প্রাচীন প্রযুক্তিবিদ্যা—আধুনিক বিস্ময়
“পৃথিবীর সর্বাধিক উষ্ণ, অতিথিবিমুখ স্থানগুলির মধ্যে একটি হলেও, শহরটি [তুরফান] এখনও একটি সবুজ মরূদ্যান রয়েছে, ২,০০০ বছরের পুরনো প্রযুক্তিবিদ্যাকে ধন্যবাদ,” টরোন্টো, ক্যানাডার দ্যা গ্লোব আ্যন্ড মেইল জানায়।
শুধুমাত্র চীনের সর্বাধিক গরম শহর বলেই তুরফানের সুনাম নেই, কিন্তু পৃথিবীতেও এটি সর্বাধিক উষ্ণ এবং শুষ্ক স্থানগুলির অন্যতম। এই শহরের ১,৮০,০০০ মানুষ তুরফান নিম্নভূমির উত্তর প্রান্তে বাস করে, যেটি তাক্লা মাকান মরুভূমির অংশ। বৃষ্টিপাত প্রায় অজানা, আর প্রচন্ড গরমের জন্য যেটুকু বৃষ্টি পড়ে, মাটি র্ছোয়ার আগেই তা বাষ্পে পরিণত হয়। গ্রীষ্মকালে, ছায়ার নীচে তাপমাত্রা সাধারণত ৫৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি পৌঁছায়।
তবুও, তুরফানের চারিপাশে, প্রায় ৮,০০০ একর জমি নিয়ে গাছপালা ও ঝোঁপঝাড় শহরটিকে পরিবেষ্টন করে রাখে। শহরের পরিসীমার চারিধারে প্রায়ই যে তুমুল বালির ঝড় ওঠে, তার থেকে এই গাছগুলি শহরবাসীদের রক্ষা করে। এই ঝড়ের উৎপত্তি হয় তাক্লা মাকান মরুভূমিতে এবং বিপুল পরিমাণ বালি বয়ে নিয়ে আসে যা বাড়িঘর সম্পূর্ণরূপে ঢেকে ফেলতে আর উর্বর জমি নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারে। সেই জন্য গাছপালা এবং ঝোপঝাড় শহর মরূদ্যানটিকে মরুভূমির ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
প্রতিকূল পরিবেশ, প্রচন্ড বালির ঝড় এবং দুঃসহ তাপমাত্রা সত্ত্বেও, একটি কৃষিকেন্দ্র হিসাবে তুরফান প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সেখানে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন রকমারি খাবার পাওয়া যায়, যার অন্তর্ভুক্ত মরুভূমির খেজুর, আঙুর, তরমুজ, বেদানা, পীচফল, আ্যপ্রিকট, আপেল, বেগুন, পেঁয়াজ, গম ও অন্যান্য শস্য, আর এছাড়াও চীনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট দীর্ঘ-তন্তু কার্পাস। অতীতে যতদূর মনে করা যায়, কৃষি-উৎপাদনের মান এবং বৈচিত্র্যের জন্য তুরফান সুপরিচিত। বহু হাজার বছর ধরে একটি উর্বর মরুদ্যানের মাঝে শহরটি এক সমৃদ্ধিশালী সমাজ হিসাবে গড়ে উঠেছে।
এই অপূর্ব সাফল্যের পিছনে ২,০০০-বছর পুরনো কোন্ প্রযুক্তিবিদ্যা আছে? দ্যা গ্লোব অ্যান্ড মেইল দাবী করে যে শহরটির সাফল্যের কারণ “একটি প্রাচীন জল-সেচন পদ্ধতি যা মানবজাতির সর্বাধিক দক্ষতাপূর্ণ এবং স্থায়ী পূর্তবিদ্যার এক নিদর্শন।” সংবাদপত্রটি আরও জানায়: “[তুরফানের] সুরক্ষার কারণ জলসেচন খাল এবং কুয়ার এক অভাবনীয় গোলকধাঁধা—স্থানীয় উইগুর ভাষায় কারেট্স্ নামে পরিচিত—যা উত্তর-পশ্চিম দিকে ৮০ কিলোমিটার [৫০ মাইল] দূরে বরফ-ঢাকা তিয়ান শান্ পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া জল সংগ্রহ করে।” এই জল হয়ত শহরের খালগুলিতে পৌঁছানোর আগেই বাষ্পে পরিণত হত যদি না তা শত শত সুরঙ্গের মাধ্যমে তৈরি একটি বিস্তৃত জলসেচন ব্যবস্থার সাহায্যে মাটির নীচে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হত।
উইগুররা তাদের জল-সেচন ব্যবস্থা তৈরি করার বহু আগে, প্রাচীন পারস্য দেশের অধিবাসীরা একই ধরনের সুরঙ্গ-গঠিত জলসেচন ব্যবস্থা ব্যবহার করত। এন্সাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা জানায়: “পাহাড়ের মধ্যে সুরঙ্গ অথবা কানাত খোঁড়ার মাধ্যমে পারস্যবাসীরা ভূগর্ভে জলের উৎস তৈরি করেছিল, যেগুলি প্রায়ই ভূপৃষ্ঠের কয়েক শত ফুট নীচে এবং এমনকি ১২ মাইল (১৯ কিলোমিটার) লম্বা হতে পারত।” বাস্তবিকই, এই প্রাচীন জলসেচন প্রযুক্তিবিদ্যা এমনকি আধুনিক কালেও একটি বিস্ময়, কারণ এই ব্যবস্থা পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ, শুষ্ক স্থানগুলির মধ্যে একটিকে, মরূদ্যান হিসাবে বজায় রেখেছে।
প্রাচীন এবং আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা মরুভূমিকে সুন্দর বাগানে পরিণত করলেও, অদূর ভবিষ্যতে, তাঁর রাজ্য সরকারের মাধ্যমে, মানবজাতির আনন্দের জন্য, যিহোবা পৃথিবীর সমস্ত মরুভূমিতে ফুল ফোটাবেন। যিহোবার ভাববাদী বলেছিলেন: “প্রান্তর ও জলশূন্য স্থান আমোদ করিবে, মরুভূমি উল্লাসিত হইবে, গোলাপের ন্যায় উৎফুল্ল হইবে। সে পুষ্পবাহুল্যে উৎফুল্ল হইবে, আর আনন্দ ও গান সহকারে উল্লাস করিবে; তাহাকে দত্ত হইবে লিবানোনের প্রতাপ, কর্মিলের ও শারোণের শোভা; তাহারা দেখিতে পাইবে সদাপ্রভুর প্রতাপ, আমাদের ঈশ্বরের শোভা।”—যিশাইয় ৩৫:১, ২. (g93 3/8)