আপনি কি জীবন ভালবাসেন?
“আমাকে আলো দেখতে দাও।” এই কথাগুলো ইতালীয় কবি জ্যাকোমো লিওপার্ডি তার মৃত্যুশয্যায় যারা তার সামনে ছিলেন তাদেরকে বলেছিলেন। তার এই কথাগুলো থেকে বোঝা যায় যে মানুষ জীবনকে কত গভীরভাবে ভালবাসে, এইজন্য সে মৃত্যুর অন্ধকার নয় বরং আলো চায়, সে বাঁচতে চায়।
জীবনের জন্য আমাদের ভালবাসা এতখানিই গভীর যে আমরা ভুল করেও বিপদে পড়তে চাই না আর বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু করা যায় তাই করি। এই দিক দিয়ে মানুষ ও পশুর মধ্যে তেমন একটা তফাৎ নেই, কারণ পশুরাও বিপদ এড়িয়ে চলার ও জীবন বাঁচানোর সবরকম চেষ্টা করে থাকে।
কিন্তু কোন্ ধরনের জীবন সত্যিই বেঁচে থাকার মতো ও আমাদের সঙ্গে তার ভালবাসা গড়ে ওঠে? এটা শুধু শারীরিক অস্তিত্ব অর্থাৎ শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া ও চলাফেরা করাকেই বোঝায় না। কিংবা দুদিনের এই জীবন থেকে যা পাও তা-ই লুটে নাও এই ধারণা থেকেও সম্পূর্ণ পরিতৃপ্তি পাওয়া যায় না। ‘আইস, আমরা ভোজন পান করি, কেননা কল্য মরিব,’ ইপিকুরীয়দের এই দর্শনও লোকেদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। (১ করিন্থীয় ১৫:৩২) মানুষের বেশ কিছু মৌলিক চাহিদা আছে, সেইসঙ্গে সে তার সংস্কৃতি ও সমাজের অংশ হতে চায়, ঈশ্বরে বিশ্বাস করার জন্মগত ইচ্ছা তার মধ্যে রয়েছে আর তাই তার আধ্যাত্মিক চাহিদাও আছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে পৃথিবীর অনেক জায়গায় ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক ব্যবস্থা ও দূষিত পরিবেশের কারণে কোটি কোটি মানুষ শুধু কোনরকমে বেঁচে আছে। যারা শুধু তাদের শারীরিক চাহিদা মেটাতে যেমন, খাওয়াপরা যোগাড় করা, ধনসম্পদ আহরণ করা বা যৌন কামনাকে তৃপ্ত করায় ব্যস্ত, তারা কমবেশ পশুর মতোই জীবনযাপন করে আর এই জীবনযাত্রা থেকে তারা খুব কম পরিতৃপ্তিই পায়। আসলে, মানুষের বুদ্ধি ও আবেগগত চাহিদা পূরণ করার জন্য জীবনে যে সুযোগগুলো রয়েছে তা তারা কোন কাজেই লাগায় না। তাছাড়া যারা শুধু তাদের নিজেদের স্বার্থপর চাহিদাগুলোই মেটানোর চেষ্টা করে তারা যে জীবন থেকে শুধু ভাল কিছু পাওয়া থেকেই বঞ্চিত হয় তাই নয়, সেইসঙ্গে তারা সমাজেরও ক্ষতি করে ও তাদের কাজ থেকে অন্যদের কোন মঙ্গল হয় না।
এই কথাকে সমর্থন করে কিশোর-অপরাধ শাখার বিচারক বলেন যে “মূল্যবোধের অভাব, খারাপ আদর্শদের প্রশংসাজনকভাবে তুলে ধরা এবং রাতারাতি বড় লোক হওয়ার পদ্ধতিগুলো প্রতিযোগিতার মনোভাবকে সাংঘাতিকভাবে বাড়িয়ে তোলে।” এর ফলে লোকেরা এমন কাজ করে যা সমাজের ক্ষতি করে ও বিশেষ করে অল্পবয়স্কদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়, কারণ তারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়তে শুরু করে।
আপনি জানেন যে জীবন আমাদের অনেক আকর্ষণীয় জিনিস দেয় যেমন মনোরম জায়গায় ছুটি কাটানো, আগ্রহজনক বিষয় পড়া ও গবেষণা করা, ভাল বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটানো, সুরেলা সংগীত শোনা। এছাড়াও আরও অনেক জিনিস রয়েছে যা কোন না কোনভাবে আমাদের পরিতৃপ্ত করে। ঈশ্বরের ওপর, বিশেষ করে বাইবেলের ঈশ্বর যিহোবার ওপর যাদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে, তাদের জীবনকে ভালবাসার আরও অনেক কারণ রয়েছে। প্রকৃত বিশ্বাস শক্তি ও প্রশান্তি দেয় যা লোকেদেরকে জীবনের কঠিন সময়ের সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। যারা সত্য ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন তারা পুরো আস্থার সঙ্গে বলতে পারেন: “‘প্রভু আমার সহায়, আমি ভয় করিব না।’” (ইব্রীয় ১৩:৬) যে লোকেরা ঈশ্বরের প্রেম সম্বন্ধে জানেন, তারা বোঝেন যে তিনি তাদের ভালবাসেন। ফলে তারাও তাঁকে ভালবেসে প্রচুর আনন্দ পান। (১ যোহন ৪:৭, ৮, ১৬) তারা পরিশ্রমী ও নিঃস্বার্থ জীবনযাপন করে প্রচুর পরিতৃপ্তি পেয়ে থাকেন। যীশু খ্রীষ্টও ঠিক এই কথাই বলেছিলেন: “গ্রহণ করা অপেক্ষা বরং দান করা ধন্য হইবার বিষয়।”—প্রেরিত ২০:৩৫.
কিন্তু দুঃখের কথা হল যে জীবনের এই ছবির আরেকটা বিপরীত দিকও আছে। সারা পৃথিবীতে দুঃখকষ্ট, অন্যায়, দারিদ্র, রোগ ও মৃত্যু রয়েছে—এগুলো মাত্র কয়েকটা বিষয় যা জীবনকে দুঃসহ করে তোলে। প্রাচীন ইস্রায়েলের ধনী, ক্ষমতাবান ও জ্ঞানী রাজা শলোমনের এমন কোন জিনিসের অভাব ছিল না, যা লোকেদের সুখী করতে পারে। কিন্তু তারপরও কিছু একটা তাকে কষ্ট দিচ্ছিল—তিনি জানতেন যে মরণের সময় তার সমস্ত “পরিশ্রম” যা তিনি “প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও কৌশল সহযুক্ত” তার নিজের জন্য করেছিলেন তা অন্যের জন্য রেখে চলে যেতে হবে।—উপদেশক ২:১৭-২১.
শলোমনের মতো বেশির ভাগ মানুষই জানেন যে তাদের জীবন খুবই ছোট যা চোখের পলকে শেষ হয়ে যায়। শাস্ত্র বলে যে ঈশ্বর ‘আমাদের হৃদয়মধ্যে চিরকাল রাখিয়াছেন।’ (উপদেশক ৩:১১) চিরকাল বেঁচে থাকার এই অনুভূতির জন্যই মানুষ জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব নিয়ে ভাবে। কিন্তু জীবন ও মৃত্যুর অর্থ কী তার কোন সঠিক উত্তর না পেয়ে সে হতাশ হয়ে পড়ে ও শূন্যতা অনুভব করে। আর এর ফলে জীবন দুঃখের হয়ে ওঠে।
মানুষকে দুঃখ দেয় এমন প্রশ্নগুলোর উত্তর কি আদৌ আছে? আর এমন পরিস্থিতি কি কখনও আসবে যেখানে জীবন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে ও আমরা অনন্তকাল ধরে তা উপভোগ করব?