সৃষ্টি বলে, “তাহাদের উত্তর দিবার পথ নাই”
“তাঁহার অদৃশ্য গুণ, অর্থাৎ তাঁহার অনন্ত পরাক্রম ও ঈশ্বরত্ব, জগতের সৃষ্টিকাল অবধি তাঁহার বিবিধ কার্য্যে বোধগম্য হইয়া দৃষ্ট হইতেছে, এ জন্য তাহাদের উত্তর দিবার পথ নাই।”—রোমীয় ১:২০.
১, ২. (ক) ইয়োব যিহোবার কাছে কি তিক্ত অভিযোগ করেছিলেন? (খ) পরে ইয়োবের মনোভাবের কি পরিবর্তন হয়েছিল?
ইয়োব, প্রাচীন কালের এক ব্যক্তি যার যিহোবা ঈশ্বরের প্রতি অখণ্ডণীয় বিশ্বস্ততা ছিল, শয়তানের দ্বারা তাকে এক ভয়ঙ্কর পরীক্ষায় পড়তে হয়েছিল। দিয়াবল ইয়োবের সমস্ত ধনসম্পত্তি নষ্ট করিয়ে দিয়েছিল, তার পুত্রকন্যাদের মৃত্যু ঘটিয়েছিল এবং তাকে এক ঘৃণ্য রোগে আক্রান্ত করেছিল। ইয়োব ভেবেছিলেন ঈশ্বর তার উপর এই সমস্ত দুঃখক্লেশ এনেছেন, তাই তিনি যিহোবার কাছে তিক্ততার সাথে অভিযোগ করেছিলেন: “এটি কি ভাল যে, তুমি উপদ্রব করিবে, . . . সেই জন্য কি আমার অপরাধের অনুসন্ধান করিতেছ, আমার পাপের অন্বেষণ করিতেছ? তুমি ত জান আমি দুষ্ট নহি?”—ইয়োব ১:১২-১৯; ২:৫-৮; ১০:৩, ৬, ৭.
২ এর কিছু পরে, ঈশ্বরের প্রতি ইয়োবের বাক্যে সম্পূর্ণ বিপরীত মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছিল: “সত্য, আমি তাহাই বলিয়াছি, যাহা বুঝি নাই, যাহা আমার পক্ষে অদ্ভুত, আমার অজ্ঞাত। পূর্ব্বে তোমার বিষয় কর্ণে শুনিয়াছিলাম, কিন্তু সম্প্রতি আমার চক্ষু তোমাকে দেখিল। এই নিমিত্ত আমি আপনাকে ঘৃণা করিতেছি, ধূলায় ও ভস্মে বসিয়া অনুতাপ করিতেছি।” (ইয়োব ৪২:৩, ৫, ৬) কি ঘটেছিল যা ইয়োবের মনোভাব পরিবর্তন করে?
৩. সৃষ্টি সম্পর্কে ইয়োব কোন্ নুতন দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছিলেন?
৩ মধ্যবর্তী সময়ে, যিহোবা ঘূর্ণবায়ুর মধ্য থেকে ইয়োবের সম্মুখীন হয়েছিলেন। (ইয়োব ৩৮:১) তিনি তাকে বহু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। ‘যখন আমি পৃথিবীর ভিত্তিমূল স্থাপন করি, তখন তুমি কোথায় ছিলে? কে কবাট দিয়ে সমুদ্রকে রুদ্ধ করেছিল ও কতটা পর্যন্ত তার তরঙ্গ আসতে পারবে সেই সীমা নির্ধারণ করেছিল? তুমি কি মেঘ থেকে পৃথিবীর উপরে বৃষ্টি নামাতে পার? তুমি কি তৃণ উৎপন্ন করাতে পার? তুমি কি নক্ষত্রের হার গাঁথতে পার ও রাশিগণকে নিজ নিজ ঋতুতে চালাতে পার?’ ইয়োবের বিবরণ পুস্তকে ৩৮ থেকে ৪১ সমস্ত অধ্যায়গুলিতে, যিহোবা ইয়োবের প্রতি এই প্রশ্নগুলি এবং তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কীয় আরো বহু প্রশ্ন বর্ষণ করেছিলেন। ঈশ্বর ও মানুষের মাঝে যে দুস্তর ব্যবধান তা তিনি ইয়োবকে দেখান, খুব ভালভাবে ইয়োবকে স্মরণ করিয়ে দেন তাঁর প্রজ্ঞা ও শক্তি সম্পর্কে যা প্রতিফলিত হয় ঈশ্বরের সৃষ্টির মধ্যে, যেগুলি সম্পন্ন করা ইয়োবের ক্ষমতার অসাধ্য অথবা এমনকি বোঝবারও। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে প্রকাশিত সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের বিস্ময়কর শক্তি ও প্রজ্ঞায় অভিভূত হয়ে, ইয়োব চিন্তা করতেও ভয় পেয়েছিল যে যিহোবার সাথে তর্ক করার সাহস তার হয়েছিল। তাই সে বলেছিল: “পূর্ব্বে তোমার বিষয় কর্ণে শুনিয়াছিলাম, কিন্তু সম্প্রতি আমার চক্ষু তোমাকে দেখিল।”—ইয়োব ৪২:৫.
৪. যিহোবার সৃষ্টির মধ্যে আমাদের কি প্রত্যক্ষ করা উচিৎ, এবং যারা তা করে না তাদের পরিস্থিতি কি?
৪ বহু শতাব্দী পরে একজন অনুপ্রাণিত বাইবেল লেখক নিশ্চিতভাবে বলেন যে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যিহোবার গুণাবলী প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে। প্রেরিত পৌল রোমীয় ১:১৯, ২০ পদে লিখেছিলেন: “ঈশ্বরের বিষয়ে যাহা জানা যাইতে পারে, তাহা তাহাদের মধ্যে সপ্রকাশ আছে, কারণ ঈশ্বর তাহা তাহাদের কাছে প্রকাশ করিয়াছেন। ফলতঃ তাঁহার অদৃশ্য গুণ, অর্থাৎ তাঁহার অনন্ত পরাক্রম ও ঈশ্বরত্ব, জগতের সৃষ্টিকাল অবধি তাঁহার বিবিধ কার্য্যে বোধগম্য হইয়া দৃষ্ট হইতেছে, এ জন্য তাহাদের উত্তর দিবার পথ নাই।”
৫. (ক) মানুষের কোন্ সহজাত প্রবৃত্তি রয়েছে এবং কিছু লোকে কিভাবে অনুচিৎ উপায়ে তা পূর্ণ করে? (খ) আথীনীতে গ্রীকদের প্রতি পৌলের কি সুপারিশ ছিল?
৫ মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছিল আরো উচ্চ কোন শক্তিকে উপাসনা করার সহজাত প্রবণতা নিয়ে। ডা. কে. জি. জাং, তার বই দি আন্ডিসকভারড্ সেলফ্-এ এই প্রবণতাকে এইভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে তা “বিশেষভাবে মানুষের এক স্বভাব-জাত মনোভাব এবং সমগ্র মানব-ইতিহাস অনুসরণ করলে এর প্রকাশ দেখা যায়।” প্রেরিত পৌল মানুষের উপাসনার এই সহজাত প্রবৃত্তি সম্বন্ধে বলেছিলেন, যা ব্যাখ্যা দেয় কেন আথীনীতে গ্রীকেরা পরিচিত এবং অপরিচিত দেবতার মুর্তি ও বেদী তৈরি করেছিল। পৌল আরও তাদের সত্য ঈশ্বরকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন যে সত্য ঈশ্বর যিহোবার অন্বেষণ করে সঠিকভাবে তাদের এই সহজাত প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করা উচিৎ, “যদি কোন মতে হাঁতড়িয়া হাঁতড়িয়া তাঁহার উদ্দেশ পায়; অথচ তিনি আমাদের কাহারও হইতে দূরে নহেন।” (প্রেরিত ১৭:২২-৩০) তাঁর সৃষ্টির যত কাছাকাছি আমরা যাই, তত ভালভাবে আমরা তাঁর গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যসকলের পরিচয় পাই।
বিস্ময়কর জলস্রোত চক্র
৬. জলস্রোত চক্রের মধ্যে আমরা যিহোবার কোন্ গুণাবলী দেখি?
৬ উদাহরণস্বরূপ, তুলার মত মেঘ যা টন টন জল ধরে রাখে, সেগুলির ক্ষমতা থেকে আমরা যিহোবার কোন্ গুণাবলীর পরিচয় পাই? আমরা তাঁর প্রেম ও প্রজ্ঞা দেখতে পাই, কারণ এইভাবে তিনি পৃথিবীর আশীর্বাদের জন্য বৃষ্টির জল দেন। তিনি তা করেন সেই অপূর্ব পরিকল্পনা দ্বারা যা উপদেশক ১:৭ পদে উল্লেখিত, জলস্রোত চক্রের সাথে জড়িত আছে: “জলস্রোত সকল সমুদ্রে প্রবেশ করে, তথাচ সমুদ্র পূর্ণ হয় না; জলস্রোত সকল যে স্থানে যায়, সেই স্থানে পুনরায় চলিয়া যায়।” বাইবেলে ইয়োবের পুস্তক নির্দিষ্টভাবে বলে কিভাবে তা ঘটে।
৭. জল কিভাবে সমুদ্র থেকে মেঘে পৌঁছায় এবং হালকা মেঘ কিভাবে টন টন জল ধরে রাখে?
৭ জলস্রোত যখন সমুদ্রে প্রবেশ করে, তখন সেখানে তা থাকে না। যিহোবা “সমুদ্র হইতে জলের বিন্দু সকল আকর্ষণ করেন, সেগুলি তাঁহার কৃত বাষ্প হইতে বৃষ্টিরূপে পড়ে।” যেহেতু জল বাষ্পে আকারে ও অতি সূক্ষ্ম কুয়াশা রূপে থাকে, “মেঘমালা ভারসাম্য রেখে উপরে দোলে, পরম জ্ঞানীর আশ্চর্য দক্ষ ক্রিয়া।” (ইয়োব ৩৬:২৭; ৩৭:১৬; দি নিউ ইংলিশ বাইবেল) মেঘমালা ভাসতে থাকে যতক্ষণ তা কুয়াশারূপে থাকে: “তিনি স্বীয় নিবিড় মেঘে জল বদ্ধ করেন, তথাপি জলধর তাহার ভারে বিদীর্ণ হয় না।” অথবা আর একটি অনুবাদ বলে: “ঘন মেঘ-সমষ্টিতে তিনি জল রুদ্ধ করে রাখেন, কিন্তু তার ভারে মেঘগুলি ভেঙ্গে পড়ে না।”—ইয়োব ২৬:৮, দি যিরূশালেম বাইবেল; NE.
৮. কোন্ বিভিন্ন ধাপগুলি দ্বারা “আকাশের কুপাগুলি” উল্টান হয় এবং জলস্রোত চক্র পূর্ণ হয়?
৮ এই “আকাশের কুপাগুলি—কে উল্টাইতে পারে” যাতে পৃথিবীতে বৃষ্টি পড়ে? (ইয়োব ৩৮:৩৭) একজনই যাঁর “পরম জ্ঞানী আশ্চর্য দক্ষ ক্রিয়া” সেগুলিকে প্রথমত সেখানে স্থাপন করেছে, যাঁর “কৃত বাষ্প বৃষ্টিরূপে পড়ছে।” আর বাষ্প থেকে বৃষ্টির ফোঁটা তৈরি করতে কিসের প্রয়োজন? অবশ্যই অণুপরিমাণ কঠিন পদার্থের, যেমন ধূলি অথবা লবণের কণা—বাতাসের প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে লক্ষ লক্ষ এরূপ কণা—পরমাণুকেন্দ্র হিসাবে কাজ করতে যাতে জলের ফোঁটা তৈরি হতে পারে। হিসাব করা হয়েছে যে দশ লক্ষ মেঘকণার প্রয়োজন হয় একটি সাধারণ বৃষ্টিফোঁটা তৈরি করতে। এত সমস্ত কিছু হওয়ার পরেই মেঘমালা পৃথিবীতে বৃষ্টি বর্ষণ করতে পারে যা জলস্রোত রূপে সমুদ্রে ফিরে যায়। এইভাবে জলস্রোত তার চক্র পূর্ণ করে। আর এ সমস্তই কি ঘটে কোন নির্দেশনা ছাড়াই? হ্যাঁ, “উত্তর দেবার পথ নেই,” বাস্তবিকই!
শলোমনের জ্ঞানের একটি উৎস
৯. এক জাতের পিপীলিকা সম্বন্ধে শলোমন কোন্ উল্লেখযোগ্য বিষয় লক্ষ্য করেছিলেন?
৯ প্রাচীন জগতে, শলোমনের প্রজ্ঞার কোন তুলনা ছিল না। এই প্রজ্ঞার বৃহদংশই যিহোবার সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করত: “[শলোমন] লিবানোনের এরস বৃক্ষ হইতে প্রাচীরের গাত্রে উৎপন্ন এসোব তৃণ পর্য্যন্ত গাছ সকলের বর্ণনা করিতেন, এবং পশু, পক্ষী, উরোগামী জন্তু ও মৎস্যের বর্ণনা করিতেন।” (১ রাজাবলি ৪:৩৩) ঐ একই রাজা শলোমন যিনি লিখেছিলেন: “হে অলস, তুমি পিপীলিকার কাছে যাও, তাহার ক্রিয়া সকল দেখিয়া জ্ঞানবান হও। তাহার বিচারকর্ত্তা কেহ নাই, শাসনকর্ত্তা কি অধ্যক্ষ কেহ নাই, তবু সে গ্রীষ্মকালে আপন খাদ্য প্রস্তুত করে, শস্য কাটিবার সময়ে ভক্ষ্য সঞ্চয় করে।”—হিতোপদেশ ৬:৬-৮.
১০. খাদ্য প্রস্তুতকারী পিপীলিকা সম্পর্কে শলোমনের উদাহরণের সত্যতা কিভাবে প্রমাণিত হয়?
১০ পিপীলিকাদের কে শিখিয়েছিলেন গ্রীষ্মকালে ভক্ষ্য সঞ্চয় করে রাখতে যাতে শীতে তাদের খাদ্যের অভাব না হয়? খাদ্য প্রস্তুত করে শীতকালে ব্যবহারের জন্য পিপীলিকাদের সঞ্চয় করে রাখার শলোমনের এই বিবরণের সত্যতা সম্বন্ধে বহু শতাব্দী ধরে সন্দেহ ছিল। এগুলির অস্তিত্বের কোন প্রমাণ কেউ খুঁজে পায়নি। কিন্তু, ১৮৭১ সালে, এক ব্রিটিশ প্রাণিতত্ত্ববিদ্ মাটির তলায় তাদের খাদ্যের গোলাঘর আবিষ্কার করেন এবং তাদের সম্বন্ধে বাইবেল তথ্যের সত্যতা সমর্থিত হয়। কিন্তু পিপীলিকারা শীতকাল যে আসছে তা গ্রীষ্মকালে জানবার দূরদৃষ্টি এবং এ সম্বন্ধে কি করতে হবে সেই প্রজ্ঞা কিভাবে লাভ করত? বাইবেল নিজেই ব্যাখ্যা করে যে যিহোবার বহু সৃষ্টির মধ্যেই তাদের বেঁচে থাকার জন্য সহজাত এক প্রজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। খাদ্য-প্রস্তুতকারী পিপীলিকারা তাদের সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে এই আশীর্বাদ লাভের এরূপ গ্রাহক। হিতোপদেশ ৩০:২৪ এ সম্বন্ধে বলে: “তাহারা বড় বুদ্ধি ধরে।” এরূপ প্রজ্ঞা যে আকস্মিক ঘটনা তা বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক; এর পিছনে এক পরম জ্ঞানী স্রষ্টা আছেন তা বুঝতে অক্ষম হলে উত্তর দেওয়ার পথ থাকে না।
১১. (ক) বৃহৎকায় সিকোয়া বৃক্ষ কেন এত বিস্ময়কর? (খ) ফোটোসিন্থেসিসের প্রথম প্রতিক্রিয়াটির মধ্যে আশ্চর্যের বিষয়টি কি?
১১ বৃহৎকায় এক সিকোয়া বৃক্ষের পাদদেশে দাঁড়িয়ে, তার বিশাল উচ্চতায় অভিভূত হয়ে, একটি মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই নিজেকে এক ক্ষুদ্র পিপীলিকার মত মনে করে। গাছটির আয়তন সত্যই বিস্ময়কর: ৯০ মিটার উঁচু, ব্যাস ১১ মিটার, ছাল ০.৬ মিটার পুরু, শিকড় তিন অথবা চার একরের উপর জমিতে বিস্তৃত। তবুও, অনেক বেশী বিস্ময়কর সেই রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা তত্ত্ব যা এর বৃদ্ধির সাথে যুক্ত রয়েছে। এর পাতাগুলি শিকড় থেকে জল, বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং সূর্য থেকে শক্তি নেয় শর্করা তৈরি করতে ও অক্সিজেন নির্গত করতে—এক প্রক্রিয়া যাকে বলা হয় ফোটোসিন্থেসিস্ ও যার সাথে যুক্ত রয়েছে ৭০টি রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া, যার অনেকগুলিই বোধগম্য নয়। আশ্চর্যের বিষয়, প্রথম প্রতিক্রিয়াটি নির্ভর করে সূর্য থেকে পাওয়া সঠিক রঙের ও সঠিক তরঙ্গ-দৈর্ঘের আলোর উপর; যা না হলে ফোটোসিন্থেসিস্ প্রক্রিয়া আরম্ভ করার জন্য ক্লোরোফিল অণুগুলি তা গ্রহণ করতে পারবে না।
১২. (ক) সিকোয়া গাছের জলের ব্যবহারের মধ্যে লক্ষ্যণীয় কি আছে? (খ) উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য নাইট্রোজেনের প্রয়োজন কেন এবং এর চক্র কিভাবে পূর্ণ হয়?
১২ আরো বিস্ময়কর যে গাছটি শিকড় থেকে ৯০ মিটার উঁচু এর বিশাল আকৃতির একেবারে উপরে জলের স্তম্ভকে টেনে তুলতে পারে। ফোটোসিন্থেসিস্রে জন্য যা প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশী জল টেনে তোলা হয়। বাড়তি জল পাতার মধ্যে দিয়ে ত্বক-নিঃসরণ প্রক্রিয়ায় বাতাসে বার করে দেওয়া হয়। ঘাম নিঃসরণ দ্বারা যেমন আমরা শীতল থাকি, গাছটি এইভাবে জল দ্বারা ঠান্ডা থাকে। বৃদ্ধির জন্য প্রোটিন তৈরি করতে হলে, শর্করা অথবা কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন নাইট্রোজেনের। পাতা বাতাস থেকে পাওয়া নাইট্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করতে পারে না, কিন্তু মাটির জৈব পদার্থগুলি নাইট্রোজেন গ্যাসকে জলে দ্রবনীয় নাইট্রেট্ ও নাইট্রাইটে রূপান্তরিত করতে পারে, যা তারপর শিকড় থেকে পাতায় গিয়ে পৌঁছায়। যখন উদ্ভিদ ও জীবজন্তুরা যারা তাদের প্রোটিনের জন্য এই নাইট্রোজেন ব্যবহার করেছে মারা গিয়ে পচে যায়, তখন ওই নাইট্রোজেন মুক্ত হয় ও এইভাবে নাইট্রোজেন চক্র পূর্ণ করে। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে, যে জটিলতা জড়িয়ে রয়েছে তা বিস্ময়কর, কোন পরিকল্পনা অথবা নির্দেশ ব্যতীত আকস্মিক কোন ঘটনা দ্বারা এই কাজ সম্পন্ন হওয়া অসম্ভব।
ভাষা অথবা শব্দ অথবা কণ্ঠস্বর ছাড়াই, তারা কথা বলে!
১৩. তারকা-শোভিত আকাশমণ্ডল দায়ূদের কাছে কি ঘোষণা করেছিল, এবং তারা আমাদের কাছেও কি বলে চলে?
১৩ তারকা-শোভিত রাতের এক আকাশ যা দর্শককে শ্রদ্ধায় ভরে তোলে, স্রষ্টাকে কি বিস্ময়করভাবেই না প্রতিফলিত করে! গীতসংহিতা ৮:৩, ৪ পদে, দায়ূদ তার বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন: “আমি তোমার অঙ্গুলি-নির্ম্মিত আকাশ-মণ্ডল, তোমার স্থাপিত চন্দ্র ও তারকামালা নিরীক্ষণ করি, বলি, মর্ত্ত্য কি যে, তুমি তাহাকে স্মরণ কর? মনুষ্য-সন্তান বা কি যে, তাহার তত্ত্বাবধান কর?” যাদের দেখবার চোখ আছে, শোনবার কান আছে এবং উপলব্ধি করার এক হৃদয় আছে, এই তারকা-শোভিত আকাশমণ্ডল তাদের কাছে কথা বলে, যেমন তারা বলেছিল দায়ূদের কাছে: “আকাশমণ্ডল ঈশ্বরের গৌরব বর্ণনা করে।”—গীতসংহিতা ১৯:১-৪.
১৪. নক্ষত্রদের মধ্যে একটির শক্তির প্রাবল্য আমাদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
১৪ যত বেশী আমরা তারাদের সম্বন্ধে জানি, তত বেশী তারা আমাদের সাথে কথা বলে। যিশাইয় ৪০:২৬ পদে তাদের প্রচণ্ড শক্তি লক্ষ্য করতে আমাদের আহ্বান জানানো হয়: “ঊর্দ্ধদিকে চক্ষু তুলিয়া দেখ, ঐ সকলের সৃষ্টি কে করিয়াছে? তিনি বাহিনীর ন্যায় সংখ্যানুসারে তাহাদিগকে বাহির করিয়া আনেন, সকলের নাম ধরিয়া তাহাদিগকে আহ্বান করেন; তাঁহার সামর্থ্যের আধিক্য ও শক্তির প্রাবল্য প্রযুক্ত তাহাদের একটাও অনুপস্থিত থাকে না।” মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এবং এদের মধ্যে একটির, আমাদের সূর্যের শক্তি পৃথিবীকে তার কক্ষপথে ধরে রাখে, উদ্ভিদ জন্মায় ও আমাদের উষ্ণ রাখে, পৃথিবীতে সমস্ত জীবন সম্ভব করে। প্রেরিত পৌল অনুপ্রাণিত হয়ে বলেছিলেন: “তেজ সম্বন্ধে একটি নক্ষত্র হইতে অন্য নক্ষত্র ভিন্ন।” (১ করিন্থীয় ১৫:৪১) বিজ্ঞান আমাদের সূর্যের মত হরিৎবর্ণ নক্ষত্রদের জানে, তা ছাড়াও জানে নীল নক্ষত্রদের, লোহিত দৈত্যদের, শ্বেত বামনদের, নিউট্রন নক্ষত্রদের, এবং বিস্ফোরিত হতে থাকা অতিনোভাদের যেগুলি ধারণার অতীত শক্তি বিকিরণ করে।
১৫. অনেক আবিষ্কারকেরা সৃষ্টি থেকে কি শিখেছে এবং অনুকরণ করার চেষ্টা করেছে?
১৫ অনেক আবিষ্কারকেরা সৃষ্টি থেকে শিখেছে এবং জীবিত প্রাণীদের দক্ষতা অনুকরণ করার চেষ্টা করেছে। (ইয়োব ১২:৭-১০) সৃষ্টির শুধুমাত্র কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করুন। সামুদ্রিক পাখীদের গ্ল্যাণ্ডগুলি যা সমুদ্রের জলকে লবণমুক্ত করে; ইল ও অন্যান্য মাছ যারা বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে; মাছ, কীট ও পোকারা যারা শীতল আলো তৈরি করে; বাদুড় ও শুশুক যারা শব্দ-ধ্বনি (Sonar) ব্যবহার করে; বোলতা যারা কাগজ তৈরি করে; পিপীলিকা যারা সেতু তৈরি করে; বীবর যারা বাঁধ বাঁধে; সাপেরা যাদের দেহের অভ্যন্তরে থার্মোমিটার রয়েছে; জলাশয়ের পোকারা যারা স্নর্কেল ও ডাইভিং বেল ব্যবহার করে; অক্টোপাস যারা জেট্-গতিশক্তি ব্যবহার করে; মাকড়সা যারা সাত রকমের জাল বোনে ও ফাঁদ-দরজা, জাল এবং ল্যাসো তৈরী করে আর বাচ্চা মাকড়সার জন্ম দেয় যারা বেলুনে চড়ার মত অনেক উঁচু দিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করে; মাছ ও কঠিন খোলাযুক্ত প্রাণীরা যারা সাবমেরিনের মত ভাসমান ট্যাঙ্ক ব্যবহার করে; আর পাখি, কীটপতঙ্গ, সামুদ্রিক কচ্ছপ, মাছ এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীরা যারা এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার অত্যাশ্চর্য কৃতিত্ব দেখায়—দক্ষতা যা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা করার শক্তির বাইরে।
১৬. বিজ্ঞানের আবিষ্কারের পূর্বেই কোন্ বৈজ্ঞানিক সত্যগুলি হাজার হাজার বছর পূর্বে বাইবেল লিপিবদ্ধ করে রেখেছিল?
১৬ বিজ্ঞানের জানবার আগেই বৈজ্ঞানিক সত্যগুলি হাজার হাজার বছর পূর্বেই বাইবেল লিপিবদ্ধ করে রেখেছিল। পাস্তুরের বহু হাজার বছর পূর্বে মোশির নিয়মে (১৬শ শতাব্দী সা.শ.পূ) রোগবীজানু সম্বন্ধে সচেতনতা প্রতিফলিত হয়েছিল। (লেবীয় পুস্তক, অধ্যায় ১৩, ১৪) ১৭শ শতাব্দী সা.শ.পূ., ইয়োব বলেছিলেন: “তিনি. . . অবস্তুর উপরে পৃথিবীকে ঝুলাইয়াছেন।” (ইয়োব ২৬:৭) খ্রীষ্টের হাজার বছর পূর্বে, শলোমন রক্ত সঞ্চালন সম্পর্কে লিখেছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানকে ১৭শ শতাব্দী পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল তা জানতে। (উপদেশক ১২:৬) তার আগে, গীতসংহিতা ১৩৯:১৬ পদ প্রজনন নিয়ম সম্বন্ধে জ্ঞান প্রতিফলিত করেছিল: “তোমার চক্ষু আমাকে পিণ্ডাকার দেখিয়াছে, তোমার পুস্তকে সমস্তই লিখিত ছিল, যাহা দিন দিন গঠিত হইতেছিল, যখন সে সকলের একটিও ছিল না।” সা.শ.পূ সপ্তম শতাব্দীতে, জীববিজ্ঞানীদের পাখিদের দেশ থেকে দেশান্তরে যাওয়া বোঝবার অনেক পূর্বে, যিরমিয় লিখেছিলেন, যেমন লিখিত আছে যিরমিয় ৮:৭ পদে: “আকাশে সারস পাখী দেশান্তরী হওয়ার সময় জানে, এবং ঘুঘু, তালচোঁচ ও বক আপন আপন আগমনের কাল রক্ষা করে।”—NE.
ক্রমবিকাশবাদীরা যে “স্রষ্টাকে” বেছে নিচ্ছে
১৭. (ক) সৃষ্ট আশ্চর্য বস্তুসকলের পিছনে যে এক পরম জ্ঞানী সৃষ্টিকর্তা আছেন তা বুঝতে যারা অস্বীকার করে তাদের কয়েকজন সম্পর্কে রোমীয় ১:২১-২৩ পদ কি বলে? (খ) এক অর্থে, ক্রমবিকাশবাদীরা তাদের “স্রষ্টা” হিসাবে কাদের বেছে নিচ্ছে?
১৭ সৃষ্ট আশ্চর্য বস্তুসকলের পিছনে যে এক পরম জ্ঞানী সৃষ্টিকর্তা আছেন তা বুঝতে যারা অস্বীকার করে তাদের কয়েকজন সম্পর্কে একটি শাস্ত্রপদ বলে: “আপনাদের তর্কবিতর্কে অসার হইয়া পড়িয়াছে, এবং তাহাদের অবোধ হৃদয় অন্ধকার হইয়া গিয়াছে। আপনাদিগকে বিজ্ঞ বলিয়া তাহারা মূর্খ হইয়াছে, এবং ক্ষয়নীয় মনুষ্যের ও পক্ষীর ও চতুষ্পদের ও সরীসৃপের মূর্ত্তি-বিশিষ্ট প্রতিকৃতির সহিত অক্ষয় ঈশ্বরের গৌরব পরিবর্তন করিয়াছে।” তাহারা “মিথ্যার সহিত ঈশ্বরের সত্য পরিবর্তন করিয়াছে, এবং সৃষ্ট বস্তুর পূজা ও আরাধনা করিয়াছে, সেই সৃষ্টিকর্ত্তার নয়।” (রোমীয় ১:২১-২৩, ২৫) ক্রমবিকাশ বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রেও তাই, যারা বাস্তবে, এক কল্পনাপ্রসূত এককোষী প্রাণীর ঊর্ধমূখী বংশের গৌরব করেছে-কৃমি-মাছ-উভচর-সরীসৃপ-স্তন্যপায়ী-“বানর-মানুষ”, এদের তাদের “স্রষ্টা” হিসাবে। কিন্তু তারা জানে, যে প্রকৃতই কোন সহজ এক-কোষী জৈব বস্তু নেই যা এই বংশকে শুরু করতে পারে। সবচেয়ে সহজতম জৈব বস্তুতে ১০,০০০ কোটি পরমাণু রয়েছে, হাজার হাজার রাসায়নিক বিক্রিয়া একযোগে তার মধ্যে সাধিত হচ্ছে।
১৮, ১৯. (ক) জীবনের উৎস রূপে কার সঠিকভাবে কৃতিত্ব পাওয়া উচিৎ? (খ) যিহোবার সৃষ্টিসকলের কতটা আমরা দেখতে পাই?
১৮ যিহোবা ঈশ্বর জীবনের সৃষ্টিকর্তা। (গীতসংহিতা ৩৬:৯) তিনিই মহান প্রথম কারণ। তাঁর নাম, যিহোবা, তার অর্থ “তিনি সব হওয়ান।” তাঁর সৃষ্টিসকল আমাদের গণনার অতীত। মানুষ যা জেনেছে তার চেয়ে অবশ্যই লক্ষ লক্ষ বেশী আরও বহু কিছু রয়েছে। গীতসংহিতা ১০৪:২৪, ২৫ এ সম্বন্ধে ইঙ্গিত দেয়: “হে সদাপ্রভু, তোমার নির্ম্মিত বস্তু কেমন বহুবিধ! তুমি প্রজ্ঞা দ্বারা সে সমস্ত নির্ম্মান করিয়াছ।” ইয়োব ২৬:১৪ এ সম্বন্ধে পরিষ্কারভাবে বলে: “দেখ, এই সকল তাঁহার মার্গের প্রান্ত; তাঁহার বিষয়ে কাকলিমাত্র শুনা যায়; কিন্তু তাঁহার পরাক্রমের গর্জ্জন কে বুঝিতে পারে?” কয়েকটি প্রান্তমাত্র আমরা দেখি, কয়েকটি কাকলিমাত্র আমরা শুনি, কিন্তু তাঁর পরাক্রমের গর্জ্জনের পূর্ণ অর্থ বোঝা আমাদের ক্ষমতার বাইরে।
১৯ আমাদের কিন্তু, তাঁর পার্থিব সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁকে দেখার চাইতেও আর একটি উত্তম উৎস রয়েছে। সেই উত্তম উৎস হচ্ছে তাঁর বাক্য, বাইবেল। পরবর্তী প্রবন্ধে আমরা সেই উত্তম উৎসের প্রতি লক্ষ্য করি। (w93 6/15)
আপনার কি স্মরণে আছে?
▫ যিহোবা ঘূর্ণবায়ুর মধ্য থেকে কথা বলার পর ইয়োব কি শিখেছিলেন?
▫ কেন পৌল বলেছিলেন যে কিছু ব্যক্তির উত্তর দেবার পথ নেই?
▫ জলস্রোত চক্র কিভাবে কাজ করে?
▫ সূর্যালোক আমাদের জন্য কি কি প্রয়োজনীয় কাজ করে?
▫ বিজ্ঞানের আবিষ্কারের পূর্বেই কোন্ বৈজ্ঞানিক সত্যগুলি বাইবেল প্রকাশ করেছিল?