৫৪ প্রেরিত যোহন
তিনি কঠিন অবস্থার মধ্যেও সাহস দেখান
প্রেরিত যোহন যখন অনেক বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তখন তিনি এই কথাগুলো লিখেছিলেন, “আমরা শেষ সময়ে রয়েছি।” তিনি জানতেন, যিশু ও পৌল এমন একটা সময়ের কথা বলেছিলেন, যখন মিথ্যা শিক্ষকেরা মণ্ডলীতে প্রবেশ করবে এবং লোকদের মিথ্যা শিক্ষায় বিশ্বাস করতে প্ররোচিত করবে। যখন এমনটা শুরু হয়, তখন যোহন এবং অন্যান্য প্রেরিত মণ্ডলীগুলোকে এই খারাপ প্রভাব থেকে সুরক্ষা জোগায়। (মথি ৭:১৫; প্রেরিত ২০:২৯, ৩০; ২ থিষল. ২:৬, ৭) কিন্তু, পরে বাকি প্রেরিতেরা মারা যায়। কেবল যোহন একাই বেঁচে ছিলেন। কল্পনা করে দেখুন, যোহন যখন দেখেছিলেন যে, মিথ্যা শিক্ষকেরা একটার পর একটা মণ্ডলীতে তাদের মিথ্যা ধারণা ছড়িয়ে দিচ্ছে, তখন তার কেমন লেগেছিল। তবে, তিনি আশা হারিয়ে ফেলেননি। এর পরিবর্তে, তিনি এই কঠিন অবস্থার মধ্যেও সাহস দেখান।
বৃদ্ধ প্রেরিত যোহনকে যখন তাড়না করা হয়েছিল এবং কারাগারে বন্দি করা হয়েছিল আর সেইসঙ্গে তিনি যখন মিথ্যা শিক্ষকদের মিথ্যা ধারণা ছড়িয়ে দিতে দেখেছিলেন, তখন কীভাবে তিনি এগুলো সহ্য করেছিলেন?
যদিও যোহনের বয়স ৯০ বছরেরও বেশি হয়ে গিয়েছিল, তা সত্ত্বেও তিনি উদ্যোগের সঙ্গে ক্রমাগত ‘ঈশ্বরের বিষয়ে কথা বলেছিলেন এবং যিশুর বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।’ এই কারণে রোমীয় সরকার তাকে বন্দি করে পাট্ম দ্বীপে রাখে। এটা এক জনশূন্য ও রুক্ষ এলাকা ছিল। কী যোহনকে আশা হারিয়ে না ফেলতে সাহায্য করেছিল? নিশ্চিতভাবেই, তিনি শিষ্যদের উদ্দেশে বলা যিশুর এই কথাগুলো স্মরণ করেছিলেন: “দেখো! এই বিধিব্যবস্থার শেষ সময় পর্যন্ত আমি সবসময় তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছি।”—মথি ২৮:২০.
এই প্রতিজ্ঞা করার ৬০ বছরেরও বেশি সময় পর যিশু যোহনকে ভবিষ্যতের বিষয়ে এক চমৎকার দর্শন দেখান। যিশু দেখান যে, “প্রভুর দিনে” সমস্ত মণ্ডলী আবার সঠিক উপায়ে যিহোবার উপাসনা করবে! এই সময়ে তিনি তাঁর অনুসারীদের শয়তানের আক্রমণ সত্ত্বেও বিশ্বস্ত থাকতে সাহায্য করবেন।
যোহনকে এই দর্শনে ‘বিভিন্ন চিহ্ন’ দেখানো হয়। তিনি যা যা দেখেছিলেন, সেগুলোর বেশিরভাগই হয়তো বুঝতে পারেননি। কিন্তু, একটা বিষয় তার কাছে স্পষ্ট ছিল: যারা মণ্ডলীগুলোতে মিথ্যা শিক্ষা ছড়িয়ে দিচ্ছিল, যিহোবা ও যিশু তাদের কখনোই সফল হতে দেবেন না। প্রভুর দিনে ঈশ্বরের লোকদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাবে আর তিনি তাদের জন্য চমৎকার চমৎকার কাজ করবেন। স্বর্গে একটা যুদ্ধে শয়তানকে পরাজিত করা হবে এবং এরপর তাকে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হবে। অবশেষে, তাকে চিরকালের জন্য ধ্বংস করে দেওয়া হবে। নিশ্চিতভাবেই, সেই দর্শন যোহনের সাহস আরও বৃদ্ধি করেছিল। আর তাই ‘তিনি যা-কিছু দেখেছিলেন, সেই সমস্ত বিষয়’ বিশ্বস্তভাবে লিখতে পেরেছিলেন।
যদিও পাট্ম দ্বীপে যোহনের জীবন অনেক কঠিন ছিল, তবুও তিনি তার আনন্দ ও উদ্যোগ হারিয়ে ফেলেননি। সেইসময়ে রোমের সম্রাট ছিলেন ডমিশিয়ান। তিনি খ্রিস্টানদের খুব তাড়না করতেন। কিন্তু, এমনটা মনে করা হয়, তিনি মারা যাওয়ার পর যোহনকে মুক্ত করা হয়। পরে যোহন হয়তো ইফিষে যান। তার বয়স যখন প্রায় ১০০ বছর, তখন তাকে একটা নতুন ও কঠিন কার্যভার দেওয়া হয়।
যোহন পবিত্র শক্তির মাধ্যমে চতুর্থ এবং শেষ সুসমাচারের বিবরণটা লেখেন। তিনি জানতেন, তার এই লেখা খুব তাড়াতাড়ি সমস্ত মণ্ডলীতে পাঠানো হবে। মণ্ডলীর খ্রিস্টানেরা যখন তার এই লেখা পড়বে, তখন তাদের সাহস ও বিশ্বাস আরও বৃদ্ধি পাবে। যোহন এটাও জানতেন, যারা খ্রিস্টানদের ঘৃণা করে, তারা তার লেখা পড়ে তার উপর আরও রেগে যাবে। কিন্তু, তারপরও তিনি তার কার্যভার পালন করেন।
যদিও যিশু মারা যাওয়ার পর প্রায় ৭০ বছর কেটে গিয়েছিল, তা সত্ত্বেও যোহন পবিত্র শক্তির সাহায্যে সেই সমস্ত কিছু স্পষ্টভাবে মনে রাখতে পেরেছিলেন, যা যিশু বলেছিলেন এবং করেছিলেন। যোহন যিশুর জীবনের এক চমৎকার বিবরণ লিখেছিলেন। এই বিবরণে লেখা প্রায় ৯০ ভাগ তথ্যই বাকি তিনটে সুসমাচারের বইয়ে পাওয়া যায় না। যেমন, কেবল এই বইয়ের মধ্যেই লাসারের পুনরুত্থানের ঘটনা রয়েছে আর সেইসঙ্গে পরে ধর্মীয় নেতারা যে তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল, সেই বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। (যোহন ১১:১-৪৬; ১২:১০) এ ছাড়া, যিশু মারা যাওয়ার আগের রাতে তাঁর শিষ্যদের যা বলেছিলেন এবং তাদের জন্য যে-প্রার্থনা করেছিলেন, সেই বিষয়ে যোহন তার বইয়ে বিস্তারিতভাবে লিখেছিলেন। আমরা কতই-না কৃতজ্ঞ যে, যোহন এই সমস্ত কিছু লিখেছেন, যাতে আমরা তার লেখা থেকে উৎসাহ লাভ করি!
প্রায় একই সময়ে যোহন তার ভাই-বোনদের উদ্দেশে তার তিনটে চিঠি লেখেন। তিনি সাহসের সঙ্গে সেই মিথ্যা শিক্ষকদের বিষয়ে সাবধান করেন, যারা মণ্ডলীর উপর খারাপ প্রভাব ফেলছিল। তিনি খ্রিস্টানদের বলেন, যাতে তারা এইরকম ব্যক্তিদের সঙ্গে মেলামেশা না করে, এমনকী তাদের সম্ভাষণও না জানায়। যোহন এই তিনটে চিঠিতে ভাই-বোনদের প্রতি তার প্রেম এবং এই আস্থা প্রকাশ করেন যে, তারা ক্রমাগত সত্যে চলবে। যোহন শিখিয়েছিলেন, “ঈশ্বর প্রেম।” আর ভাই-বোনদের উৎসাহ ও পরামর্শ দেওয়ার সময়ে তিনি নিজেও এই প্রেম প্রকাশ করেন। যোহন এও লেখেন, তিনি এটা দেখে খুব খুশি যে, তিনি যাদের সত্য শিখিয়েছেন, তারা এখনও “সত্যে চলছে।” নিশ্চিতভাবেই, তার চিঠি পড়ে অনেকেই ক্রমাগত সত্যে চলার জন্য উৎসাহ লাভ করেছিল।
যোহন যে-পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, আমরা কখনো সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হব না। যোহন মারা যাওয়ার পর, মিথ্যা শিক্ষকেরা তাদের মিথ্যা ধারণা আরও ছড়িয়ে দিয়েছিল এবং সমস্ত মণ্ডলীর উপর খারাপ প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু, যিহোবা প্রতিজ্ঞা করেছেন, তিনি আর কখনো এইরকমটা ঘটতে দেবেন না। (যিশা. ৫৪:১৭; প্রেরিত ৩:২১) তবে, যোহনের মতো আমাদের হয়তো কষ্ট ও তাড়না ভোগ করতে আর এমনকী জেলেও যেতে হতে পারে। আসুন, আমরা যোহনের উদাহরণ অনুকরণ করি। আর যা-ই ঘটুক না কেন, আমরা যেন সবসময় সাহসী হই এবং ঈশ্বরের সঙ্গে চলি!
বাইবেল থেকে বিবরণটা পড়ুন:
আলোচনার জন্য:
কোন কোন উপায়ে যোহন সাহস দেখিয়েছিলেন?
গভীরভাবে গবেষণা করুন
১. কী দেখায় যে, যোহন অনেক উদ্যোগী ও দৃঢ় ছিলেন? (সাক্ষ্য দেওয়া ৩৩, বাক্স অনু. ৩-৪)
২. কেন যোহনকে “অশিক্ষিত এবং সাধারণ ব্যক্তি” বলা হয়েছিল? (প্রেরিত ৪:১৩; প্রহরীদুর্গ ০৮ ৫/১৫ ৩০ অনু. ৬)
৩. কোন অর্থে যোহন যিশু না আসা পর্যন্ত ছিলেন? (যোহন ২১:২২; প্রহরীদুর্গ ০৫ ১/১৫ ১৩ অনু. ১৪-১৫)
৪. কী দেখায় যে, চতুর্থ সুসমাচারের বিবরণ যোহনই লিখেছিলেন? (অন্তর্দৃষ্টি “যোহন লিখিত সুসমাচার” অনু. ২-৮-wcgr) ক
Fondation Martin Bodmer, Cologny (Genève)
ছবি ক: প্রায় ২০০ খ্রিস্টাব্দের একটা পাণ্ডুলিপি, যেখানে “যোহন লিখিত সুসমাচার” কথাগুলো লেখা আছে
আমি কী শিখেছি?
যিশু আমাদের জন্য বলি হিসেবে তাঁর জীবন দিয়েছেন আর এই বলিদান থেকে আমরা উপকার লাভ করি। যোহন তার বইয়ে এই বিষয়ে ১০০-রও বেশি বার বলেছিলেন। কীভাবে আমরাও যোহনকে অনুকরণ করতে পারি এবং যিশুর বলিদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখাতে পারি?
যোহন যখন বাইবেলের পাঁচটা বই লিখেছিলেন, তখন তার বয়স ৯০ বছরেরও বেশি ছিল। যিহোবা বয়স্ক ব্যক্তিদের কীভাবে দেখেন, সেই বিষয়ে এটা থেকে আমরা কী শিখতে পারি? খ
ছবি খ
কোন কোন উপায়ে আপনি আপনার জীবনে যোহনের মতো সাহস দেখাতে পারেন?
এই বিষয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করুন
এই বিবরণ থেকে যিহোবা সম্বন্ধে আমি কী শিখেছি?
এই বিবরণ কীভাবে যিহোবার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত?
যোহনকে স্বর্গে খ্রিস্টের সঙ্গে শাসন করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। এরজন্য কেন আমি কৃতজ্ঞ?
আরও জানুন
বর্তমানে, বয়স্ক ভাই ও বোনেরা কি যোহনের মতো সাহস দেখাতে পারে?
যোহন প্রেম সম্বন্ধে অনেক কিছু লিখেছিলেন। তার লেখা এবং তার উদাহরণ থেকে আমরা কী শিখতে পারি, তা লক্ষ করুন।
“‘যিশু যাকে ভালোবাসতেন, সেই শিষ্যের’ কাছ থেকে শিক্ষা” (প্রহরীদুর্গ ২১.০১ ৮-১৩)