ঈশ্বরকে সেবা করতে কী আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?
“তুমি তোমার সমস্ত অন্তঃকরণ, তোমার সমস্ত প্রাণ, তোমার সমস্ত মন ও তোমার সমস্ত শক্তি দিয়া তোমার ঈশ্বর প্রভুকে প্রেম করিবে।”—মার্ক ১২:৩০.
১, ২. প্রচার কাজকে কেন্দ্র করে কোন্ উত্তেজনামূলক ঘটনাগুলি সাধিত হচ্ছে?
একটি গাড়ির আসল মূল্য তার বাহ্যিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা যায় না। তার উপরের রঙটি এবং তার বাইরের গঠনটি হয়ত একজন সম্ভব্য খরিদ্দারের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে পারে; কিন্তু এর চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল এমন একটি জিনিস যা দেখা যায় না—অর্থাৎ এর ইন্জিনটি যা এই গাড়িটিকে চালায় এবং তার সাথে আরও আনুসাঙ্গিক বস্তুগুলি যেগুলি এটিকে পরিচালনা করে।
২ ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে যে খ্রীষ্টীয় পরিচর্যা, সেই ক্ষেত্রেও ঠিক একই জিনিস প্রযোজ্য। যিহোবার সাক্ষীরা ঈশ্বরীয় কাজে উচ্ছলিত। প্রতি বছরে একশ কোটিরও বেশি ঘন্টা ব্যায় করা হয় ঈশ্বরের রাজ্যের সুসমাচার প্রচার করার ক্ষেত্রে। এছাড়াও লক্ষাধিক সংখ্যায় বাইবেল অধ্যয়ন পরিচালনা করা হয় এবং যারা বাপ্তিস্ম নেয়, তাদের সংখ্যাও প্রায় লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। যদি আপনি সুসমাচারের প্রচারক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনারও নিশ্চয়ই এর মধ্যে কিছুটা অংশ আছে—যদিও বা এই উত্তেজনামূলক পরিসংখ্যানে—আপনার ভূমিকা অপেক্ষাকৃতরূপে খুব কমও হয়ে থাকে। আর আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে “ঈশ্বর অন্যায়কারী নহেন; তোমাদের কার্য্য, এবং. . .তদ্দ্বারা তাঁহার নামের প্রতি প্রদর্শিত তোমাদের প্রেম, এই সকল তিনি ভুলিয়া যাইবেন না।”—ইব্রীয় ৬:১০.
৩. কাজ ছাড়া আর কোন্ জিনিসটি খ্রীষ্টানদের পক্ষে বিশেষ বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত এবং কেন?
৩ কিন্তু আমাদের পরিচর্যার আসল মূল্যটি—তা সমষ্টিগত অথবা ব্যক্তিগত যে কোন ক্ষেত্রেই হোক না কেন—তা কেবলমাত্র সংখ্যার মাধ্যমে নির্ণয় করা যায় না। যেমন শমূয়েলকে বলা হয়েছিল, “মনুষ্য প্রত্যক্ষ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি করে, কিন্তু সদাপ্রভু অন্তঃকরণের প্রতি দৃষ্টি করেন।” (১ শমূয়েল ১৬:৭) হ্যাঁ, অন্তরে আমরা যে ধরনের মানুষ, সেটাই ঈশ্বরের কাছে বেশি অর্থ রাখে। এটা সত্যি যে, কাজের প্রয়োজন আছে। ঈশ্বরীয় ভক্তির যে কাজ তা যিহোবার শিক্ষাকে অলঙ্কৃত করে এবং যাদের শিষ্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। (মথি ৫:১৪-১৬; তীত ২:১০; ২ পিতর ৩:১১) তবুও, আমাদের কাজ সম্পূর্ণ চিত্রটি প্রকাশ করে না। ইফিষীয় মণ্ডলীর সম্বন্ধে চিন্তা করার যথেষ্ট কারণ পুনরুত্থিত যীশুর ছিল—তাদের উত্তম কাজের রেকর্ড থাকা সত্যেও। “আমি জানি তোমার কার্য্য সকল,” তিনি তাদের বলেছিলেন। “তথাচ তোমার বিরুদ্ধে আমার কথা আছে, তুমি আপন প্রথম প্রেম পরিত্যাগ করিয়াছ।”—প্রকাশিত বাক্য ২:১-৪.
৪. (ক) কিভাবে ঈশ্বরের প্রতি আমাদের কাজ এক যান্ত্রিক নিয়মে পরিনত হতে পারে? (খ) নিজেকে পরীক্ষা করার প্রয়োজন আছে কেন?
৪ একটি বিপদ আছে। অনেক বছর ধরে কাজ করার দরুন, ঈশ্বরের পরিচর্যা হয়ত আমাদের কাছে একটা কর্তব্যমূলক রীতি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন খ্রীষ্টীয় মহিলা এইভাবে এর বর্ণনা দেন: “আমি পরিচর্যায় যেতাম, সভাতে যোগদান করতাম, অধ্যয়ন করতাম, প্রার্থনা করতাম—কিন্তু এসমস্তই আমি একটা যন্ত্রের মতো করে যেতাম, এগুলির প্রতি আমার কোন অনুভূতি ছিল না।” অবশ্যই ঈশ্বরের দাসেরা “পরিত্যক্ত” অথবা ‘অবনত’ হওয়া সত্ত্ব্যেও যখন প্রাণপন চেষ্টা করে তখন তাদের প্রশংসা করা উচিত। (২ করিন্থীয় ৪:৯; ৭:৬) কিন্তু, যখন খ্রীষ্টীয় কর্মসূচি এক ঘেয়ে হয়ে উঠে, তখন আমাদের উচিত, আরেক কথায় বলতে গেলে ইন্জিনকে পরীক্ষা করা। এমনকি সবচাইতে উত্তম গারিকেও নিয়মিতভাবে দেখাশোনা করার প্রয়োজন আছে; ঠিক তেমনি, প্রত্যেক খ্রীষ্টানের উচিত নিয়মিতরূপে আত্ম-পরীক্ষা করা। (২ করিন্থীয় ১৩:৫) অন্যেরা আমাদের কাজ দেখতে পারে, কিন্তু তারা বুঝতে পারে না যে কোন জিনিসটি আমাদের এই কাজ করতে অনুপ্রাণিত করছে। অতএব আমাদের প্রত্যেকের উচিত এই প্রশ্নটি বিবেচনা করা: ‘ঈশ্বরকে সেবা করতে কী আমাকে অনুপ্রাণিত করছে?’
সঠিক অনুপ্রেরণার পথে বাধাগুলি
৫. যীশু কোন আদেশকে প্রথম স্থান দিয়েছিলেন?
৫ তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় ইস্রায়েলদের উদ্দেশ্যে দেওয়া নিয়মগুলির মধ্যে কোনটি প্রথম, তখন যীশু একটি নির্দেশের কথা উল্লেখ করেন, যা কেবলমাত্র বাহ্যিক বিষয়ের উপর নয়, কিন্তু অন্তরের উদ্দেশ্যের প্রতি আলোকপাত করে: “তুমি তোমার সমস্ত অন্তঃকরণ, তোমার সমস্ত প্রাণ, তোমার সমস্ত মন ও তোমার সমস্ত শক্তি দিয়া তোমার ঈশ্বর প্রভুকে প্রেম করিবে।” (মার্ক ১২:২৮-৩০) এইভাবে যীশু শনাক্ত করেন যে ঈশ্বরকে সেবা করার ক্ষেত্রে কোনটি আমাদের অনুপ্রেরণার বিষয় হওয়া উচিত: সেটি হল—প্রেম।
৬, ৭. (ক) কিভাবে শয়তান ছলনাপূর্বক পরিবারের গন্ডিকে আক্রমন করে এবং কেন? (২ করিন্থিয় ২:১১) (খ) যেভাবে একজন বড় হয়ে ওঠে তা কিভাবে ঐশিক কত্তৃত্বের প্রতি তার মনোভাবকে প্রভাবিত করে?
৬ প্রেমের এই গুরুত্বপূর্ণ গুণটিকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের যে ক্ষমতা রয়েছে, তা শয়তান ব্যাহত করতে চায়। এটি সম্পাদন করার জন্য একটি পদ্ধতি যা সে ব্যবহার করে থাকে তা হল পরিবারের গন্ডিকে আক্রমণ করা। কেন? কারণ এখানেই আমাদের প্রথম এবং সবচাইতে গভীর প্রেমের প্রকাশ ঘটে। শয়তান খুব ভালভাবে বাইবেলের মানটি জানে যা বলে যে ছোটবেলায় যা শেখা হয় তার মূল্য বড় হলে বোঝা যায়। (হিতোপদেশ ২২:৬) সে ছলানাপূর্বকভাবে চেষ্টা করে ছোটবেলা থেকে প্রেম সম্বন্ধে আমাদের ধারনাকে বিকৃত করতে। “এযুগের দেব” হিসাবে শয়তানের উদ্দেশ্য সাধিত হয় যখন সে দেখে যে অনেকে এমন এক পরিবারের মধ্যে বড় হয়ে উঠছে যা একেবারেই প্রেমের পরিবেশ নয় বরঞ্চ তিক্ততা, ক্রোধ ও কুৎসিত ভাষার রণক্ষেত্র।—২ করিন্থীয় ৪:৪; ইফিষীয় ৪:৩১, ৩২; ৬:৪, পাদটীকা; কলসীয় ৩:২১.
৭ আপনার পারিবারিক জীবন সুখী করা বইটি দেখায় যে, যে ভাবে একজন পিতা তার অবিভাভকের দায়িত্ব পালন করে “তা পরবর্তীকালে মানুষ এবং ঐশিক, উভয় অধিকর্তার প্রতিই সন্তানের আচরণের উপরে এক দৃঢ় প্রভাব ফেলে।”a একজন খ্রীষ্টীয় ব্যক্তি যে তার পিতার অত্যন্ত কড়া শাসনের অধীনে বড় হয়েছে, সে স্বীকার করে: “আমার পক্ষে, যিহোবার বাধ্য হওয়া সহজ; তাঁকে ভালবাসা অনেক বেশি শক্ত।” অবশ্যই বাধ্য হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঈশ্বরের চোখে “বলিদান অপেক্ষা আজ্ঞাপালন উত্তম।” (১ শমূয়েল ১৫:২২) কিন্তু কোন্ জিনিসটি আমাদের সাহায্য করতে পারে বাধ্যতাকে অতিক্রম করে যিহোবার প্রতি প্রেমকে গড়ে তুলতে, যাতে করে আমাদের উপাসনার পিছনে সেটাই অনুপ্রেরণার বস্তু হয়ে দাঁড়ায়?
“খ্রীষ্টের প্রেম আমাদিগকে বশে রাখিয়া চালাইতেছে”
৮, ৯. যীশুর মুক্তির মূল্যদান কিভাবে যিহোবার প্রতি আমাদের প্রেমকে উদ্দীপিত করে তুলতে পারে?
৮ যিহোবার প্রতি সর্বান্তকরণে প্রেম গড়ে তোলার জন্য সবচাইতে অনুপ্রেরণার বিষয়টি হল যীশু খ্রীষ্টের মুক্তির মূল্যকে উপলব্ধি করা। “আমাদিগেতে ইশ্বরের প্রেম ইহাতেই প্রকাশিত হইয়াছে যে, ঈশ্বর আপনার একজাত পুত্ত্রকে জগতে প্রেরণ করিয়াছেন, যেন আমরা তাঁহা দ্বারা জীবন লাভ করিতে পারি। (১ যোহন ৪:৯) একবার যখন আমরা এটি বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পারি তখন এটি আমাদের ভিতর থেকে প্রেমের প্রতিক্রিয়াকে প্রকাশ করতে বাধ্য করে। “আমরা প্রেম করি, কারণ [যিহোবা] প্রথমে আমাদিগকে প্রেম করিয়াছেন”—১ যোহন ৪:১৯.
৯ মানুষের রক্ষাকর্তা হিসাবে তাঁর এই কাজকে যীশু স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছিলেন। “তিনি আমাদের নিমিত্তে আপন প্রাণ দিলেন, ইহাতে আমরা প্রেম জ্ঞাত হইয়াছি।” (১ যোহন ৩:১৬; যোহন ১৫:১৩) যীশুর এই আত্ম-ত্যাগমূলক প্রেম আমাদের মধ্যে এক উপলব্ধিমূলক প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তোলা উচিত। একটি দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক: ধরুন আপনাকে কেউ ডোবার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। আপনি কি শুধুমাত্র গা মুছে নিয়ে ঘরে ফিরে যাবেন কোন কিছুই মনে রাখবেন না? অবশ্যই নয়! যে আপনাকে বাঁচিয়েছে আপনি তার প্রতি অবশ্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন। যে কোন কারণই থাকুক না কেন, আপনি সেই ব্যক্তিটির কাছে আপনার জীবনের জন্য ঋণী। যিহোবা ঈশ্বর ও যীশু খ্রীষ্টের কাছে কি আমরা কোন অংশে কম ঋণী? মুক্তির মূল্য যদি না দেওয়া হত, তাহলে আমরা প্রত্যেকেই পাপ ও মৃত্যুর মধ্যে ডুবে যেতাম। বরঞ্চ এই মহান প্রেমের প্রকাশ হেতু, আমাদের আশা আছে পরমদেশ পৃথিবীতে চিরকাল বেঁচে থাকা।—রোমীয় ৫:১২, ১৮; ১ পিতর ২:২৪.
১০. (ক) মুক্তির মূল্যকে আমরা কিভাবে ব্যক্তিগত বিষয় করে তুলতে পারি? (খ) কিভাবে খ্রীষ্টের প্রেম আমাদের বশ্যতায় রাখে?
১০ মুক্তির মূল্যের বিষয় ধ্যান করুন। ব্যক্তিগতভাবে এটিকে গ্রহণ করুন যেমন পৌল করেছিলেন যখন তিনি বলেন: “আর এখন মাংসে থাকিতে আমার যে জীবন আছে, তাহা আমি বিশ্বাসে, ঈশ্বরের পুত্ত্রে বিশ্বাসেই, যাপন করিতেছি; তিনিই আমাকে প্রেম করিলেন, এবং আমার নিমিত্তে আপনাকে প্রদান করিলেন।” (গালাতীয় ২:২০) এই ধরনের চিন্তাধারা হৃদয়ের অনুপ্রেরণাকে জাগিয়ে তোলে, কারণ পৌল করিন্থীয়দের লিখেছিলেন: “কারণ খ্রীষ্টের প্রেম আমাদিগকে বশে রাখিয়া চালাইতেছে; কেননা . . . তিনি সকলের জন্য মরিলেন, যেন, যাহারা জীবিত আছে, তাহারা আর আপনাদের উদ্দেশে নয়, কিন্তু তাঁহারই উদ্দেশে জীবন ধারণ করে, যিনি তাহাদের জন্য মরিয়াছিলেন, ও উত্থাপিত হইলেন।” (২ করিন্থীয় ৫:১৪, ১৫) দ্যা যিরূশালেম বাইবেল জানায় যে খ্রীষ্টের প্রেম “আমাদের অভিভূত করে।” যখন আমরা খ্রীষ্টের প্রেমের কথা চিন্তা করি তখন আমরা বাধ্য হই, গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হই এমনকি অভিভূত হয়ে পড়ি। এটি আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে এবং কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। জে. বি. ফিলিপস-এর অনুবাদ যেমন শব্দান্তরে অর্থ প্রকাশ করে, “খ্রীষ্টের প্রেমই হল আমাদের কর্মের উৎস।” অন্যধরনের অনুপ্রেরণা আমাদের মধ্যে স্থায়ী ফল উৎপাদন করতে পারবে না, যা ফরিশীদের উদাহরণ থেকে প্রমাণিত হয়।
“ফরীশী ও সদ্দূকীদের তাড়ী হইতে সাবধান থাক”
১১. ধর্মীয় কাজের প্রতি ফরীশীদের মনোভাব বর্ণনা করুন।
১১ ফরীশীরা ঈশ্বরের উপাসনার মূল উদ্দেশ্যকেই হরণ করেছিল। ঈশ্বরের প্রতি প্রেমের বিষয়টিকে জোর না দিয়ে তারা কাজের উপর জোর দেয় এবং সেটিকে আধ্যাত্মিকতা মাপার মানদন্ড হিসাবে ব্যবহার করে। তারা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিধি নিয়মকে নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে বাহ্যিকভাবে তাদের ধার্মিক বলে মনে হত, কিন্তু ভিতরে তারা ছিল “মরা মানুষের অস্থি ও সর্ব্বপ্রকার অশুচিতা ভরা।”—মথি ২৩:২৭.
১২. যীশু যখন লোকটিকে ভাল করে তোলেন তখন ফরীশীরা কিভাবে তাদের হৃদয়ের কঠিনতা প্রকাশ করে?
১২ একসময় যীশু করুণার সাথে একটি লোককে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ করে তুলেছিলেন যার হাত ক্ষয়ে গিয়েছিল। সেই ব্যক্তিটি কতই না আনন্দিত হয় যখন সে দেখতে পেল যে মুহুর্তের মধ্যে কিভাবে সে এমন একটা রোগের থেকে মুক্তি পায় যা তাকে দৈহিক ও মানুসিকভাবে নিশ্চয়ই যথেষ্ট পীড়া দিচ্ছিল! কিন্তু ফরীশীরা তার সাথে আনন্দ করেনি। বরঞ্চ তারা খুঁটিনাটি বিষয়ের উপর দোষ ধরতে থাকে—যেমন যীশুর বিশ্রামবারে সাহায্য করার ব্যপারটি। নিয়মের রীতিকৌশল ব্যাখ্যা করার কাজে তারা এত ব্যস্ত ছিল যে ফরীশীরা সম্পূর্ণরূপে নিয়মের পিছনে যে আসল উদ্দেশ্যটি রয়েছে তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। এটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে যীশু “তাহাদের অন্তঃকরণের কাঠিন্যে দুঃখিত” হয়েছিলেন। (মার্ক ৩:১-৫) এছাড়াও তিনি তার শিষ্যদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন: “ফরীশী ও সদ্দূকীদের তাড়ী হইতে সাবধান থাক।” (মথি ১৬:৬) আমাদের উপকারের জন্য বাইবেলের মধ্যে তাদের কার্যকলাপ ও মনোভাবকে প্রকাশ করে দেওয়া হয়েছে।
১৩. ফরীশীদের উদাহরণ থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই?
১৩ ফরীশীদের উদাহরণ আমাদের শিক্ষা দেয় যে কাজ সম্বন্ধে আমাদের যুক্তিসঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি থাকার প্রয়োজন আছে। অবশ্যই, কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ “কর্ম্মবিহীন বিশ্বাসও মৃত।” (যাকোব ২:২৬) কিন্তু, অসিদ্ধ মানুষের একটা প্রবণতা আছে যে তারা অপরের বিচার করে তাদের কাজ দেখে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা কিধরনের ব্যক্তি তার উপর ভিত্তি করে নয়। একএক সময় আমরা নিজেদেরও এইভাবে বিচার করে থাকি। আমরা আমাদের কাজের প্রতি এত বেশি আশক্ত হয়ে পড়ি যে, আমরা মনে করতে শুরু করি, যেন এটাই আমাদের আধ্যাত্মিকতার প্রধান অংশ। আমরা হয়ত এগুলির পিছনে আমাদের উদ্দেশ্যকে পরীক্ষা করার গুরুত্বকে ভুলে যেতে পারি। (তুলনা করুন ২ করিন্থীয় ৫:১২) আমরা হয়ত কঠোর মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠতে পারি যারা ‘মশা ছাঁকিয়া ফেলে, কিন্তু উট গিলিয়া থাকে,’ অর্থাৎ নিয়মের কথাগুলিকে পালন করে, কিন্তু তার উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করে।—মথি ২৩:২৪.
১৪. ফরীশীরা কিভাবে অপরিষ্কৃত পান অথবা ভোজনপাত্র হয়ে ওঠে?
১৪ যে জিনিসটি ফরীশীরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল সেটি হল এই যে, একজন ব্যক্তি যদি প্রকৃতপক্ষে যিহোবাকে ভালবাসে, তাহলে ঈশ্বরীয় ভক্তির যে কাজ তা আপনি থেকেই প্রকাশ পাবে। আধ্যাত্মিকতা অন্তর থেকে প্রবাহিত হয়ে বাইরে প্রকাশ পায়। যীশু কঠোরভাবে ফরীশীদেরকে তাদের এই ভ্রান্তিকর চিন্তাধারার জন্য তিরষ্কার করেন, এই বলে যে: “হা অধ্যাপক ও ফরীশীগণ, কপটীরা, ধিক্ তোমাদিগকে! কারণ তোমরা পানপাত্র ও ভোজনপাত্র বাহিরে পরিষ্কার করিয়া থাক, কিন্তু সেগুলির ভিতরে দৌরাত্ম্য অন্যায় ভরা। অন্ধ ফরীশী, অগ্রে পানপাত্র ও ভোজনপাত্র ভিতরে পরিষ্কার কর, যেন তাহা বাহিরেও পরিষ্কার হয়।”—মথি ২৩:২৫, ২৬.
১৫. যীশু যে রূপের চাইতেও আরও বেশি কিছু লক্ষ্য করতেন তার একটি উদাহরণ দিন।
১৫ একটি পানপাত্র, একটি ভোজনপাত্র অথবা একটি বাড়ির বাহ্যিক রূপটি কিছুই প্রকাশ করে না। যিরূশালেমের যে মন্দির তার সৌন্দর্য দেখে যীশুর শিষ্যরা একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন, যাকে যীশু “দস্যুগণের গহ্বর” বলেছিলেন, বিশেষকরে ভিতরে যা ঘটছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে। (মার্ক ১১:১৭; ১৩:১) মন্দিরের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য তা লক্ষ লক্ষ নামধারী খ্রীষ্টানদের ক্ষেত্রেও সত্য, বিশেষকরে খ্রীষ্টজগতের যা রিপোর্ট দেখায় তার পরিপ্রেক্ষিতে। যীশু বলেছিলেন যে যারা তাঁর নামে “পরাক্রম-কার্য্য” করবে তাদের তিনি ‘অধর্মচারী’ হিসাবে বিচার করবেন। (মথি ৭:২২, ২৩) ঠিক তার বিপরীতে, একজন বিধবা যে মন্দিরেতে নিতান্তই নগণ্য অর্থ দান করেছিল তার সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন: “ভান্ডারে যাহারা মুদ্রা রাখিতেছে, তাহাদের সকলের অপেক্ষা এই দরিদ্রা বিধবা অধিক রাখিল . . . এ নিজ অনাটন হইতে, যাহা কিছু ছিল, সমস্ত জীবনোপায় রাখিল।” (মার্ক ১২:৪১-৪৪) অসঙ্গত বিচার? কখনই না। এই উভয় ক্ষেত্রে যীশু যিহোবার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করেন। (যোহন ৮:১৬) তিনি কাজের পিছনে যে উদ্দেশ্য সেটিকে লক্ষ্য করেছিলেন এবং সেই অনুসারে বিচার করেছিলেন।
“যাহার যেরূপ শক্তি, তাহাকে তদনুসারে”
১৬. অপর আরেকজন খ্রীষ্টানের সাথে আমাদের কাজকে তুলনা করার কেন প্রয়োজন নেই?
১৬ যদি আমাদের উদ্দেশ্য সঠিক হয়, তাহলে অনবরত তুলনা করার কোন প্রয়োজন থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, খুব অল্পই উত্তম কিছু সাধিত হয় যখন কেউ প্রতিযোগীতামূলকভাবে তুলনা করে, অপর এক খ্রীষ্টানের পরিচর্যার মত একই সমান সময় ব্যয় করে অথবা প্রচার কাজে একই কৃতকার্যতা লাভ করার চেষ্টা করা হয়। যীশু বলেছিলেন যিহোবাকে, নিজের সম্পূর্ণ হৃদয়, মন, প্রাণ এবং শক্তি দিয়ে প্রেম করতে—অপরের নয়। যদি আপনার পরিস্থিতি আপনাকে সুযোগ দেয়, তাহলে প্রেম আপনাকে অনুপ্রাণীত করবে পরিচর্যার কাজে আরও বেশি সময় ব্যয় করতে—এমনকি হয়ত পূর্ণসময় অগ্রগামী পরিচারক হিসাবেও কাজ করতে পারেন। যদি কোন রোগের সাথে আপনি যুদ্ধ করছেন, তাহলে, পরিচর্যার কাজে হয়ত আপনি যতটা আশা করেছিলেন সেই অনুসারে সময় দিতে পারবেন না। এর জন্য নিরুৎসাহ হয়ে পড়বেন না। ঘন্টার মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ততার পরিমাপ করা যায় না। সঠিক উদ্দেশ্য থাকলে, তবেই আপনার আনন্দ করার কারণ থাকবে। পৌল লিখেছিলেন: “প্রত্যেক জন নিজ নিজ কর্ম্মের পরীক্ষা করুক, তাহা হইলে সে কেবল আপনার কাছে শ্লাঘা করিবার হেতু পাইবে, অপরের কাছে নয়।”—গালাতীয় ৬:৪.
১৭. নিজের ভাষায় তালন্তের দৃষ্টান্তটির সংক্ষেপে বর্ণনা দিন।
১৭ মথি ২৫:১৪-৩০ পদে উল্লেখিত যীশুর দেওয়া তালন্তের যে দৃষ্টান্ত তার কথা বিবেচনা করুন। একজন ব্যক্তি বিদেশে যাত্রা করার সময় তার দাসেদের নিজস্ব কিছু জিনিস দিয়ে যান। “তিনি এক জনকে পাঁচ তালন্ত, অন্য জনকে দুই তালন্ত, এবং আর এক জনকে এক তালন্ত, যাহার যেরূপ শক্তি, তাহাকে তদনুসারে দিলেন।” যখন প্রভু দাসদের কাছ থেকে হিসাব নেন তখন তিনি কী পান? যে দাসটিকে পাঁচ তালন্ত দেওয়া হয়েছিল সে আরও পাঁচটি তালন্ত উপার্জন করে। ঠিক একইভাবে যে দাসটিকে দুটি তালন্ত দেওয়া হয়েছিল সেও আরও দুটি অর্জন করে। কিন্তু যে দাসকে একটি তালন্ত দেওয়া হয়েছিল, সে তা মাটির তলায় পুঁতে রাখে এবং তার প্রভুর ধনকে বাড়াবার কিছুমাত্র চেষ্টা করে না। এই পরিস্থিতিকে প্রভু কিভাবে বিচার করলেন?
১৮, ১৯. (ক) যে দাসটিকে দুটি ও যাকে পাঁচটি তালন্ত দেওয়া হয়েছিল এদের দুজনের সাথে একেঅপরকে কেন প্রভু তুলনা করেন নি? (খ) তালন্তের দৃষ্টান্তটি আমাদের প্রশংসা ও তুলনা করা সম্বন্ধে কী শিক্ষা দেয়? (গ) তৃতীয় দাসটিকে কেন কঠিনভাবে বিচার করা হয়?
১৮ প্রথমে আসুন আমরা বিবেচনা করে দেখি সেই দুটি দাসের কথা যাদের পাঁচ ও দুই তালন্ত দেওয়া হয়েছিল। এই দুই দাসকে প্রভু বলেন: “বেশ, উত্তম ও বিশ্বস্ত দাস!” যে দাসকে তিনি পাঁচ তালন্ত দিয়েছিলেন সে যদি অতিরিক্ত আরও দুই তালন্ত উপার্জন করত তাহলে কি তিনি তাকে এধরনের কথা বলতে পারতেন? সম্ভবত নয়! অপরদিকে অন্য দাসটি যে অতিরিক্ত দুটি তালন্ত অর্জন করেছিল তিনি তাকে বলেন নি যে: ‘কেন তুমি পাঁচটি তালন্ত উপার্জন কর নি? তোমার সহদাসকে দেখ সে আমার জন্য কত কী উপার্জন করেছে!’ না, এই দয়ালু প্রভু, যিনি যীশুকে চিত্রিত করছেন, তিনি এক্ষেত্রে কোন তুলনা করেন নি। তিনি তালন্ত “যাহার যেরূপ শক্তি, তাহাকে তদনুসারে দিলেন,” এবং তাদের যতটুকু দেওয়ার ক্ষমতা তার চাইতে বেশি তিনি তাদের কাছ থেকে আশা করেন নি। দুই দাসই একই ধরনের প্রশংসা পেয়েছিল যেহেতু দুজনেই তাদের প্রভুর জন্য প্রাণপন চেষ্টা করে। এর থেকে আমরা সকলে কিছু শিখতে পারি।
১৯ অবশ্য, তৃতীয় দাসটিকে প্রশংসা করা হয় নি। বস্তুতপক্ষে তাকে অন্ধকারের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। একটি তালন্ত পাওয়ার দরুন তার কাছ থেকে ততটা উৎপাদন আশা করা হয় নি যা সেই দাসের কাছ থেকে আশা করা হয়েছিল যাকে পাঁচটি তালন্ত দেওয়া হয়। কিন্তু সেই দাসটি চেষ্টা পর্যন্ত করেনি! পরিশেষে তার উপরে কঠিন বিচার আসে কারণ তার হৃদয়ের পরিস্থিতি ছিল “দুষ্ট অলস,” যা প্রভুর প্রতি প্রেমের অভাবকেই প্রকাশ করেছিল।
২০. যিহোবা আমাদের সীমিত ক্ষমতাকে কিভাবে দেখেন?
২০ যিহোবা আশা করেন যে আমরা প্রত্যেকে যেন তাঁকে সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রেম করি, কিন্তু তবুও এটা জানা কতই না হৃদয়গ্রাহী যে “তিনিই আমাদের গঠন জানেন; আমরা যে ধূলিমাত্র, ইহা তাহার স্মরণে আছে”! (গীতসংহিতা ১০৩:১৪) হিতোপদেশ ২১:২ পদ বলে যে “সদাপ্রভু হৃদয় সকল তৌল করেন”—পরিসংখ্যান করেন না। তিনি আমাদের সমস্ত সীমিত ক্ষমতা সম্বন্ধে জানেন যার উপর আমাদের কোন হাত নেই, তা সে অর্থনৈতিক, দৈহিক, মানসিক বা অন্য যে কোন ক্ষেত্রেই তা হোক না কেন। (যিশাইয় ৬৩:৯) কিন্তু, একই সাথে, তিনি আশা করেন যে আমরা যেন আমাদের সংস্থানের সদ্ব্যবহার করি যদি তা আমাদের কাছে থেকে থাকে। যিহোবা সিদ্ধ, কিন্তু যখন তিনি তাঁর অসিদ্ধ উপাসকদের সাথে ব্যবহার করেন তখন তিনি তাদের কাছ থেকে সিদ্ধতা আশা করেন না। ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি অযৌক্তিক নন এবং আশা করার ক্ষেত্রেও তিনি অবাস্তব নন।
২১. ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে আমাদের যে কাজ তা যদি প্রেমের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে, তাহলে কোন্ উত্তম পরিণাম আসতে পারে?
২১ যিহোবাকে সমস্ত অন্তঃকরণ, প্রাণ, মন এবং শক্তি দিয়ে প্রেম করা “সমস্ত হোম ও বলিদান হইতে শ্রেষ্ঠ।” (মার্ক ১২:৩৩) যদি আমরা প্রেমের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে থাকি, তাহলে আমরা সাধ্য মত ঈশ্বরের কাজে অংশ নেব। পিতর লিখেছিলেন যে যদি ঈশ্বরীয় গুণগুলি যার অন্তর্ভুক্ত হল প্রেম তা, “তোমাদিগেতে থাকে ও উপচিয়া পড়ে, তবে আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্টের তত্ত্বজ্ঞান সম্বন্ধে তোমাদিগকে অলস কি ফলহীন থাকিতে দিবে না।”—২ পিতর ১:৮.
[পাদটীকাগুলো]
a ওয়াচটাওয়ার বাইবেল অ্যান্ড ট্র্যাক্ট সোসাইটি নিউ ইয়র্কে ইনক্-এর দ্বারা প্রকাশিত।
পুনরালোচনা
◻ ঈশ্বরের কাজ করার ক্ষেত্রে কোনটি অনুপ্রেরণার বিষয় হওয়া উচিত?
◻ খ্রীষ্টের প্রেম কিভাবে আমাদের যিহোবার সেবা করতে বাধ্য করে?
◻ ফরীশীদের কোন সর্বাগ্রে করণীয় কর্ম আমরা এড়িয়ে চলব?
◻ অন্য আরেকজন খ্রীষ্টানের সাথে আমাদের কাজকে তুলনা করা কেন বিজ্ঞতার কাজ হবে না?
[Pictures on page 16]
ব্যক্তিবিশেষের ক্ষমতা, উদ্যম এবং পরিস্থিতি পার্থক্য দেখা যায়