আজ বড়দিনে কি যীশুর কোন স্থান আছে?
“আমি কোন সময়ই বড়দিনের ধুমধাম ও আনন্দ-উৎসবকে মেনে নিতে পারিনি। আমার মনে হয়েছে যীশুর জীবন ও শিক্ষার সঙ্গে এগুলি একেবারেই বেমানান।”—মোহনদাস কে. গান্ধি।
অনেকেই গান্ধির এই কথাকে মেনে নেবেন না। তারা হয়ত ভাবতে পারেন, ‘একজন হিন্দু নেতা খ্রীষ্টীয় উৎসবের কতটুকুই বা জানেন?’ কিন্তু এ কথা মানতেই হবে যে আজ সারা পৃথিবীতে সব ধরনের লোকেরা বড়দিন পালন করেন। আর মনে হয় যেন প্রত্যেক ডিসেম্বর মাসে এই ছুটির দিনটি পৃথিবীর সব জায়গাতেই পালন করা হয়।
উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, এশিয়ার প্রায় ১৪ কোটি ৫ লক্ষ অধিবাসী বড়দিন পালন করেন এবং এই সংখ্যা দশ বছর আগের চেয়ে চার কোটি বেশি। আর ‘ধুমধাম ও আনন্দ-উৎসব’ বলার দ্বারা গান্ধি যদি আধুনিক বড়দিনের জাঁকজমক ও কেনাকাটার হিড়িককে বুঝিয়ে থাকেন যা আমরা সকলেই দেখে থাকি, তাহলে আমাদের বলতেই হবে যে আজ বড়দিন পালন করা এই জাঁকজমক ও কেনাকাটা ছাড়া আর কিছুই নয়। এশিয়াউইক পত্রিকা উল্লেখ করে: “এশিয়ায় বড়দিন—হংকংয়ের উৎসবমুখর আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে বেইজিংয়ে বড় বড় হোটেলে সাজানো ক্রিস্মাস ট্রি ও সিংগাপুর শহরে মূর্তি দিয়ে সাজানো যীশুর জন্মের দৃশ্য পর্যন্ত সবকিছুই—আসলে ধর্মের সঙ্গে খুব কমই সম্পর্ক রাখে কারণ এগুলি প্রধানত বাণিজ্যিক।”
তাই আজকে যেভাবে বড়দিন পালন করা হয় তাতে কি প্রশ্ন আসে না যে আজ বড়দিনে কি যীশুর কোন স্থান আছে? সা.কা. চতুর্থ শতাব্দীতে রোমান ক্যাথলিক গির্জা ২৫শে ডিসেম্বরকে সরকারিভাবে ধর্মীয় পর্বদিন অর্থাৎ যীশুর জন্মদিন হিসাবে পালন করার জন্য বেছে নিয়েছে আর সেইসময় থেকেই ওই দিনটিকে পালন করা হচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্টে নেওয়া এক জরিপ দেখায় যে মাত্র ৩৩ শতাংশ লোকেরা মনে করেন যে খ্রীষ্টের জন্মই বড়দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আপনি কী মনে করেন? আপনার কি মাঝে মাঝে মনে হয় না যে বিজ্ঞাপনের চমক, উপহার কেনার হয়রানি, গাছ সাজানো, সামাজিক মেলামেশার আয়োজন করা ও সেখানে উপস্থিত থাকা, কার্ড পাঠানো ইত্যাদি সমস্তকিছুর মধ্যে যীশুর কোন স্থান নেই?
অনেকে মনে করেন, মূর্তি দিয়ে যীশুর জন্মের দৃশ্য সাজিয়ে বড়দিনে যীশুকে আবার ফিরিয়ে আনা যায়। সম্ভবত আপনি এইধরনের কিছু জন্মসংক্রান্ত দৃশ্য দেখেছেনও যেখানে ছোট ছোট মূর্তি দিয়ে দেখানো হয়েছে যে ছোট্ট যীশু জাবপাত্রে শুয়ে আছেন আর তাঁকে ঘিরে মরিয়ম, যোষেফ, কয়েকজন মেষপালক, “তিন পণ্ডিত” কিংবা “তিন জন রাজা,” কিছু গবাদি পশু ও কয়েকজন দর্শক দাঁড়িয়ে আছেন। সাধারণত মনে করা হয় যে যীশুর জন্মসংক্রান্ত এই দৃশ্যগুলি লোকেদেরকে বড়দিনের আসল তাৎপর্য মনে করিয়ে দেয়। ইউ.এস. ক্যাথলিক অনুযায়ী, “যীশুর জন্মসংক্রান্ত একটি দৃশ্য এতখানিই জোড়ালো প্রভাব ফেলতে পারে যা কোন একটি সুসমাচার বই পারে না, যদিও এই দৃশ্য দেখে এটিকে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বলে মনে হয় না।”
কিন্তু কিভাবে যীশুর জন্মসংক্রান্ত একটি দৃশ্য দেখাতে পারে যে বাইবেলের সুসমাচারের বিবরণগুলি ঐতিহাসিক নয়? যাইহোক, এটি মানতেই হবে যে যীশুর জন্মদিনে সাজানো রংবেরঙ্গের ছোট মূর্তিগুলি দেখে খ্রীষ্টের জন্মের বিবরণকে কাল্পনিক কাহিনী কিংবা রূপকথা বলে মনে হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে একজন সন্ন্যাসী এটি প্রচলন করেছিলেন তবে তখন জন্মসংক্রান্ত দৃশ্য এতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। কিন্তু আজকে এই ছুটির দিনটির সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য বিষয়গুলির মতোই জন্মসংক্রান্ত দৃশ্যগুলিও লোভনীয় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ইতালির নেপল্সে সারা বছর দোকানগুলিতে যীশুর জন্মসংক্রান্ত দৃশ্য কিংবা প্রিসেপির জন্য মূর্তি বিক্রি হয়। এছাড়া রাজকুমারী ডায়ানা, মাদার তেরেজা ও পোশাক নকশাকারী জিয়ান্নি ভারসাচির মতো কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিদের মূর্তিও রাখা হয় যাদের সঙ্গে সুসমাচার বিবরণের কোন সম্পর্কই নেই। কোন কোন জায়গায় প্রিসেপি চকলেট, ময়দার তাল এমনকি সামুদ্রিক প্রাণীদের খোল দিয়েও তৈরি করা হয়। এইসব বস্তুগুলি দেখে আপনি বুঝতে পারেন যে কেন লোকেদের যীশুর জন্মসংক্রান্ত বিবরণকে ইতিহাস বলে মেনে নিতে কষ্ট হয়
তাহলে, কিভাবে যীশুর জন্মসংক্রান্ত দৃশ্যাবলি “এতখানিই জোড়ালো প্রভাব ফেলতে পারে যা কোন একটি সুসমাচারের বই পারে না”? সুসমাচারের বিবরণগুলি কি আসলেই ঐতিহাসিক নয়? এমনকি একগুঁয়ে নাস্তিকরাও যীশুকে একজন বাস্তব, ঐতিহাসিক ব্যক্তি বলে স্বীকার করেন। আর এর অর্থ হচ্ছে, তিনি অবশ্যই এক সময় শিশু ছিলেন এবং তাঁর জন্মের একটি স্থানও ছিল। তাই তাঁর জন্মের বিভিন্ন ঘটনাবলি সম্বন্ধে জানার জন্য কেবল জন্মসংক্রান্ত দৃশ্য দেখার চেয়েও সত্যিই আরও ভাল উপায় থাকা উচিত!
আর ভাল উপায় অবশ্যই আছে। দুজন ইতিহাসবেত্তা আলাদা আলাদাভাবে যীশুর জন্মের বিবরণ লিখেছিলেন। আপনার যদি মনে হয় যে বড়দিন থেকে যীশুকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাদ দেওয়া হচ্ছে, তবে আপনি নিজে এই বিবরণগুলি পরীক্ষা করুন না কেন? এখানে আপনি রূপকথা কিংবা পৌরাণিক গল্প নয় কিন্তু একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় কাহিনী পাবেন—খ্রীষ্টের জন্মের সত্য কাহিনী।
[৩ পৃষ্ঠার চিত্র সৌজন্যে]
৩-৬, ৮ ও ৯ পৃষ্ঠার বর্ডার: Fifty Years of Soviet Art