ওয়াচটাওয়ার অনলাইন লাইব্রেরি
ওয়াচটাওয়ার
অনলাইন লাইব্রেরি
বাংলা
  • বাইবেল
  • প্রকাশনাদি
  • সভা
  • g৯৮ ১০/৮ পৃষ্ঠা ১৯-২৫
  • ‘আমরা আর আপনাদের উদ্দেশে জীবন ধারণ করি না’

এই বাছাইয়ের সঙ্গে কোনো ভিডিও প্রাপ্তিসাধ্য নেই।

দুঃখিত, ভিডিওটা চালানো সম্বভব হচ্ছে না।

  • ‘আমরা আর আপনাদের উদ্দেশে জীবন ধারণ করি না’
  • ১৯৯৮ সচেতন থাক!
  • উপশিরোনাম
  • অনুরূপ বিষয়বস্ত‌ু
  • এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
  • আফ্রিকায় আমাদের পরিচর্যা
  • জাতীয়তাবাদ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়
  • আমাদের জীবন বিপদের মধ্যে ছিল
  • তাদের বিশ্বাসের কারণে কারাবদ্ধ
  • নতুন নতুন কার্যভারে
  • পুনরায় দেশে!
  • আমি যিহোবার দেখানো পথে চলি
    প্রহরীদুর্গ যিহোবার রাজ্য সম্বন্ধে ঘোষণা করে (অধ্যয়ন)—২০২২
  • যিহোবা সবসময় আমাদের জন্য চিন্তা করেন
    ২০০৩ প্রহরীদুর্গ যিহোবার রাজ্য ঘোষণা করে
  • আমি “সময়ে অসময়ে” আশীর্বাদ পেয়েছি
    ২০১৫ প্রহরীদুর্গ যিহোবার রাজ্য ঘোষণা করে
১৯৯৮ সচেতন থাক!
g৯৮ ১০/৮ পৃষ্ঠা ১৯-২৫

‘আমরা আর আপনাদের উদ্দেশে জীবন ধারণ করি না’

জ্যাক জোহান্সসন দ্বারা কথিত

মালাউইর এক আফ্রিকান সৈনিক, আমাকে নদীর ধারে ল্যান্ড রোভার গাড়ির হেডলাইটের আলোর সামনে দাঁড়াতে আদেশ দিয়েছিল। সেই সৈনিক যখন তার কাঁধের উপর রাইফেলটি উঠিয়েছিলেন, তখন লয়েড লিকওয়াইড দৌঁড়ে নদীর ধারে এসে আমার সামনে দাঁড়ান। আর তিনি অনুরোধ করতে থাকেন: “আমাকে গুলি করুন! এই বিদেশীর পরিবর্তে আমাকে মেরে ফেলুন! ইনি কোন অন্যায় করেননি!’ কেন একজন আফ্রিকান লোক আমার, অর্থাৎ একজন ইউরোপীয় ব্যক্তির জন্য তার জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিলেন? প্রায় ৪০ বছর আগে, কিভাবে আমি আফ্রিকায় একজন মিশনারি হয়ে এসেছিলাম তা আমাকে বলতে দিন।

উনিশশো বিয়াল্লিশ সালে আমার বয়স যখন মাত্র নয় বছর, তখন বাবা আর আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে রেখে মা মারা যান। আমিই ছিলাম সবার ছোট। চার মাস পর বাবা এক দুর্ঘটনায় মারা যান। ফিনল্যান্ডের প্রথম যিহোবার সাক্ষীদের মধ্যে আমার বাবা একজন ছিলেন। আমার বড় দিদি মায়া, আমাদের সবাইকে মানুষ করেছিলেন আর আমরা কোনমতে আমাদের খামারটি চালিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের আধ্যাত্মিক বিষয়গুলিও দিদিই দেখাশুনা করতেন। বাবার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে তিনি এবং আমার এক দাদা যিহোবা ঈশ্বরের প্রতি তাদের উৎসর্গীকরণের প্রতীকস্বরূপ জলে বাপ্তিস্ম নিয়েছিলেন। তার এক বছর পর, ১১ বছর বয়সে আমি বাপ্তিস্ম নিই।

এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

১৯৫১ সালে বাণিজ্য শাখায় পড়াশুনা শেষ করার পর আমি ফিনল্যান্ডের ফোর্ড মোটর কোম্পানিতে কাজ করতে শুরু করি। ছয় মাস পর, যিহোবার সাক্ষীদের একজন বিজ্ঞ ভ্রমণ অধ্যক্ষের ব্যবহারে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। তিনি আমাকে একটি অধিবেশনে অগ্রগামী অথবা পূর্ণ-সময়ের পরিচর্যার আশীর্বাদ সম্বন্ধে কিছু বলার জন্য ডেকেছিলেন। আমি অস্বস্তি বোধ করতে থাকি কারণ আমি পূর্ণ-সময়ের চাকরি করতাম, আমার মনে হয়েছিল যে আমি কী করে আমার হৃদয় থেকে তা বলব। আমি যিহোবার কাছে প্রার্থনা করি। আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম যে খ্রীষ্টানেরা “আর আপনাদের উদ্দেশে নয়, কিন্তু তাঁহারই উদ্দেশে জীবন ধারণ করে, যিনি তাহাদের জন্য মরিয়াছিলেন,” আর তাই আমি একজন অগ্রগামী হিসাবে সেবা করার জন্য আমার জীবনে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিই।—২ করিন্থীয় ৫:১৫.

আমার নিয়োগকর্তা বলেছিলেন যে আমি যদি ওই কোম্পানিতে থাকি, তিনি আমাকে দ্বিগুণ বেতন দেবেন। কিন্তু তিনি যখন বুঝতে পারেন যে আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল, তখন তিনি বলেছিলেন: “আপনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। আমি এই অফিসে আমার সারাটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি কয়জনকে সাহায্য করতে পেরেছি?” ফলে, ১৯৫২ সালের মে মাসে আমি একজন অগ্রগামী হই। কয়েক সপ্তাহ পর, আমি দৃঢ়প্রত্যয়ের সঙ্গে আমার অগ্রগামী পরিচর্যা সম্বন্ধে বক্তৃতা দিতে পেরেছিলাম।

কয়েক মাস অগ্রগামী হিসাবে সেবা করার পর, খ্রীষ্টীয় নিরপেক্ষতার কারণে আমাকে ছয় মাসের জন্য জেলে যেতে হয়। এরপরই, আমি ফিনল্যান্ড উপসাগরের হাসতো বুসো দ্বীপের অন্যান্য যুবক সাক্ষীদের সঙ্গে আরও আট মাস আটক থাকি। আমরা এই দ্বীপটিকে ছোট্ট গিলিয়েড বলতাম কারণ সেখানে আমরা নিজেরা বাইবেলের গভীর অধ্যয়ন করতাম। কিন্তু আমার সত্যিকারের গিলিয়েড অর্থাৎ ওয়াচটাওয়ার স্কুল অফ গিলিয়েডে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল যা নিউ ইয়র্কের সাউথ ল্যান্সিং এর কাছে অবস্থিত ছিল।

সেই দ্বীপে বন্দি থাকাকালে, আমি ওয়াচটাওয়ার সোসাইটির শাখা অফিস থেকে একটি চিঠি পেয়েছিলাম। আর এতে আমাকে যিহোবার সাক্ষীদের একজন ভ্রমণ অধ্যক্ষ হিসাবে পরিচর্যা করার জন্য বলা হয়েছিল। মুক্তি পাওয়ার পর আমাকে ফিনল্যান্ডের সুইডিশ-ভাষী মণ্ডলীগুলিতে পরিদর্শন করতে হয়েছিল। তখন, আমার বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর আর আমি মনে মনে ভাবতাম যে আমি বোধহয় এর যোগ্য নই কিন্তু আমি যিহোবার উপর আমার আস্থা রেখেছিলাম। (ফিলিপীয় ৪:১৩) আমি যে মণ্ডলীগুলিতে সেবা করেছিলাম সেখানকার সাক্ষীরা অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন, আমি নিতান্তই ‘একজন বালক’ হওয়া সত্ত্বেও, তারা কখনও আমাকে অবজ্ঞা করেননি।—যিরমিয় ১:৭.

পরের বছর একটি মণ্ডলী পরিদর্শন করার সময় লিন্ডার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, সে আমেরিকা থেকে ফিনল্যান্ডে ছুটি কাটাতে এসেছিল। আমেরিকায় ফিরে গিয়ে সে খুব তাড়াতাড়ি আধ্যাত্মিক অগ্রগতি করেছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই সে বাপ্তিস্ম নিয়েছিল। তারপর ১৯৫৭ সালের জুন মাসে আমরা বিয়ে করি। ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, গিলিয়েড স্কুলের ৩২তম ক্লাসে যোগ দেওয়ার জন্য আমাদের ডাকা হয়েছিল। আমাদের স্নাতক উপাধি লাভ করার পরের ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার নায়াজাল্যান্ডে কার্যভার পাই, যে জায়গাটিকে এখন মালাউই বলা হয় যা দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকায় অবস্থিত।

আফ্রিকায় আমাদের পরিচর্যা

আফ্রিকার ভাইবোনদের সঙ্গে প্রচার করতে আমাদের খুবই ভাল লাগত, সেই সময়ে নায়াজাল্যান্ডে প্রায় ১৪,০০০ জনেরও কিছু বেশি প্রকাশক ছিল। মাঝে মাঝে আমরা আমাদের বাক্স-বিছানা সবকিছু নিয়ে ল্যান্ড রোভার গাড়িতে চড়ে ভ্রমণ করতাম। আমরা এমন গ্রামেও থেকেছিলাম যেখানে কখনও কোন সাদা চামড়ার লোকেরা পা রাখেননি আর সেইজন্য লোকেরা সবসময়ই আমাদের সাদরে অভ্যর্থনা করত। যখন আমরা কোন গ্রামে যেতাম তখন আমাদের দেখার জন্য পুরো গ্রামের লোকেরা এসে হাজির হতো। নমস্কার করার পর, তারা চুপচাপ মাটিতে বসে পড়ত আর খুব মন দিয়ে একদৃষ্টে আমাদের দেখতে থাকত।

গ্রামবাসীরা প্রায়ই বিশেষ করে আমাদের জন্য ছোট কুঁড়ে ঘর মতো বানিয়ে দিত। কখনও বা মাটি দিয়ে আবার কখন বড় বড় ঘাস দিয়ে। সেই ঘরে কেবল একটি বিছানাই পাতা যেত। কখনও কখনও রাতের বেলা আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে হায়না চলাফেরা করত আর ঠিক আমাদের মাথার কাছেই এমন ভয়ংকর গর্জন করত যে ভাবা যায় না। কিন্তু নায়াজাল্যান্ডের সাক্ষীদের বন্য জন্তুর চেয়েও আরও বিপদজনক শক্তির মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

জাতীয়তাবাদ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়

সমগ্র আফ্রিকায় স্বাধীনতা আন্দোলন সক্রিয় হচ্ছিল। নায়াজাল্যান্ডের একমাত্র রাজনৈতিক দলে প্রত্যেকে যোগ দেবে বলে আশা করা হয়েছিল। হঠাৎই, আমাদের নিরপেক্ষতা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সেই সময় আমি অফিসের কাজ দেখাশুনা করছিলাম কারণ আমাদের শাখা অধ্যক্ষ, ভাই ম্যালকম ভিগো তখন ছিলেন না। আমি, নায়াজাল্যান্ডের তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী ড. হেস্টিংস কামুজু বান্ডার সঙ্গে দেখা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে আরও দুইজন খ্রীষ্টান প্রাচীন ছিলেন আর আমরা তাদেরকে আমাদের নিরপেক্ষতা সম্বন্ধে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম এবং আমাদের সাক্ষাৎ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছিল। তাসত্ত্বেও, প্রায় এক মাস পর ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, ইলাটন ওয়াচান্ডি প্রথম অত্যাচারের শিকার হন—তাকে লোকেরা বড়শা দিয়ে মেরে ফেলেছিল। তার গ্রামের অন্যান্য সাক্ষীদের পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।

আমরা ড. বান্ডাকে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলাম আর আবেদন করেছিলাম যে তিনি যেন তার কর্তৃত্ব ব্যবহার করে এইধরনের হিংস্রতাকে বন্ধ করেন। শীঘ্রই প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমার কাছে ফোন আসে আর আমাকে সেখানে উপস্থিত হওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। হেরোল্ড গায় নামে একজন মিশনারি এবং আলেকজান্ডার মাফামবানা নামে একজন স্থানীয় সাক্ষীর সঙ্গে আমি ড. বান্ডার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। দুজন সরকারি মন্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

আমরা বসার সঙ্গে সঙ্গেই, ড. বান্ডা কোন কথা না বলেই টেলিগ্রামটি নাড়াতে থাকেন। শেষে তিনি এই বলে নীরবতা ভাঙেন: “মি. জোহান্সসন, এই টেলিগ্রাম পাঠানোর অর্থ কী?” আবারও একবার আমরা তাকে বুঝিয়েছিলাম যে আমরা কোন রাজনীতিতে অংশ নিই না এবং আমি বলেছিলাম: “ইলাটন ওয়াচান্ডিকে হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে একমাত্র আপনিই এখন আমাদের সাহায্য করতে পারেন।” এরপরে ড. বান্ডা কিছুটা শান্ত হয়েছিলেন।

কিন্তু সেখানে উপস্থিত একজন সরকারি মন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন যে একটি গ্রামে সাক্ষীরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করেননি। অপর মন্ত্রী তখন বলেছিলেন যে কোন একটি গ্রামে সাক্ষীরা ড. বান্ডা সম্বন্ধে অসম্মানজনক কথা বলেছেন। কিন্তু কারা এইধরনের আচরণ করেছিলেন, তাদের একজনের নামও তারা আমাদেরকে দিতে পারেননি। আমরা ব্যাখ্যা করেছিলাম যে সাক্ষীদের সর্বদা সরকারি কর্তৃপক্ষকে সম্মান করতে শেখানো হয়। কিন্তু, দুঃখের বিষয় যে ড. বান্ডা ও তার মন্ত্রীদেরকে আমাদের সম্বন্ধে মিথ্যা ধারণা থেকে সংশোধন করার জন্য, আমাদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

আমাদের জীবন বিপদের মধ্যে ছিল

নায়াজাল্যান্ড ১৯৬৪ সালে স্বাধীন হয় এবং পরে মালাউই প্রজাতন্ত্র হয়। আমাদের প্রচার কাজ স্বাভাবিকভাবে চললেও তা ক্রমবর্ধিষ্ণু চাপের মধ্যে ছিল। তখন ওই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাক্ষীরা ফোন করে জানিয়েছিলেন যে সেখানে রাজনৈতিক বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। সাক্ষীদের অবস্থা দেখার এবং তাদের নৈতিক সমর্থন দেওয়ার জন্য, আমরা অবিলম্বে সেখানে কাউকে পাঠানোর প্রয়োজন বোধ করেছিলাম। আগে আমি একা একাই বনজঙ্গলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করতাম আর লিন্ডা সাহসের সঙ্গেই তা মেনে নিত। কিন্তু এবার সে আমাকে স্থানীয় যুবক সাক্ষী লয়েড লিকওয়াইডকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। শেষ পর্যন্ত আমি রাজি হলাম এই ভেবে, ‘এতে যদি সে আনন্দিত হয় তবে আমি তা করব।’

আমাদের বলা হয়েছিল যে সন্ধ্যা ছয়টায় সান্ধ্য আইন জারি হওয়ার আগেই ফেরিতে করে আমাদের একটি নদী পার হতে হবে। ওই সময়ের মধ্যে পার হওয়ার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু রাস্তা খারাপ হওয়ার দরুণ আমাদের দেরি হয়ে গিয়েছিল। পরে আমরা জানতে পেরেছিলাম যে ছয়টার পর আমরা নদীর যে পারে ছিলাম সেখানে কাউকে দেখামাত্রই গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নদীর দিকে আসার সময়ই আমরা দেখি যে ফেরিটি ইতিমধ্যেই অপর তীরে পাড়ি জমিয়েছে। আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য ভাই লিকওয়াইড সেটিকে ডাকলেন। এটি এসেছিল ঠিকই কিন্তু একজন সৈনিক নৌকা থেকে চিৎকার করে বলেছিলেন: “সাদা চামড়ার লোকটিকে আমি গুলি করব!”

প্রথমে আমি এটিকে এমনি একটি হুমকি মনে করেছিলাম কিন্তু নৌকাটি যখন কাছে আসে তখন ওই সৈনিকটি আমাকে গাড়ির আলোর সামনে দাঁড়ানোর আদেশ দিলেন। তখনই আমার আফ্রিকান বন্ধু সামনে এসে দাঁড়ান এবং আমার পরিবর্তে তাকে গুলি করার জন্য সৈনিককে অনুরোধ জানান। আপাতদৃষ্টিতে মনে হল যেন সৈনিকটি আমার পরিবর্তে তার মরতে চাওয়ার এই ইচ্ছার দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিলেন, ফলে তার বন্দুক তিনি নামিয়ে রেখেছিলেন। আমি যীশুর কথাগুলি স্মরণ করেছিলাম: “কেহ যে আপন বন্ধুদের নিমিত্ত নিজ প্রাণ সমর্পণ করে, ইহা অপেক্ষা অধিক প্রেম কাহারও নাই।” (যোহন ১৫:১৩) সেই প্রিয় ভাইকে সঙ্গে আনার বিষয়ে লিন্ডার পরামর্শ শোনায় কত আনন্দিতই না আমি হয়েছিলাম!

পরের দিন ফিরে আসার সময়, কয়েকজন যুবক ব্লানটায়ারের পথ অবরোধ করে ভাই লিকওয়াইডের দলীয় সদস্যপদ কার্ডটি দেখতে চেয়েছিল। তখন কেবল একটি পথই ছিল—অতি দ্রুত সেই দলের মধ্য থেকে পালিয়ে যাওয়া! আমি দ্রুত গীয়ারে চাপ দিই এবং গাড়িটি হঠাৎ সামনের দিকে লাফ দেয়, ফলে তারা চমকে সরে যায় ও আমাদের যাওয়ার জন্য যথেষ্ট জায়গা হয়ে যায়। উচ্ছৃঙ্খল জনসাধারণ যদি ভাই লিকওয়াইডকে ধরতে পারত তবে সম্ভবত সেখানেই তার মৃত্যু হতো। আমরা যখন শাখা অফিসে এসে পৌঁছাই, তখন দুজনেই কাঁপছিলাম কিন্তু তবুও রক্ষা করার জন্য যিহোবাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম।

তাদের বিশ্বাসের কারণে কারাবদ্ধ

মালাউইতে আমাদের কাজের উপর ১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসে সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। ওই দেশে তখন প্রায় ১৮,০০০ জন সাক্ষী ছিল। দুই সপ্তাহ পর আমরা জানতে পারি যে রাজধানী শহর লিলংওয়েতে ৩,০০০ জন সাক্ষীকে কারাবদ্ধ করা হয়েছে। তাদেরকে অন্তত নৈতিক সমর্থন জানাতে পারব ভেবে, আমরা ওই রাতেই ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সেই স্থানে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমরা ল্যান্ড রোভার গাড়িটিকে ওয়াচটাওয়ার প্রকাশনা বোঝাই করে, যিহোবার কল্যাণে কোন রকম অনুসন্ধান ছাড়াই অনেক অবরোধ পার হয়ে গিয়েছিলাম। সারা রাস্তায় আমরা একটির পর একটি মণ্ডলীতে সময়োপযোগী আধ্যাত্মিক খাদ্যের বাক্সগুলি পৌঁছে দিয়েছিলাম।

সকাল বেলা আমরা কারাগারের দিকে গিয়েছিলাম। কী এক দৃশ্য! সারারাত বৃষ্টি হয়েছিল এবং আমাদের খ্রীষ্টীয় ভাইবোনেরা চারদিকে বেড়া দেওয়া খোলা জায়গায় ছিলেন। তারা ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন এবং কিছু ভাইবোন তাদের কম্বলগুলিকে বেড়ার উপর মেলে শুকানোর চেষ্টা করছিলেন। আমরা বেড়ার ভিতর দিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলাম।

তাদের মামলাটি দুপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং বেশ কিছু সংখ্যক নামধারী সাক্ষী সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা চোখ দিয়ে তাদের ইশারা করতে চেয়েছিলাম কিন্তু তাদের মুখমণ্ডল নির্লিপ্ত ছিল। আমাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়ে তারা সকলে তাদের বিশ্বাস অস্বীকার করেছিলেন! কিন্তু আমি জানতে পেরেছিলাম যে যারা যিহোবার সাক্ষী হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন তাদের কাউকেই স্থানীয় সাক্ষীরা চিনতেন না। এই সমস্তকিছু স্পষ্টত প্রকৃত সাক্ষীদের নিরুৎসাহিত করার একটি কৌশল ছিল মাত্র।

এরই মধ্যে, আমাদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। ব্লানটায়ারে আমাদের শাখা অফিসকে বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং ২৪ ঘন্টার মধ্যে মিশনারিদের সেই দেশ ত্যাগ করতে বলা হয়েছিল। আমরা যখন ঘরে ফিরে আসি, একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের দরজা খুলে দিচ্ছেন তা দেখা কতই না আশ্চর্যের বিষয় ছিল! পরের দিন দুপুরে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আসেন এবং কিছুটা দুঃখ প্রকাশ করে আমাদের গ্রেপ্তার করেন ও গাড়ি চালিয়ে বিমানবন্দরে নিয়ে যান।

আমাদের খ্রীষ্টান ভাইরা মালাউইতে এক কঠিন পরীক্ষা ভোগ করছেন তা জেনেও, আমরা ১৯৬৭ সালের ৮ই নভেম্বর সেই দেশ ত্যাগ করি। তাদের জন্য আমাদের দুঃখ লেগেছিল। অনেকে তাদের প্রাণ হারান; শত শত ব্যক্তিরা নিষ্ঠুর নির্যাতন ভোগ করেন; আর হাজার হাজার ব্যক্তিরা তাদের চাকরি, গৃহ এবং সম্পদ হারিয়েছিলেন। তাসত্ত্বেও, প্রায় সকলেই তাদের আনুগত্য রক্ষা করেছিলেন।

নতুন নতুন কার্যভারে

কষ্ট সত্ত্বেও, আমরা কখনও মিশনারি কাজ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবিনি। বরং আমরা একটি নতুন কার্যভার গ্রহণ করেছিলাম—কেনিয়ায়, যেখানে প্রাকৃতিক দৃশ্য ও লোকেদের মধ্যে প্রচুর বৈচিত্র্য বিদ্যমান। লিন্ডা, মাসাইদের দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন একজন মাসাইও যিহোবার সাক্ষী হয়নি। কিন্তু এরপর লিন্ডা, ডরকাস নামে এক মাসাই মহিলার সাক্ষাৎ পায় এবং তার সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করে।

ডরকাস জেনেছিলেন যে ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করার জন্য তার বিবাহকে বৈধ করতে হবে। তার দুই সন্তানের বাবা তা করতে অস্বীকার করেছিলেন তাই ডরকাস একাই তার সন্তানদের ভরণপোষণ করার চেষ্টা করেছিলেন। লোকটি যিহোবার সাক্ষীদের প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন কিন্তু পরিবার থেকে আলাদা হওয়ার ফলে তিনি অত্যন্ত অসুখী ছিলেন। শেষে, ডরকাসের অনুরোধের ফলে তিনিও যিহোবার সাক্ষীদের সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন শুরু করেছিলেন। তিনি তার জীবনে সমন্বয়সাধন করে একজন সাক্ষী হয়েছিলেন এবং ডরকাসকে বিয়ে করেছিলেন। ডরকাস একজন অগ্রগামী হন এবং তার স্বামী ও তার বড় ছেলে বর্তমানে মণ্ডলীর প্রাচীন হিসাবে সেবা করছেন।

হঠাৎ, ১৯৭৩ সালে, কেনিয়াতে যিহোবার সাক্ষীদের কাজের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় আর তাই আমাদের সেই দেশ ছেড়ে আসতে হয়। কিন্তু অল্প কয়েক মাস পরই নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়া হয়। তবে ওই সময়ে আমরা আমাদের তৃতীয় কার্যভার পেয়ে গিয়েছিলাম—কঙ্গোতে (ব্রাজাভিলে)। ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে আমরা সেখানে গিয়ে পৌঁছাই। প্রায় তিন বছর পর আমাদের মিশনারিদের গুপ্তচর বলে মিথ্যাভাবে অভিযুক্ত করা হয় এবং আমাদের কাজের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এছাড়া, ব্রাজাভিলের রাষ্ট্রপতি গুপ্তঘাতকের দ্বারা নিহত হওয়ার পরপরই সেখানে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। অন্যান্য সমস্ত মিশনারিদের বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত করা হয়েছিল কিন্তু আমাদের যতদিন সম্ভব সেখানে থাকার কথা বলা হয়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ আমরা পরের দিন বেঁচে থাকব কি না এই অনিশ্চয়তা নিয়ে বিছানায় যেতাম। কিন্তু যিহোবার যত্নের উপর আস্থা রেখে আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতাম। শাখা অফিসে একা থাকা ওই কয়েকটি মাসই সম্ভবত আমাদের মিশনারি কাজের সবচেয়ে বিশ্বাস-পরীক্ষাকারী ও বিশ্বাস-দৃঢ়কারী সময়।

১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে আমাদের ব্রাজাভিল ত্যাগ করতে হয়েছিল। এরপর ইরানে শাখা অফিস স্থাপনের কার্যভার পাওয়ায় আমরা সত্যই আশ্চর্য হয়েছিলাম। ফার্সী ও পারস্য ভাষা শেখার প্রবল প্রচেষ্টা ছিল আমাদের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতা। একটি নতুন ভাষা শেখার দরুণ মণ্ডলীর সভাগুলিতে আমাদের উত্তর দেওয়ার পরিমাণ কমে এসেছিল। আমরা একেবারে সহজ, ছোট বাচ্চাদের উত্তরগুলি দিতাম! ইরানে ১৯৭৮ সালে বিপ্লব শুরু হয়। আমরা লড়াইয়ের চরম মুহূর্তেও সেখানে ছিলাম কিন্তু ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে সমস্ত মিশনারিদের সেই দেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল।

মধ্য আফ্রিকার জাইরেতে আমরা আমাদের পঞ্চম কার্যভার লাভ করি, যেটি বর্তমানে গণপ্রজাতান্ত্রিক কঙ্গো। জাইরেতে আমরা ১৫ বছর যাবৎ সেবা করেছি, এমনকি নিষেধাজ্ঞার সময়েও। আমরা যখন ওখানে এসেছিলাম, তখন সেই দেশে ২২,০০০ জন সক্রিয় সাক্ষী ছিলেন—এখন সেখানে ১,০০,০০০ জনের বেশি সাক্ষী রয়েছেন!

পুনরায় দেশে!

১৯৯৩ সালের ১২ই আগস্ট মালাউইতে যিহোবার সাক্ষীদের কাজের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়া হয়। দুই বছর পর লিন্ডা ও আমাকে আবার আমরা যেখানে শুরু করেছিলাম সেখানে—আফ্রিকার উষ্ণ হৃদয় নামে পরিচিত অপূর্ব, বন্ধুভাবাপন্ন দেশ, মালাইউতে কার্যভার দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আমরা মালাউইর সুখী, শান্তিপ্রিয় লোকেদের সঙ্গে কাজ করার আনন্দ উপভোগ করছি। আরেকবার আমাদের মালাউইর ভাইদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগকে আমরা অত্যন্ত মূল্যবান মনে করি। এই ভাইদের মধ্যে অনেকে তিন দশক ধরে তাড়না সহ্য করেছেন। আফ্রিকান ভাইরা আমাদের অনুপ্রেরণা দানের এক উৎস হয়ে এসেছেন আর আমরা তাদের ভালবাসি। তারা অবশ্যই পৌলের কথা অনুযায়ী জীবনযাপন করেছেন: “অনেক ক্লেশের মধ্য দিয়া আমাদিগকে ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করিতে হইবে।” (প্রেরিত ১৪:২২) বর্তমানে মালাউইতে প্রায় ৪১,০০০ জন সাক্ষী প্রকাশ্যে প্রচার এবং বড় বড় সম্মেলনেরও আয়োজন করতে পারেন।

আমরা আমাদের সমস্ত কার্যভার অত্যন্ত উপভোগ করেছি। লিন্ডা ও আমি শিখেছি যে অভিজ্ঞতা, যত কঠোরই হোক না কেন, তা আমাদের অধিক উত্তম ব্যক্তি হিসাবে গড়ে তুলতে পারে, “সদাপ্রভুতে . . . আনন্দ,” বজায় রাখতে আমাদের সাহায্য করে। (নহিমিয় ৮:১০) কার্যভার ত্যাগ করার সময় খাপ খাইয়ে নিতে আমার কিছু সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু লিন্ডার খাপ খাইয়ে নেওয়ার মনোভাব—এবং বিশেষভাবে যিহোবার উপর তার দৃঢ় বিশ্বাস—আমাকে সাহায্য করেছে এবং “উত্তম (NW) ভার্য্যা” পাওয়ার আশীর্বাদ উপলব্ধি করার কারণ যুগিয়েছে।—হিতোপদেশ ১৮:২২.

কী এক আনন্দিত এবং রোমাঞ্চকর জীবনই না আমরা অতিবাহিত করেছি! যিহোবার সুরক্ষিত হস্তের জন্য আমরা বার বার তাঁকে ধন্যবাদ দিয়েছি। (রোমীয় ৮:৩১) পূর্ণ-সময়ের পরিচর্যার আশীর্বাদের উপর বক্তৃতা দেওয়ার পর থেকে চার দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। আমরা আনন্দিত যে আমরা ‘যিহোবার পরীক্ষা নিয়াছি এবং তিনি মঙ্গলময় কি না তাহা আস্বাদন করিয়াছি।’ (গীতসংহিতা ৩৪:৮; মালাখি ৩:১০) আমরা দৃঢ়প্রত্যয়ী যে ‘আপনাদের উদ্দেশে জীবন ধারণ না করাই’ জীবনের যথাসম্ভব সর্বোত্তম পথ।

[২৩ পৃষ্ঠার মানচিত্র/চিত্র]

যে দেশগুলিতে আমরা সেবা করেছি

ইরান

প্রজাতন্ত্রী কঙ্গো

গণপ্রজাতান্ত্রিক কঙ্গো

কেনিয়া

মালাউই

[২০ পৃষ্ঠার চিত্র]

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন হয়ে মালাউই যাওয়ার পথে

[২২ পৃষ্ঠার চিত্র]

আমরা যখন গ্রেপ্তার হই এবং মালাউই থেকে আমাদের বের করে দেওয়া হয়

[২৩ পৃষ্ঠার চিত্র]

একজন মাসাই মহিলা, ডরকাস তার স্বামীর সঙ্গে

    বাংলা প্রকাশনা (১৯৮৯-২০২৬)
    লগ আউট
    লগ ইন
    • বাংলা
    • শেয়ার
    • পছন্দসমূহ
    • Copyright © 2026 Watch Tower Bible and Tract Society of Pennsylvania
    • ব্যবহারের শর্ত
    • গোপনীয়তার নীতি
    • গোপনীয়তার সেটিং
    • JW.ORG
    • লগ ইন
    শেয়ার