পরিচিত হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রশংসনীয় নারী যিহোবার প্রতি সশ্রদ্ধ ভয়। আশ্চর্যের কিছু নয় গুণবতী ভার্যার মূল্য ছিল “মুক্তা হইতেও . . . অনেক অধিক।” জুয়েলারী এবং সাজানোর জন্য মহামূল্যবান লোহিত বর্ণ মুক্তোর জন্য উচ্চ মূল্য দিতে হত।—হিতোপদেশ ৩১:১০-৩১.
যে সব নারীরা ঈশ্বরের বিশেষ অনুগ্রহ পেয়েছিলেন
১৮. বাইবেলের সময়ে কোন্ কোন্ উপায়ে বিশেষ কয়েকটি নারীর উপর অনুগ্রহ দেখানো হয়েছিল?
১৮ নারীদের প্রতি যিহোবার শ্রদ্ধা প্রতিফলিত হয়েছে যখন আমরা দেখি যে বাইবেলের সময়ে নারীদের প্রতি যে বিশেষ অনুগ্রহ তিনি দেখিয়েছেন। হাগার, সারা এবং মানোহের স্ত্রীর কাছে স্বর্গদূতেরা পরিদর্শন করেন যারা তাদের ঐশিক নির্দেশসকল দিয়ে যান। (আদিপুস্তক ১৬:৭-১২; ১৮:৯-১৫; বিচারকর্ত্তৃগণ ১৩:২-৫) তাম্বুতে “নারী উপাসকেরা” থাকতেন এবং শলোমনের দরবারে নারী গায়িকারা থাকতেন।—যাত্রাপুস্তক ৩৮:৮; ১ শমূয়েল ২:২২; উপদেশক ২:৮.
১৯. কয়েক সময়ে, কিভাবে যিহোবা নিজেকে প্রতিনিধিত্ব করতে নারীদের ব্যবহার করেছিলেন?
১৯ ইস্রায়েলের ইতিহাসে যিহোবা বহুবার নারীকে ব্যবহার করেছিলেন তার প্রতিনিধিত্ব করে কথা বলার জন্য। ভাববাদিনী দেবোরা সম্পর্কে আমরা পড়ি: “ইস্রায়েল-সন্তানগণ বিচারার্থে তাঁহার নিকটে উঠিয়া আসিত।” (বিচারকর্ত্তৃগণ ৪:৫) কনানীয় রাজা যাবিনকে ইস্রায়েল পরাভূত করাতে সত্যই দেবোরার বিশেষ সুযোগ ছিল। তিনি অবশ্যই ছিলেন সেই বিজয়সূচক গীতের আংশিক রচয়িতা যা শেষ পর্যন্ত যিহোবার অনুপ্রাণিত লিপির অংশবিশেষ হয়ে দাঁড়ায়।c (বিচারকর্ত্তৃগণ ৫ অধ্যায়) অনেক শতাব্দী পরে, যিহোবাকে জানার উদ্দেশ্যে রাজা যোশিয় ভাববাদিনী হুল্দার কাছে এক প্রতিনিধিবর্গকে পাঠিয়েছিলেন যার মধ্যে মহাযাজকও অন্তর্ভুক্ত ছিল। হুল্দা সাহসের সাথে উত্তর দিয়েছিলেন: “ইস্রায়েলের ঈশ্বর সদাপ্রভু এই কথা কহেন।” (২ রাজাবলি ২২:১১-১৫) সেই উপলক্ষ্যে রাজা সেই প্রতিনিধিবর্গকে ভাববাদিনীর কাছে যেতে আদেশ দেন, কিন্তু যিহোবার কাছ থেকে পরিচালনা পাওয়ার জন্য করা হয়েছিল।—তুলনা করুন মালাখি ২:৭.
২০. কী উদাহরণ ইঙ্গিত দেয় যে নারীদের অনুভূতি ও মঙ্গলের প্রতি তিনি চিন্তিত?
২০ নারীদের কল্যাণের জন্য যিহোবার উদ্বেগ দেখা যায় যখন তিনি তাঁর কিছু নারী উপাসকদের সপক্ষে কাজ করেছিলেন। দুবার তিনি অব্রাহামের সুন্দরী স্ত্রীকে অপবিত্র হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন। (আদিপুস্তক ১২:১৪-২০; ২০:১-৭) ঈশ্বর যাকোবের কম স্নেহপ্রাপ্ত স্ত্রীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করেছিলেন “তাঁহার গর্ব্ভ মুক্ত করে,” যাতে করে সে সন্তান প্রসব করতে পারে। (আদিপুস্তক ২৯:৩১, ৩২) যখন দুজন ইস্রায়েলীয় ঈশ্বরভীরু ধাত্রী তাদের জীবন বিপন্ন করে ইব্রীয় নবজাত শিশুদের হত্যার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন, তখন যিহোবা তা উপলব্ধি করে “তাহাদের বংশবৃদ্ধি করিলেন।” (যাত্রাপুস্তক ১:১৭, ২০, ২১) তিনি হান্নার সনির্বন্ধ প্রার্থনার উত্তরও দিয়েছিলেন। (১ শমূয়েল ১:১০, ২০) আর যখন একজন ভাববাদীর বিধবা, এক পাওনাদারের সম্মুখীন হয় যে তার দুটি সন্তানকে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন যিহোবা তাকে পরিত্যাগ করেননি। প্রেমের সাথে যিহোবা ভাববাদী ইলীশাকে তার তৈলের যোগান বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যাতে করে সে তার দেনা মিটাতে পারে। এইভাবে তিনি তার পরিবারকে এবং মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন।—যাত্রাপুস্তক ২২:২২, ২৩; ২ রাজাবলি ৪:১-৭.
২১. নারীদের পরিস্থিতির প্রতি কোন্ ভারসাম্যমূলক চিত্র ইব্রীয় শাস্ত্রাবলিতে পাওয়া যায়?
২১ নারীদের সম্পর্কে কোন হীন মনোভাব রাখা, উৎসাহ দেওয়ার চাইতে ইব্রীয় শাস্ত্রে ঈশ্বরের সেবকদের মাঝে এক ভারসাম্যমূলক চিত্র প্রদর্শন করে। যদিও যিহোবা আদিপুস্তক ৩:১৬ পদের পরিপূর্ণতা থেকে নারী উপাসকদের রক্ষা করেননি, তথাপি যেসব ঈশ্বরভীরু লোকেরা যিহোবার উদাহরণ অনুসরণ করে এবং তাঁর নীতি পালন করে চলেছিলেন, সেইসব লোকেদের দ্বারা নারীরা মর্যাদা এবং সম্মান পেয়েছিলেন।
২২. যীশু যখন পৃথিবীতে ছিলেন, কিভাবে নারীদের ভূমিকা পালটে গিয়েছিল এবং কোন্ প্রশ্নগুলি উত্থাপিত হয়েছিল?
২২ ইব্রীয় শাস্ত্র শেষ হয়ে যাওয়ার পরের শতাব্দীগুলিতে যিহূদীদের মাঝে নারীদের ভূমিকা পরিবর্তিত হয়ে যায়। আর যে সময়ে যীশু এই পৃথিবীতে আসেন, তখন রব্বিদের পরম্পরাগত বিধি নারীদের ধর্মীয় সুযোগসুবিধাগুলিতে এবং সামাজিক জীবনে কঠিনভাবে বাধা দিতে শুরু করে দেয়। কিন্তু যীশু যেভাবে নারীদের সাথে আচরণ করতেন তার উপর কি তাদের রীতিনীতি কোন প্রভাব বিস্তার করেছিল? আজকের দিনে খ্রীষ্টীয় নারীদের প্রতি কেমন ব্যবহার করা উচিত? এই সব প্রশ্নগুলির উত্তর পরবর্তী প্রবন্ধে আলোচিত হবে।
[পাদটীকাগুলো]
a ওয়েবস্টার নাইন্থ নিউ কলেজিয়েট ডিকশনারী অনুসারে “বহুগামী” চিত্রিত করে “সেই বিবাহকে যেখানে স্বামী অথবা স্ত্রী দুজনের কারও একের অধিক সঙ্গী আছে।” আরও সূক্ষ্মভাবে “বহুগামী”-কে ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায় “এমন এক অভ্যাস যেখানে এক ব্যক্তির একটির অধিক স্ত্রী অথবা নারী একই সময়ে রয়েছে।”
b ইব্রীয় শাস্ত্রে সর্বাংশে বিবাহিত পুরুষ এবং নারী প্রায়ই “স্বামী” (ইব্রীয় ইস্) এবং “স্ত্রী” (ইব্রীয় ইশ্সা) বলা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এদনে যিহোবা যে শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, তা “অধিকারী” এবং ‘অধিকার’ নয়, কিন্তু তা ছিল “স্বামী” এবং “স্ত্রী”। (আদিপুস্তক ২:২৪; ৩:১৬, ১৭) হোশেয় ভাববাণী করেছিলেন নির্বাসন থেকে ফেরার পর ইস্রায়েলজাতি অনুতপ্ত হয়ে যিহোবাকে “আমার স্বামী” বলে ডাকবে, আমাদের “আমার অধিকারী” বলে নয়। এটা হয়ত ইঙ্গিত দেয় যে, “স্বামী” শব্দটির মধ্যে “অধিকারী”-র থেকে আরও অধিক স্নেহপ্রবণ গূঢ়ার্থ আছে।—হোশেয় ২:১৬, NW.
c বিচারকর্ত্তৃগণ ৫:৭, পদে দেবোরার বিষয় বলতে গিয়ে প্রথম পুরুষের ব্যবহার হল উল্লেখযোগ্য।
আপনি কিভাবে উত্তর দেবেন?
◻ নারীর ঈশ্বর-নিযুক্ত ভূমিকাতে “সহকারিণী” এবং “পরিপূরক” কথাগুলি কী ইঙ্গিত করে?
◻ বাইবেলের সময়ে যে প্রথাগুলি নারীদের প্রভাবিত করেছিল তা বিবেচনা করার সময়ে আমাদের কী মনে রাখা উচিত?
◻ কী দেখায় যে প্রাচীনকালে ঈশ্বরের দাসেদের মধ্যে নারীদের মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা ছিল?
◻ প্রাক্-খ্রীষ্টীয় সময়ে কোন্ কোন্ উপায়ে যিহোবা নারীদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ দেখিয়েছিলেন?