আপনার বিবাহকে একটি স্থায়ী বন্ধন করে তুলুন
“ঈশ্বর যাহার যোগ করিয়া দিয়াছেন, মনুষ্য তাহার বিয়োগ না করুক।”—মথি ১৯:৬.
১. বর্তমানে সত্য খ্রীষ্টানদের মধ্যে বৈবাহিক সাফল্যের ভিত্তি কী?
যিহোবার লোকেদের মধ্যে আজ হাজার হাজার ব্যক্তি সন্তুষ্টিজনক এবং স্থায়ী বিবাহ উপভোগ করে। এই ধরনের ব্যাপক সাফল্য কিন্তু আকস্মিক আসে না। খ্রীষ্টীয় বিবাহ সফল হয়ে ওঠে যখন উভয় বিবাহসঙ্গী (১) বিবাহ সম্বন্ধে ঈশ্বরের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান দেখায় এবং (২) তাঁর বাক্যের নীতি অনুযায়ী চলতে চেষ্টা করে। কারণ, ঈশ্বর স্বয়ং বৈবাহিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই ‘পৃথিবীতে সমস্ত পরিবার তাদের নাম পেয়েছে।’ (ইফিষীয় ৩:১৪, ১৫) যিহোবা যেহেতু জানেন যে বিবাহে সাফল্য পেতে হলে কী করতে হবে, তাই তাঁর নির্দেশ পালন করলে আমরা উপকার পেতে পারি।—যিশাইয় ৪৮:১৭.
২. বিবাহে বাইবেলের নীতি প্রয়োগ করায় ব্যর্থতার ফল কী হয়?
২ অপরপক্ষে, বাইবেল নীতি প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হলে, বৈবাহিক জীবনে দুর্দশা আসতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে যতজন বিবাহ করে, তাদের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ অবশেষে বিবাহবিচ্ছেদ করবে। এমনকি খ্রীষ্টানেরাও এই “বিষম সময়ের” সঙ্কট ও চাপ থেকে মুক্ত নয়। (২ তীমথিয় ৩:১) আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং কর্মক্ষেত্রের চাপ যে কোন বিবাহের প্রতি ক্ষতিকারক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এছাড়াও, কিছু খ্রীষ্টান খুবই হতাশ হয়েছে কারণ তাদের সঙ্গীরা বাইবেলের নীতি প্রয়োগ করতে অসমর্থ হয়েছে। “আমি যিহোবাকে ভালবাসি,” একজন খ্রীষ্টান স্ত্রী বলেছেন, “কিন্তু ২০ বছর ধরে আমাদের বিবাহে সমস্যা থেকে গেছে। আমার স্বামী স্বার্থপর ও কোন পরিবর্তন করতে চায় না। আমার মনে হয় আমি ফাঁদের মধ্যে রয়েছি।” বেশ কিছু খ্রীষ্টীয় স্বামী এবং স্ত্রী একই ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করেছে। কোথায় ভুল হয়েছে? আর একটি বিবাহে, উদাসীনতা অথবা সরাসরি বিদ্বেষ এসে পড়াকে কিভাবে রোধ করা যায়?
বিবাহের স্থায়িত্ব
৩, ৪. (ক) বিবাহ সম্বন্ধে ঈশ্বরের মান কী? (খ) বিবাহের স্থায়িত্ব ন্যায্য এবং উপকারী কেন?
৩ এমনকি সবচেয়ে উপযুক্ত পরিস্থিতিতেও, বিবাহ হল অসিদ্ধ ব্যক্তিদের বন্ধন। (দ্বিতীয় বিবরণ ৩২:৫) সুতরাং, প্রেরিত পৌল বলেছিলেন: “তথাপি [বিবাহ করলে] . . . দৈহিক ক্লেশ ঘটিবে।” (১ করিন্থীয় ৭:২৮) কিছু বিরল ক্ষেত্রে, এমনকি আলাদা থাকা অথবা বিবাহবিচ্ছেদও হতে পারে। (মথি ১৯:৯; ১ করিন্থীয় ৭:১২-১৫) কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে, খ্রীষ্টানেরা পৌলের এই উপদেশ প্রয়োগ করে: “স্ত্রী স্বামীর নিকট হইতে চলিয়া না যাউক . . . আর স্বামীও স্ত্রীকে পরিত্যাগ না করুক।” (১ করিন্থীয় ৭:১০, ১১) বাস্তবিকই, বিবাহ একটি স্থায়ী বন্ধন হওয়ার ছিল, কারণ যীশু খ্রীষ্ট বলেছিলেন: “ঈশ্বর যাহার যোগ করিয়া দিয়াছেন, মনুষ্য তাহার বিয়োগ না করুক।”—মথি ১৯:৬.
৪ যে একটি বিদ্বেষপূর্ণ অথবা ভালবাসাহীন বিবাহের মধ্যে বাস করে, তার কাছে যিহোবার মান কঠোর এবং অযৌক্তিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তা নয়। বৈবাহিক বন্ধনের স্থায়িত্ব ঈশ্বরভীরু একটি দম্পতিকে সাহায্য করে তাদের সমস্যার সম্মুখীন হয়ে তার সমাধান করতে, সমস্যার প্রথম লক্ষণেই হাল ছেড়ে দিতে নয়। কুড়ি বছর ধরে বিবাহিত একজন ব্যক্তি বিষয়টিকে এইভাবে বলেছিলেন: “কখনও কখনও সমস্যা এড়ানো যায় না। একে অপরের প্রতি সবসময়ে সন্তুষ্ট থাকা যায় না। তখনই দায়িত্ববোধ সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।” অবশ্যই, বিবাহিত খ্রীষ্টীয় দম্পতিরা উপলব্ধি করে যে বিবাহের প্রবর্তক, যিহোবা ঈশ্বরের কাছে তাদের একটি প্রাথমিক দায়িত্ব আছে।—তুলনা করুন উপদেশক ৫:৪.
মস্তক-ব্যবস্থা এবং বশ্যতা
৫. স্বামী ও স্ত্রীদের দেওয়া পৌলের কিছু উপদেশ কী?
৫ সুতরাং, যখন সমস্যা দেখা দেয়, তখন মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজবার সময় নয়, কিন্তু ঈশ্বরের বাক্য আরও ভাল করে প্রয়োগ করবার সময়। উদাহরণস্বরূপ, ইফিষীয় ৫:২২-২৫, ২৮, ২৯ পদে দেওয়া পৌলের এই কথাগুলি বিবেচনা করুন: “নারীগণ, তোমরা যেমন প্রভুর, তেমনি নিজ নিজ স্বামীর বশীভূতা হও। কেননা স্বামী স্ত্রীর মস্তক, যেমন খ্রীষ্টও মণ্ডলীর মস্তক; তিনি আবার দেহের ত্রাণকর্ত্তা; কিন্তু মণ্ডলী যেমন খ্রীষ্টের বশীভূত, তেমনি নারীগণ সর্ব্ববিষয়ে আপন আপন স্বামীর বশীভূতা হউক। স্বামীরা, তোমরা আপন আপন স্ত্রীকে সেইরূপ প্রেম কর, যেমন খ্রীষ্টও মণ্ডলীকে প্রেম করিলেন, আর তাহার নিমিত্ত আপনাকে প্রদান করিলেন; এইরূপে স্বামীরাও আপন আপন স্ত্রীকে আপন আপন দেহ বলিয়া প্রেম করিতে বাধ্য। আপন স্ত্রীকে যে প্রেম করে, সে আপনাকেই প্রেম করে। কেহ ত কখনও নিজ মাংসের প্রতি দ্বেষ করে নাই, বরং সকলে তাহার ভরণ পোষণ ও লালন পালন করে; যেমন খ্রীষ্টও মণ্ডলীর প্রতি করিতেছেন।”
৬. জগতের লোকেদের থেকে খ্রীষ্টীয় স্বামীদের কিভাবে পৃথক হতে হবে?
৬ পুরুষেরা প্রায়ই স্বামী হিসাবে তাদের কর্তৃত্বের অপব্যবহার করে এবং তাদের স্ত্রীদের উপরে অধিকার চালায়। (আদিপুস্তক ৩:১৬) কিন্তু, পৌল খ্রীষ্টীয় স্বামীদের জগতের লোকেদের থেকে অন্যরকম হতে বলেছেন, খ্রীষ্টের মত হতে বলেছেন, যথেচ্ছাচারীদের মত তাদের স্ত্রীদের জীবনের ক্ষুদ্রতম বিষয়গুলিও নিয়ন্ত্রণ করতে বলেননি। অবশ্যই, মানুষ হিসাবে যীশু খ্রীষ্ট কখনও কঠোর বা উদ্ধত ছিলেন না। তিনি তাঁর অনুগামীদের সাথে সম্মান ও শ্রদ্ধাপূর্বক ব্যবহার করতেন। তিনি বলেছেন: “হে পরিশ্রান্ত ও ভারাক্রান্ত লোক সকল, আমার নিকটে আইস, আমি তোমাদিগকে বিশ্রাম দিব। আমার যোঁয়ালি আপনাদের উপরে তুলিয়া লও, এবং আমার কাছে শিক্ষা কর, কেননা আমি মৃদুশীল ও নম্রচিত্ত।”—মথি ১১:২৮, ২৯.
৭. একজন ব্যক্তির স্ত্রীকে যখন জাগতিক কাজ করতে হয়, তখন সে কিভাবে তাকে সম্মান দেখাতে পারে?
৭ দুর্বল পাত্র হিসাবে স্ত্রীর প্রতি একজন খ্রীষ্টীয় স্বামী সম্মান দেখান। (১ পিতর ৩:৭) উদাহরণস্বরূপ, হয়ত স্ত্রীকে জাগতিক কাজ করতে হয়। স্বামীর উচিত এই বিষয়টি মনে রেখে, যতদূর সম্ভব সাহায্যকারী ও সহানুভূতিশীল হওয়া। স্ত্রীরা বিবাহবিচ্ছেদের যে কারণগুলি দেখায়, তার মধ্যে একটি প্রধান কারণ হল, স্বামী ছেলেমেয়ে অথবা পরিবারকে অবহেলা করে। সুতরাং, খ্রীষ্টীয় স্বামী ঘরে তার স্ত্রীকে কার্যকারীরূপে সাহায্য করার উপায় খোঁজে, যা সম্পূর্ণ পরিবারের প্রতি উপকার আনে।
৮. খ্রীষ্টীয় স্ত্রীদের জন্য বশ্যতার অর্থ কী?
৮ সম্মানের সাথে ব্যবহার পেলে, স্বামীদের প্রতি বশ্যতা দেখাতে খ্রীষ্টীয় স্ত্রীদের সুবিধা হয়। কিন্তু এর অর্থ সম্পূর্ণরূপে দাসত্ব নয়। ঈশ্বর ঘোষণা করেছিলেন যে স্ত্রী একজন দাসী নয়, কিন্তু “পরিপূরক,” (“অনুরূপ অংশ,” টীকা, NW) পুরুষের পক্ষে উপযুক্ত হবে। (আদিপুস্তক ২:১৮) মালাখি ২:১৪ পদে, স্ত্রীকে পুরুষের “সখী” বলা হয়েছে। এইজন্য, বাইবেলের সময়ে, স্ত্রীয়েরা যথেষ্ট স্বাধীনতা ও ক্ষমতা উপভোগ করত। “গুণবতী ভার্য্যা” সম্বন্ধে বাইবেল বলেছে: “তাঁহার স্বামীর হৃদয় তাঁহাতে নির্ভর করে।” বাস্তবিকই, স্ত্রীকে গৃহের কাজ তত্ত্বাবধান করা, খাদ্য দ্রব্য কেনা, জমি-বাড়ি কেনার দেখাশোনা করা এবং ছোট কোন ব্যবসা করার ভার দেওয়া হত।—হিতোপদেশ ৩১:১০-৩১.
৯. (ক) বাইবেলের সময়ে ঈশ্বরভীরু নারীরা কিভাবে প্রকৃত বশ্যতা দেখাতেন? (খ) বর্তমানে একজন খ্রীষ্টীয় স্ত্রীকে বশীভূত থাকতে কী সাহায্য করবে?
৯ কিন্তু, ঈশ্বরভীরু স্ত্রী তার স্বামীর কর্তৃত্বকে স্বীকার করত। উদাহরণস্বরূপ, সারা ‘অব্রাহামের আজ্ঞা মানতেন, প্রভু বলে তাঁকে ডাকতেন,’ ভদ্রতার রীতিঅনুযায়ী নয়, কিন্তু তার বশ্যতা স্বীকারের আন্তরিক প্রকাশ হিসাবে। (১ পিতর ৩:৬; আদিপুস্তক ১৮:১২) এছাড়াও, তিনি স্বেচ্ছায় ঊর শহরে তাদের আরামদায়ক বাড়ি ছেড়ে, তার স্বামীর সাথে তাম্বুতে থাকতেন। (ইব্রীয় ১১:৮, ৯) কিন্তু বশ্যতার অর্থ এই নয় যে প্রয়োজন হলে একজন স্ত্রী কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। মোশি যখন ত্বক্ছেদ সম্বন্ধে ঈশ্বরের আইন পালন করতে অসমর্থ হয়েছিলেন, তখন তার স্ত্রী সিপ্পোরা সক্রিয় হয়ে কাজ করেছিলেন। (যাত্রাপুস্তক ৪:২৪-২৬) একজন অসিদ্ধ মানুষকে খুশি করা ছাড়াও আরও কিছু জড়িত আছে। স্ত্রীরা “যেমন প্রভুর, তেমনি নিজ নিজ স্বামীর বশীভূতা” হবে। (ইফিষীয় ৫:২২) একজন খ্রীষ্টীয় স্ত্রী যখন ঈশ্বরের সাথে তার সম্পর্কের কথা চিন্তা করে, তখন তা তার স্বামীর সামান্য কিছু ভুলত্রুটি উপেক্ষা করতে সাহায্য করে, ঠিক যেমন স্ত্রীর সঙ্গে ব্যবহারে স্বামীরও করা উচিত।
ভাববিনিময়—একটি বিবাহের জীবনীশক্তি
১০. বিবাহে ভাববিনিময় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
১০ একজন বিবাহবিচ্ছেদের উকিলকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় যে বিবাহ ভেঙে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণটি কী, তখন তিনি বলেছিলেন: “একে অপরের সাথে সততার সাথে কথা বলার, তাদের অন্তরের অনুভূতি প্রকাশ করার এবং একে অপরের সাথে বন্ধুর মত ব্যবহার করার অক্ষমতা।” হ্যাঁ, একটি দৃঢ় বিবাহের জীবনীশক্তি হল ভাববিনিময়। বাইবেল যেমন বলে, “মন্ত্রণার অভাবে সঙ্কল্প সকল ব্যর্থ হয়।” (হিতোপদেশ ১৫:২২) স্বামী ও স্ত্রীদের ‘অন্তরঙ্গ বন্ধু’ হতে হবে, নিজেদের মধ্যে একটি আন্তরিক, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উপভোগ করতে হবে। (হিতোপদেশ ২:১৭) কিন্তু, বহু দম্পতি ভাববিনিময়ের ক্ষেত্রে অস্বস্তি বোধ করে আর তাই অসন্তুষ্টি বাড়তে থাকে যতক্ষণ না একদিন ধ্বংসাত্মক রাগ ফেটে পড়ে। অথবা বিবাহসঙ্গীরা নিজেদের মনোভাব একটি পাতলা আবরণের নিচে লুকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু মানসিকভাবে একে অপরের থেকে বহু দূরে সরে যেতে পারে।
১১. স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কিভাবে ভাববিনিময়ের উন্নতি করা যায়?
১১ সমস্যার একটি অংশ মনে হয় যে পুরুষ এবং স্ত্রীদের ভাববিনিময় করার ধরণ প্রায়ই ভিন্ন প্রকৃতির হয়। অধিকাংশ নারী অনুভূতি আলোচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, কিন্তু পুরুষেরা বাস্তব আলোচনা করতে পছন্দ করে। নারীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সহানুভূতি এবং মানসিক সমর্থন দেখাতে ভালবাসে, কিন্তু পুরুষেরা সমাধান চায় ও দেয়। তবুও, যেখানে উভয় বিবাহসঙ্গী “শ্রবণে সত্বর, কথনে ধীর ক্রোধে ধীর” হতে নিশ্চিৎ থাকে, সেখানে ভাববিনিময় ভালভাবে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। (যাকোব ১:১৯) একে অপরের দিকে তাকান এবং মন দিয়ে শুনুন। সুবিবেচিত প্রশ্নের দ্বারা একে অপরের মনোভাব জানতে চেষ্টা করুন। (তুলনা করুন ১ শমূয়েল ১:৮; হিতোপদেশ ২০:৫) আপনার সঙ্গী যখন কোন সমস্যা ব্যক্ত করে, তখন তাড়াতাড়ি কোন সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করার পরিবর্তে, ভালভাবে শুনুন এবং পরিস্থিতিটি বিশ্লেষণ করুন। আর নম্রতার সাথে একসঙ্গে প্রার্থনা করুন, ঈশ্বরের নির্দেশ চান।—গীতসংহিতা ৬৫:২; রোমীয় ১২:১২.
১২. খ্রীষ্টীয় বিবাহসঙ্গীরা কিভাবে একে অপরের জন্য সময় করে নিতে পারে?
১২ কখনও কখনও, জীবনের সঙ্কট ও চাপের জন্য, বিবাহসঙ্গীদের কাছে অর্থপূর্ণ অর্থ কথা বলার জন্য অল্পই সময় অথবা ইচ্ছা থাকে। কিন্তু, খ্রীষ্টানদের যদি তাদের বিবাহকে সম্মানীয় রাখতে হয় এবং কলুষিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে হয়, তাহলে তাদের একে অপরের কাছাকাছি থাকতে হবে তাদের বন্ধনকে দুর্লভ, মূল্যবান হিসাবে দেখতে হবে এবং একে অপরের জন্য সময় করে নিতে হবে। (তুলনা করুন কলসীয় ৪:৫.) কিছু কিছু ক্ষেত্রে গঠনমূলক কথাবার্তার জন্য সময় করে নেওয়ার সমাধান, টিভি বন্ধ করে দেওয়ার মত সাধারণ হতে পারে। নিয়মিতভাবে একসঙ্গে বসে চা অথবা কফি খেলে বিবাহসঙ্গীরা ভাববিনিময় বজায় রাখতে পারে। এই সময়ে, তারা পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়ে ‘পরামর্শ’ করতে পারে। (হিতোপদেশ ১৩:১০) আর সামান্য কিছু অসুবিধা এবং ভুল বোঝার ঘটনা অশান্তির বিশাল কারণ হয়ে ওঠার আগেই সেগুলি সম্বন্ধে আলোচনা করা কত বিজ্ঞতার কাজ!—তুলনা করুন মথি ৫:২৩, ২৪; ইফিষীয় ৪:২৬.
১৩. (ক) সততা ও মনখোলাভাব সম্বন্ধে যীশু কী উদাহরণ দিয়েছিলেন? (খ) কী কী উপায়ে বিবাহসঙ্গীরা একে অপরের নিকটবর্তী হতে পারে?
১৩ একজন ব্যক্তি স্বীকার করেছিলেন: “প্রায়ই, আমার মনের কথা বলতে এবং আমি কী অনুভব করি, [আমার স্ত্রীকে] প্রকৃতই তা জানাতে আমার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।” কিন্তু, মনের কথা জানানো, ঘনিষ্ঠতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যীশু তাঁর ভার্যা শ্রেণীর সম্ভাব্য সদস্যদের প্রতি কত মন-খোলা ও সৎ ছিলেন তা লক্ষ্য করুন। তিনি বলেছিলেন: “আমি তোমাদিগকে আর দাস বলি না, কেননা প্রভু কি করেন, দাস তাহা জানে না; কিন্তু তোমাদিগকে আমি বন্ধু বলিয়াছি, কারণ আমার পিতার নিকটে যাহা যাহা শুনিয়াছি, সকলই তোমাদিগকে জ্ঞাত করিয়াছি।” (যোহন ১৫:১৫) সুতরাং, আপনার সঙ্গীকে একজন বন্ধু মনে করুন। আপনার অনুভূতি তাকে জানান। সাধারণ, সৎভাবে “প্রেমের অভিব্যক্তি” জানান। (পরমগীত ১:২, NW) মনখোলা ভাববিনিময় কখনও কখনও অস্বস্তিজনক হতে পারে, কিন্তু যদি উভয় বিবাহসঙ্গীই যথেষ্ট চেষ্টা করে, তাহলে তাদের বিবাহকে স্থায়ী বন্ধন করে তুলতে তারা অনেক কিছু সম্পাদন করতে পারে।
মতবিরোধের মোকাবিলা করা
১৪, ১৫. ঝগড়াবিবাদ কিভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায়?
১৪ প্রকৃত মতবিরোধ কখনও কখনও দেখা দেবেই। কিন্তু আপনার গৃহকে যে ‘বিবাদযুক্ত’ হয়ে পড়তে হবে, তা নয়। (হিতোপদেশ ১৭:১) ছেলেমেয়েদের সামনে কোন সূক্ষ্ম বিষয় আলোচনা করা থেকে সাবধান থাকুন এবং আপনার সঙ্গীর অনুভূতির প্রতি বিবেচনা দেখান। বন্ধ্যা হওয়ার জন্য রাহেল যখন উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এবং যাকোবকে বলেছিলেন তাকে সন্তান দিতে, তখন যাকোব রেগে গিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন: “আমি কি ঈশ্বরের প্রতিনিধি? তিনিই তোমাকে গর্ব্ভফল দিতে অস্বীকার করিয়াছেন।” (আদিপুস্তক ৩০:১, ২) যদি পারিবারিক সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সমস্যাটির মোকাবিলা করুন, সেই ব্যক্তির নয়। ব্যক্তিগত আলোচনার সময়ে, “অবিবেচনার কথা” বলা অথবা বিনা কারণে একে অপরের কথায় বাধা দেওয়া এড়িয়ে চলুন।—হিতোপদেশ ১২:১৮.
১৫ হ্যাঁ, আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আপনার দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে পারে, কিন্তু সেগুলি “কটুকাটব্য, রোষ, ক্রোধ, কলহ, নিন্দা” ছাড়াই প্রকাশ করা যায়। (ইফিষীয় ৪:৩১) “আপনার সমস্যা সাধারণ কণ্ঠস্বর রেখে আলোচনা করুন,” একজন স্বামী বলেছিলেন। “যদি কেউ রেগে যায়, তাহলে আলোচনা থামিয়ে দিন। কিছুক্ষণ পরে ফিরে আসুন। আবার শুরু করুন।” হিতোপদেশ ১৭:১৪ পদ এই সদুপদেশ দেয়: “উচ্চণ্ড হইবার পূর্ব্বে বিবাদ ত্যাগ কর।” যখন দুজনেই শান্ত হয়ে আসবেন, তখন আবার আলোচনা করার চেষ্টা করুন।
একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকুন
১৬. পারদার্য অত্যন্ত গুরুতর বিষয় কেন?
১৬ ইব্রীয় ১৩:৪ পদ বল: “সকলের মধ্যে বিবাহ আদরণীয় ও সেই শয্যা বিমল [হউক]; কেননা ব্যভিচারীদের ও বেশ্যাগামীদের বিচার ঈশ্বর করিবেন।” পারদার্য হল ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ। পারদার্য বিবাহতেও প্রবল সঙ্কট নিয়ে আসে। (আদিপুস্তক ৩৯:৯) একজন বিবাহ উপদেষ্টা লিখেছেন: “প্রকাশিত হয়ে পড়লে, পারদার্য সম্পূর্ণ পরিবারকে চূর্ণ করে দেয়, আস্থা ও আত্মসম্মানকে ভেঙে দেয়, ছেলেমেয়েদের ক্ষতি করে।” গর্ভাবস্থা অথবা যৌন রোগও হতে পারে।
১৭. পারদার্যের প্রতি ঝোঁক কিভাবে এড়ানো বা পরিত্যাগ করা যেতে পারে?
১৭ গল্পের বই, টিভি অথবা সিনেমাতে যেমনভাবে যৌনতার প্রতি এই জগতের বিকৃত মনোভাব ব্যক্ত করা হয়, তা গ্রহণ করে কিছু ব্যক্তি পারদার্যের প্রতি ঝোঁক দেখায়। (গালাতীয় ৬:৮) যদিও গবেষকেরা বলেন যে, সাধারণত পারদার্য যৌন আকাঙ্ক্ষার জন্য নয়, কিন্তু নিজেকে এখনও আকর্ষণীয় দেখানোর অথবা আরও বেশি ভালবাসা পাওয়ার কাল্পনিক প্রয়োজনের জন্য হয়। (তুলনা করুন হিতোপদেশ ৭:১৮.) কারণ যাই হোক না কেন, একজন খ্রীষ্টানকে অনৈতিক সুখাভিলাষের চিন্তা করা পরিত্যাগ করতেই হবে। আপনার অনুভূতি সততার সাথে আপনার সঙ্গীর সাথে আলোচনা করুন। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে মণ্ডলীর প্রাচীনদের থেকে বিরত করা যেতে পারে। এছাড়াও, বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের সাথে আচার ব্যবহারে খ্রীষ্টানদের সতর্কতা দেখাতে হবে। একজনের সাথে বিবাহিত থেকে আরেকজনের প্রতি আকাঙ্ক্ষা রাখা শাস্ত্রসঙ্গত হবে না। (ইয়োব ৩১:১; মথি ৫:২৮) সহকর্মীদের সাথে বন্ধন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খ্রীষ্টানদের বিশেষত সাবধান থাকতে হবে। এই ধরনের সম্পর্কগুলি বন্ধুত্বপূর্ণ কিন্তু ব্যবসাসুলভ রাখুন।
১৮. প্রায়ই বৈবাহিক যৌন সমস্যার মূল কোথায় এবং এগুলির সমাধান কিভাবে করা যায়?
১৮ এর থেকেও বড় সাবধানতা হল একজনের বিবাহসঙ্গীর সাথে আন্তরিক, মনখোলা সম্পর্ক থাকা। বহু গবেষকেরা বলেন যে বিবাহের মধ্যে যৌন সমস্যা কদাচিৎ দৈহিক কারণে হয়, কিন্তু সাধারণত তা ভাববিনিময়ের অভাবের ফলে হয়। এই ধরনের সমস্যা খুবই কম দেখা দেয় যদি কোন দম্পতি খোলাখুলিভাবে ভাববিনিময় করে এবং প্রেমের অভিব্যক্তি হিসাবে বৈবাহিক প্রাপ্য দেয়, কর্তব্য হিসাবে নয়।a এইধরনের উপযুক্ত পরিস্থিতিতে, আন্তরিক সম্পর্ক বৈবাহিক বন্ধনকে দৃঢ় করে তুলতে পারে।—১ করিন্থীয় ৭:২-৫; ১০:২৪.
১৯. “সিদ্ধির যোগবন্ধন” কী এবং বিবাহের উপরে তা কী প্রভাব নিয়ে আসতে পারে?
১৯ খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীর মধ্যে প্রেম হল “সিদ্ধির যোগবন্ধন।” প্রেম বাড়িয়ে তোলার মাধ্যমে, কোন ঈশ্বরভীরু বিবাহিত দম্পতি ‘সহনশীল হতে পারে এবং পরস্পরকে ক্ষমা করতে পারে।’ (কলসীয় ৩:১৩, ১৪) নীতিবদ্ধ প্রেম অপরের মঙ্গল করতে চায়। (১ করিন্থীয় ১৩:৪-৮) এই ধরনের প্রেম গড়ে তুলুন। আপনার বিবাহ বন্ধন দৃঢ় করে তুলতে তা সাহায্য করবে। আপনার বৈবাহিক জীবনে বাইবেলের নীতি প্রয়োগ করুন। যদি আপনি তা করেন, তাহলে আপনার বিবাহ একটি স্থায়ী বন্ধন হয়ে উঠবে এবং যিহোবা ঈশ্বরের প্রতি প্রশংসা ও সম্মান নিয়ে আসবে।
[পাদটীকাগুলো]
a আগস্ট ১, ১৯৯৩ সালের প্রহরীদুর্গ পত্রিকায় প্রকাশিত “ভাববিনিময়—কথা বলার থেকে আরও বেশি কিছু” প্রবন্ধটি এই ধরনের সমস্যার সমাধান দম্পতিরা কিভাবে করতে পারে, তা দেখিয়েছিল।
আপনি কিভাবে উত্তর দেবেন?
▫ বিবাহ কেন স্থায়ী বন্ধন হওয়া উচিত?
▫ মস্তক-ব্যবস্থা এবং বশ্যতা সম্বন্ধে বাইবেলের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
▫ বিবাহিত দম্পতিরা কিভাবে ভাববিনিময়ের উন্নতি করতে পারে?
▫ দম্পতিরা কিভাবে খ্রীষ্টীয় উপায়ে মতবিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারে?
▫ বৈবাহিক বন্ধনকে কী আরও দৃঢ় করে তুলবে?
[Pictures on page 25]
একজন স্ত্রীকে যদি জগতিক কাজ করতেই হয়, একজন খ্রীষ্টীয় স্বামী তার উপরে খুব বেশি চাপ এসে পড়তে দেবেন না।